অভাগিনী
সুলেখা ভান্ডারী,
কসবা, বালিগঞ্জ
ছোট্ট একটি গ্রাম নাম তার মধুবনী। সবুজ গাছ গাছালি ফল ফুলে আর পাখিদের
কলরবে ভরা। তারই মাঝে থাকতো পলাশ আর মালতি। অভাব অভিযোগ থাকলেও কেউ বুঝতে
পারত না। সদা হাসিমুখে থাকতো তারা। এদিকে বছর ঘুরতে না ঘুরতে মালতি
সন্তানসম্ভবা হলো। পলাশের তো মা-বাবা কেউ ছিলনা। তাই পলাশ নিজে একদিন
গ্রামের ঠাকুর মশাইয়ের কাছে গিয়ে মন্দির থেকে পঞ্চামৃত নিয়ে মালতিকে
খাইয়া দিল। ওর তখন পাঁচ মাস। তারপরে যখন ওর সাত মাস তখন মালতি একদিন
পলাশকে বলল
- কিগো তোমার মা থাকলে যেমন করে হোক কিছু রান্না করে আমার সাধ দিত। তা
তুমি আমাকে দেবে না?
- হ্যাঁগো আমার মনে আছে, আমি তো আছি। যেমন করে হোক রান্না করে আমি
খাওয়াবো।
তারপর পলাশ মালতীর সাধ দিলো। সে কষ্ট করে একটা শাড়ি, সায়া, ব্লাউজ,
মালা ঘুমশি, সাত রকম মিষ্টি আর সাত বেঞ্জন রান্না করে আসন পেতে জলের
গ্লাস দিয়ে সুন্দর করে সাজিয়ে গুছিয়ে খেতে দিল গর্ভবতী মালতি কে। তা
দেখে মালতি খুব খুশি হয়েছে। আনন্দে তার দু চোখে জল ভরে গেলো। পলাশ
বলল
- আজ শুভ দিনে চোখের জল ফেলতে নেই। তাতে বাচ্চার অমঙ্গল হবে।
এ যে মালতীর আনন্দের চোখের জল। কেননা মা নেই তো কি হয়েছে, তার স্বামী
তাকে কোনো কিছুর অভাব বুঝতে দেয় না। তাকে সে যে এতো ভালোবাসে তাই তার
চোখে কষ্টের জল নয় এ যে আনন্দের অশ্রুধারা ঝরছে। এদিকে দেখ দেখ করে সময়
এগিয়ে আসছে। হঠাৎ একদিন প্রসব যন্ত্রণা শুরু হলো। মালতি পলাশকে বললো
- কিগো ধাইমাকে ডেকে আনো না। আমি যে আর পারছিনা, মাঝে মাঝে পেটটা ব্যথা
করছে।
পলাশ বললো- হ্যাঁ আমি এক্ষুনি যাচ্ছি, তুমি শুধু ঠাকুরকে ডাকো।
যথারীতি ধাইমা তো এলো।
পলাশকে বললো - একটু গরম জল এনে দে বাবা।
পলাশ তাড়াতাড়ি করে উনানে গরম জল করে এনে দিলো। এই নাও ধাইমা।
বারান্দার এক ধারে কাপড় দিয়ে ঘেরা, সেখানে আছে মালতি। পলাশ তো সেখানে
যেতে পারছেনা। শুধু কানে শুনতে পাচ্ছে মালতির প্রসব যন্ত্রণার কান্নার
আওয়াজ। ও মা গো বাবা গো আমি আর পাচ্ছিনা। ঠাকুর কোথায় তোমরা আমাকে
বাঁচাও আমাকে শক্তি দাও। মালতির খুব যেন ইচ্ছা হচ্ছিল সে যেন একবার
পলাশকে দেখতে পায়। জানিনা তার মন হয়তো জানতে পেরেছিল যে সে হয়তো যদি
না বাঁচে যদি মরে যায় শেষ বারের মতো একটিবার যেন দেখা দেয়। পলাশ একবার
খুব জোরে চিৎকার শুনতে পেলো কানে। তারপরে বাচ্চার কান্নার আওয়াজ শুনতে
পেলো ওঁয়াও ওঁয়াও ওঁয়াও। যাক বাবা নিশ্চিন্ত হলাম। এদিকে মালতি বলছে
ধাইমা আমার কি হয়েছে?
- মেয়ে হয়েছে লো মেয়ে হয়েছে। এক্কেবারে লক্ষ্মী প্রতিমা।
- মেয়ে হয়েছে তাতে কি হয়েছে ধাইমা, নাইবা হলো ছেলে। আমি তো মা হয়েছি
দাওনা বাজিয়ে শাঁখটা একটু।
-ও পলাশ একটু শাঁখটা নিয়ে আয় তো বাবা। বেজে উঠল শাঁখ তিন বার। মালতি
শুনতে পেলো শঙ্খের আওয়াজ। কানে শুধু শুনল চোখে আর দেখা হলোনা মেয়েকে।
ততক্ষণে মালতির চোখে আস্তে আস্তে আঁধার ঘনিয়ে আসছে। তার গলার স্বর ক্ষীণ
হয়ে আসছে।
পলাশ বলল - ধাই মা আমার মালতি কেমন আছে? তার কোনো আওয়াজ পাচ্ছিনা কেনো?
আমাকে একটু ওর কাছে যেতে দাও ধাই মা।
ধাইমা পিছনে ঘুরে তাকিয়ে দেখে মালতি যেন কেমন করছে।
চিৎকার করে উঠল ধাইমা- পলাশ, পলাশ তাড়াতাড়ি ছুটে আয় দেখ মালতি কেমন
করছে। ওর কাছে বস ওর গালে একটু জল দে।
- কেন? কেন? ধাই মা, আমার মালতির কি হয়েছে!
- জানি নে তবে অবস্থা ভালো না।
পলাশ মালতির কাছে এলে মালতি শিথিল হাতে পলাশের হাত দুটো জড়িয়ে বললো
- তুমি ভালো থেকো। আমার মেয়েটাকে দেখো.....
বলতে বলতে মালতি চীরতরে নিদ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে গেলো। মেয়েকে আর দেখা
হলোনা।
চিৎকার করে কেঁদে উঠলো পলাশ- মালতি.........না না তুমি আমায় ছেড়ে চলে
যেতে পারোনা। তুমি চলে গেলে তোমার মেয়েকে কে দেখবে? কেমন করে ওকে আমি
একা মানুষ করব!
একদিন যায়, দুদিন যায়, সপ্তাহ- মাস -বছর যায়। পলাশ একা হাতেই একটু
একটু করে অনেক কষ্ট করে মেয়েকে বড়ো করছিল। পলাশের চাষ আবাদের কোনো জমি
জায়গা ছিলনা। ঘরের সামনে একটু জায়গা ছিল সেখানে একটু আধটু সবজি চাষ
করত। তাই দিয়ে কি আর সংসার চলে? এদিকে একটু করে মেয়ে বড়ো হচ্ছে।
গ্রামের ইস্কুলে একটু আধটু পড়াশোনা করেছে। বেশিদূর পড়াশোনা শেখাতে
পারেনি পলাশ। টাকা পয়সা কোথায় যে পড়াবে। এইরকম করে তো আর চলেনা।
এইদিকে মেয়ে বড়ো হচ্ছে বিয়ে দিতে হবে। তখনকার দিনে তো অল্প বয়সে
বিয়ে হতো। একদিন পলাশ চিন্তা করলো। সে মেয়েকে একা রেখে শহরে কাজের
সন্ধানে যাবে। সারারাত তার চোখে ঘুম নেই শুধু চিন্তা করছে যে মেয়েকে একা
রেখে সে কোনদিন কোথাও যায়নি। তার ভয় হচ্ছিল।
সকালে উঠে অভাগিনীকে বললো
- মা আমি আজ একটু শহরের দিকে কাজের সন্ধানে যাবো।
- কেন বাবা?
- তুমি তো বড়ো হচ্ছ। তোমার তো বিয়ে দিতে হবে। আমার কাছে অত টাকা
কোথায়? কাজ না করলে হবে কি করে?
জন্মেই মাকে হারিয়েছিল বলে সবাই ওকে অভাগিনী বলে ডাকতো। বাবা বললো - মা
তুমি সাবধানে একা থাকবে। কেউ ডাকলে যাবেনা। লক্ষ্মী মেয়ে হয়ে থাকবে।
আমি রাতে বাড়ি আসবো, কেমন?
- ঠিক আছে বাবা, আমি কোথাও যাবনা। তুমি সাবধানে যেও, সময় করে খেয়ে নিও।
তোমার পুঁটুলি তে পান্তা ভাত, আলু সেদ্ধ, নুন, লঙ্কা আর পিঁয়াজ দেওয়া
আছে।
- আচ্ছা বাবা আচ্ছা, ঠিক আছে। তুইও খেয়ে নিস ঠিক সময় করে।
দুগ্গা দুগ্গা বলে মেয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করে দিলো। এদিকে মেয়ে তো বাবার
জন্য খুব চিন্তা করছে কেননা বাবা কোনোদিন তো শহরে যায়নি। কি করছে?
কোথায় কাজ পাবে? কেই বা কাজ দেবে? কেনোনা বাবা তো পড়াশোনা জানেনা। ঘুরে
ঘুরে ঠিক সময় খাবারটা হয়তো খাবেনা। তার মনে কতো কি প্রশ্ন হচ্ছে। বাবার
মনেও মেয়ের জন্য কতো কথা মনে হচ্ছে। হয়তো কতো কান্না কাটি করছে। আমাকে
নিয়ে হয়তো কোনো চিন্তা করছে। একা কি করছে কি জানি। এদিকে পলাশ ট্রেনে
যেতে যেতে একটি ছেলের সাথে দেখা হলো। পলাশ এক কোণে চুপ চাপ বসে মেয়ের
কথা চিন্তা করছিল। হঠাৎ পাশে এসে ছেলেটা বসলো। অনেক্ষন চুপচাপ থাকার পরে
ছেলেটি বলল- কি হলো কাকু চুপচাপ কেন ? কি অতো চিন্তা করছো? কোথায় যাবে ?
কোথা থেকে আসছো?
- না বাবা বাড়ীতে মেয়েটা একা আছে তো। তাই একটু চিন্তা করছি। কোনোদিন
একা রেখে শহরে আসিনি তো। এই প্রথম আসছি কাজের সন্ধানে।
- তা মেয়ে কত বড়ো? এই বছর ষোল সতেরো হবে। এই দেখো আমি শুধু আমার কথাই
বলে যাচ্ছি। তোমার কথা একটুও জানা হলো না। তা বাবা তোমার নাম কি? কোথায়
থাকা হয়?
- ও আমি? আমি কুনাল জানা। ইচ্ছে নদীর পারে আমার বাড়ি। আমি এই বছর দুয়েক
হল শহরের একটা বাড়িতে কেয়ারটেকারের কাজ করি। মাধ্যমিক পাস করেছি। আমার
বাড়িতে আমি আর আমার বৃদ্ধা মা থাকি।
- আমি কোথায় একটা কাজ পাবো? কে দেবে আমায় কাজ ? আমার তো কোনো চেনা জানা
নেই।
কুনাল বলল - ঠিক আছে আমি দেখছি। আমি যে বাড়িতে কাজ করি, বাড়ির মালিক
কিছুদিন আগে আমাকে বলছিল তোর চেনা জানা কেউ থাকলে বলিস তো। আমার একটা
বাগানে মালি লাগবে। তা তুমি করবে নাকি কাকু?
পলাশ কুনালের হাতটা ধরে বলল - তুমি আমায় বাঁচালে বাবা। আমার যে কোন একটা
কাজের খুব দরকার ছিল। তোমাকে কি যে বলে ধন্যবাদ জানাবো আমার মুখের ভাষা
নেই।
- ঠিক আছে আমাকে এইসব বলতে হবে না।
- কাজটা পেলে আমি তোমার কাছে চির ঋণী হয়ে থাকবো।
- তবে আমার সাথে তুমি এখনই চলো। আমি মালিকের সাথে কথা বলিয়ে দেবো।
- তা চলো বাবা।
ট্রেন থেকে বালিগঞ্জ স্টেশনে নেমে একটু হেঁটে তারপরে পৌছাল মালিকের
বাড়ি। সামনে বিরাট বড় লোহার গেট ঢুকেই সামনে ফোয়ারা চারিদিকে বড় উঁচু
পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। পাঁচিলের গায়ে বড় বড় ইউক্যালিপটাস, নারিকেল সুপারি
গাছ। তার মাঝখানে কতো রংবাহারী ফুলের গাছ। দেখে মনটা ভরে গেল। এদিকে ভয়ও
হচ্ছিল, কি জানি কি হবে। কাজটা পাবো তো।
পলাশ এইসব ঘুরে ঘুরে দেখছিল আর ভাবছিল। ততক্ষণে কুনাল মালিকের সাথে দেখা
করে কথা বলতে গিয়েছিল।
হঠাৎ দেখে এক লম্বা চওড়া ব্যক্তি, ধুতি পরা হাতে লাঠি নিয়ে এসে পলাশকে
বলল
- কি পছন্দ হয়েছে ?
পলাশ ওনাকে দেখে প্রথমে রীতিমত ভয় পেয়ে গিয়েছিল। উনি এসে পলাশের কাঁধে
হাত রেখে বললেন
- তুমিই কাজ করবে ?
থত মত খেয়ে বললে- হ্যাঁ হ্যাঁ, আজ্ঞে আজ্ঞে স্যার।
- কোন স্যার ট্যার নয়। কেন ঢোকার সময় নেমপ্লেট দেখনি? সেন বাড়ি লেখা
আছে। আমাকে সেন মশাই বলে ডাকবে ওইসব স্যার ট্যার নয়।
- আজ্ঞো বাবু আমি তো পড়ালেখা জানিনা।
- আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে। কুনাল তুমি ওনাকে সব কাজকর্ম বুঝিয়ে দাও। আমি
আসছি। চলে যাওয়ার আগে যেন চা জল খাবার খেয়ে যায়।
তখন পলাশ মনে মনে বলছিল অভাগিনী আমি একটা কাজ জোগাড় করতে পেরেছি। এখনো
অনেক ভালো মানুষ এই পৃথিবীতে আছে রে মা।
পাঁচটা বাজতে কুনাল বলল- চলো কাকু, বাড়িতে যাবে তো? তাহলে একেবারে
ডিসেম্বরের ১ তারিখ থেকে কাজে লাগবে। আর ৪-৫ দিন পরে। এখন বাড়িতে চলো।
- সত্যি বাবা তুমি গত জনমের আমার কেউ ছিলে। তাই দেখা হল তোমার সাথে। কত
বড় যে উপকার হলো তা বলে বোঝাতে পারবো না।
এদিকে মেয়ে তো চিন্তা করছে। রাত অনেক হয়ে যাচ্ছে, বাবা এখনো বাড়িতে
ফিরছে না। তারপরে রাত আটটার সময় দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ।
পলাশের গলায় এলো - মা, মা রে আমি ফিরে এসেছি।
ছুটে গিয়ে মেয়ে তাড়াতাড়ি করে দরজা খুলে বাবা মেয়ে জড়িয়ে ধরে সে কি
খুশি।
বাবা বললো- মা রে আমি একটা কাজ পেয়েছি।
- কি করে বাবা ? কে দিল ? কোথায়? কবে থেকে যাবে ? কত টাকার মাইনে?
- দাঁড়া রে বাবা দাঁড়া, আমাকে আগে একটু বসতে দিবি তো নাকি ? সব বলব সে
অনেক কথা। তোকে বলবো না তো আর কাকে বলবো। তুই তো আমার সব। মা মরা ধণ। তোর
মা বেঁচে থাকলে আজ কত না খুশি হত। আমি শহরে কাজ পেয়েছি শুনে।
তারপরে ১ তারিখের অপেক্ষায় মেয়ে বাবা। মেয়ে বলল বাবা আমি তোমাকে
প্রতিদিন যাই হোক রান্না করে দেবো তুমি নিয়ে যাবে।
- তুই অত সকালে রান্না করতে পারবি?
- হ্যাঁ বাবা হ্যাঁ। তোমায় তা নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। আমি ঠিক
পারবো।
মেয়ে একদিন ঘরের পাশে একটা ডুমুর গাছে কিছু ডুমুর হয়েছে দেখে তা তুলে
আনলো। ঘরের পিছনে একটা ছোট ডোবা ছিল, তাতে ছোলা কচু হয়েছে দেখে সেগুলো
কেটে আনলো। ডুমুর ভাজা আর কচু শাক রান্না করেছিল।
- বাবা তোমার খাবার গুছিয়ে দিয়েছি তুমি নিয়ে যাও।
এদিকে কুনালও কাজে এলো। একসাথে দুজনে যখন খেতে বসেছিল তখন পলাশ বলল- কি
বাবা একটু খাবে নাকি?
- না না কাকু তুমি খাও।
- আরে আমার মেয়ের হাতের রান্না,খেয়ে দেখো না একটু কেমন হয়েছে।
- তা অত করে বলছেন যখন আমাকে একটু দিন।
অভাগিনীর রান্না মুখে তুলেই একরাশ প্রশান্তি নিয়ে কুনাল বলল
- বাহ বাহ খুব ভালো হয়েছে। কতদিন হয়ে গেল এইসব রান্না খাইনি। মা তো এখন
আর এইসব পদ রান্না করতে পারে না। মা র শরীরটা তো এখন খুব একটা ভালো
যাচ্ছে না। যাইহোক করে একটু আধটু করে।
-তা বাবা একদিন এসো না আমাদের বাড়িতে।
- ঠিক আছে আসব, তবে এখন নয় কাকু, পরে একদিন সময় করে ছুটি ছাটা দেখে
যাব।
মাঝেমাঝে কুনালের মা ছেলেকে বলতো
- আমি আর কতদিন বাঁচবো। তুই একটা বিয়ে কর না বাবা। আমি যেন বৌমার মুখ
দেখে যেতে পারি।
- বালাই ষাট! তুমি কি যে বলো না মা। আমি তোমাকে মরতে দিলে তো।
- তা বলে কি হয়, মৃত্যু যখন আসবে তখন চলে যেতেই হবে। কেউ বাঁচাতে পারবে
না। ডাক এলে চলে যেতে হবে।
পলাশ মেয়েকে বলল- জানিস তোর রান্না খেয়ে একজন খুব প্রশংসা করছিল। আর
যখন খাচ্ছিল আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি কি যে তৃপ্তি করে খাচ্ছিল।
- কে ? কে গো বাবা?
- আরে কুনাল রে মা।
- তুমি চুপ কর তো মিথ্যে কথা।
- নারে মা আমি একেবারে সত্যি কথাই বলছি। আমি কুনালকে একদিন আমাদের
বাড়িতেও আসতে বলেছি। আর এলে তোর হাতের রান্না খেয়ে যেতে বলবো। পিছনের
ডোবাটা থেকে যদি কিছু মাছ পাই আর গাছের চাল কুমড়ো আছে আর একটু চালতার টক
করিস তাহলেই হবে।
- আচ্ছা বাবা আচ্ছা, আগে আসুক তো তারপরে দেখা যাবে।
কুনালের মা এখন আর পিঠে টিঠে করতে পারে না। কুনালকে বলল - বাবা তুই একটু
নারকেল কুরে দিবি।
- কেন মা?
- তুই যে বললি তোর ওই কাকুদের বাড়িতে যাবি। তুই কি খালি হাতে যাবি নাকি
রে ? একটু নারকেল আর গুড় দিয়ে নাড়ু করে দেব, নিয়ে যাস।
- তা দিও মা।
কুনাল আগে থেকে পলাশকে কিছু না জানিয়ে এক রবিবার ছুটি দিনে গিয়ে হাজির।
বাড়ি তো চেনে না রাস্তায় লোকেদের জিজ্ঞাসা করে করে বাড়িতে গিয়েছিল।
- পলাশ কাকু, পলাশ কাকু, বাড়িতে আছো নাকি?
পলাশ তখন একটু ঘরের পিছনে বাগানে মাটি কোঁপাচ্ছিল। বাইরে কারুর আওয়াজ
পেয়ে সেখান থেকেই পলাশ চেঁচে জিজ্ঞেস করল
- কে, কে ? ও কুনাল নাকি? এসো বাবা এসো। কোথায় রে মা দেখ দেখ কে এসেছে।
অভাগিনী ঘর থেকে ছুটে বেড়িয়ে এসে বলে- কে বাবা? কে?
ততক্ষণে কুনাল বারান্দায় উঠে পড়েছে। দুজনে একদম মুখোমুখি। দুজন দুজনকে
দেখে চোখ সরাচ্ছে না।
কি অপূর্ব দেখতে, কোমর ছাপানো কোঁকড়ানো চুল, টিকলো নাক টানা টানা একটু
কটা দুটো চোখ, আর তেমনই ফর্সা।
কুনালও দেখতে খুব সুন্দর। যেমন টিকালো নাক তেমন সুন্দর চোখ। এক কথায়
যাকে বলে, সুপুরুষ।
পলাশ বলল - কিরে মা ওকে একটু এবার জল টল দে, বসতে বল।
মেয়ে লজ্জায় মাথা নিচু করে বলে - হ্যাঁ বাবা দিচ্ছি।
পলাশ কুনাল কে বলল - আজ কিন্তু খাওয়া-দাওয়া করেই যাবে। তা মাকে তো
নিয়ে আসতে পারতে।
- হ্যাঁ আমি বলেছিলাম, কিন্তু মা বলল তুই আগে একবার যা। পরে না হয় কোন
একদিন আমি যাব।
নাড়ুটা হাতে দিয়ে বলল - নাও কাকু মা বানিয়ে দিয়েছে।
- তা বাবা আবার এইসব কেন ? একে ওনার শরীরটা তেমন ভালো যাচ্ছেনা।
নাড়ু পেয়ে অভাগিনী তো খুব খুশি। কারণ ছোট থেকে তো কোনদিন মাকে দেখেনি।
মায়ের হাতে বানানো কোনদিন কিছুই খায়নি। তাই তার খুব ভালো লাগলো। সে
টপাটপ দুটো নাড়ু খেয়ে ফেলল ওদের আড়ালে। কেননা তাতে মায়ের হাতে ছোঁয়া
আছে।
তারপরে আলু ভাজা ডিম ভাজা দিয়ে মুড়ি মেখে খেতে দিল। পলাশ ডোবা থেকে মাছ
ধরে নিয়ে এলো। মেয়ে একাই সব রান্না বান্না করলো উনানে। বাবাকে আর
কুনালকে একসাথে আসন পেতে গ্লাসে জল দিয়ে কলাপাতায় খুব সযত্নে পরিপাটি
করে তাদের খেতে দিল। দুজনে খুব হাসি গল্প বলে মজা করে খাচ্ছিল।
অভাগিনী বলল
- বাবা আর কিছু লাগবে নাকি? তুমি ওনাকে জিজ্ঞাসা করো।
- কি বাবা লজ্জা করে খাচ্ছো না তো? আর কিছু লাগবে? বলো বাবা অভাগিনী মা
আমার জিজ্ঞাসা করছে।
- চাল কুমড়ো টা খুব ভালো হয়েছে। আর আছে ? তাহলে একটু দিতে পারো।
- হ্যাঁ দিচ্ছি।
খাওয়া দাওয়া সেরে শীতের দুপুরে উঠানে মাদুর পেতে পলাশ ও কুনাল একটু ভাত
ঘুম দিয়ে নিল। তারপরে সন্ধ্যে হবে হবে তখন কুনাল বলল
- এবারে তবে আমি আসি? মা একা আছে। সপ্তাহে একটা দিনই তো আমাকে কাছে পায়।
মনে মনে বললো বাড়ি গিয়ে মার কাছে সব গল্প করব। কি কি খেয়েছে, মেয়েটা
কেমন দেখতে, তাদের ব্যবহার, ইত্যাদি।
কুনাল সারাদিনের সব কথা রাতে শুয়ে শুয়ে মায়ের কাছে বলল। মা শুনে খুব
খুশি হয়েছে।
একদিন কাজে যাওয়ার সময় পলাশের সাথে দেখা হল। সে কুনালের হাতটা ধরে
বলল
- আমার মা মরা মেয়েটাকে তুমি বিয়ে করো। আমি তোমার মত ভালো ছেলের হাতে
দিতে পারলে খুব খুশি হবো। তুমি না করো না বাবা।
- আমি আর কি বলবো, বাড়িতে তো মা আছে। আমি তো হ্যাঁ বলতে পারি না। আপনি
একদিন আমাদের বাড়িতে এসে মায়ের সাথে কথা বলবেন এই ব্যাপারে।
- ঠিক আছে, আমি যাব একদিন।
পরের একটি রবিবার দেখে পলাশ গেল কুনালের মায়ের সাথে কথা বলতে। মায়ের
সাথে সব কথাবার্তা হল। কুনালের মা পলাশ কে বলল
-আমাদের দুজনার বয়স হয়েছে, তার উপর আমার শরীরটাও ভালো না। দুজনে থাকতে
থাকতে চার হাত এক করে দিতে পারলে বাঁচি।
যথা সময়ে শুভ দিন দেখে ওদের চার হাত এক করে দিল। কুনাল ও তার মায়ের কোন
দাবি ছিল না। ওরা বলেছিল আমাদের কিছু লাগবে না। শুধু আমার ঘরের লক্ষ্মী
এলে হবে।
কন্যা বিদায়ের সময় অভাগিনীকে ধরে রাখা যাচ্ছিল না। সে তার বাবাকে
জড়িয়ে ধরে খুব কাঁদছিল। বারবার বলছিল- তোমাকে সবসময় বাবা বাবা বলে
ডাকবে কে? তোমাকে খেতে দেবে কে?
পলাশ কুনালকে জড়িয়ে ধরে বলল- তুমি আমার মা মরা মেয়েটাকে দেখো। ওকে
সুখে রেখো তুমি। অভাগিনী তুই মা কুনালের মায়ের যত্ন আত্তি করিস সংসারে
সবাইকে নিয়ে ভালো থাকিস মা।
- আপনি কোন চিন্তা করবেন না। আমি কথা দিচ্ছি ওকে ভালো রাখার চেষ্টা করব।
আপনিও ভালো থাকবেন। সময় মত খাওয়া দাওয়া করবেন।
পালকিতে করে গ্রামের আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে যতদূর দেখা যায় বাবা ও
মেয়ে একে অপরের দিকে তাকিয়ে ছিল। এক সময় আর দেখা গেল না। কুনাল বলল-
ঠিক আছে আর কান্নাকাটি করতে হবে না। একটু জল খাবে?
সে মাথা নাড়লো না। তখন ইচ্ছে নদীর পাড়ে সাজো সাজো রব। সবার মুখে কখন
আসবে নতুন বৌমা। এদিকে পলাশের মা পাশাপাশি বৌদের বললো
- কিগো বৌমারা বরন ডালা সাজিয়ে রেখেছ তো? এই বুঝি আমার ঘরের মা লক্ষ্মী
এসে পড়ল।
- হ্যাঁ জেঠাইমা আমাদের যখন দায়িত্ব দিয়েছো আমরা সব গুছিয়ে রেখেছি।
তারপরে শোনা গেল হুন হুনা রে হুন হুনা হুন হুনারে হুন হুনা পালকি চলে...
পালকি চলে... পালকি চলে রে। পালকি এসে নদীর পাড়ে পৌঁছালো। সবাই শঙ্খ
নিয়ে উলুধ্বনি দিতে দিতে চলে এলো। অভাগিনী যখন পালকি থেকে পা নামিয়ে
দাঁড়িয়েছে তখন সবাই দেখে বলাবলি করছে এ তো একেবারে মা লক্ষ্মী প্রতিমা।
উফ্ কুনালের বউ বলে কথা। একেবারে যেন লক্ষ্মীর পাশে নারায়ণ। কুনাল তার
মালিককে তার বিয়েতে আসার জন্য বলেছিল।
সেন মশাই বলেছিলেন - নারে আমি যেতে পারব না অত দূরের পথ। তারপরে আমার
শরীরটাও কয়েকদিন হলো ভালো যাচ্ছেনা। ঠিক আছে, এই টাকা তুই রাখ। আমি যেতে
পারলাম না তুই ভালো করে বিয়ের আয়োজন করিস। আর এই গহনাটা তোর বউকে দিবি।
বলবি আমি দিয়েছি।
- ঠিক আছে বাবু। তবে গেলে সবাই খুব খুশি হত। বিশেষ করে মা।
বাড়িতে মিষ্টি তৈরির ভিয়েন বসেছে, দই পাতা হচ্ছে, মাছ ধরা হচ্ছে, কাঠ
কাটা হচ্ছে, কলাপাতা কাটা হচ্ছে, মুড়ি ভাজা হচ্ছে। বড়ি দেওয়া হয়েছে,
পান সাজানো হচ্ছে। সে কি তোড়জোড় সব, কুনালের বিয়ে বলে কথা। সবাই খুব
খুশি, সবার মনে খুব আনন্দ। চারিদিকে শুধু হইচইয়ের শব্দ। রাতে ফুলশয্যার
ঘরে কুনাল অভাগিনীকে ফুলের সাজে দেখে বলে
- যার এত সুন্দর রূপ তার এই নামে মানায় না। আজ থেকে আমি তোমার নাম
রাখলাম রাজলক্ষ্মী। কি পছন্দ হয়েছে তো ?
লজ্জায় দুহাতে মুখ ঢেকে বলল- খুব পছন্দ হয়েছে। সকালে উঠে মাকে বলবে আমি
আজ থেকে তোমায় রাজলক্ষ্মী নাম দিলাম।
- হু ঠিক আছে বলবো।
নতুন বৌমার হাতের ছোঁয়ায় বাড়িঘর যেন ঝলমল করছে। সব সময় সব কাজে
পরিপাটি। ঘর দুয়ার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। আশেপাশে সবার সাথে খুব সুন্দর
ব্যবহার। শাশুড়ির সেবা যত্নের কোন ত্রুটি রাখেনি। কুনালকে সে স্বামী
হিসেবে পেয়ে খুব খুশি। অভাগিনীও থুড়ি রাজলক্ষ্মী কুনালের মায়ের মত এমন
ভালো মানুষ শাশুড়িকে পেয়ে তার আজন্ম মায়ের অভাব পূর্ণ হয়েছে।