আনমনা ছবিঘর
অনিন্দিতা গুড়িয়া,
নিউ-দিল্লি
শরত কাল আমার দোরগোড়ায় এসে দাঁড়িয়েছে। আকাশে সাদা মেঘগুলোর বাড়ি
ফেরার পালা। ছাদের গাছগুলিতে মাঝে মাঝে খেয়ালি হাওয়া দোল দিয়ে যাচ্ছে
আর একটা হলুদ কালো টিপ টিপ প্রজাপতি গাছের ডাল-পাতা আর ফুলের সাথে
লুকোচুরি খেলছে। আকাশটা বর্ষা শেষে বৃষ্টি ধোওয়া, ঝকঝকে নীল।
বিয়ের পর বাইশ বছর হল আমার দিল্লি শহরে শরত কাটানোর। এ ক’বছর বাংলা থেকে
অনেক দূরে আছি, কিন্তু, অবাক হয়েছি এই দেখে যে শরতের এই দিনগুলো সবখানেই
এক রকম – ঝকঝকে সোনালি রোদ, নিবিড় নীল আকাশে সাদা- সাদা পাল তোলা মেঘ,
হাইওয়ের দু'ধারে যত্রতত্র দুধেল সাদা কাশের বন আর এর মাঝে আমি এক আনমনা
প্রবাসী বঙ্গবাসিনী। কাজ ফেলে মাঝে মাঝেই চোখ চলে যায় আকাশপানে, মন টানে
গ্রামে, আমার জন্মভূমি পশ্চিম বাংলায়। উপড়ে ফেলা শিকড়টা মাটির টানে
কাতরায়। আমার মনও দীর্ঘঃশ্বাস ফেলে ডায়রির পাতায় স্মৃতি চারন করে।
প্রতিবার ভাবি, ‘অনেক তো হল, পরবাসেই যখন ঘর, মন তুমি এখানেই মন দাও।
মাটির টানে আর কেঁদো না’।
কিন্তু আমার প্রবাসী অভিমানী মন জড়িয়ে থাকে শরতের সঙ্গে জড়ানো স্মৃতির
জালে। আমাদের পাড়ার গড়ের পুকুরের ধারে দুটো বড় বড় শিউলি গাছ ছিল।
শরতের ভোরে পুকুরের পাড় আর জল জুড়ে পড়ে থাকত দুধেল সাদা আর কমলা রঙের
একটা গালিচা। মুঠোভরে কুড়িয়ে আনতাম শিউলি। দুহাত ভরা শিউলি নাকের কাছে
নিয়ে গিয়ে লম্বা একটা শ্বাস টেনে বুক ভরে শিউলির সুবাস নিতাম। শিউলির
সেই পরশ এখনও লেগে আছে মুখে, চোখে, মনে। মন খুঁজে মরে সেই সুবাসিত শিউলি।
এখানেও কখনো এক আধবার শিউলি ফুল চোখে পড়েছে, তবে সে শিউলির না আছে তেমন
রূপ আর না আছে গন্ধ। শহরের ধুলো বালি দূষণে সাদা কমলা শিউলি যেন অন্য রূপ
ধারণ করেছে, আর সেই শিউলি কুড়িয়ে নাকে শোঁকার মত দুষ্পর্ধাও দেখাতে
পারি না।
আরও স্মৃতি ভিড় করে আসে মনে, জোর করে মনকে সরিয়ে আনার চেষ্টা করি। পিঠে
বাড়ি মারছে সংসারের কাজ। ছেলেমেয়ে স্কুল কলেজ থেকে ফিরবে - তাদের
খাওয়া-দাওয়ার জোগাড়, ঘরে দুটো পোষ্য আছে তাদের ভালো-মন্দের চিন্তা,
ছাদের উপরে অসংখ্য গাছ-গাছালির পরিচর্যা, সন্ধ্যায় নিজের মানুষটা
বাড়িতে ফিরবে, তার ডিউটির জামা এখনো প্রেস করা হয়নি।
কিন্তু দুচোখ ভরা তখন অতীতের ছবি, গন্ধ। রোজ সকালে চার বোনের
ক্যালেন্ডারে দিন গোনা; স্কুল থেকে ফিরে রোজ নিয়ম করে সেই বাড়ি যেতাম,
সুবোদা পূজা বার্ষিকী আনলে কি না দেখতে। রান্নাঘরে বয়াম ভরা নারকেল
নাড়ু, ক্ষীরের ছাপা সন্দেশ, ডালের বরফি। একটা বড় অ্যালুমিনিয়ামের
হাঁড়িতে মুখ বেঁধে রাখা থাকতো মিষ্টি মাখা খই। বিজয়া দশমীর দিন ভাসান
দেখে বাড়ি ফিরেই খোলা হবে সেই হাঁড়ির মুখ। আর বড় বড় বাটি ভরে সেই খই
আর তার সাথে নারকেল নাড়ু, ক্ষীরের ছাপা সন্দেশ, ডালের বরফি দিয়ে মা
বাড়ি বাড়ি পাঠাবে বিজয়ার প্রণাম করতে।
– উফ কত কাজ পড়ে আছে, মনের সুতোয় টান দিয়ে মনকে বর্তমানে ফিরিয়ে আনার
ব্যর্থ চেষ্টা করলাম। এবার মনকে একটু কড়া গলাতেই শাসন করে বললাম, ‘অনেক
দিন আগেই তো শিকল কেটে উড়িয়ে দিয়েছে অচিন আকাশে, দিব্যি তো নতুন আকাশ
দখলের লড়াইয়ে ডানা মেলেছ, আবার কেন পুরানো দাঁড়ের জন্য
কান্নাকাটি?’
মনে তখন ঢাকের বাদ্যি। বাবার কিনে দেওয়া, কখনো বা বাবার নিজের হাতে তৈরি
করে দেওয়া নতুন জামার খুশি, বুকের ভিতর আনন্দের একটা তিরতিরে কম্পন
সবসময়। হাত গুনতাম কবে মহালয়া। মহালয়ার ভোরে বাবা রেডিওতে চালিয়ে দিত
বাণী কুমারের মহিষাসুরমর্দিনী। গুরুগম্ভীর দরাজ কণ্ঠে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ
ভদ্রের চন্ডীপাঠে গমগম করে উঠত পাড়া, আকাশ বাতাস পুজোর আবেশে মুখরিত
হয়ে উঠতো।
রেডিওতে মহালয়া শেষ হতো কি হতো না, এক ছুটে চলে যেতাম হেমন্ত দাদুর
বাড়ি, টিভিতে কলকাতা দূরদর্শনে মহালয়া দেখব বলে। পঞ্চমীর দিন আমাদের
স্কুলে অ্যানুয়াল ডে হতো, খুব ছোট থেকেই স্কুলের প্রতিটা অনুষ্ঠানে
অংশগ্রহণ করতাম। কখনো নাচ, কখনো গান, কখনো ইংরেজি বা বাংলা নাটকে। সেদিন
সারাদিন ব্যস্ত থাকতাম বিবেকানন্দ হলে। তারপর ষষ্ঠীর দিন সকালবেলা
সাতটায় স্কুল বসতো। ছুটির কাজ বুঝে নিয়ে দশটা বাজলেই ছুটির নোটিশ হাতে
পেয়ে যেতাম। তারপর ছুটি.......ছুটি......ছুটি.......
পুরো এক মাসের ছুটি। দুর্গাপুজা, লক্ষ্মীপূজা, কালীপুজা, ভাইফোঁটা সেরে
তারপর স্কুল খুলবে।
তখন স্কুলে ছুটি পড়লেই টিভিতে 'ছুটি ছুটি'- নামে একটি অনুষ্ঠান হতো। সেই
সময় আমাদের নিজেদের বাড়িতে টিভি ছিল না, টিভি দেখার জন্য যেতে হতো
হেমন্ত দাদুর বাড়িতে অথবা আমাদের সেই বাড়ি মানে জেঠুদের বাড়িতে। সেই
সময় আমাদের গ্রামে ইলেকট্রিসিটি ও ছিল না, ব্যাটারিতে টিভি চলত। আর
ব্যাটারি ফুরিয়ে গেলে টিভি চলতো না। সারা ছুটিতে যে ছুটি ছুটি অনুষ্ঠান
টা দেখতে পেতাম এমন নয়, বেশিরভাগই দিনই দেখা যেত ব্যাটারি না থাকায়
অনুষ্ঠানটা দেখতে পেতাম না। সে ছিল এক ভারী মন খারাপের পালা। তবে সে মন
খারাপ বেশিক্ষণ স্থায়িত্ব হত না, মা বাবা আর বোনেদের সাথে হাসি মজা গল্প
গান আড্ডা ইত্যাদিতে ভরে উঠতো ছুটির দিনগুলো।
তখনো আমাদের পাড়ায় পুজো শুরু হয়নি, পুজো দেখতে যেতে হতো মাঝের পাড়ায়
অথবা মোহনপুরে। সপ্তমীর ভোরে পাট ভাঙ্গা নতুন জামা পরে, একটি রেকাবে
সাতটি ছোট ছোট বাটিতে সাজিয়ে নিতাম সিঁদুর চন্দন সহযোগে সাতটা রঙের
ডালি, আর থাকতো দুর্গা ফোঁটা ফল, যাকে অনেকে ঝাঁপি ফোঁটা ফল বা পেটারি ফল
ও বলে। যা আমরা ষষ্ঠীর দিনই জোগাড় করে রেখে দিতাম।
ঠাকুর ঘর তুলসী মঞ্চ থেকে শুরু করে সবগুলো ঘরের দরজার মাথায় ফোঁটা দিয়ে
তারপর আবার পাড়া-প্রতিবেশী এবং জ্ঞাতি কুটুম্বদের বাড়িতেও আমরা ফোঁটা
দিতে যেতাম। ছোটরা আমরা সবাই সবার নতুন জামা কাপড় দেখতাম আর ফোঁটা দিতে
গিয়ে বাড়ি বাড়ি নারকেল নাড়ু, রসকরা, ছাপা সন্দেশ, ডালের বরফি খেয়ে
বেড়াতাম। সে একটা দারুন মজার ব্যাপার ছিল।
এর ফাঁকেই ছোট বোন গুলোর হাত ধরে আমরা ভিড় করতাম দানে পুকুরের চাঁদনীর
ঘাটের পাশে, সেখানে তখন তাক্ কুড়কুড়- তাক্ কুড়কুড় করে ঢাক বাজছে।
মুহুর মুহুর উলুধ্বনি, শঙ্খ ধ্বনি আর ধূপ ধুনোর মাঝে চোখ ভরে দেখতাম
নবপত্রিকা বা কলা বউ স্নান। শুনতাম মনে ঘোর লাগানো ঢাকের বাদ্যী। তারপর
ঢাক বাজিয়ে ঠাকুরমশাইয়ের কোলে থাকা লাল পাড়ের সাদা শাড়ি জড়ানো লম্বা
ঘোমটা টানা নবপত্রিকার পিছন পিছন আমরাও হাজির হতাম মাঝের পাড়ার বটতলা
পুজো মন্ডপে। আগে ওটা আমাদের ওই তল্লাটের জমিদার জগদীশ হালদারের বাড়ির
পুজো ছিল। ক্রমে তা সার্বজনীন পূজায় পরিণত হয়। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে
থাকতাম শান্ত সৌম্য মাতৃমূর্তির দিকে।
অষ্টমীর সকালে মায়ের সদ্যস্নাত ঢেউ খেলানো এলো চুলের সিঁথিতে টানা
সিঁদুরের রেখা, কপালে জ্বলজ্বলে রক্ত জবা সিঁদুরের লাল টিপ, পরনে আটপৌরে
করে পরা মোটা সুতোয় বোনা রংবেরঙের চেক চেক নীল- বেগুনি তাঁতের শাড়ি,
হাতে ঝকঝক করছে শাঁখা পলা, পায়ে গাঢ়ো লাল আলতা। এই সামান্য সাজ পোশাকেই
অপরূপা আমাদের মা। আমরা মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতাম মায়ের দিকে। বাবা
কাজে বেরিয়ে গেলেই মা দ্রুত হাতে সারতো পুজোর কাজ। ফল কাটার সময়,
নৈবেদ্য সাজানোর সময় বা নারকেল কোরার সময় মায়ের হাতের শাঁখা পলা আর
সোরু চুড়ি থেকে মৃদু আওয়াজ উঠত।, যখন মা চালগোলার বাটিতে ঠাকুমার
পুরানো পরিষ্কার সাদা থান বা বাবার পুরানো কোন পরিষ্কার সাদা ধুতির টুকরো
ডুবিয়ে তুলসী মঞ্চ, ঠাকুর ঘর, আর সব ঘরের শর্দালে আলপনা দিত, মায়ের
মোটা সুতোর তাঁতের শাড়ি থেকে খসখস করে শব্দ উঠতো। আমরা অবাক বিস্ময়ে
দেখতাম কেমন করে মা চালের গুঁড়োয় কলা মেখে বিভিন্ন রকম রং করে ঝকঝকে
করে মেজে রাখা পিতলের রেকাবে একটু একটু করে গড়ে তুলত শ্রী। বছর বছর
আলাদা আলাদা আকৃতির আর আকারের অনন্য সব শ্রী গড়তো আমার মা। পাড়ার
প্রায় সব মেয়ে বৌ রা আমাদের ঠাকুর ঘরে মহাষষ্ঠী আর মহাঅষ্টমীর ব্রত করে
পূজা অঞ্জলি দিতে আসতো।
দুপুরে মায়ের হাতে লুচি, নারকেল কুচি দেওয়া ছোলার ডাল, সুজির বরফি
খেয়ে বিকেল বিকেল মা আমাদের সাথে নিয়ে চলে যেত ডায়মন্ড হারবারে বাবার
দোকানে। আমাদের আশেপাশের মধ্যে ডায়মন্ড হারবারে সবথেকে ভালো দুর্গাপূজা
হয়। ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় গোটাকুড়ি ঠাকুর ওঠে। বাবা দোকান থেকে একটু
তাড়াতাড়ি ছুটি নিয়ে আমাদেরকে সাথে করে প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘোরায়,
আর দেখায় দারুন দারুন সব প্যান্ডেল, লাইটিং, মূর্তি। তারপর পেট ভরে আলুর
চপ, ফুচকা, ঘুগনি, ঝাল মুড়ি, ভেজেটেবল চপ ইত্যাদি খেয়ে বেলুন কিনে আমরা
বড় দুই বোন বাবার সাইকেলে আর ছোট দুই বোনকে নিয়ে মা ভ্যান- রিকশায়
চেপে বাড়ি ফিরতাম।
দশমীর দিন সন্ধ্যায় লাল পাড় সাদা শাড়ি পড়ে হাতে রেখাবে সিঁদুর জল
মিষ্টি আর পান নিয়ে মা আমাদেরকে সাথে করে যেতো ঠাকুর বরণ করতে। প্রদীপের
কাঁপা কাঁপা আলোয় ত্রিনয়নীর ম্রিয়মাণ হয়ে আসা সিঁদুরে রাঙা মুখ,
ছলছলে চোখ; বিদায় বেলার উদাস হাসি, আর ঢাকের করুন বোলে আকাশ বাতাস
ব্যথীত হয়ে উঠতো। ভাসানের সময় 'আবার এসো মা'- বলে দুটো হাত জড়ো করে
কপালে ঠেকিয়ে চোখ ভরা জল নিয়ে ভারাক্রান্ত মনে বাড়ি ফিরতাম।
প্রতি বছর এই সময় শরত আমার দ্বারে এসে আমায় হাঁসায়, কাঁদায়, ভাসিয়ে
নিয়ে যায় স্মৃতির স্রোতে, অতীতের ফেলে আসা শরতের দিনগুলোতে। কিন্তু
গ্রামে ফেরা আর হয় না! এই সময় এখানে বাচ্চাদের স্কুলে ছুটি থাকে না,
শুধুমাত্র দশমীর দিন বলা ভালো দশেরাতে ছুটি পায় ওরা। আর তার উপরে দুধের
স্বাদ ঘোলে মেটাতে কয়েকজন বাঙালি মিলে এখানেও আমরা ছোট করে পূজা করি।
পুজোর চারটে দিনে সন্ধ্যার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের দায়িত্ব থাকে আমার
উপরে, তার জন্য পূজোর তিন মাস আগে থেকে শুরু হয়ে যায় রিহার্সাল। ছোট
ছোট বাচ্চাদেরকে নাচ গান আবৃত্তি শেখাই, হিন্দি বাংলা নাটক করাই, নিজেও
দুই একটা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করি। পুজো চার দিন এমন ব্যস্ততার মধ্যে কাটে
যে নিঃশ্বাস নেওয়ারও যেন সময় পাইনা।
এখানেও আশেপাশে অনেকগুলো ঠাকুর ওঠে। প্রতিদিন প্রায় দুবেলা নতুন নতুন
শাড়ি সাথে ম্যাচিং গয়না পরে পূজা মন্ডপে যাই। আগের থেকে অনেক বেশি
পূজার কেনাকাটা করি এখন। নিজের গাড়িতে করে ঠাকুর দেখতে যাই, নিজেদের
পূজা মন্ডপে ধুনুচি নাচ, এংকারিং করা, ফাংশন ইত্যাদি নিয়ে খুবই ব্যস্ত
থাকি। কিন্তু তবুও কোথাও যেন অনেক কিছু ফাঁকি রয়ে যায়। আমার অবুঝ মনের
অভিমান কোথায় আমি বুঝি। ফিরে যেতে চায় সে ফেলে আসা নিশ্চিন্ত সেই
গ্রামের দিনগুলোতে, মেতে উঠতে চায় উৎসবের রঙে, ফিরতে চায় সবার মাঝে, সব
ফেলে পালাতে চায় অকারণ খুশির খোঁজে।।