অপেক্ষা

ঝুম্পা মন্ডল,

ডায়মন্ড হারবার, দঃ ২৪-পরগনা

আজ অফিস থেকে তুষার বাড়ি ফিরে ফ্রেস হয়ে সোফায় আয়েস করে ঋতুর পাশে বসলো। কি খবর, সারাদিন কেমন আছো বলতে বলতে তার পেটের উপর থেকে শাড়ীটা সরিয়ে পেটে হাত রাখলো। সস্নেহে হাত বুলিয়ে দিলো পেটের এদিক ওদিক, কয়েক সেকেন্ড পরেই মুখটা হাসিতে ভরে উঠলো তার, বললো... "দেখো দেখো কেমন লাথি মারছে। আমি হাত দিলেই কেমন টের পেয়ে যায় যেন ও তাইনা !"

ঋতু মাথা নাড়লো, ভিতরের সন্তানের আনন্দটুকু অনুভব করতে পারছে সে। ও জানে তুষার এসে ঋতুর পেটে হাত দিলেই বাচ্চাটা কেমন যেন একটু বেশিই নড়ে চড়ে ওঠে। বাবার উপস্থিতিতে মায়ের মনের যে চঞ্চলতা ভালো লাগা.... সেটা থেকেই বাচ্চারা ভিতরে থাকতেই অনুভব করে এই যে এখন কাছে আসার মানুষটা মায়ের মত আমারও খুব আপন। এইভাবেই জন্মের আগে থেকেই বাবাকে চিনতে শেখে শিশুরা।

ঋতু তুষারের হাতের উপরে হাত রাখলো। আজ মনটা তার ভালো নেই।

তুষার অন্য দিনের মত বললো, "সোনামা টা দিনদিন কিন্তু দুস্টু হয়ে উঠছে খুব।"

ঋতু অন্যমনস্ক ভাবে বললো , "না সোনা মা নয়, মেয়ে নয়, ছেলে হোক আমার। "

তুষার একটু অবাক হয়ে ঋতুর কাছে সরে এসে মৃদু হেসে বললো, "একি নতুন কথা !! এমনটা তো কথা ছিলোনা, তুমি তো মা মা কোরো, আজ হঠাৎ ছেলে কেন গো!"

ঋতুকে চুপ থাকতে দেখে তুষার ঋতুর হাতের আঙ্গুল গুলো নিজের আঙুলে বেঁধে বললো, " আমি চাই তোমার মত মিষ্টি একটা ছটপটে মেয়ে হোক আমাদের। "

বলে ঋতুর নাকটা টিপে দিলো আলতো করে।

ঋতু কেমন অস্থির ভাবে বলল, "না মেয়ে চাইনা, ছেলে চাই আমি, তুমিও আর কখনো মেয়ে চেয়োনা।"

তুষার ঋতুর মুখের দিকে তাকিয়ে এবারে অবাক হলো ভীষণ।

বুঝলো ঋতুর মনটা আজ ভীষণ খারাপ। তুষার ব্যস্ত হয়ে বললো... "ঋতু কি হয়েছে তোমার!! "

একটা রাগ, বিরক্তি, কষ্ট সবকিছু নিয়ে ভীষণ পাজল ঋতু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো , "মেয়ে হলে অনেক সমস্যা।"

তুষার এবারে ভালো করে ঋতুর দিকে লক্ষ্য করে অবাক হয়ে গেলো, ঋতু কাঁদছে!! এইভাবে ওকে ভেঙে পড়তে ও দেখেনি।

ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে না পেরে ঋতুর কাছে এসে বললো "আচ্ছা ছেলে হোক আর মেয়ে সুস্থ সবল হোক এটাই চাই।"

ঋতু দুইদিকে মাথা নেড়ে বলল, " না না ছেলে চাই আমার। "

তুষার ঋতুকে আর ঘাঁটালো না, ওর কাছে সরে এসে হাতটা ধরে মৃদু চাপ দিলো, প্রেগনেন্সির সময় নানারকম ভাবে মুড সুইঙ হয়, সেটাই ভেবে চুপ করে থাকলো, ভাবলো কোনোকারণে মনটা বড্ড বিক্ষিপ্ত ঋতুর, নিশ্চই কিছুক্ষণ পরে তাকে সব বলবে নিজে থেকেই। কিছুটা সময় দিলো তাকে।

ঋতু তুষারের কাঁধে মাথা রাখলো। তুষার এক হাত দিয়ে ঋতুকে জড়িয়ে ধরে কষ্টটা বোঝার চেষ্টা করলো। ঋতু শান্ত হলে একটু পরে রিমোট নিয়ে টিভি অন করলো সে।

তারপরেই তুষারের চোখ আটকে গেলো টিভির খবরে, ধর্ষিতা মেয়েটির মা তখন এক সাক্ষাৎকারে হাহাকার করে বলছে "দশ বছর ধরে এই বিচার আমি চাইনি। "

খবরটা শুনে তুষার মাথা নাড়িয়ে বললো "ইসস ছেড়ে দিলো??"

ঋতু এবারে আস্তে আস্তে বলল," খুব আদরে মানুষ করবো আমরা আমাদের সন্তানকে , তিল তিল করে, কোনো কষ্ট যেন আমার সন্তানকে ছুঁতে না পারে, সব বাবা মায়ের তো এই ইচ্ছেটাই থাকে বোলো! "

তুষার টিভির ভলিউম কমিয়ে দিয়ে সম্মতিসূচক মাথা নাড়লো বিষণ্ণ মনে।

"তাহলে বলতে পারো?? সেই আদরের সন্তানকে কয়েকটা পিশাচ মিলে কি অত্যাচার!! " ঋতুর চোখে মুখে তীব্র কষ্ট... "তারপরে কতটা নিষ্ঠুর!! মেয়েটার নাভি পর্যন্ত ছিঁড়ে দিয়েছিলো। মাথা কেটে.... উফফফ! "

এইটুকু বলার পরে ঋতুর চোখে মুখে তীব্র ব্যথার রেখাতে ভরে গেলো।

অনেক বছর আগের শোনা খবর, তবুও আজ আবার ঋতুর কথায় শিউরে উঠলো তুষার । ঋতুর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল "চুপ কোরো ঋতু , আর বলোনা, ওরা এতো সহজে হাল ছাড়বে না, সুপ্রিম কোর্টে নিশ্চই যাবে। শাস্তি পেতেই হবে ওদের ।"

"কি অদ্ভুত না!! দশ বছর ধরে.... একজন মা, তার পরিবারের লোক নিজের সন্তানকে হারিয়ে শুধু অপেক্ষা করে যাচ্ছে সঠিক বিচারের। ভাবো তো!!

তুষার কিছু বলতে পারেনা, খবরটা শুনে তারও ভীষণ কষ্ট হচ্ছে, রাগ হচ্ছে, কেমন এক হতাশা ঘিরে ধরলো তাকে ।

"তাহলে বলো আমাদের যদি এইরকম মনের অবস্থা হয় তাহলে সেই মেয়েটার বাড়ির লোকের অবস্থা কেমন? তার মায়ের মনের অবস্থা কেমন!! মেয়েটা মরেই গেলো, তিল তিল করে বড়ো হয়ে ওঠা মেয়েটা শুধুমাত্র কয়েকটা নোংরা মানুষের লালসার শিকার হয়ে চিরতরে শেষ হয়ে গেলো। মেয়েটার মা কি করতে পারলো?? কিচ্ছু না। করলো শুধু অপেক্ষা, দশটা বছর ধরে কেস চললো!!

তুষারের কিচ্ছু বলার নেই, কি বলবে সে!!

ঋতু আত্মমগ্নর মত বলেই চলেছে..."মেয়েটার উপরে অত্যাচার করেছে যারা, কোর্টে মেয়েটার মায়ের নিশ্চই ইচ্ছে করেছিলো সামনে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে হাসতে থাকা পিশাচগুলোকে ছিঁড়ে ফালা করে দেয়। কিন্তু নাহ , বিচারের উপরে আস্থা রেখেছিলো। কিন্তু আজ, এই পিশাচ গুলো হাসতে হাসতে ছাড়া পেয়ে গেলো, ছাড় পেয়ে গেলো আরো এইরকম অপরাধ করার। "

তুষার চুপ করে ঋতুর কষ্টটা প্রকাশ করতে দিলো সে।

ঋতু বললো," বলতে পারো এ আমাদের সমাজ কোন পথে চলেছে? নিরাপত্তা কোথায়?? আলোর দিশা কোথায়? "

"তুমি এতো ভেবোনা ঋতু, শরীর খারাপ করবে তোমার।"তুষার সামলাতে চাইলো ঋতুকে।

"না আ... তুমিই বলো, ওরা তো এখন বুক ফুলিয়ে ঘুরবে, ওদের দেখে আরও নৃশংস নরকের কীটেরা উৎসাহ পাবে, মেয়েরা রাস্তা ঘাটে নিরাপত্তা কিভাবে পাবে। আজ এইবাড়ির মেয়ের হয়েছে, কাল আমার বাড়ির মেয়ের যে হবেনা কি গ্যারান্টি আছে, মেয়েরা কি আর নিরাপদ থাকবে??

তুষার ঋতুকে কাছে টেনে নিলো । কিচ্ছু বলার নেই তার, বুঝতে পারছে ঋতু কেন এতো কষ্ট পাচ্ছে, সে নিজেও যে একজন মেয়ে, মা হতে চলেছে, দুশ্চিন্তা তো হবেই।

ঋতু তুষারের বুকের কাছে সরে এসে বলে..."আমি ভাবতেই পারছিনা, আমার মেয়ে হলে তার সেই ছোট্ট থেকে এতো ভয় নিয়ে আমি বাঁচতে পারবোনা, আমি শান্তি পাবোনা, নিরাপত্তা পাবোনা, বিচার পাবোনা। তাই তার থেকে ভালো আমার ছেলে হোক।"

"ছেলে হলে কি এই সমস্যা মিটবে ঋতু ?? "তুষার ঋতুর মাথায় বিলি কেটে দিতে দিতে বোঝাতে চেষ্টা করলো ঋতুকে।

"জানিনা গো, কিন্তু এটুকু জানি আমি ছেলের মা হয়ে আমার সন্তানকে আমি শেখাবো মেয়েদেরকে সম্মান করতে, মেয়েদের রক্ষা করতে। এতে যদি কোনো একটা মেয়ের ভবিষ্যতের পথ নিশ্চিন্তের হয়, বাবা মায়েরা শান্তিতে থাকতে পারে, সেটাই অনেক।"

তুষার ঋতুর হাত ধরে অল্প চাপ দিল। বুঝলো ঋতুর এই ভয় অযথা নয়, সত্যি, সমাজ এখন যে নোংরা সামাজিক ক্ষতের পথে এগোচ্ছে!! তাতে মেয়েদের নিরাপত্তা ঝুলি শুন্য। তুষার বুঝলো ঋতু ঠিকই বলেছে, প্রত্যেক ছেলের মায়ের এই দায়িত্বটা পালন করা উচিৎ,নইলে ভবিষ্যতেও সমাজের মেয়েরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে সারাজীবন ।"