বাহা পরব

স্বাতী নাথ,

বর্ধমান, পশ্চিমবঙ্গ

ভারতের বিভিন্ন জেলায় ও রাজ্যে বিশেষ করে মেদিনীপুর,বাঁকুড়া,পুরুলিয়া, ঝাড়খণ্ড বিহার, অসম এমনকি বাংলাদেশেও সাঁওতাল, ওরাং, মুন্ডা এবং অন্যান্য আদিবাসী সম্প্রদায় বাহা পরব আন্তরিকতার সঙ্গে উদ্‌যাপন করেন। এই উৎসবের যেমন বহিরঙ্গ রয়েছে, তেমনই রয়েছে অন্তরের দর্শন। প্রাকৃতিক সম্পদকে ঐশ্বরিক নিবেদনের পরে, প্রকৃতির সুনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার। প্রতি বছরই ইংরেজি ক্যালেন্ডারের ফেব্রুয়ারি ও মার্চ

মাসের মাঝামাঝি বসন্তে এই পরবটি উদ্‌যাপিত হয়ে থাকে।

অনেকের মতে, সাঁওতালদের বিভিন্ন পরবের মধ্যে সেরা ‘বাঁদনা’, আবার কেউ কেউ বাহা পরবকেই বৃহত্তম উৎসব হিসাবে বিবেচিত করেন। কেন না সাঁওতালদের মাঘ মাস যদি বছরের শেষ মাস হয়, তবে ফাল্গুন মাসটি নিঃসন্দেহে ধরা হয় সাঁওতালিতে ‘নাওয়া সিরমা’ বা নতুন বছর। সাঁওতালদের ‘নাওয়া সিরমা’য় প্রত্যাশা থাকে, নতুন দিনগুলি অন্যরূপে প্রকৃতিতে দেখা দিক। বসন্তে প্রকৃতিতে ফুটে ওঠা ফুল, লতা ও পাতা সঙ্গে প্রাণী ও জীবকূলের মধ্যে গভীর সম্পর্ক গড়ে উঠুক—এটাও চাওয়া হয়।

সমগ্র ছোটনাগপুর মালভূমি অঞ্চলের অন্যতম আদিবাসী গোষ্ঠী সাঁওতালদের মধ্যে প্রকৃতিপূজা বা পরবের অন্যতম একটি হল বাহা। বাহা কথাটির আক্ষরিক অর্থ ফুল। আর ফুলের ভূমিকা হল সৃষ্টি। নতুন জীবনের জন্যই তার জন্ম। তাই,বসন্ত উৎসবের সঙ্গে একে বলা যেতেই পারে সাঁওতাল জনগোষ্ঠির নববর্ষের উৎসব।

বসন্তকালে ফাল্গুন মাসের প্রথম চাঁদ দেখার পাঁচদিন পর শুরু হয় বাহা পরব। তিনদিনের এই পরবে মেতে ওঠেন স্থানীয় মানুষ। তাঁদের বিশ্বাস অনুযায়ী মাঘ মাস বছরের শেষ মাস অর্থাৎ সমাপ্তি। ফাল্গুন মাসে বছরের শুরু। আর প্রকৃতি ফাল্গুন মাসেই ভরে ওঠে রূপে-রঙে। তাই এই রূপে, রঙে ভরা প্রকৃতির কাছে সুন্দর জীবনের কামনাতেই গাঢ় হয় এই পরব। সঙ্গে জোড়ে সারা বছর সুন্দর থাকার আবেদন।

বাহা' সাঁওতালদের পবিত্র ধর্ম বিষয়ক উৎসব।ফাল্গুন মাসের দ্বাদশী তিথি থেকে বাহা পরব আরম্ভ হয়।তবে অমাবস্যার পর চাঁদ দেখার পর থেকেই সাঁওতাল পল্লীতে দুন্দুভি বেজে ওঠে।চলে ফাগুনের দোল পূর্ণিমার দিন পর্যন্ত। অবশ্য ক্ষেত্রবিশেষে দোলপূর্ণিমার পর আরও এক সপ্তাহ জুড়ে এটা পালন করা হয়।গ্রামসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নির্দিষ্ট দিনে জঙ্গল থেকে কচিপাতাসহ শালফুলে ভরা ডাল সংগ্রহ করে আনা হয়।গ্রামের সবাই একত্রিত হয়ে এ' গান দিয়ে গেয়ে উৎসব আরম্ভ করে-

অকয় মায় চিয়ায়া হো বির বিসম দ?
অকয় মায় দহয় হো আতোরে পাঁয়রি?
মারাং বুরুয়া চিয়ারা হো বির দিশম দ,
জাহের এরায় দহয় হো আতোরে পাঁয়রি।

এদিকে পুরোহিত মশাই জাহের থানে গিয়ে দেবতাদের স্মরণ করেন যাতে দেবতারা তাদের মাঝে উপস্থিত হন।এখানে একটা কথা বলে রাখি আদিতে সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর এত বোঙ্গাবুরু ছিল না,তারা একমাত্র ঠাকুর - জিউরই সেবা করত।তাদের ধারনাই তিনি সৃষ্টিকর্তা- জগদীশ্বর। এখনও অনেকেই মাঝে মাঝে চান্দো বোঙ্গা বলে সেই ঠাকুরকেই স্মরণ করে।

যাইহোক,নায়কে( পুরোহিত) মশাই দেবতাদের মিনতি করেন যাতে গ্রামের সকলের মঙ্গল হয় সকলের কল্যান হয়।গ্রামের সকলেই নিজস্ব জাহের থানে একত্রিত হয়ে শালফুলের পূজার্চনা করে।মজার ব্যাপার বাহা পরব শেষ না হওয়া পর্যন্ত কেউই নতুন পাতা,ফুল, ফল ব্যবহার করে না।এমনকি সাঁওতাল রমণীরাও বাহা পরবের আগে খোঁপায় রঙিন ফুল নিয়ে নিজেদের শোভা বর্দ্ধন করে না।পূজা শেষে নায়কে গ্রামে ফিরে আসেন।জাহের থেকে আসার সময় নায়কে মশাই কিছু শালফুল সঙ্গে আনেন।গ্রামের মেয়েরা প্রত্যেকে থালায় জল আর বাটিতে তেল নিয়ে নিজ নিজ বাড়িতে অপেক্ষা করে।পুরোহিত প্রত্যেকটি বাড়িতে যান।পুরোহিত বাড়িতে প্রবেশ করলে প্রত্যেক মেয়ে পুরোহিতের পা ধুয়ে তেল মাখিয়ে দেয়।পুরোহিত তখন তাদের শালফুল দেন।তারপর থেকে সারাবছর মেয়েরা শালফুল মাথায় পরতে পারে আর কোন বাধা নিষেধ থাকে না।

বাহা’তে পূজিত হন ‘বোঙ্গা’গণ (পবিত্র আত্মা অথবা দেবতা), দেবী ‘জাহের এরা’, ‘মঁড়েকো-তুরুইকো’ (পাঁচ-ছ’জন) ও ‘দেবী গোঁসাই’। ‘মঁড়েকো-তুরুইকো’ দেবতারা পাঁচ ভাই। তাঁদের মা ‘জাহের এরা’। পাঁচ ভাইয়ের স্ত্রী ‘গোঁসাই এরা’। এই পূজার স্থান ‘জাহের থান’, যা প্রতি সাঁওতাল গ্রামেই থাকে। পূজার কাল মূলত ফাল্গুনী পূর্ণিমা। ত্রিদিবসীয়। অর্থাৎ, তিন দিন ধরে পালিত হয় এই পূজার প্রথা। প্রথম দিন হয় ‘উম মাহা’। এই দিন সকলে নিজের-নিজের ঘরদোর পরিষ্কার করে, নতুন করে সাজায়। রাতের সময় আদিবাসী পুরোহিত বা নায়েক বাবার ঘরে কুমার ও কুমারী ছেলেমেয়েরা উপবাস করে। সঙ্গে চলে নাচ-গান। দ্বিতীয় দিন হয় ‘সারদি মাহা’। ‘নায়েক জাহের আয়ো’ অর্থাৎ প্রকৃতি মায়ের কাছে পুজা দেওয়া হয়। এই সময় ফের নাচ গান হয়। শিকড়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা গান আর নাচ সেইসব। বেজে ওঠে ধমসা মাদল, তিরিয়ো বানাম। এই দিনে সবাই কানে শালফুল গুঁজে নেয়। এই শাল ফুল হয়ে ওঠে নতুনের প্রতীকস্বরূপ। তৃতীয় বা শেষ দিন ‘বাহা সেরেন্দা’। এই দিন সবাই সবাইকে শুভেচ্ছা জানায়, শুভকামনা বিনিময় করে নতুন বছরের।

বাহা পরব আনন্দের পরব। নবজীবনের গান গাওয়ার পরব। নতুন বছরের শুরুর দিনগুলি আনন্দে কাটিয়ে আগামী দিনগুলোও আনন্দময় করে তোলাই এই উৎসব বা পরবের মূল কথা। এখানে ভক্ত ও ভগবানের সম্পর্ক খুবই সহজ সরল। অনতিক্রম্য দূরত্ব নেই। প্রাচুর্যের ভিড়ে হারিয়ে যায় না কেউ কোথাও। মানুষ এবং প্রকৃতি মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় এই পরবের উদযাপনে, ভাষায়, গানে। বর্তমান পৃথিবী যেখানে অহেতুক ধর্মের নামে হানাহানিতে মেতে উঠেছে, একে অপরকে টেক্কা দেওয়ার খেলায় মেতেছে, সেখানে পৃথিবীর এই আদিমতম মানবগোষ্ঠীর মানুষেরা কী সহজে, কত অবলীলায় শিখিয়ে দেন ঈশ্বরের স্বরূপ। ভাবতে অবাক লাগে-- গাছ, নদী, পাহাড় প্রকৃতি যে আসলে মানুষের বাঁচার জন্য খুবই প্রয়োজনীয় এবং মানবজীবনের সঙ্গে অচ্ছেদ্য বাঁধনে জড়িয়ে, তা সেই আবহমান কাল ধরে শিখিয়ে দিচ্ছে এই ধর্ম।