বন্ধন

গৌরাঙ্গ বন্দ্যোপাধ্যায়,

হাওড়া

অন্যান্য দিনের মত ভোর পাঁচটায় ব্রাহ্ম মুহূর্তে ঘুম ভেঙে যায় দীপ মহারাজের। গতকাল সারাদিনই মনটা খুব বিক্ষিপ্ত ছিল। তারই ফলশ্রুতিতে ঘুম হয়েছে ছেঁড়া ছেঁড়া। তাঁর এই দীর্ঘ চল্লিশ বছরের জীবনে এই রকম ঘটনা আর কখনো হয়েছে কিনা সন্দেহ। হ্যাঁ, আরো একদিন - যেদিন তিনি সারারাত শুয়ে চোখের পাতা বুজে থেকেও ঘুমাতে পারেননি। যেদিন তিনি গৃহত্যাগী সন্ন্যাসী হবার সিদ্ধান্ত বাড়িতে জানিয়েছিলেন তার আগের দিন রাতে। কিন্তু সেটা তো অস্বাভাবিক ছিল না। কুড়ি বছরের সংসারী জীবনের বন্ধন ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া মোটেই সহজ ব্যাপার ছিল না। বিশেষ করে বাড়ির তখনকার পরিস্থিতির কথা বিচার করে। কিন্তু তাঁর মন তখন এক অনাস্বাদিত অমৃতের সন্ধানে উদগ্রীব হয়েছিল। তাই সংসারের বন্ধন কাটিয়ে ওঠার সিদ্ধান্ত নিতে, নিজের মনকে বুঝিয়ে উঠতে একটু সময় লাগলেও মনে তার জন্য কোন অনুতাপ বা দ্বিধা তিনি কখনই অনুভব করেননি। চোখের সামনে ভেসে ওঠে ছোটবেলার কথা।

তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে তামিলনাড়ুর রামেশ্বরম জেলার একটি ছোট টাউনে। রামানাথপুরম থেকে মাত্র ৩০ কিমি দূরে। সংসারের অবস্থা খুব সচ্ছল না হলেও দারিদ্র্য ছিল না। বাবা ছিলেন স্থানীয় সরকারি লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ান, মা গৃহবধূ। তিনি নিজে ক্লাস টেন পর্যন্ত পড়াশুনা করেন ঐ টাউনের অন্যতম প্রধান স্কুলে। পড়াশোনায় ভালোই ছিলেন। ক্লাসে প্রথম না হলেও প্রথম পাঁচের মধ্যে স্থান থাকত সর্বদা। আর স্কুলের বইয়ের বাইরের বই পড়ার আগ্রহ ছিল সাংঘাতিক। বাবার দৌলতে সুযোগও ছিল যথেষ্ট। শুধু তামিল ভাষায় নয়, মালায়ালম, কানাড়ি, তেলেগু ও ইংরেজি ভাষারও অনেক বই তাঁর পড়া হয়ে গিয়েছিল ক্লাস টেনের পরীক্ষার আগেই।

তাঁদের স্কুলটা ছিল টাউনের একপ্রান্তে। সেখানে বিরাট খেলার মাঠ আজও আছে। আর তার থেকে দশ মিনিটের হাঁটাপথে সমুদ্রের খাড়ি বা ব্যাকওয়াটার। খেলাধুলার নেশাও ছিল যথেষ্ট। স্কুলে টিফিন পিরিয়ডে বা অন্য অফ পিরিয়ডে গোটা মাঠ জুড়ে খেলা, আর স্কুল ছুটির পর ছুটে দশ মিনিটের রাস্তা পাঁচ মিনিটে গিয়ে ঐ ব্যাকওয়াটারে হুটোপাটি করে নৌকা বাইচ করা ছিল তাঁর অন্যতম প্রিয় শখ। বন্ধুদের সঙ্গে ঐ দামালপনা চলত শেষ বিকেল অবধি। বাড়ি ফিরতে সন্ধে হয়ে যেত। তবে বাবা-মার নির্ধারিত সময়ের সীমা সাধারণত কখনই অতিক্রম হত না।

প্রতি সপ্তাহে শনি ও রবিবার লাইব্রেরি গিয়ে বিভিন্ন বিষয়ের উপর নানান বই পড়তেন, তাই ঐ দুদিন বিকেলে খেলতে যেতেন না, সেটা কিন্তু সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছায়। এছাড়া বাবা কখনো কখনো সপ্তাহের মাঝেও লাইব্রেরি থেকে সেই বয়সের উপযুক্ত বই আনতেন। সেগুলো পড়া তখন স্কুলের পাঠ্য পুস্তকের থেকে অগ্রাধিকার পেত। ঘটনাচক্রে তাঁর স্কুলের বই পড়ার সময় যেত কমে। তাতে অবশ্য খুব একটা ক্ষতি হত না। কারণ মনোযোগ সহকারে কোন বই একবার বুঝে নিয়ে পড়লে তাঁর স্মৃতিতে সেটা থেকে যেত বহুদিন। স্কুলের ইংরাজীর শিক্ষক মুরুগান স্যার বলতেন, "তোর তো দেখছি ফটোগ্রাফিক মেমোরি।"

যখন তিনি ক্লাস নাইন, সেই সময় নাইন-টেনের ছাত্রদের নিয়ে স্বামী বিবেকানন্দের মাদ্রাজে পদার্পনের শতবর্ষ উপলক্ষে গোটা তামিলনাড়ু জুড়ে একটি প্রবন্ধ প্রতিযোগিতা হয়। বিষয় ছিল "স্বামী বিবেকানন্দ ও বর্তমান ভারতে তাঁর প্রভাব"। ঐ স্কুল থেকে তাঁকে নিয়ে দুজন তাতে জেলাস্তরে নির্বাচিত হন। পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে দ্বিতীয় ধাপে রাজ্যভিত্তিক প্রতিযোগীদের মধ্যে রামেশ্বরম জেলা থেকে তিনি একাই প্রথম দশে নির্বাচিত হন।

শেষ ধাপে মাদ্রাজে গিয়ে প্রবন্ধ রচনা ও গ্রুপ ডিসকাশনের পর তিনি দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। প্রথম তিনজনকে পুরস্কৃত করা হয় রামানাথপুরমের রামকৃষ্ণ মিশনের সেই ঐতিহাসিক সভাগৃহে, যেখানে স্বামী বিবেকানন্দকে শিকাগো ধর্ম মহাসভায় বক্তৃতা ও বিশ্বজয়ের পর ভারতে পদার্পনের পরে সংবর্ধনা জানান হয়েছিল।

সেখানেই প্রথম তিনি তাঁর মেন্টর, ফিলোজফার ও গাইড শ্রী আনন্দময়ানন্দ মহারাজের দেখা পান ও তাঁর স্নেহের বন্ধনে জড়িয়ে পড়েন এবং পরবর্তীতে তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। সেই অনুষ্ঠানে তিনি প্রধান অতিথিরূপে আসা ভারতের তৎকালীন 'মিসাইল ম্যান' (পরে যিনি ভারতের রাষ্ট্রপতি হন) শ্রী এ পি জে আব্দুল কালামের হাত থেকে পুরস্কার গ্রহণ করেন।

সাত-পাঁচ ভাবনায় নিজের অজান্তেই কিছুটা সময় অতিবাহিত হবার পর শয্যা ছাড়লেন দীপ মহারাজ। দ্রুত প্রাত্যহিক বিধিবদ্ধ কাজ সেরে ধ্যানঘরে গিয়ে ধ্যানে বসলেন মহারাজ। ঘরের 'ওম' খোদাই করা আসনটির সামনে হালকা আলো জ্বলছে। সেখানে বসে তৃতীয় নয়নে মনকে সংহত করে ধীরে ধীরে শ্বাস প্রশ্বাসের গতি নিয়ন্ত্রণ করে ধ্যানে নিমগ্ন হয়ে গেলেন তিনি।

প্রায় ঘন্টা খানেক পর আশ্রমিক রামলাল ধীরে ধীরে ধ্যানঘরের দরজার পর্দা সরাতে বাইরের ঊষার আভাস ঘরে প্রবেশ করল। আরো মিনিট পাঁচেক পর ধ্যান ভেঙে উঠে এলেন স্বামী সুহৃতানন্দ ওরফে দীপ মহারাজ। ঘরের বাইরে বেরিয়ে এসে দিগন্তরেখার দিকে তাকিয়ে দেখলেন পাহাড়চূড়াগুলির মাথায় নতুন ভোরের নতুন সূর্যোদয়ের দৃশ্য। পাখিদের কলকাকলি ঊষাকে স্বাগত জানাচ্ছে। আশ্রমে ধীরে ধীরে প্রাণস্পন্দন সঞ্চারিত হচ্ছে। মায়াবতী অদ্বৈত আশ্রমের এই অংশে সময় যেন থমকে আছে। স্বামীজী কি অসাধারণ দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়ে আজ থেকে অতদিন আগে এই স্থানটি নির্বাচন করেছিলেন। এই আশ্রমের চারিদিকে অপার শান্তি সদা বিরাজমান। এখানের সমস্ত কিছুই নিয়মের অনুশাসনে চলে। প্রকৃতিও যেন সেই সুরেই সুর মেলায়।

এরপর তিনি চলে গেলেন লাইব্রেরিতে। জানেন আর কিছুক্ষণের মধ্যে গৃহী ভক্তদের আনাগোনা শুরু হবে এখানের ডাইনিং হলে। তারপর সকাল আটটায় শুরু হবে তাঁর 'স্পিরিচুয়াল হেরিটেজ' ক্লাস। আজ সেখানে তিনি যা পাঠ করবেন, যা আলোচনা করবেন - সেটাই আরো একবার তিনি ঝালিয়ে নেবেন এইবার। এছাড়া কাল রাতে যা যা পড়েছেন, সেগুলোর নোট রাখবেন ডাইরিতে, যাতে 'প্রবুদ্ধ ভারত' এর পরবর্তী সংখ্যার জন্য যে প্রবন্ধটি উনি রচনা করবেন, তার কাজ কিছুটা এগিয়ে রাখা যায়।

আজ ক্লাসে তাঁর বিষয় ছিল 'আধ্যাত্মিকতা ও মন নিয়ন্ত্রণ' (Spiritualism and Control of Mind)। গৃহী ভক্তদের মধ্যে অনেকেই স্বেচ্ছায় এই ক্লাসে যোগদান করেন। প্রতিদিন আটটা থেকে ন'টা একঘন্টার এই ক্লাসের দ্বায়িত্বভার দীপ মহারাজ বেশ উপভোগ করেন।

তাঁর গ্রন্থপাঠ, বিশ্লেষণ ও বিভিন্ন উদাহরণ সহযোগে তত্ত্ব ও তথ্যের ব্যাখ্যার পর শুরু হল পারস্পরিক প্রশ্নোত্তরের পালা। কয়েকটি সাধারণ প্রশ্নোত্তরের পর শেষ সারির কোণের দিকের এক ভদ্রমহিলা বললেন, "মহারাজ, আমরা সাধারণ গৃহী মানুষ। আমরা বা বিশেষ করে আমি আপনাদের নির্দেশমত ধ্যান করি। প্রতিদিন বার বার চেষ্টা করি। তাও মনকে সংহত করতে পারি না। নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা, গৃহস্থালীর সমস্যা বা আশেপাশের শব্দ এসে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কি উপায়ে এই বাধা দূর করব?"

মহারাজ বললেন, "পুকুরে ঢিল ফেললে তরঙ্গ তো উঠবেই। প্রথমে আপনাকে ধ্যান করার এমন স্থান নির্বাচন করতে হবে যেখানে মনপুকুরে ঢিল ফেলার কেউ নেই। তারপর আগের ঢিলের ফলে ওঠা ঢেউকে থিতিয়ে যেতে দিতে হবে। নিজের মনকে যতটা সম্ভব চিন্তাশুন্য করতে হবে। তারপর ধ্যান শুরু করতে হবে। প্রথম প্রথম অসুবিধা হলেও আপনি যদি দিনের পর দিন এই অভ্যাস চালিয়ে যান তবে কিছুদিন পর আপনি নিশ্চয় সফল হবেন।“

এবার একজন মধ্যতিরিশের ভদ্রমহিলা রিমা বললেন, "মহারাজ, আপনি যখন পাঠ করেন, বা ব্যাখ্যা করেন, তখন আপনি মাঝে মাঝে থেমে যান, স্বপ্নালু দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন, সে সময় আপনার মুখে একটা জ্যোতি ফুটে ওঠে। তারপর আপনি নতুন কোন উদাহরণ দিয়ে জিনিসটা ব্যাখ্যা করেন, আমরাও সেটা বুঝতে পারি। আপনি কি ঐ উদাহরণগুলি তৈরী করে আনেন, নাকি স্বতঃস্ফূর্তভাবে সেগুলি আপনার মনে আসে?"

পাশ থেকে ওনার স্বামী কিংশুক চাপা স্বরে বলে উঠলেন, "কি করছ কি তুমি? ওনার মত মহারাজকে এইসব প্রশ্ন করছ?"

দীপ মহারাজ হাসিমুখে বলে উঠলেন, "না, না, এ প্রশ্ন মোটেই অপ্রাসঙ্গিক নয়। শুনুন, আমি যেদিন যেটা পাঠ করব তার মূল পয়েন্টগুলো অবশ্যই তৈরি করে আনি। কিন্তু ব্যাখ্যার সময় আমি আমার সন্ন্যাসজীবন এমনকি পূর্বজীবনেরও বিভিন্ন ঘটনার কথা স্মরণ করে সেই পরিস্থিতির বিচারে সবচেয়ে উপযুক্ত বলে মনে হয় যে ঘটনা, সেটাই উদাহরণ স্বরূপ বলে বোঝানোর চেষ্টা করি। আর আপনাদের অনেকের অনেক প্রশ্ন থেকেও আমি নতুন কিছু পাই, সেটাও আমাকে সমৃদ্ধ করে বইকি।"

সেদিনের মত ক্লাস শেষ হবার পর ঐ বাঙালি দম্পতি রিমা ও কিংশুক ক্লাস রুম থেকে বেরিয়ে এসে গোল চাতালটায় দাঁড়াল। সামনে অজস্র ফুলের সজ্জা চোখ জুড়িয়ে দিচ্ছে। একটু দূরে খাদ পেরিয়ে পরপর পাহাড়ের সারি। রিমা বলল, "মহারাজকে আজ যেন একটু আনমনা মনে হল।" কিংশুক বলল, "হ্যাঁ, তুমি তো সব বোঝ? সাইকিয়াট্রিস্ট বলে একেবারে মহারাজের মনের বিশ্লেষণ শুরু করে দিলে?"

"না, গো, তোমার মনে পড়ে কাল উনি ওনার পূর্বজীবনের কথাও অল্প করে বলছিলেন একবার। বললেন না, আমরা যখন পড়তে বসতাম তখন মা রান্নাঘর থেকে সেখানকার বিভিন্ন শব্দের মধ্যেও আমার আর বোনের গলার আওয়াজে কান পেতে রাখতেন। আমরা কেউ মনোযোগ দিয়ে না পড়লে সেটা উনি আমাদের স্বর শুনেই বুঝে যেতেন। সত্যি, মায়েরা কিভাবে এগুলো বুঝে যায় বলোতো? আমারও ছোটবেলার অভিজ্ঞতা ঠিক একই রকম।"

আরো কিছুক্ষন ঘোরাঘুরি করে ওরা নিচে ওদের গেস্ট হাউসের দিকে রওনা দিল। আশ্রমের গেট অতিক্রম করার একটু পরেই দেখতে পেল দূর থেকে দীপ মহারাজ ছুটতে ছুটতে আসছেন। ওরা মহারাজকে হাতজোড় করে প্রণাম জানাল। উনি ছুটতে ছুটতেই প্রতিনমস্কার করে ওদের অতিক্রম করে এগিয়ে গেলেন। ওরা গত দুদিনে জেনেছে যে এটা মহারাজের শারীরিক কসরতের সময়। উনি ক্লাসের পরে প্রতিদিন পাহাড়ি রাস্তায় পাঁচ কিমি ছুটে নামেন, আবার সেভাবেই ওঠেন। এই চড়াই-উৎরাই পথে ছোটাছুটি করে উনি নিজেকে ফিট রাখেন। এখন এই নভেম্বরের ঠান্ডাতেও উনি রীতিমতো ঘেমে গেছেন।

এরপর আশ্রমের মূল ভবনে পৌঁছে মহারাজ মিনিট দশেক বিশ্রাম নিয়ে ইচ্ছুক গৃহী ভক্তদের নিয়ে চললেন আশ্রম থেকে অনেকটা উপরে স্বামী বিবেকানন্দের ধ্যানঘরে, যেখানে স্বামীজী একা বেশ কিছুদিন ধ্যান করেছিলেন। গতকাল রিমাও গিয়েছিল অন্য ভক্তদের সাথে। কিংশুকের পায়ে সমস্যা থাকায় সে যেতে পারেনি।

আজ মধ্যাহ্নভোজনের পর আশ্রমের অফিসে টানা চারঘন্টা কম্পিউটার ও ফাইল সহযোগে বিভিন্ন অফিসিয়াল কাজ করার পর বিকেলে গোশালার দিকে গেলেন দীপ মহারাজ। কানহাইয়ার কাছে সব গোমাতার খোঁজ নিয়ে তাদের আদর করে আবার ফিরে এলেন আশ্রমের লাইব্রেরি রুমের পাশে অবস্থিত 'প্রবুদ্ধ ভারত' পত্রিকার অফিসে। ফেরার পথেই আবার তাঁর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল ঐ বাঙালি দম্পতির।

  এ কি অদ্ভুত লীলা ঈশ্বরের! বারবার কেন ঐ দীঘল চোখের শ্যামলা মেয়েটির মুখোমুখি হয়ে যাচ্ছেন উনি। কবিতার সঙ্গে এই মেয়েটির মুখের এত মিল হয় কি করে? কোন জাদুতে? না, এসব চিন্তা মন থেকে দূর করা দরকার। গতকাল সকাল আটটার ক্লাসে মেয়েটির প্রশ্নের উত্তর দেবার সময় প্রথম ওকে দেখেন তিনি। তখনই চমকে উঠেছিলেন। এরপর যখন বাকি সকলকে নিয়ে পাহাড়ের উপর স্বামীজীর ধ্যানঘরে গিয়েছিলেন, তখনও যাত্রাপথে ওর সঙ্গে বেশ কয়েকবার মুখোমুখি হতে হয়েছে। মেয়েটির জানার আগ্রহ অপরিসীম। বেশ কয়েকবার ওনাকে প্রশ্ন করেছে বিভিন্ন বিষয়ে। ঠিক যেমন ওর সহোদরা ভগিনী কবিতা বলত, "দাদা, এটা কেন হয়? এটা কিভাবে হয়?", ইত্যাদি। আবার জোর করে 'প্রবুদ্ধ ভারত' এর সম্পাদনার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করলেন স্বামী সুহৃতানন্দ।

নৈশাহার সম্পন্ন করার পর নিজের পড়াশুনা শুরুর আগে আজ গুরুমহারাজ স্বামী আনন্দময়ানন্দকে স্মরণ করে ধ্যানে বসলেন দীপ মহারাজ। ধীরে ধীরে ওনার মন সম্পূর্ণ প্রশান্ত হয়ে উঠল। একটু পরেই গুরুমহারাজ আবির্ভূত হলেন। বললেন, "বাছা, তোমার স্মৃতিতে তোমার হারিয়ে যাওয়া প্রিয় ভগিনী এসে উপস্থিত হয়েছে, তাতে তুমি অত বিচলিত হচ্ছ কেন? এই চিত্তচাঞ্চল্য তোমার স্বভাববিরুদ্ধ। ঐ কন্যাটিও তো তোমার আরেক ভগিনী। তোমার যত মহিলা গৃহী ভক্ত তারা সবাই তোমার হয় মাতৃসমা, নয় ভগিনীসমা, নয়তো কন্যাসমা। তুমি তো এভাবেই এতদিন তাদের দেখে এসেছো? তবে আজ এই অস্থিরতার কারণ কি?"

এবার পরিপূর্ণ শান্তি পেলেন দীপ মহারাজ। ঠিক করলেন আগামীকাল ক্লাস শেষ হবার পর ঐ বাঙালি দম্পতির সঙ্গে আলাদা করে আলাপচারিতা করবেন। যদি প্রসঙ্গ ওঠে তবে তাঁর পূর্বজীবনের সহোদরার কথা ও তার সঙ্গে মেয়েটির মুখের মিলের কথাও উল্লেখ করবেন। এরপর মনোযোগ সহকারে আরো দু'ঘন্টা পড়াশোনা করে বিছানায় শয়ন করলেন। বরাবরের মত আজ তাঁর নিশ্ছিদ্র সুখনিদ্রা সম্পন্ন হল।

পরদিন ক্লাস নেওয়ার সময় সেই বাঙালি দম্পতিকে দেখতে পেলেন না। ক্লাসের প্রশ্নোত্তরের শেষে বললেন, "গত দু'দিন আমায় যিনি সবচেয়ে বেশিবার প্রশ্ন করেছিলেন সেই ভগিনীটিকে আজ দেখতে পাচ্ছি না তো!" অন্য একজন গৃহী ভক্ত বলে উঠলেন,"মহারাজ, রিমা-কিংশুক তো শ্রীরামকৃষ্ণ গেস্ট হাউসে আমাদের পাশের রুমেই ছিল। ওরা তো আজ একটু আগেই প্রাতরাশ শেষে আলমোড়া চলে গেল যোশীজির গাড়িতে।"