বট্ঠাকমা
মৈত্রেয়ী ব্যানার্জি,
বালি, হাওড়া
"ফোটে যে রক্তগোলাপ
চিরদিনই তার কাঁটাতেই সুখ
নেভাতে প্রদীপ আমার আসে যে ঝড়
ভেঙে যায় বুক..."
গভীর গলায় কিশোরের গান ছড়িয়ে যাচ্ছে মাঠ থেকে মাঠে, ঢুকে পড়ছে মাঠের
শেষে শুরু হওয়া গ্রামের শেষ বাড়িটার উঠোনে, যেখানে মৌমিতা পা ছড়িয়ে চুলে
তেল মাখছে চুপচুপে করে। সামনে খোলা মোবাইলে একজন মহিলা বলে দিচ্ছেন
কিভাবে আঙুলের ডগা দিয়ে চুলের গোড়ায় আস্তে আস্তে ঈষৎ চাপে মাখলে চুল
হবে ঘন কালো একঢাল। কিশোরের গানে মাথা নড়ছে, গলায় গান ঘুষঘুষে কাশির মত
ঠেলা মারছে মৌমিতার। কিন্তু সে এখন গাইছে না। কারণ খুব মন দিয়ে ভিডিওটি
দেখে তেল মাখছে সে। গ্রামের মেয়েদের নাম টেঁপি, খেন্তি, বুঁচি ছিল
এককালে, এখন কেউ অমন নাম রাখে না। এখন ঘরে ঘরে মৌমিতা, সুস্মেলি, দিশা,
রিয়ার ছড়াছড়ি। আর হ্যাঁ, আরও একটা নাম খুব জনপ্রিয়। টুম্পা! যেকোন
গ্রামে খুঁজলে চার পাঁচটা টুম্পা পাওয়া যাবেই যাবে। তা যা বলছিলাম, গানটা
আসছে মাঠের ওপারে পিচরাস্তা থেকে।
পিচরাস্তার ওপারে গেদোরমাঠে আজ রাত থেকে তিনরাত যাত্রা হবে। মৌমিতা খুবই
উত্তেজিত।বাবা এখনও মাঠ থেকে ফেরেনি। ফিরলে জিজ্ঞেস করে জানতে পারবে যে
বাবা টিকিট পেল কিনা! ঘোষবাড়ির কাকীমা বলছিলেন যে নিশ্চিন্দের প্রাইমারি
স্কুলে যত টিকিট নিয়ে বসেছিল ছেলেরা, সব নাকি বিক্রি হয়ে গেছে! ঘোষকাকীমা
আবার পুবপাড়ায় টিকিট কাটতে পাঠিয়েছেন শতদলকে। কে জানে পুবপাড়াতেও
টিকিট পাওয়া যাবে কিনা? এখন তো ফেসবুকের জন্যে দশটা গ্রামের মানুষ জেনে
যায়, কোথায় কি হচ্ছে। বাবা মাঠে গেছেন ফসল দেখতে। মাঝেমধ্যেই যান, গিয়ে
কালোকাকার সঙ্গে হিসেব নিকেশ করেন। কালোকাকার হাতেই মৌমিতাদের সব জমি
দেওয়া আছে। কালোকাকা অক্লান্ত পরিশ্রম করেন জমির পেছনে।
বাবা আর কালোকাকা আসলে ছোটবেলার বন্ধু।কালোকাকা গয়লাপাড়ার আর
শ্যামাপ্রসাদ মানে মৌমিতার বাবা বামুনপাড়ার। গ্রামের মধ্যেই ছোট ছোট ভাগ
থাকে। গয়লাপাড়া, বামুনপাড়া, তেলিপাড়া, দুলেপাড়া। এখন অবশ্য
ছোঁয়াছুঁয়ির বালাই ঘুচেছে। নাহলে আগে তো দুলেদের ছুঁলেই চান অবধারিত। সে
শীতের রাত হলেও। মৌমিতা এসবের গল্প শুনেছে বট্ঠাকমার কাছে। বট্ঠাকমা মানে
হল শ্যামাপ্রসাদের ঠাকুমা। হ্যাঁ। তিনি এখনও বহাল তবিয়তে বেঁচে আছেন, আর
শুধু বেঁচে আছেন, তাই নয়, দাপিয়ে বেঁচে আছেন। শ্যামাপ্রসাদের মাও আছেন,
শাশুড়ির আশ্রয়ে। সুরলতা হলেন বটঠাকমা আর ছোটঠাকমা অর্থাৎ ঠাকুমা হলেন
হৈমন্তী। আপাততঃ দুজনে পাশাপাশি উঁচু রোয়াকে বসে নাতনির চুল পরিচর্যা
দেখছেন।
"কি যে সব ঢং হয়েছে! ঐ মোবাইল দেখে তবে তেল মাখতে হবে ছুঁড়িকে! কত করে
বল্লুম, যে উঠোনে জবা গাছ থেকে কুঁড়ি তুলে এনে নারকোল তেলে ফুটিয়ে
ঠান্ডা করে রেখে দে, সেটা মাখ। তা নয়। ছুঁড়ি টরটর করে বলে কিনা, ওসব
তুমি বুঝবে না বট্ঠাকমা! কালে কালে আর কত দেখবো গো বৌ?" বৌ অর্থাৎ
হৈমন্তী হাসছেন মিটিমিটি আর শাশুড়ির হাঁটুতে তেল মালিশ করে দিচ্ছেন।
হৈমন্তী বেশি কথা বলেন না। শাশুড়ির মুখে মুখে তো নয়ই। রান্নাঘর সামলাতে
সামলাতে একবার মৌমিতার মা, রাত্রি, এসে চা দিয়ে গেল শাশুড়ি আর
দিদিশাশুড়িকে। রাত্রি অবশ্য মুখরা। তবে ভব্যতা মেনে চলে। তাছাড়া
শ্যামাপ্রসাদ ভয়ানক রাগী মানুষ। তার মা ঠাকুমাকে কেউ কিছু বললে সে রক্ষে
রাখবে না, সেই ভয়ও আছে। এ ঘোষাল বাড়ির জন্যে আগে নাকি বাঘে গরুতে একঘাটে
জল খেত। কবে খেত জানা নেই তবে এখনও শ্যামাপ্রসাদের রাগ দেখলে সেটা মাঝে
মাঝে মনে হয় সুরলতার। হাসিও পায়, চেপে চেপে খুকখুক করে হাসেন তিনি।
হৈমন্তী জিজ্ঞেস করেন "হাসির কি হল মা?" সুরবালা উত্তর দেন, "তোমার
ব্যাটার রাগ আর দেমাক দেখে!" উত্তরে হৈমন্তীও হেসে মুখে আঁচল চাপা দেন।
ওদিকে রাত্রি অবাক হয়ে যায় দুই বুড়ির হাসি দেখে। তার তো স্বামীর
রক্তচক্ষু দেখলে হাড় হিম হয়ে যায়। আরও অবাক হয় সে, যে দুই শাশুড়ি
বউয়ের অত ভাব কি করে হয়! কই! তার সঙ্গে তো দুই বুড়ির অত ভাব নেই! দুই
বুড়ি সমানে ফিসফিস গুজগুজ করে, আসলে কাজ তো বেশি নেই, ওই টিভি দেখা, ছেলে
বা নাতি ফিরলে গল্প করা। তারই হয়েছে যত জ্বালা! সব কাজ একা দেখতে হয়।
কাজের লোক আছে দুটি, কিন্তু গ্রামের ছড়ানো বাড়িতে কাজ কি কম?
শতদল মৌমিতার জন্যে টিকিট কেটে রেখেছে, মোবাইলে জানিয়েছে। মৌমিতা মনের
আনন্দে পাশের পুকুর তোলপাড় করে সাঁতার দেয়, সঙ্গে সঙ্গীতা আর ঝুমি। ওরা
শতদলকে নিয়ে নানান আলোচনা করে আর হাসে খিলখিল করে। উঠতি বয়সের ধারা। তবে
সঙ্গীতা এক সময় বলে ওঠে, "দ্যাখ, ঘোষালকাকা কিন্তু মৌয়ের বিয়ে কক্খনো
শতদলের সঙ্গে দেবেন না, দেখে নিস। ওরা একে বামুন তার ওপর জমিদারের রক্ত
বইছে শরীরে। কাকা খুব জাত মানেন..." মৌমিতার অন্য বান্ধবীরাও সায় দেয়।
মৌমিতার মুখ পলকে একবার শুকিয়ে যায় পরক্ষণেই সে বলে, "ছাড় তো! আমিও তো
ঘোষালবাড়ির মেয়ে। আমারও রাগ জেদ কম নয়। বিয়ে করলে আমি শতদলকেই করব... "
শ্যামাপ্রসাদের চান সেরে একটি ঘন্টা লাগে পুজো সারতে। খুব নিষ্ঠা সহকারে
সে পুজো করে। ছোঁয়াছুঁয়ির বাতিকও আছে সামান্য, বুঝতে দেয় না, কিন্তু তার
কাছের মানুষ জানে তার বাতিকের কথা। সবাই তটস্থ থাকে শ্যামাপ্রসাদের বাড়ি
থাকার সময়টুকু। আড়ত, কোল্ডস্টোরেজ সব সামলে সে বাড়িতে খুব বেশি সময়
থাকে না। মানী মানুষের মান তো থাকবেই। তবু গেল বছর ঘোষকাকা যখন মারা গেল,
বাবা গিয়ে দূর থেকে একটু কর্তব্য করে চলে এল দেখে মৌমিতার খুব খারাপ
লেগেছিল। অত কম বয়সে শতদলের বাবা হঠাৎ মারা গেলেন। হার্ট অ্যাটাক।
কোলকাতার একটা অফিসে সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি করতেন কাকা। বাবার ছোটবেলার
বন্ধুও, কিন্তু 'ওই ঘোষের পো শেষে দারোয়ানের কাজ নিল!' বলে বাবা আর
মিশতেন না ভাল করে। কি কষ্টে ওদের চলছে সংসার মৌমিতা জানে। শতদল নিজের
পড়াশোনা চালিয়ে অনেকগুলো টিউশনি করছে। অল্প জমি আছে ওদের, তা থেকে ভাতের
চালটা আসে তাই রক্ষে। বাবার সব ভাল, শুধু ওই জাতের অভিমান আর মান সম্মান
নিয়ে এত খুঁতখুঁতে যে মৌমিতার সত্যিই ভয় করে।
যাত্রা দেখতে গিয়ে শতদলের কোল ঘেঁষে বসার সুযোগ শতদলের বোন বিন্তি করে
রেখেছিল। সিনেমার অনেক আর্টিস্ট দিনকতক খুব গাঁয়ে আসছিল যাত্রা করতে।
এখন সিরিয়াল করে সব আসা কমেছে। তবে কলকাতার পার্টি তো, পালা করে খুব
সুন্দর। মোহিত হয়ে পার্ট দেখছিল মৌ, হাতে শতদলের হাত। হঠাৎ যাত্রা ছাপিয়ে
হুঙ্কার!. "উঠে আয়!" চমকে উঠে মৌমিতা দেখে বাবা! টকটকে ফর্সা রঙ যেন লাল
হয়ে উঠেছে। নাকের পাটা ফুলছে। মৌমিতা ভয়ে শতদলের হাত চেপে ধরে। বিন্তি
সামলে দেয় পরিস্থিতি। বলে, "কাকা, আমি নিয়ে এসেছি মৌদিদিকে।" ওর কথায়
কাজ হয় কিনা জানা নেই, তবে খানিক শান্ত হয়ে মেয়েকে ডাকেন শ্যামাপ্রসাদ।
মৌ বাপের পেছনের সিটে বসে। সারারাস্তা কিচ্ছু বলে না শ্যামাপ্রসাদ।
বাড়িতে ঢুকেই আছড়ে মাটিতে ফেলে মারতে শুরু করে মেয়েকে! ওই দারোয়ানের
ছেলের গা ঘেঁষে বসে ছিলি? তুই আমার বংশের মান সম্মান সব ডোবাবি? তোকে আমি
আর পড়াবো না। এই মাসেই তোর বিয়ে দিয়ে দেবো।" রাত্রি ধরতে গেলে তার গায়েও
দু'চার ঘা পড়ে। সুরবালা আর হৈমন্তী ঘুম ভেঙে প্রথমে ঠাওর করতে পারছিলেন
না। তারপর সুরবালা খুব জোরে ধমক দিলেন একটা। তাতে কাজ হল। তবে কথার
তড়পানি চলতেই থাকল। "আমার এত বড় বংশের সুনাম! আমাদের জমিদারি! একটা
চাষা তার ওপর দারোয়ানের ছেলের সঙ্গে প্রেম! সব প্রেম আমি ছুটিয়ে দেবো!"
হৈমন্তী বললেন, "খোকা, শ্যামল তোর বন্ধু ছিল।"
"তো? ওরকম অনেক বন্ধু থাকে"
"তোকে একবার জলে ডোবা থেকে বাঁচিয়েছিল"
এবার একটু থমকে গেলেন শ্যামাপ্রসাদ। এরপর সুরবালা আর হৈমন্তী তাকে নিয়ে
টেনে ঘরের দোর দিলেন। রাত্রি এসে মেয়েকে তুলে নিয়ে ঘরে গেল। মেয়ে কেঁদে
কেঁদে প্রায় অজ্ঞান। পরদিন সকাল থেকে শ্যামাপ্রসাদ একেবারে গুম মেরে
রইল। খেতে দিলে খায়, কি খায় সেটা দেখে না। শুয়ে ঘুমোতে পারে না, এপাশ
ওপাশ করে। রাত্রি বিরক্ত হলেও কিছু ভয়ে বলে না। যা চন্ডাল রাগ ওনার।
পাঁচ ছ'দিন এরকম গেল। তারপর একদিন শতদল এল এক বাক্স মিষ্টি নিয়ে প্রণাম
করতে ঘোষালবাড়ি। রাত্রি তো অবাক! শুধু দুই বুড়ি হেসে হেসে আশীর্বাদ
করলেন শতদলকে। শতদল শ্যামাপ্রসাদের কোল্ডস্টোরেজের ম্যানেজার হয়েছে!
মৌমিতা তো এর থেকে অবাক আর কিছুতে হয়নি। তবে শ্যামাপ্রসাদের মুখে হাসি,
সে তেজ কোথায় যেন অস্তমিত। খাবারে রুচি নেই। শ্যামার মা আর ঠাকুমা আবারও
ছেলেকে নিয়ে দোর দিলেন। এবারে মৌ তক্কে তক্কে ছিল। সেদিন সে কিছুই জানতে
পারেনি, কারণ বাবা তাকে মেরে আধমরা করে ফেলেছিল। কিন্তু আজ ছোট্ঠাকমা আর
বট্ঠাকমা কি তুকতাক করছে, সেটা তাকে জানতেই হবে।
ঘরের মধ্যে ফিসফিস "দ্যাখ বাবা, আমার শাশুড়ি আমায় বলেছিলেন বলেই তো আমি
জেনেছি, আর তোর মা আমার সুখ দুঃখের সাথী, তাই তাকে আমি বিয়ের পর পরই বলে
দিয়েছি, আর কিন্তু কেউ জানে না। তোর দাদুর বাবার বংশধর দেবার কোন ক্ষমতাই
ছিলনা। তাই আমার শাশুড়ি ওই গয়লাপাড়ার সুদামের পীরিতে ফাঁসলেন। কিন্তু
কেউ জানলে না। তোর দাদু মানে যাঁকে তুই জমিদার বলে জানিস, সে কিন্তু
গয়লার ব্যাটা। আরও একটা কথা শোন বাপ, আগের কালে কে যে কার বাপ তার ঠিক
ছেল কি? কে বামুন আর কে জাত হারিয়ে বোষ্টম কেউ কি জানে? তুই ওরম শুকনো
মুখে থাকিস না ভাই, খাওয়া দাওয়া কর। দেখবি দু দিনে সব ভুলে যাবি। "
মৌমিতা দম বন্ধ করে বট্ঠাকমার বাণী শুনতে লাগল। আর বুঝতে পারল, একথা সে
আর কাউকে বলতে পারবে না, এমনকি মাকেও না। কোনদিন যদি ছোট্ঠাকমার মতো কেউ
বন্ধু হয়, হয়ত তাকে বলতে পারবে...