জানা-অজানা বাঙালি বিজ্ঞানীরা
অরুন্ধতী পুরকাইত,
ডায়মন্ড হারবার দক্ষিণ ২৪ পরগনা
বিজ্ঞান আমাদের সামনে খুলে দিয়েছে এক অপার জ্ঞান ভান্ডারের দরজা । বের
করে এনেছে অজানা অনেক কিছু । কিন্তু অনেকেই আমরা জানি না এই আধুনিক
বিজ্ঞানেও বাঙালিদের অবদান আছে । নিউটন, আইনেষ্টাইন,গ্যালিলিও, স্টিফেন
হকিং কে আমরা সবাই চিনি । কিন্তু বাঙালি বিজ্ঞানীদের কত জন ই বা চিনি ।
চলুন কয়েক জন এর সাথে পরিচিত হই । তাঁদের আবিষ্কার গুলোর কথা জেনে নিই
।
স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু-
সবর্প্রথম উদ্ভিদে প্রাণের অস্তিত্ব অনুভব করেছিলেন তিনি হলেন বাংলাদেশের
প্রথম আধুনিক বিজ্ঞানী এবং বাংলার গর্ব আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু। ১৯০০
সালের আগে বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু শুধুমাত্র পদার্থবিজ্ঞান নিয়েই
গবেষণা করতেন। এক পযার্য়ে পদার্থ বিজ্ঞানের পাশাপাশি তার জীব বিজ্ঞানের
প্রতিও তার আগ্রহ সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন উদ্ভিদ নিয়ে গবেষণার এক পযার্য়ে তার
মনে হলো, বিদ্যূত প্রবাহে উদ্ভিদও উত্তেজনা অনুভব করে এবং সাড়া দিতে
পারে। সাড়া দেবার মতো ক্ষমতা শুধু প্রানীর আছে এ কথাটি সত্য নয়, উদ্ভিদও
সাড়া দিতে পারে। অর্থ্যাৎ, উদ্ভিদেরও প্রাণ আছে। ১৯০১ সালের ৬ জুন
বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু রয়েল সোসাইটির এক সেমিনারে বক্তৃতা দেন।
বক্তৃতার বিষয়বস্তু,- অজৈব বস্তুর বৈদ্যুতিক সাড়া’(Electric Response of
Inorganic Substances)। পরের বছর ২০ মার্চ তিনি লিনিয়াস সোসাইটির এক
সেমিনারে বক্তব্য রাখেন। এবারে সরাসরি উদ্ভিদের কথা বলা হয়। সেমিনারের
বিষয় ছিল- ‘যান্ত্রিক উত্তেজনায় সাধারন উদ্ভিদের বৈদ্যূতিক
সাড়া’(Electric Response in Ordinary Plants Under Mechanical Stimulus)।
বিভিন্ন অবস্থায় উদ্ভিদ কেমন সাড়া দেয় তা দেখার জন্য বিজ্ঞানী বসু গাজর,
মূলা, বাদাম, শালগম, বেগুন, ফুলকপি সহ বেশ কয়েকটি উদ্ভিদ নিয়ে গবেষনা
করেন। উদ্ভিদের বৈদ্যুতিক সাড়া এবং বৃদ্ধির পরিমান নির্নয় করার জন্য তিনি
একটি যন্ত্র তৈরি করেছিলেন যার নাম অনুরণন মাপক(Resonant Recorder)। ১৯১০
সালের দিকে বিজ্ঞানী বসু তার গবেষণার পূর্ণাঙ্গ ফলাফল একটি বই আকারে
প্রকাশ করেন। বইটির নাম ‘জীব ও জড়ের সাড়া’(Response in the Living and
Non-Living)। আর এভাবেই জগদীশ চন্দ্র বসু সমগ্র বিশ্বে সামনে তুলে ধরেন
একটি শ্বাশত সত্য, ‘উদ্ভিদেরও প্রাণ আছে” ।
সত্যেন্দ্রনাথ বসু-
পদার্থবিজ্ঞানী পিটার হিগস ও বাঙালি বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুর নামে
নামকরণ করা হিগস-বোসন কণাটি ‘ঈশ্বর কণা’ হিসেবেও পরিচিত। বিজ্ঞানী হিগস
১৯৬৪ সালে শক্তি হিসেবে এমন একটি কণার ধারণা দেন, যা বস্তুর ভর সৃষ্টি
করে। এর ফলে এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি সম্ভব হয়েছে। এ কণাটিই ‘ঈশ্বর কণা’ নামে
পরিচিতি পায়। নিউক্লিয়ার গবেষণার ক্ষেত্রে ইউরোপীয় সংস্থা সার্নের
গবেষকেরা নতুন একটি অতিপারমাণবিক কণার খোঁজ পাওয়ার তথ্য জানিয়েছেন। ৪
জুলাই বুধবার যুক্তরাজ্য ও জেনেভায় আলাদা সংবাদ সম্মেলনে তাঁরা এ দাবি
করেছেন। গবেষকেদের দাবি, এই কণাটি হিগস-বোসন বা ‘ঈশ্বর কণা’র অভিন্ন
বৈশিষ্ট্যের। ভূগর্ভস্থ লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডারে বিগ ব্যাং ঘটিয়ে এ কণার
অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়ার দাবি করেছেন সার্ন গবেষণাগারের বিজ্ঞানীরা। খুঁজে
পাওয়া নতুন কণাটির বৈশিষ্ট্য হিগস বোসনের মতো হলেও এটিই হিগস-বোসন কণা কি
না, তা জানতে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথাও জানিয়েছেন তাঁরা।
২০১০ সালে লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডারে মিনি বিগ ব্যাং ঘটানোর পর থেকে
অপেক্ষার পালা শুরু। কিন্তু এ কণার অস্তিত্ব আদৌ আছে কি নেই, সে তথ্য
জানার অধীর অপেক্ষায় ছিলেন গবেষকেরা। গবেষকেরা দাবি করেছেন, প্রাপ্ত
উপাত্তে ১২৫-১২৬ গিগাইলেকট্রন ভোল্টের কণার মৃদু আঘাত অনুভূত হওয়ার তথ্য
তাঁরা সংরক্ষণ করতে পেরেছেন। এ কণা প্রোটনের চেয়ে ১৩০ গুণেরও বেশি ভারী।
সার্নে এ ঘোষণা দেওয়ার পর হাততালিতে ভরে ওঠে অনুষ্ঠানস্থল। গবেষক হিগস
নিজেও এ পরীক্ষার ফলাফলে সন্তুষ্ট।
বিজ্ঞানী রাধানাথ শিকদার-
ভাবতে অবাক লাগে বিশ্বের সর্ব বৃহৎ এবং উচ্চতম পর্বত শৃঙ্গ হিমালয়ের
উচ্চতা নির্ধারণ করেছেন একজন বাঙালি বিজ্ঞানী, জানেন তিনি কে?
ঊনবিংশ শতাব্দীর ১ম ভাগে জরিপ কাজে ব্যবহৃত গণিত বিষয়ে চর্চা প্রয়োগ
উদ্ভাবনে তিনি স্বকীয়তার সাক্ষ্য রেখেছেন। এইজন্য তিনি ভূয়সী প্রশংসা
অর্জন করেছিলেন। তিনি জার্মানির সুবিখ্যাত ফিলজফিক্যাল সোসাইটির
ব্যাভেরিয়ান শাখার সম্মানীয় সদস্যপদ লাভ করেন ১৮৬২ সালে। গণিতে অসাধারণ
পারদর্শিতার জন্য তার এই সম্মান প্রাপ্তি।
রাধানাথ শিকদার ভারতে তদানিন্তন ব্রিটিশ প্রশাসনের জরিপ বিভাগ সার্ভেয়র
জেনারেল অফ ইন্ডিয়ার দপ্তরে কাজ করতেন। তিনি ১৮৪০ সালের মহা
ত্রিকোণমিতিক জরিপ কাজে অংশ নেন।১৮৫১ সালে ম্যানুয়াল অফ সারভেইং নামক
সমীক্ষণ পুস্তিকা প্রকাশিত হয়। পুস্তিকার,বৈজ্ঞানিক অংশ রাধানাথ
শিকদারের লেখা। ব্যারোমিটারে সংযুক্ত ধাতব স্কেলের তাপজনিত প্রসারণ এবং
পারদের নিজের প্রসারণ জনিত, পরিমাপের ত্রূটি যা আবহমানসংক্রান্ত পাঠ
প্রভাবিত করে,সেই ত্রুটি বাতিল করার জন্য ইউরোপে ব্যবহৃত সূত্র,
রাধানাথের অজানা ছিল। সুতরাং রাধানাথ তার বৈজ্ঞানিক অন্তর্দৃষ্টি ব্যবহার
করে, ৩২°ফারেনহাইট (০°সেলসিয়াস) এ ব্যারোমিটার পাঠ/রিডিং কমানোর জন্য,
নিজের সূত্র উদ্ভাবন করেন। সূত্রটি তিনি এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গল
জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণা পত্রে উপস্থাপন করেন। ১৮৫৭ থেকে ১৮৬২ অবধি
তিনি আবহাওয়াবিজ্ঞান বিভাগের 'আবহবিদ্যা এবং পদার্থবিজ্ঞান কমিটিতে'
সদস্য ছিলেন। রাধানাথ ১৮৬২ সালে চাকরি থেকে অবসর নিয়েছিলেন, এবং পরে
জেনারেল অ্যাসেমব্লিজ ইনস্টিটিউশন (বর্তমান স্কটিশ চার্চ কলেজে) গণিত
শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। ১৮৫৪ সালে তিনি ও তার ডিরোজিয়ান বন্ধু
প্যারীচাঁদ মিত্র "মাসিক পত্রিকা" নামক মহিলাদের শিক্ষাবিষয়ক পত্রিকাটি
চালু করেন। তিনি প্রথাগত শৈলী ছেড়ে, একটি সহজ এবং বিশৃঙ্খলমুক্ত শৈলীতে
লিখতেন।
তিনি একজন বাঙালি গণিতবিদ ছিলেন যিনি হিমালয় পর্বতমালার ১৫ নং শৃঙ্গের
(চূড়া-১৫) উচ্চতা নিরূপণ করেন, এবং প্রথম আবিষ্কার করেন যে, এটিই
বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ। এই পর্বত শৃঙ্গটিকেই পরে মাউন্ট এভারেস্ট
নামকরণ করা হয়।
২০০৪ সালের ২৭ জুন তারিখে ভারতের ডাক বিভাগ চেন্নাইয়ে ভারতের
ত্রিকোণমিতিক জরিপের প্রতিষ্ঠার স্মরণে একটি ডাকটিকিট প্রকাশ করে, যাতে
রাধানাথ শিকদার ও নইন সিং এর ছবি প্রদর্শিত হয়েছে।
বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়-
আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় (১৮৬১-১৯৪৪) ছিলেন একজন প্রখ্যাত বাঙালি
রসায়নবিদ, শিক্ষক, এবং লেখক। তিনি "ভারতীয় রসায়নের জনক" হিসাবে
পরিচিত।
প্রফুল্ল চন্দ্র রায় কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক
হিসেবে যোগ দেন এবং দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেন। তিনি রসায়নে আধুনিক গবেষণার
ক্ষেত্রে পথিকৃৎ ছিলেন। তাঁর গবেষণার একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল পারদের
নাইট্রেট নিয়ে গবেষণা।
১৮৯২ সালে তিনি বেঙ্গল কেমিক্যালস ওয়ার্কস প্রতিষ্ঠা করেন। এই
প্রতিষ্ঠানটি দেশীয় কাঁচামাল ব্যবহার করে বিভিন্ন ওষুধ ও রাসায়নিক দ্রব্য
তৈরি করত। এটি ছিল ভারতের প্রথম ঔষধ প্রস্তুতকারী কারখানা এবং এটি ভারতীয়
শিল্পায়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল।
১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি মার্কারি নাইট্রেট (মারকিউরাস নাইট্রাইট)
[Hg2(NO2)2] আবিষ্কার করেন যা বিশ্বব্যাপী আলোড়নের সৃষ্টি করে। এটি তার
অন্যতম প্রধান আবিষ্কার। তিনি তার সমগ্র জীবনে মোট ১২টি যৌগিক লবণ এবং
৫টি থায়োএস্টার আবিষ্কার করেন।
সমবায়ের পুরোধা স্যার পিসি রায় ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে নিজ জন্মভূমিতে একটি
কো-অপারেটিভ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে বিজ্ঞানী পি সি
রায় পিতার নামে আর,কে,বি,কে হরিশ্চন্দ্র স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন।
বাগেরহাট জেলায় ১৯১৮ সালে তিনি পি.সি কলেজ নামে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা
করেন। যা আজ বর্তমান বাংলাদেশের শিক্ষা বিস্তারে বিশাল ভূমিকা রাখছে।
সাহিত্যচর্চাও ছিল তার অন্যতম আগ্রহের বিষয়। তিনি বাংলা ও ইংরেজিতে অনেক
প্রবন্ধ ও গ্রন্থ রচনা করেছেন। তার বিখ্যাত গ্রন্থ "A History of Hindu
Chemistry" (হিন্দু রসায়নের ইতিহাস) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এছাড়া, তিনি
"দ্য রেনিন্স ইন ইণ্ডিয়া", "মেমোয়ার্স অফ এ নজরুলিয়ান" সহ বেশ কয়েকটি
উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রচনা করেছেন।
প্রফুল্ল চন্দ্র রায় ছিলেন একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক এবং সমাজ সংস্কারক।
তিনি "স্বদেশী" আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন এবং ব্রিটিশ শাসনের
বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। তিনি কুসংস্কার ও সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধেও
ছিলেন সোচ্চার।
আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্রের দেশপ্রেম তাঁকে ইউরোপে থেকে ফিরিয়ে এনেছিল।
দেশে এসেও তিনি তার সেই স্বদেশপ্রীতির পরিচয় দিয়েছেন। তিনি ক্লাসে
বাংলায় লেকচার দিতেন। বাংলা ভাষা তার অস্তিত্বের সাথে মিশে ছিল। তার
বাচনভঙ্গী ছিল অসাধারণ যার দ্বারা তিনি ছাত্রদের মন জয় করে নিতেন খুব
সহজেই। তিনি সকল ক্ষেত্রেই ছিলেন উদারপন্থী।