গঙ্গা পুত্র দেবব্রত

তমাল আচার্য,

গোরক্ষপুর, উঃ প্রদেশ

যোজন বিস্তৃত কুরুক্ষেত্র প্রান্তর। প্রান্তরের দুদিকে কৌরব পান্ডব যুদ্ধ শিবির। নিশ্চিত এ মহাযুদ্ধ। ক্ষমতালোভী, দুরাচারী দুর্যোধন এক লহমায় কৃষ্ণ-র শান্তি দৌত্য কে নস্যাৎ করে দিয়ে গর্জে উঠলো-"বিনা যুদ্ধে সূচী অগ্র মেদিনী দেব না।" অতএব যুদ্ধ অবশ্য নিশ্চিত।

পিতামহ ভীষ্ম বিষণ্ণ, বিমর্ষ, অস্থিরচিত্তে পায়চারী করছেন শিবিরে। অধীর ব্যাকুলিত মনটা হাহাকার করে উঠছে। উদ্‌গত কান্না ক্ষত্রিয়ের শোভা পায় না। পদচারণা আরও তীব্র হয়ে উঠল। "কি করে, কি করে আপন প্রিয়তম পান্ডব পৌত্রদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করবেন পিতামহ। শিশুকাল থেকে স্নেহসিক্ত স্নেহের পরশে লালিত হয়েছে যারা, তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ! না.. না.. অসম্ভব, সর্বৈব অসম্ভব। পরমুহূর্তে সম্বিৎ ফিরে পেয়ে পিতামহর কাতর উক্তি-ক্ষত্রিয় ধর্ম পালন করতে হবে। রাজাদেশ পালন করতেই হবে।

দমবন্ধ হয়ে আসছে পিতামহ-র। শিবিরের বাইরে সতেজ বাতাস বুক ভরে নিলেন। ঊর্দ্ধপানে অসংখ্য নক্সাখচিত আকাশ পানে অনিমেষ চেয়ে আছেনআছেন। ঐতো আকাশ গঙ্গা-আমার জননী- গঙ্গা। মনে জাগে মাতৃক্রোড়ে ক্ষণকাল বিশ্রাম নিতে।

নিরুপায় গঙ্গাপুত্র দেবব্রত বশিষ্ঠ ঋষির শাপে শাপভ্রষ্ট হয়ে মনুষ্যলোকে দীর্ঘকাল জীবন অতিবাহিত করতে হবে। ভগ্নহৃদয় দেবব্রত শিবিরে প্রবেশ করলেন। জন্মক্ষণ থেকে গঙ্গাপুত্র দায়বদ্ধতার বেড়াজালে আবদ্ধ। উপেক্ষিত কিন্তু কর্তব্যপালনে সদা নিরত।

হস্তিনাপুর রাজা শান্তনু, একদা ভ্রমণরত অবস্থায় ধীবর কন্যা সত্যবতীর অপরূপ সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে বিবাহ করতে ইচ্ছুক হোল। পিতার দ্বিতীয় বিবাহ জানতে পেরে ধীবর রাজের সাক্ষাতে পিতার বাসনা প্রকাশ করলেন। ধীবর রাজ জানালেন বিবাহ অসম্মতি। বিবাহের পরে কন্যার পুত্র সিংহাসন হতে বঞ্চিত হবে। দেবব্রত প্রতিজ্ঞা করলেন, চিরকুমার থাকবেন। ধীবর রাজ সম্মতি দিলেন এবং যথা সময়ে পিতা শান্তনুর বিবাহ হোল সত্যবতীর সাথে। দেবব্রত-র অমোঘ প্রতিজ্ঞায় ত্রিলোকে ধন্য ধন্য রবে "ভীষ্ম" আখ্যায় ভূষিত হোল। কিন্তু ভীষ্ম পরিজন মাঝে থেকেও একা, একদম একা, নিঃসঙ্গ।

পূর্বস্মৃতি মন্থন করছেন পিতামহ ভীষ্ম।

পিতা শান্তনু ও বিমাতা সত্যবতী-র সময়কালে দুই পুত্র চিত্রাঙ্গদ ও বিচিত্রবীর্য জন্মগ্রহণ করলো। সময়ের আবর্তনে তারা যৌবন প্রাপ্ত হোল। কালান্তরে পিতা শান্তনু মৃত্যুবরণ করলেন। বৈমাত্রেয় ভাইদের বিবাহের জন্য ব্যস্ত হলেন পিতামহ ভীষ্ম। ভ্রাতা চিত্রাঙ্গদ অসুর যুদ্ধে নিহত। কেবল মাত্র বিচিত্রবীর্য জীবিত। কাশীরাজ নরেশ তাঁর তিন কন্যা অম্বা, অম্বিকা, অম্বালিকার এক যোগে স্বয়ম্বর সভার আয়োজন করেছে। কালাতিপাত না করে ভীষ্ম সভায় প্রবেশ করে বলপূর্বক হরণ করে হস্তিনাপুরে বিবাহের আয়োজন করেন।

জ্যেষ্ঠা কন্যা অম্বা রাজা শাল্বর বাগদত্তা- কুমার দেবব্রত তাঁকে মুক্তি দিল। রাজা শাল্ব অম্বাকে বরণ করলো না। অপমানিত অম্বা প্রত্যাবর্তন করে কুমার দেবব্রত-কে স্বামী রূপে যাচনা করলো, কিন্তু ভীষ্ম আপন প্রতিজ্ঞা- -বদ্ধতায় বিবাহে বিমুখ হলেন। উপেক্ষিতা, লাঞ্ছিতা অম্বা যজ্ঞাগ্নিতে নিজ শরীর ত্যাগ করলো এবং পিতামহকে অভিশাপ দিল-পরজন্মে আমি তোমার মৃত্যুর কারণ হবো।”

ভাগ্যের পরিহাস! দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে পিতামহ বৈমাত্রেয় ভাই বিচিত্রবীর্যের দুই কন্যার সাথে বিবাহ সম্পন্ন করলেন। কিয়ৎদিন পরে বিচিত্রবীর্য যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু প্রাপ্ত হলো। বিমাতা সত্যবতী রাত্রিদিন দুশ্চিন্তায় মগ্ন। তবে কি কুরুবংশ ধ্বংস হয়ে যাবে! হঠাৎ বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে বিমাতার মনে পড়লো ঋষি দ্বৈপায়নের কথা। তাঁরই তো পুজ। পরাশর মুনির ঔরসজাত কুমারী সত্যবতীর গর্ভজাত পুত্র দ্বৈপায়ন। কুরু বংশ রক্ষার্থে তাঁকে প্রয়োজন। গঙ্গাপুত্র সাথে বিমর্শ পরামর্শ করে শীঘ্র ঋষিকে আনায়নের ব্যবস্থা করা হোল।

হস্তিনাপুরে প্রবেশ করে দ্বৈপায়ন মাতৃ অভিলাষ পূর্ণ করলেন। যথাকালে জ্যেষ্ঠাবধূ অম্বিকা অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রকে এবং কনিষ্ঠা অম্বালিকা কৃশ, পীত দেহ পাণ্ডুকে জন্ম দিল। কার্য সমাধান্তে দ্বৈপায়ন আশ্রমে প্রত্যাবর্তন করলেন।

নিদ্রাহীন বিষাদভরা চোখে আকাশের পানে চেয়ে আছেন পিতামহ। মনে প্রশ্ন জাগে, কুরু বংশের পরিবার পরিজনদের লালন পোষণ করবার একমাত্র দায়িত্ব কি শুধু পিতামহর? দুরাচারী, অধর্মী কুচক্রী মাতুল শকুনির কু-পরামর্শে দুর্যোধন কুরুবংশের ধ্বংসের কারণ হয়ে উঠেছে। দেবতাদেরও সাধ্য নেই এ মহাযুদ্ধ বন্ধ করবার।

অগ্রহায়ণ মাস, কৃষ্ণা সপ্তমী, মঘা নক্ষত্র। কৌরব পাণ্ডব যোদ্ধা সকল যুদ্ধক্ষেত্রে প্রস্তুত। কৃষ্ণ তাঁর পাঞ্চজন্য শঙ্খ; পিতামহ তাঁর শশাঙ্খ শঙ্খ; যুধিষ্ঠির তাঁর অনন্ত বিজয় শঙ্খ ক্রমান্বয়ে গগন মথিত নিনাদে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন। যুদ্ধের নিয়ম-মহারথী- - মহারথী; রথী-রথী; পদাদিক- পদাতিক ইত্যাদি বর্গ-বিশেষে যুদ্ধরত হবে এবং যুদ্ধ সময়- সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত কেবল মাত্র।

যুদ্ধের প্রথম দশদিন পিতামহ ভীষ্ম কৌরবপক্ষের সেনাপতি। যুদ্ধ শুরু। শনৈঃ শনৈঃ যুদ্ধ তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। অস্ত্রে অস্ত্রে ঝনঝনানি। আর্তনাদ, বিলাপ দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। রণক্ষেত্র রক্তে রক্তে ভরে উঠছে। ক্রমান্বয়ে দুই শিবিরের অসংখ্য যোদ্ধা প্রাণ হারালো।

অষ্টম দিবস। যুদ্ধে আজ পিতামহ সাক্ষাৎ যম। রুদ্র মূর্তিতে বানে বানে পান্ডব যোদ্ধারা তৃণের মতো উড়ে যাচ্ছে। তৃতীয় পান্ডব পিতামহ-র সাথে যুদ্ধে নিমজ্জিত হয়ে পড়ছে। অর্জুন পর্যুদস্ত, বিধ্বস্ত। যুদ্ধ রথ চূর্ণ। তাই দেখে সারথী কৃষ্ণ অতি ক্রোধে ভগ্নরথের চাকা তুলে পিতামহ-র প্রতি ধাবমান হলেন। পিতামহ স্মিত হাস্যে ধনুর্বাণ সংবরণ করে আনত হয়ে রইলেন। অর্জুন ঝটিতি আগুয়ান হয়ে সাখাকে ক্ষান্ত করে বললো, -"সখা, তুমি যদি পিতামহকে বধ করো, তাহলে আমার প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ হবে। আমি ভীষ্ম বধ প্রতিজ্ঞা করেছি - তা তুমি নিশ্চিত জ্ঞাত আছ।" কৃষ্ণ শান্ত হলেন। পিতামহ কৃষ্ণকে মনে মনে বন্দনা করে বল্লেন-"হে জনার্দন, আবার আমি আমার প্রতিজ্ঞা রাখতে পারলাম। তুমি বলেছিলে, যুদ্ধে অস্ত্রধারণ করবে না। আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, তোমায় অস্ত্রধারণ করাবো।" সূর্যাস্ত হওয়ার কারণে সেদিনের মত যুদ্ধ সমাপ্ত।

দশম দিবস। কুরু সেনাপতি ভীষ্ম আজ বিচলিত। অমঙ্গল যেন কুরুক্ষেত্রকে পরিবেষ্টন করে রেখেছে। না... দুর্বল হলে চলবে না। প্রবল পরাক্রান্ত ভীষ্ম ক্ষাত্র ধর্ম পালনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। পিতামহ আজ ভয়ংকর, রথের ঘূর্ণনে ধুলায় ধুলায় আকাশ অন্ধকারে আচ্ছন্ন। তীক্ষ্ণ তিরের আঘাতে প্রতিপক্ষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। ক্ষিপ্ত, দুর্দম পিতামহ বজ্রনিনাদ কন্ঠে ফুকারে অর্জুনকে। ইতোমধ্যে অন্য পাণ্ডব- ভ্রাতাদের সম্মুখ সমরে পেয়েও মুক্ত কার দিলেন পিতামহ। তাঁর একমাত্র প্রতিপক্ষ কুন্তিপুত্র অর্জুন, গুরু দ্রোণাচার্যর প্রিয়তম শিষ্য অর্জুন। কোথায় অর্জুন এসো... আমার সম্মুখে। যুদ্ধ করো। উম্মত উন্মাদ পিতামহ খোঁজে অর্জুনকে। মুহুর্মুহু নিনাদ মাঝে অর্জুনের রথ প্রকাশ্যে গোচর হোল। কিন্তু একি! রথারূঢ দ্রুপদ পুত্র শিখণ্ডী। পূর্বজন্মে -কাশীরাজ কন্যা, অম্বা। রাজা শাল্ব দ্বারা প্রত্যাখ্যাতা, পিতামহ ভীষ্ম দ্বারা উপেক্ষিতা। নারীমন চরম অপমানের প্রতিশোধ, এই যুদ্ধক্ষেত্রে পিতামহকে বধ করে, চরিতার্থ করবে শিখন্ডী।

ললাটের লিখন। পিতামহ ধনুর্বাণ অস্ত্র ত্যাগ করে রখে আনত হয়ে রইলেন। শিখন্ডী সন্মুখ হতে এবং অর্জুন পশ্চাৎ হতে বানে বাণে বিদ্ধ করে দীর্ঘদেহী, পরাক্রমশালী পিতামহকে দুর্বল, অসহায় করে তুললো। রক্তাল্পুত অবস্থায় পিতামহ অসংখ্য বাণে বিদ্ধ, শরশয্যায় লুটিয়ে পড়লেন। কৌরব পাণ্ডব যোদ্ধৃগণ মহাগুরু পতনে হাহাকার করে উঠল। যুদ্ধ স্তগিত হোল। পিতা শান্তনু দ্বারা বরদান প্রাপ্ত "ইচ্ছামৃত্যু-র প্রতীক্ষায় শরশয্যায় দিন অতিবাহিত করছেন পিতামহ। এবং সেই ঈপ্সিত মাহেন্দ্রক্ষণ এসে গেল- মাঘ মাস, শুক্লপক্ষ, অষ্টমী তিথি-উত্তরায়ণ।”

গঙ্গাপুত্র দেবব্রত ঋষি-শাপমুক্ত হয়ে হৃষ্টচিত্তে প্রতীক্ষারত সপ্ত-বসুগণ সাথে অষ্টম বসু" মিলিত হলেন ক্রন্দরত কুন্তী মাদ্রী পুরূগণ যথোচিত শ্রদ্ধা ও সম্মানের সাথে পিতামহ-র নশ্বর দেহ দাহ করলো। মহাভারতের এক মহাযুগ সমাপ্ত।

! ! ক্রন্দিত ক্রন্দসি ! !

কাহিনিসূত্র: কাশীরাম দাস বর্ণিতঃ মহাভারত ।।