আমার প্রথম বিদেশ যাত্রা (পর্ব- ২)

অদিতি মন্ডল,

কলকাতা


পূর্ববর্তী অংশটি পড়ার জন্য লাইব্রেরি বিভাগে দেখুন...

রাতে বেশ ঠান্ডা লাগছিল তবে নরম বিছানায় গা ডুবিয়ে স্বপ্নের দেশে যেতে খুব বেশি সময় লাগল না। পরের দিন সকালে উঠে কাঁচের জানলা থেকে বাইরের দিকে তাকাতেই মনটা কেমন জানি করে উঠলো। এমন ঝকঝকে পরিষ্কার নীল আকাশ আমি আগে কখনো দেখিনি। এমন চকচকে সুন্দর বায়ুমণ্ডল আমি দেখিনি। গাছপালা ভরা শহর লন্ডন। সামনেই বড় পার্কে লোক একটা দুটো হাঁটছে। সামনের রাস্তাটা চলে গেছে কিংস অ্যভিনিউ এর দিকে, সেদিকটাতে অনেকেই সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছে, কেউ কেউ জগিং করছে। প্রত্যেকটা সাইকেলের পেছনে লাল আলো জ্বলছে, এমনটা এখানে কম্পালসারি। তাকিয়ে দেখলাম প্রত্যেকে এখানে মাথায় হেলমেট পরেই সাইকেল চালায়। তবে এখানকার সাইকেলের স্পিড আমাদের দেশের তুলনায় অনেক বেশি।

আগের দিন রাতে ঠিক করাই ছিল, আজ যেহেতু রবিবার তাই তমালের অফিস নেই, তমাল কাল জয়েন করে নেবে তাই আমরা দুজনে একসাথে আজ ঘুরতে বেরোবো। আরামদায়ক গরম জলে স্নান সেরে হালকা কিছু খেয়ে আমরা ড্রেস করে বেরিয়ে পড়লাম লন্ডনের রাস্তায়।


লন্ডন একটি ইতিহাস এবং সংস্কৃতির শহর। এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পরিদর্শন করা শহর হিসাবে বিবেচনা করা হয়, যেখানে বার্ষিক 50 মিলিয়নেরও বেশি দর্শক আসে। বাকিংহাম প্যালেস থেকে চায়নাটাউন এবং লন্ডন আই থেকে ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবে, সমস্ত জায়গা জুড়ে আছে ইতিহাস এবং আভিজাত্যের প্রাচুর্য।

প্রথমে আমরা ডিসাইড করলাম আমরা তমালের অফিস টা দেখতে যাব, যাতে কাল ও সময়মত অফিস পৌঁছাতে পারে। তারপর দেখব বাকিংহাম প্যালেস, কিংস গার্ডেন, কিংস সরোবর ইত্যাদি। আগেই ঠিক করেছিলাম পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ইউজ করব আমরা। সেই মতো সিটি ম্যাপার দেখে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। এতে করে খরচটাও কিছুটা কম হবে আর লন্ডনের সেই বিখ্যাত লাল দোতলা বাসে চড়ে লন্ডনে ঘোরা যাবে। সঙ্গে বিদেশী লোকজনদের সঙ্গে মেলামেশা ও তাদের হাবভাব দেখার একটা সুযোগ থেকে যাবে।


আমরা হেঁটে তাই সামনের রাস্তাটাই ধরলাম যেটা কিংস এভিনিউ এর দিকে চলে গেছে। কিংস এভিনিউ এর বাসস্টপে পৌঁছাতে পাঁচ মিনিটের মত হাঁটা পথ। বাইরের হিম শীতল বাতাসে আমাদের গ্লাভস না পরা হাত ঠান্ডায় কেঁপে কেঁপে উঠছিল। কোটের পকেটে হাত ঢুকিয়ে কোনোভাবে রক্ষা পাওয়া গেল এ যাত্রায়। গরম লম্বা কোট নিয়ে এসেছি বলে নিজেদেরকে ধন্যবাদ দিতে থাকলাম মনে মনে।

পৃথিবীর বৈচিত্র্যময় শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম ব্রিটেনের রাজধানী লন্ডন শহর। এ শহরে পুরোনো অভিজাত স্থাপনা যেমন নজর কাড়ে, তেমনি চোখ ধাঁধিয়ে দেয় আধুনিকতাও। বিশ্বের বিভিন্ন জাতি–গোষ্ঠীর মানুষের বাস এখানে। তাই স্বাভাবিকভাবে এখানে আছে বৈচিত্র্যময় খাবারের বিশাল সমাহার। রাতের লন্ডন ভিন্ন এক সৌন্দর্যের ডালি সাজিয়ে হাজির হয়। আলোর ঝলকানি আর বিবিধ আয়োজন এর রূপ যেন পাল্টে দেয়।


লন্ডন শহরের অলিগলি ভালো করে দেখতে প্রয়োজন দীর্ঘ সময়। কিন্তু আমাদের হাতে অত সময় নেই, এবার দিন দশেক হাতে পাব লন্ডন ঘুরে দেখার জন্য। এই ট্রিপে বৈচিত্র্যময় শহর লন্ডনকে সেভাবে দেখার সুযোগ না হলেও চেষ্টা করব সব থেকে বিখ্যাত কিছু জায়গায় ঘোরার এবং তাদের ইতিহাস সম্বন্ধে একটু জানার। আর আমরা দুজন ভোজন রসিক তাই চেখে নেব এখানকার রকমারি খাবার।

যাইহোক বাসস্টপে পৌঁছে দেখলাম অল্প কয়েকজন লোকই আছে। তাদেরই একজনকেই আমরা জিজ্ঞেস করলাম যে টিকিট কিভাবে কাটবো বাসের জন্য। ভদ্রলোক জানালেন যে কার্ডে টিকিট কাটতে হয় এখানে। যাই হোক বাস আসতে লাইনে লেগে আমরাও বাকি সবার সাথে পর পর উঠে গেলাম বাসে। বাসে চড়ে লোকজন ড্রাইভারের সিটের জানলার পাশেই গোল যন্ত্রে কার্ড ঠেকাচ্ছে আর বিপ শব্দ হতেই যে যার সিটে চলে যাচ্ছে। আমরাও অন্য যাত্রীদের দেখাদেখি তাই করলাম। দুজনে দুটো কার্ড দেখালাম। তমালের টা বিপ করে উঠলো কিন্তু আমারটা বেশ জোরে টুঁ টুঁ আওয়াজ করল। বুঝলাম না কি হলো! তবে সিটে বসে গেলাম দুজনে।


বাসে আমাদের টিকিটের দামস্বরূপ লাগলো 1.75 ইউরো। বাসে কোন কন্ডাকটর নেই, বাসের মধ্যে সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো এবং বাসের ভেতরের প্রতিটা কোণা সিসিটিভি ক্যামেরার মনিটরে দেখা যায়। বাসের ভিতর বড় একটা ইলেকট্রনিক্স বোর্ড লাগানো ছিল যাতে পর পর প্রতিটা বাসস্টপের নাম স্ক্রিনের উপর ফুটে উঠছিল। রাস্তায় রাস্তায় ইলেকট্রনিক্সের বোর্ডে বিভিন্ন জায়গা, অফিস, বিভিন্ন কোম্পানি, এবং বিভিন্ন বিল্ডিং এর নাম দেখা যাচ্ছিল। আর দেখতে পাচ্ছিলাম বিশাল বিশাল ইমারত, নামি দামি গাড়ি। রাস্তায় ও রাস্তার দু'ধারে যেখানে কোন কাজ হচ্ছে বা নতুন বিল্ডিং বানাচ্ছে সেখানে কোন রকম নোংরা ইট বালির টুকরো অবধি দেখা যায় না। সমস্ত বাড়ি সিল করে এখানে কাজ করা হয়, সেফটির ব্যাপারে পুরো লক্ষ্য রাখা হয়।

আমরা দুটো বাস চেঞ্জ করে গেলাম ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের সামনে। লন্ডন ঘুরতে যাবো আর ব্রিটিশ মিউজিয়াম যাবো না, সে কি হয়! এখানে এক চক্কর দিলেই হবে না, আসতে হবে সময় নিয়ে। এখানে প্রবেশের জন্য কোনো মূল্য দিতে হয় না। তবে চাইলে আপনি জাদুঘর কর্তৃপক্ষকে দান করতে পারেন। কত রকমের আয়োজন এই জাদুঘরে? বলা যায়, এত আয়োজন এখানে যা আপনি চিন্তাও করেননি!


এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় জাদুঘরগুলোর মধ্যে অন্যতম। মোটামুটি পুরো পৃথিবীর মানুষের সংস্কৃতির প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ নিদর্শন সংরক্ষিত আছে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে। এখানে এলে আপনি ভুলে যাবেন মিসর এসেছেন না গ্রিস? রোমে, চীন নাকি প্রাচীন ভারতে? আমেরিকা থেকে সংগৃহীত বস্তু ও প্রত্নসামগ্রীও রয়েছে এই জাদুঘরে। হাজার বছরের পুরোনো মিসরীয় রাজাদের মমি এবং অনেক প্রত্ন নিদর্শন রয়েছে এখানে। এক কোণে রাখা আছে দক্ষিণ এশিয়ার নিদর্শন। সেখানে শোভা পাচ্ছে টিপু সুলতানের তলোয়ারসহ আরও কিছু ঐতিহাসিক বস্তু। ব্রিটিশ মিউজিয়ামে স্থান পাওয়া নিদর্শনগুলোর সব যে সঠিক উপায়ে সংগ্রহ করা হয়েছিল, তেমনটা বলেন না জাদুঘর বিশেষজ্ঞরা। এই জাদুঘরে শুধু দেখা নয়, বিভিন্ন সংগ্রহ সম্পর্কে দর্শনার্থীদের জানানোর জন্যও রয়েছে প্রযুক্তির অভিনব ব্যবহার।

এটি স্থাপিত হয় ১৭৫৩ সালে। শুরুতে পদার্থবিজ্ঞানী স্যার হ্যান্স স্লোয়েনের সংগৃহীত জিনিসপত্রের ওপর ভিত্তি করে এই জাদুঘরটি গড়ে ওঠে। স্যার হ্যান্স ৭১ হাজারের বেশি বস্তুসামগ্রী সংগ্রহ করে দিয়েছিলেন জাদুঘরটিতে। এগুলোর মধ্যে ছিল ৪০ হাজারের বেশি বই, ৭ হাজার পাণ্ডুলিপি, ৩৩৭ প্রজাতির উদ্ভিদ দেহাবশেষ। পরবর্তী সময়ে আরও সমৃদ্ধ হয়েছে ব্রিটিশ মিউজিয়াম এবং বলা চলে এখনো সমৃদ্ধ হয়েই চলেছে জাদুঘরটি।


দেখলাম সেই বিখ্যাত মিউজিয়াম, বিশালাকারের এর সাইন্স পাঠের জায়গাটা। যেখানে আগামীকাল থেকে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে একটি আন্তর্জাতিক সেমিনার, আর সেই সেমিনারে তমালের বক্তব্য রাখার আছে। আগেভাগেই আমরা জায়গাটা ভালো মতো দেখে নিলাম যাতে আগামীকাল সময়মতো তমাল পৌঁছে যেতে পারে। গোটা বিল্ডিংটা বিভিন্নভাবে বিভক্ত। দেখলাম স্টাফরা সিকিউরিটিকে আইডি কার্ড দেখিয়ে ঢুকছে। আমরা আর ভিতরে ঢুকলাম না, বাইরে থেকে চার দিকটা ভালো করে ঘুরে ঘুরে একবার দেখে নিলাম এবং কিছু ফটো তুললাম।

তারপরে আমরা বেরিয়ে পড়লাম বাকিংহাম প্যালেসের দিকে। বিখ্যাত সেই বাকিংহাম প্যালেস সামনে দাঁড়িয়ে! কেমন অবাক চোখে বইয়ের পাতা থেকে উঠে আসা জল জ্যান্ত প্যালেসকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখলাম।
লন্ডনের বাকিংহাম প্যালেস পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রাজপ্রাসাদগুলোর অন্যতম। কাছে যেতেই চোখে পড়লো মানুষের ভিড়, ছবি তোলার হিড়িক। বিশাল এই প্রাসাদের সদর দরজা লাগানো থাকে। বাইরে থেকেই যতটা দেখে নেওয়া যায়। ভেতরে বড় কালো টুপি আর লাল পোশাক পরা প্রহরীদের সশস্ত্র পাহারা। প্রাসাদের সামনে রয়েছে বিশাল বাগান। বাগানের মধ্যে মানুষ ও সিংহের ভাস্কর্য। শ্বেতপাথরের আরেক নজরকাড়া ভাস্কর্যও দেখলাম এখানে। এ ছাড়া এখানে রয়েছে বেশ কয়েকটি স্থাপনা। সব মিলিয়ে বাকিংহাম প্যালেস আমাকে মুগ্ধ করেছে।


বাকিংহাম প্রাসাদটি ব্রিটিশ রাজপরিবারের বিভিন্ন রাজকীয় অনুষ্ঠান এবং অবসরকালীন বিনোদনের জন্য তৈরি হয়েছিল। প্রথমে প্রাসাদটির নাম ছিল বাকিংহাম হাউস। প্রাসাদটি ১৮৩৭ সালে রানি ভিক্টোরিয়ার সিংহাসন আরোহণের সময় ব্রিটিশ রাজপরিবারের রাজকীয় কাজে ব্যবহৃত হয়েছিল।
সুন্দর কারুকার্যময় গেটের হাতলে হাত দিয়ে অনুভব করার চেষ্টা করলাম সত্য জগতকে। বাকিংহাম প্যালেসের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হল গার্ডের আনুষ্ঠানিক পরিবর্তন। এই অনুষ্ঠান 45 মিনিট স্থায়ী হয়। আমরা বাকিংহ্যাম প্যালেসের সামনে থাকাকালীন শুরু হয়ে গেল লাল পোশাক পরা প্রহরীর চেঞ্জের সময়। বিভিন্ন ছন্দ এবং ভঙ্গিমায় প্যারেড করে চেঞ্জ হলো গার্ড। লোকেরা সহাস্যে তালি দিয়ে সম্ভাষণ জানালো গার্ডদের। বাকিংহাম প্যালেস হল রাণীর অফিসিয়াল লন্ডন বাসভবন, সেইসাথে রাষ্ট্রপ্রধানের অফিসও। প্রাসাদটি মূলত ডিউক অফ বাকিংহাম দ্বারা তৈরি করা হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে সেখানে বসবাসকারী প্রথম রাজা ছিলেন রানী ভিক্টোরিয়া। বর্তমানে এটি পর্যটনের বিশেষ আকর্ষণ।
বিভিন্ন দেশ বিদেশের লোকেরা ভিড় জমিয়েছে এর পাদদেশে।
লক্ষ্য করলাম বিদেশি বৃদ্ধ মহিলা পুরুষের মুখেও যৌবনের হাসি ফুটে উঠছিল এর পাদদেশে।

বাকিংহাম প্যালেস থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে চোখে পড়লো বিশাল এক পার্ক। এটি বেশ পরিচিত। হাইড পার্ক লন্ডনের বৃহত্তম রয়্যাল পার্ক। চারদিকে সারি সারি বিশাল আকারের গাছ, বড় মাঠ, পার্কে বসার স্থান সব মিলিয়ে একটি দারুণ জায়গা। মানুষ এখানে এসে শুধু ঘুরে বেড়াচ্ছে না। কেউ সাইকেল চালাচ্ছে, কেউ দৌড়াচ্ছে, আবার কেউবা পার্কের বেঞ্চে বসে শুধুই আড্ডা মারছেন। এই সময় পুরো পার্কটার চারদিক ঘন সবুজে ঘেরা। এখানেই দেখলাম আমাদের দেশের মতো মানুষে চালানো তিন চাকা ওয়ালা রিক্সা। যা লাভ সাইন, উজ্জ্বল লাইট, বিভিন্ন সাইজের কার্ড এবং ল্যাম্প দিয়ে সুন্দর করে সাজানো রয়েছে। এবং সেই সঙ্গে স্পিকারের ও ব্যবস্থা করা আছে। এরা পার্কের চারদিকটা ঘুরিয়ে দেখায়।


যাই হোক এরপর আমরা দুজনে সুন্দর স্মৃতি নিয়ে এগিয়ে চললাম জর্জ সিক্সের দরজায় কড়া নাড়তে। সবুজ মখমলের বিস্তীর্ণ উপত্যকাময় পার্কের মধ্যে দিয়ে গিয়ে পৌঁছালাম দরজায়। এখানে জর্জ সিক্স তার মূর্তির মধ্যে দিয়ে তখন ও গাম্ভীর্য প্রকাশ করে চলেছেন ও লোকেদের আনুগত্য চেয়ে চলেছেন।
ভেতরে ঢুকে চারদিক ঘুরে আমরা চললাম সেই বিখ্যাত সরবরে। রাজহংস ও হংসিনী ভরা দিঘী, চারিদিকে লোকেরা এদেরকে খাবার দিচ্ছে। আনন্দে তারা উড়ে উড়ে খাচ্ছে। এখানকার মনোরম দৃশ্যের সামনে কিছুক্ষণ থাকলাম এবং আমরাও হংস-হংসীদের খেলা উপভোগ করলাম। হীম ঠান্ডা বাতাস বেশিক্ষণ সহ্য হলো না আমাদের। সরবররের তীরে সুন্দর মনোমুগ্ধকর পরিবেশে বেশিক্ষণ থাকতে না পেরে আমরা বেরিয়ে পড়লাম।

পেটটাতেও একটু টান অনুভব করলাম , খিদে পাচ্ছে বেশ। এজন্য আমরা ভাবলাম এবার কিছু খেয়ে নেওয়া যাবে।
হাটতে হাঁটতে আমরা একটা পাবে ঢুকলাম। এখানে বাচ্চা বড় ফ্যামিলির সবাই একসাথেই খায় পাবে। সেখানে আমাদের দুপুরের খাবার খাওয়ার একটাই রিজন হলো যে আমরা সানডে রোস্ট খেতে এসেছি।


ইয়র্কশায়ার পুডিংয়ের সাথে সানডে রোস্ট লন্ডনের একটি ঐতিহ্যবাহী খাবার যা কেবলমাত্র রবিবারেই পরিবেশন করা হয়। এতে আলু, স্টাফিং এবং পুডিং সহ এক টুকরো তন্দুরি বা রোস্ট করা মাংস অন্তর্ভুক্ত থাকে। মুরগির মাংস, ভেড়ার মাংস, গরুর মাংস এবং শুয়োরের মাংসের সাথে রোস্ট নিজেই বেশ কিছুটা আলাদা হতে পারে। ঋতুভেদে হাঁস, টার্কি এবং গ্যামন অন্তর্ভুক্ত।
এই খাবারের পুডিং সাইড ডিম, ময়দা এবং দুধ থেকে তৈরি করা হয়। এই খাবারটি স্থানীয় রেস্তোরাঁ সহ লন্ডনের ছোট বড় নামে দামি প্রায় প্রতিটি পাব বা ক্যাফেতে পাওয়া যায়। এটি লন্ডনের অন্যতম সেরা স্থানীয় খাবার।
তাই দেরি না করে লন্ডনের খাবারের মধ্যে বেস্ট ফুড চয়েস করে আমরা সানডে রোস্ট অর্ডার করলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের খাবার চলে এলো। দুটো প্লেটে দুটো বড় সাইজের চিকেন তন্দুরি মতো যা বাটারে বানানো সঙ্গে স্ম্যাস্ড পোটাটো (আলু সিদ্ধ) আর রোস্টেড ফুলকপি গাজর। প্লেটৈ সাজানো লেটুস ও আর একটা কিছু শাক পাতা দেওয়া যা খুবই টেস্ট লাগলো, সঙ্গে ছিল মেয়োনিজ ও সস।
১৬ ইউরো-র মত দাম নিয়েছিল।

এরপর রাস্তার বাসস্টপে অনেকক্ষণ আমরা ওয়েট করলাম আমাদের নির্দিষ্ট বাসের জন্য। এখানে বিভিন্ন হিপহপ বাস দেখলাম। যাদের মাথা খোলা দোতলা বাস, যা লন্ডন ঘুরে দেখানোর জন্য বেশ ইন্টার স্টিং। তবে ঠান্ডা লাগার পুরো সম্ভবনা আমাদের মত শীতকাতুরে লোকেদের। মজার ব্যাপার হলো লন্ডনের লোকেদের ঠান্ডা বা গরম লাগার ব্যাপারটাতে আমরা বেশ কনফিউজড। কারণ কিছু জন বেশ মোটা মোটা জ্যাকেট পরে নিজেদেরকে মোটা করে তুলেছেন আর কিছু লোক স্যান্ডো হাফপ্যান্ট পরে দিব্যি হেঁটে চলেছে লন্ডনের অমন ঠান্ডার মধ্যেও।


ফেরার পথে আমরা ক্লাপহাম কমন হয়ে ফিরছিলাম, এখানে নেমে আমরা চলে গেলাম সামনের 'আইরিশ'-এ (শপিং মল)। এখানে আমরা প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস কিনে নিলাম পরের দিনের জন্য। যেমন কিছু সবজি, পনির, হ্যাম, সসেজেস এন্ড ব্লুবেরি। আমাদের ইন্ডিয়ার মত এখানে শপিংমলে জায়গায় জায়গায় সাহায্য করার জন্য কোন লোক বা ছেলে মেয়ে দাঁড়িয়ে নেই, বা অ্যাকাউন্টে পয়সা নেওয়ার জন্য কোন লোকের ব্যবস্থা করা নেই। কোন জিনিসের দাম হয়তো নিজে বুঝতে পারছ না তখন সেই জিনিস নিয়ে গিয়ে স্ক্যানিং মেশিনের সামনে ধরলেই দামটা বেরিয়ে আসবে। দোকানগুলোতে দুটো করে গেট থাকা সত্ত্বেও কোন মানুষ কিন্তু জিনিসপত্র নিয়ে দাম না দিয়ে বেরিয়ে আসছে না। তবে বলতে দ্বিধা নেই, এটা যদি লন্ডন না হয়ে অন্য কোন দেশে হতো, মানে তো আপনারা বুঝতেই পারছেন.......
তবে আর শপিংমল গুলোর মালিকদের ব্যবসা করে খেতে হতো না সমস্ত মালপত্রই যেত চোরের পেটে। দেখলাম লন্ডন টোটালি ক্যাশলেস সিটি, অর্থাৎ আপনি কোথাও কোন জিনিস কিনেছেন বা কোন জিনিসের দাম দেবেন অথবা টিকিট কাটবেন, এর জন্য আপনাকে ক্যাশ দেওয়ার দরকার নেই বা ক্যাশ চলেই না। সেখানে সবকিছুই লেনদেন চলে কার্ডের মাধ্যমে। আমরাও আমাদের জিনিসপত্র নেওয়ার পর কার্ডের মাধ্যমে তার দাম দিয়ে বেরিয়ে এলাম।
এরপর আমরা কিংস এভিনিউ এর বাস ধরে ফিরে এলাম আমাদের হোমস্টে তে।

ফেরার সময় দেখলাম রাস্তার দুপাশের বিভিন্ন বিশাল বিশাল পার্ক, যার বেঞ্চে কেউ বসে আছেন, কেউ কেউ হাঁটছেন, আবার অনেকেই শরীর চর্চা করছেন। শরীর চর্চার জন্য এখানে যেনো কোন নির্দিষ্ট সময় নেই! সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি কেউ কখনও শরীর চর্চা করে চলেছে। আসলে এখানকার এনভায়ার্নমেন্ট- ই এমন।


এদেশের রাস্তা ক্রস করাটাও আমার কাছে বেশ মজাদার মনে হয়েছে, তার কারণ আমাদের দেশে এমন পদ্ধতিতে আমরা কখনোই রাস্তা ক্রস করি না।
রাস্তার ক্রস করার সময় ক্রসিংয়ের রিকোয়েস্ট বটন টিপে দিলে কিছুক্ষণের মধ্যেই এখানের রাস্তায় লাল আলো জ্বলে পথযাত্রীকে রাস্তা ক্রস করার সুযোগ সুবিধা করে দেওয়া হয়। এছাড়াও দেখলাম গাড়ি চালক ক্রসিং এর দাঁড়ানো পথচারীকে দেখলেই নিজেই গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে যায় ও পথচারীকে যাওয়ার সুযোগ করে দেন। খুব ভালো লাগলো ব্যাপারটা দেখে।

সারাদিনের পর বাড়ি ফিরে দেখলাম জুতোর তলাতেও কোন ধুলো লাগেনি! এমন ক্লিন এনভাইরনমেন্ট এমন বিনয়ী মানুষজন আগে আমি কখনো দেখিনি। এ যেনো এক নতুন অভিজ্ঞতা! মনে পড়ল সেই ছোটবেলায় পড়া একটা লাইন "যার পায়ে লাগেনি ধুলি, তার কেমনে নেবে চরণ ধুলি"......এজন্যই বোধহয় এখানে হ্যান্ডশেকের চল, আমাদের মত পায়ে হাত দিয়ে প্রণামের চল নেই।


সন্ধ্যার সময় আমরা বাড়ি ফিরে এলাম। এরপর একটু বিশ্রাম নিয়ে আমরা নিজেরাই রাতের খাবার বানালাম। পটল ভাজা, বাঁধাকপির সবজি, সোয়াবিনের তরকারি আর ডিম কারি। বিদেশে বসে এমন দেশি খাবার খাওয়ার মজাটাই আলাদা। সব থেকে মজা লাগলো রান্না করার সময়, যখন আমাদের মসলার ঝাঁঝে বিদেশি লোকেরা- "ও গড সেভ মি".......বলেই দৌড়াদৌড়ি করে দরজা টেনে পালায়।

রাত্রে বিছানায় যাওয়ার আগে পরের দিন তমাল কি পরবে, কোন গিফট নিয়ে যাবে, কোন ব্যাগ নেবে, কি ব্রেকফাস্ট করবে, সব রেডি করে তারপরে আমরা শুতে গেলাম।
পরের দিন সকাল হলো, জেগেও গেলাম কিন্তু লেপের বাইরে যেন বেরতে ইচ্ছে করছে না। যাই হোক সকাল সকাল ঘুম চোখে লাঞ্চের জন্য তমাল মটর পনির এবং অন্যান্য সব্জি দিয়ে ভেজ পোলাও বানালো এবং আমাদের ব্রেকফাস্ট এর জন্য হ্যাম সসেজেস ওমলেট ব্রেডটোস্ট ও কফি বানানো হলো। এরপর তমাল রেডি হয়ে খাওয়া দাওয়া করে অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ল। আমি মনে মনে দুর্গা দুর্গা বলে হাত নেড়ে বাই বলে জানলায় দাঁড়িয়ে থাকলাম যতক্ষণ দেখা যায়। তমাল হাত নেড়ে রাস্তার বাঁকে অদৃশ্য হলো। তারপরও আমি কিছুক্ষন জানলা ধরে দাঁড়িয়ে রইলাম।


সোমবার সকাল তাই বাচ্চারা স্কুল যাচ্ছে। এখানে ইউনিফর্মের বোধহয় তেমন কড়াকড়ি নেই। বিভিন্ন রকম কোট সোয়েটার ও চুলের বিভিন্ন রকম বাঁধুনী বাচ্চাদের। এদের স্কুলে যাওয়া দেখতে বেশ লাগছিল। এরপর আমি ভাবলাম আজ আর বেরবো না, তাই হাত মুখ ধুয়ে তমালের বানানো ব্রেকফাস্টে প্লেটে নিয়ে একটা বই নিয়ে বসে গেলাম। গরম কফির চুমুক আর ইন্ডিয়ান স্টেট পলিটিক্সের টপিকটা সকালটাকে বেশ তাজা করছিল। হ্যাম এবং সসেজ আমার খুব পছন্দের জিনিস, তাই খুব আয়েশ করে পেট টাইট করে যখন ব্রেকফাস্ট টা শেষ করে অনুভব করলাম কেমন যেন ঘুম ঘুম পাচ্ছে। তমাল অফিস পৌঁছে ইতিমধ্যে মেসেজ করে জানিয়েছে যে পৌঁছে গেছে। ইনকামিং বা আউটগোয়িং কলের তো অনেক পয়সা লাগে তাই আমরা খুব বেশি কল করে পয়সা নষ্ট করতে চাইনি। যখন ঘুম থেকে উঠলাম তখন দেখলাম লন্ডনের ঘড়িতে প্রায় বেলা 11:30 বাজে।
ভাবলাম মাকে একটু ফোন করি। যেমন ভাবা তেমন কাজ। মাকে ফোন করে জিজ্ঞেস করলাম- মা কি করছো? মা বলল- এই যে বিকেলের চুল বাঁধছি।
আমার তখন যেন হঠাৎ মনে পড়লো হ্যাঁ, তাইতো....আমরা তো সাড়ে পাঁচ ঘন্টা পিছিয়ে। দুপুরে স্নান খাওয়া সেরে আবারো আমি ঘুম দিলাম। সারাদিন এভাবে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে কাটালাম। সন্ধ্যে আটটায় তমাল বাড়ি এলে জমিয়ে বসে সব গল্প শুনলাম ওর থেকে। তমাল তো খুব খুশি, সবাই ওর সঙ্গে বেশ ভালো ব্যবহার করেছে এবং ও যার জন্য যে গিফট নিয়ে এসেছিল তা পেয়ে সবাই যারপরনাই উচ্ছসিত এবং আনন্দিত।

পরের দিন তমাল অফিস বেরানোর পরে আমি ব্রেকফাস্ট সেরে তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নিলাম। আজ আমি একাই ঘুরে বেড়াবো লন্ডন শহরে।
আমি তো আগেই বলেছি আমার প্রথম বার হলেও তমাল এর আগে আরো বেশ কয়েকবার লন্ডন এসেছে। তাই তমালের থেকে যতদূর জেনেছি লন্ডন ভ্রমণের জন্য কারও সাহায্য না নিলে ও চলবে। একা একাই ঘোরা যায় শুধু গুগল ম্যাপ ব্যবহার করেই। ম্যাপে গন্তব্যের স্থান দিলেই দেখাবে কতটুকু রাস্তা হাঁটতে হবে, কত দূর ট্রেনে যেতে হবে বা কতটুকু জায়গা বাসে যেতে হবে। এমনকি কতক্ষণ পর পর বাস বা ট্রেন আছে তা–ও জানা যাবে গুগল ম্যাপে। লন্ডনের আবহাওয়ার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এই রোদ নয় তো এই বৃষ্টি! এ জন্য ছাতা রাখা বুদ্ধিমানের কাজ। তবে আজকে আকাশ ঝকঝকে থাকায় আমি আর ছাতা ক্যারি করলাম না। এখানকার মানুষজন খুবই বিনয়ী, তাই আপনি কিছু জিজ্ঞেস করলে যে কেউ আপনাকে সহায়তা করবে।
ওয়েস্টার কার্ড কিনে তাতে টাকা ভরে নিয়েছি, নয় তো বাসে–ট্রেনে উঠতে সমস্যা দেখা দিতে পারে।


প্রথমদিনের দেখা জায়গা গুলো আজ আর নয়। আজ যাবো টাওয়ার অফ লন্ডন দেখতে। সেই মতো আমি নিউ পার্ক রোডের বাসস্টপ থেকে বাস নিয়ে নিলাম। বাসে উঠেই একেবারে চলে গেলাম দোতলার সামনের সিটটাতে। পরিষ্কার চকচকে কাঁচের সামনে বসে বাইরের টা খুব সুন্দর দেখা যাচ্ছিল। সুন্দর জায়গা গুলোর মধ্যে থেকে বাসটা এগিয়ে চলতে লাগলো। অসংখ্য সবুজ ময়দান, সুন্দর কারুকার্যময় বাড়ি, সুন্দর লাল রঙের পোস্ট অফিস, উচুঁ উচুঁ ইমারত পেরিয়ে। মাঝে মাঝে এমন মনে হচ্ছিল সুন্দর বড় বড় বাড়িগুলোর সামনে গিয়ে রাস্তা বুঝী শেষ হয়ে গেছে! ওমা! তারপর দেখি বাসটা কেমন সর্পিল গতি নিয়ে আবার এগিয়ে চলেছে রাস্তায়। মোটকথা বাসে বসে ঘুরতেও বেশ লাগছিল। ফটো তুলছিলাম ইচ্ছে মতো।
ওয়াটার লু পেরিয়ে বাসটা আরো সামনের দিকে চলার পরে আমি পৌঁছে গেলাম আমার নির্দিষ্ট বাসস্টপে।

বহু আকাঙ্ক্ষিত এবং বিস্ময়কর টেমস নদী. ....
পৃথিবীর বিখ্যাত নদীর তালিকায় আছে লন্ডনের ‘হৃৎপিণ্ড’ টেমস নদী। পুরো লন্ডন ঘিরে আছে টেমস। এর আশপাশেই গড়ে ওঠে লন্ডনের নগরসভ্যতা। এই নদীতে অপূর্ব সুন্দর ছোট ছোট জাহাজ ভাসে। এগুলোতে আছে খাবারের দোকান। রিভার ক্রুজ নামের অনেক প্যাকেজ আছে টেমসের সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য। দল বেঁধে সে প্যাকেজ নিয়ে ঘুরে বেড়ানো যায় নদীতে। টেমস নদী একবার চক্কর দিলেই দেখা হয়ে যায় পুরো লন্ডন। সন্ধ্যার টেমস সেজে ওঠে অপরূপ সাজে। নদীর নামের উৎপত্তি ঘটেছে টেমস উপত্যকা থেকে। এই উপত্যকাকে কেন্দ্র করেই টেমস প্রবাহিত হয়েছে।


টেমস নদীর তীরে সাউথবার্গ অঞ্চলে অবস্থিত ফোর্টটি রয়াল জুয়েলারি রক্ষা করে থাকে। এটি একাধারে সুরক্ষিত একটি রাজকীয় প্যালেস এবং কুখ্যাত জেল।
বেশ কিছু টাওয়ারের সমন্বয়ে গঠিত লন্ডনের বিখ্যাত টাওয়ার অব লন্ডনে আছে ৯০০ বছরের ইতিহাস। কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই স্থাপত্যটি একসময় কারাগার হিসেবে ব্যবহৃত হতো যেখানে লন্ডনের কুখ্যাত আসামীদের বন্দী করে রাখা হতো এবং টর্চার করা হতো। পরবর্তীতে এটিকে একটি অত্যন্ত সুরক্ষিত দূর্গে পরিণত করা হয়েছে যেখানে যুক্তরাজ্যের রাজার মূল্যবান স্বর্ণ ও হীরামন্ডিত রাজমুকুট সহ অন্যান্য রাজ-অলংকার সংরিক্ষিত আছে।
একদা দুর্ভেদ্য এই দূর্গে ট্যুরিস্টরা এখন টিকিট কেটে ঢুকতে পারে। টিকেট মূল্য ২৯.৯০ ইউরো এবং বিনামূল্যে গাইডেড ট্যুরের ব্যবস্থা আছে।

রহস্য-রোমাঞ্চে ভরা দুর্গটি দেখার পর টেমসের তীরে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। শান্ত টেমস এর উপর থেকে বয়ে চলা ঠান্ডা বাতাস চুল উড়িয়ে কানের পাশ থেকে বয়ে চলেছিল।
বিদেশী লোকের ভাব ভঙ্গি বা অঙ্গভঙ্গি হাসাহাসি কথাবার্তা লক্ষ্য করতে লাগলাম দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। বেশ লাগছিল সবকিছু দেখতে। আমাদের দেশের থেকে এটা একদমই আলাদা নয়। আনন্দ উচ্ছাস প্রকাশে সবার ভঙ্গিমাটা বোধহয় একই হয়। সবাই উচ্ছ্বাসে হাসছে! জোরে জোরে কথা বলছে! আনন্দে হাততালি দিচ্ছে! লাফাচ্ছে- ঝাঁপাচ্ছে! বাচ্চারা দৌড়াদৌড়ি করছে! এই সব দেখতে দেখতে ডানদিকের রাস্তা ধরে আরও একটু এগিয়ে চললাম।


সুন্দর ঝকঝকে চকচকে নীল আকাশ আর তার সঙ্গে সুন্দর একটা গাছ। কাছে একটু এগিয়ে যেতেই দেখলাম সবাই সেদিকেই এগিয়ে যাচ্ছে ক্যামেরা হাতে। সবার মতো আমিও এগিয়ে গিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম। দেখলাম লন্ডনের টাওয়ার ব্রিজ দেখা যাচ্ছে সেখান থেকে।

টাওয়ার অফ লন্ডনের ঠিক পাশেই টাওয়ার ব্রিজ নদীর উপরে একটি চলমান ও ঝুলন্ত সেতু, যেটা খুলে যায় আমাদের খিদিরপুরের বাস্কেল ব্রিজের মত। আমার মতে লন্ডনের আইকন খ্যাত টাওয়ার ব্রিজ না দেখলে লন্ডন ভ্রমণ মাটি! বহুবার সিনেমা আর স্থিরচিত্রে দেখা টাওয়ার ব্রিজ স্বচক্ষে দেখলে একটা আলাদা শিহরণ জাগে মনে। টেমসের ওপর এই ব্রিজ যেন রাজকীয় লন্ডনের আভিজাত্যের আরেক প্রতীক। দিনের একটি সময় খুলে দেওয়া হয় টাওয়ার ব্রিজ। টিকিটের লাইনে ভিড় দেখে আমি কিছুটা দূর থেকেই এটা দেখে ফেললাম। ব্রিজের রূপ একেক দিক থেকে একেক রকম। বর্তমান সংযোগ সেতুটি পারাপারের জন্য ১৯৭৩ সালে খুলে দেওয়া হয়। এটি মূলত কংক্রিট এবং লোহায় তৈরি একটি বক্স গার্ডার সেতু। আগে এখানে কাঠের তৈরি সেতু ছিল, যেটি লন্ডনের প্রথম রোমান প্রতিষ্ঠাতারা তৈরি করেছিলেন।
কত হিন্দি বলিউড ফিল্মে এই টাওয়ার ব্রিজের উপরে নায়ক নায়িকাদের অনেক নাচ গান দেখেছি, সেটা নিজের চোখে দেখতে পেরে যেন খুব ভালো লাগছিল।


এখান থেকে বেরিয়ে আমি চলে গেলাম একটা সুভিনিয়ার শপে। কাঁচের সুন্দর শো কেস এবং ঝাঁ চকচকে দোকানে থরে থরে সাজানো সুন্দর জিনিস, যা কিনা সবাই কিনে নিয়ে চলেছে তাদের পরিবার-পরিজন বা প্রিয়জনকে উপহার হিসেবে দেওয়ার জন্য। পুরো দোকানটা আমি ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম। আমি ভাবলাম আজকে হয়তো তেমন কিছু কিনব না তবে দেখে যাই কেমন কি জিনিস হয়, এখান থেকে উপহার নিয়ে যাওয়ার জন্য।
অবশ্যই আমাদেরও তো সবার জন্য কিছু না কিছু নিয়ে যেতেই হবে। সেখানে সাজানো আছে ফোর্টের ছোট্ট প্রতিরূপ, বিভিন্ন রকম ওয়াইন গ্লাস, ওয়াইন বোটল, প্রহরী, ছাতা, টুপি, লন্ডনের লাল দোতলা বাস ইত্যাদি। বেশ সুন্দর সাজানো দোকান তবে জিনিসের দামও বেশ ভালো।

এরপরে আমি মেট্রো স্টেশনে মেট্রো ধরে পৌঁছে গেলাম লন্ডন আই দেখতে। লন্ডনের সিগনেচার পর্যটন স্থাপনার মধ্যে অন্যতম একটি লন্ডন আই। লন্ডনের যেকোনো দিক থেকে দেখা যায় এটি। পর্যটকদের কাছে এর আবেদন কতটুকু, তা দেখতে হলে যেতে হবে আশপাশে। টেমস নদীর এক পাশে লন্ডন আই। লাইন ধরে উঠতে হয় গোলাকার এই রাইডটিতে। বেশ উঁচু চাকার মতো গোলাকার লন্ডন আইয়ের শীর্ষবিন্দুতে উঠলে ৩৬০ ডিগ্রি প্যানারোমিক ভিউতে দেখা যায় পুরো লন্ডন শহর। মোট ৩২টি ক্যাপসুলে প্রতিদিন প্রায় ১৫ হাজার পর্যটক এখানে উঠে পাখির দৃষ্টিতে দেখেন পুরো শহরটি।


লন্ডন আইয়ের একেকটি ক্যাপসুলের ওজন প্রায় ১০ টনের মতো। এই ৩২টি ক্যাপসুল বৃহত্তর লন্ডনের ৩২টি উপশহরের প্রতিনিধিত্ব করে। প্রতিটি ক্যাপসুল শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এবং দর্শনার্থীদের বসার জন্য বেঞ্চ দেওয়া আছে। একটি ক্যাপসুলে ২৫ জন পর্যন্ত দর্শনার্থী বসতে পারেন।
রাতের লন্ডন আই ও এর চারপাশের এলাকা হরেকরকম আলোতে ভরে ওঠে। লাল আভা ছড়িয়ে পড়ে লন্ডন আইয়ের চারপাশে। নিচে টেমস নদীর আশপাশের ল্যাম্পপোস্টগুলো জ্বলে উঠলে রাজকীয় লন্ডনের চেহারাই বদলে যায়। লন্ডন আইয়ের পাশে রয়েছে ছোটবড় খাবারের দোকান। তবে দাম কিছুটা বেশি।
এটি হলো বিশ্বের বৃহত্তম ক্যান্টিলিভার পর্যবেক্ষণ চাকা যা চালু হয়েছিল ২০০০ সালে। এখান থেকে পুরো লন্ডন শহর টা দেখা যায়। ১৩৫ মিটার লম্বা টেমস নদীর উপরে ২৫ মাইল পর্যন্ত দেখা যায়।

পাশের মনোরম পরিবেশে বসে থাকলাম বেশ কিছুক্ষণ। গাছের নিচে বেদি করে রাখা আছে, প্রচুর লোকের ভিড়। লন্ডন আই-এ চড়ার জন্য অনেক লম্বা লাইন। এখানে যাওয়ার সময় অদ্ভুত জিনিস লক্ষ্য করলাম, এত বড় কাঠবেড়ালি আমি এর আগে কখনো দেখিনি। আর কাঠবিড়ালি গুলো মানুষকে ভয়ও পাচ্ছে না, ইভেন তারা কি সুন্দর মানুষের হাত থেকে খাবার পর্যন্ত নিয়ে যাচ্ছে! বিভিন্ন রং বিভিন্ন বর্ণ ভিন্ন সাধ বিভিন্ন ধরনের দেশের মানুষ এখানে। এতো ভিন্ন হলেও একটা জিনিসে সকলেই অভিন্ন যেটা কিনা মানুষের আনন্দ উচ্ছ্বাস।
এখানেই দেখলাম স্ট্যাচুম্যান আর এখান থেকে টেমস এর ওপারে বিগ বেন দেখতে পেলাম।


লন্ডনের ল্যান্ডমার্ক আইকন বিগ বেন। পার্লামেন্ট ভবনের পাশেই অবস্থিত। বিগ বেন লন্ডনের অতিপরিচিত ও জনপ্রিয় স্থাপনা। প্রথমে এটি গ্রেট বেল হিসেবে পরিচিত ছিল। কেউ কেউ মনে করেন যে, এ নামটি নেওয়া হয়েছে স্যার বেঞ্জামিন হলের নাম থেকে। কেননা, তিনি গ্রেট বেলের নির্মাণকাজ তদারক করেছিলেন। আবার ইংরেজ মুষ্টিযোদ্ধা ও হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন বেঞ্জামিন কন্টের নাম থেকে বিগ বেন এসেছে বলেও ধারণা করা হয়ে থাকে। এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় শব্দ উৎপাদনকারী চতুর্মুখ ঘড়ি। শুধু ঘড়িটির ওজনই পাঁচ টনের বেশি। ঘড়িটির সম্মুখভাগে সংখ্যাগুলো ২ ফুট (৬১০ মিলিমিটার) এবং মিনিটের কাঁটাটি ১ ফুট (৩০৫ মিলিমিটার) লম্বা। প্রায় ১৬ তলা উচ্চতার বিগ বেন টাওয়ারের নির্মাণ শেষ হয় ১৮৫৯ সালে।
এটি লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার অঞ্চলে অবস্থিত। সুবিশাল এই ঘন্টার জন্য লোকে সখকরে বিগ বেন বলে ডাকে। তবে এটির আসল নাম কিন্তু ক্লক টাওয়ার অথবা প্যালেস অফ ওয়েস্টমিনস্টার। গথিক শৈলীতে বানানো এই টাওয়ারের উচ্চতা প্রায় 96 মিটার।

এদিনের মত আমার যাত্রা এখানেই শেষ করলাম, আর এরপরে ফেরার জন্য বাস ধরলাম। ফেরার পথে দোকানে ঢুকে একটু কিছু খেয়ে নিলাম, বার্গার এবং আলুর চিপস। এরপর নিউ পার্ক স্টপ এ নেমে হাঁটতে হাঁটতে আমি পৌঁছে গেলাম বাড়িতে। রাস্তায় আসার সময় দেখতে পেলাম শান্ত নিরিবিলি রাস্তা। প্রতিটা বাড়ির ভেতরে অল্প অল্প একটা দুটো আলো জ্বলে গেছে। রাস্তায়ও হলুদ লাইট গুলো জ্বলে গেছে। এখানে অনেক বড় বাড়ি, পার্ক বা সবকিছু আছে কিন্তু যেন কেমন শান্ত। দেখলাম লোকজন রাস্তা দিয়ে ইভনিং ওয়াকে বেরিয়েছে, সঙ্গে অনেকেই কুকুর নিয়ে হেঁটে চলেছে। এখানকার কুকুরগুলো যেন ভীষণভাবে মালিকের বাধ্য আমাদের দেশের কুকুরদের মতন কারণে-অকারণে লম্ফঝম্প বা হাঁক ডাক করেনা এরা। প্রায় ১৫ দিন লন্ডনে থাকার পরও একবারও কুকুরদের ডাক আমি কখনো শুনিনি।


যাইহোক আমি বাড়ি ফিরে এলাম।
হাতমুখ ধুয়ে বিছানায় একটু গা এলিয়ে দিয়ে সারাদিনের রোমাঞ্চকর অনুভূতি সম্বন্ধে একটু ভাবতে লাগলাম। শহরে এমন একা একা নিজে হেঁটে নিজে বাস ধরে মেট্রো করে একা এভাবে ঘোরার একটা যেন অন্য রকম অনুভূতি বা এক্সপেরিয়েন্স। সমস্ত কিছুই মনে করে কেমন যেন বেশ খুশি হতে লাগলাম।
এক স্থান থেকে আরেক স্থান কতটা বৈচিত্র্যময়, এখানে না ঘুরলে বোঝা দায়! যাই দেখি বিস্ময়ের ঘোর আর কাটে না!
এরপরে নিত্যদিনের মতো তমাল অফিস থেকে বাড়ি এসে গেলে আমরা দুজনে গরম গরম ধূমায়িত কফির কাপে চুমুক লাগাতে লাগাতে একে অপরের সারাদিনের অভিজ্ঞতা আর অনুভূতির ঝাঁপি খুলে বসলাম।





ক্রমশ.......

আলোকচিত্র সৌজন্যে লেখিকা অদিতি মন্ডল