আমার প্রথম বিদেশ যাত্রা (পর্ব- ৩)

অদিতি মন্ডল,

কলকাতা


পূর্ববর্তী অংশটি পড়ার জন্য লাইব্রেরি বিভাগে দেখুন...

সকালের এলার্ম নরম তুল তুলে বিছানার স্বপ্নের জগত থেকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনলো। ঘুম ঘুম চোখে ঘড়ির দিকে এক ঝলক তাকিয়ে নিমেষে ঘুম কয়েক যোজন দূরে ভেগেছে। তড়িঘড়ি দুজনে বিছানা ত্যাগ করে দৌড়ালাম নিচের কিচেনে। তমালের অফিস ছিল আর তমাল ভীষণ পাংচুয়াল, পাঁচ মিনিট আগে পৌছাবে বই এক মিনিট পরে নয়। তমালের কথা- "ছোটবেলায় স্কুলে পড়াশোনা করার সময় পয়সা দিতাম তবুও কখনও দেরী করে স্কুলে য়াইনি আআরআর এখন সরকার পয়সা দেয় কাজ করার জন্য সেখানে দেরী করব কেন!"
কাভার্ড থেকে কড়াই হাতা বের করে বানানো হলো ডিম কষা আর ফ্রয়েড রাইস। ওটা খেয়ে তমাল অফিস যাবে। আর টিফিন টাইমে তমাল মিউজিয়ামের ক্যান্টিনে খেয়ে নেয়। স্টাফ আইডি আছে মানে কিছু পয়সা কমই লাগে, ওই সাড়ে চারশো ইউরোর মতো মানে আমাদের ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় সাড়ে চারশো পাঁচশোর মতো। আমার ব্রেক ফাস্টের জন্য বানানো হলো হ্যাম সসেজ স্যান্ডউইচ, ওমলেট কফি আর সাথে একটু ফল ও আছে।

এরপর তমালের যাওয়া অবধি দাঁড়িয়ে থাকি জানালায়, যতোক্ষণ না রাস্তার বাঁকের তমাল শেষ হাতনাড়া দিয়ে অদৃশ্য না হয়ে যায়। এরপর আমি কখনো কফি নিয়ে রাস্তার দেখি বা আয়েস করে ব্রেকফাস্ট সারি। আজ আর কোথাও যাব না তাই নেটফ্লিক্সে দ্য ম্যানিফোরস্টেটাস ওয়েব সিরিজ টা দেখতে শুরু করি। দুপুরের স্নান খাওয়া সেরে একটু গড়িয়ে ও নিলাম। এর পর ভাবলাম আশপাশে এটু ঘুরে আসি।

যেমন ভাবা তেমন কাজ, দেরী না করে তৈরী হয়ে গেলাম স্ট্রেথাম স্ট্রিট এর দিকে। ফুটপাত ধরে কিছু পথচারী চলেছে তাদের বেশীরভাগ সান্ধ্য ভ্রমণে বেরিয়েছেন। তাদের মধ্যে কেউ দৌড়াচ্ছে আবার কেউ নিজের কুকুর সাথে নিয়ে চলছে। এখানকার কুকুরের ডিসিপ্লিন দেখে খুব ভালো লাগে।

দেখতে দেখতে চলছিলাম গাছপালা, মানুষ জন, এখানকার গৃহশৈলী ইত্যাদি। তবে কেমন যেন থমথমে ভাব! কোন বাড়িতে কোন লোককে দেখা যাচ্ছিল না।

এএর পর হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে পড়লাম এক প্রসস্ত পার্কে। সবুজ মখমলের ঘাসে ঢাকা সমস্ত পার্ক। চারপাশে গাছ লাগানো, কেবল লোকজন যেখানে জগিং করছে সেখানেই মাটির আভাস পাওয়া যায়। বেশ অনেকটা হেঁটে এসে একটু ক্লান্তি বোধ করছিলাম, তাই পার্কের ধারে গাছের ফাঁকে ফাঁকে লাগানো একটি খালি বেঞ্চ দেখে অনান্য লোকের মতো আমিও বসে পড়লাম। লক্ষ করছিলাম তাদের আদব কায়দা ব্যবহার ইত্যাদি। ধীরে ধীরে গাছের ছায়ায় ছায়ায় কালো কালো ছোপ ছোপ সন্ধ্যার আঁধার ঘনিয়ে আসছে। স্ট্রিট লাইটের হলুদ বাতি গুলি জ্বলে ওঠার সাথে সাথে আবারও হাঁটতে হাঁটতে ফিরে এলাম। হোমস্টে তে ফিরে হালকা কিছু খেয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে লন্ডনের সন্ধ্যা উপভোগ করতে লাগলাম। গত কয়েক দিনের দেখা একই দৃশ্যের কোন পরিবর্তন নেই। সেই এক রকম ঠান্ডা ঠান্ডা আবহাওয়া, হৈ হট্টগোল বিহীন শান্ত পরিবেশ। রাস্তা দিয়ে ছুটে চলা দু একটি গাড়ি। নেই বাচ্চাদের কোলাহল, নেই কুকুরের ঘেউ ঘেউ! এ আমাদের দেশের চির চেনা সান্ধ্য পরিবেশের চেয়া একেবারে আলাদা কেমন যেন ঝিমমারা ভাব!

দেখতে দেখতে প্রায় সাড়ে আটটা বাজলো আর তমাল ও ফিরে এলো। ও হাতমুখ ধুয়ে পোষাক পরিবর্তন করে এলে দুজনে কফির মগ হাতে নিয়ে বসলাম নিজের নিজের সারাদিনের অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে।

ঠিক হলো পরের দিন সন্ধায় আমাদের পরিচিত এক ব্যক্তির বাড়িতে যাব আমরা। তমাল নিজের কাজ সেরে স্টেশনের কাছে পৌঁছে যাবে আর আমি গুছিয়ে গাছিয়ে রেডি হয়ে এখান থেকেই সোজা পৌঁছে যাব। সেখান থেকে দুজনে একসাথে হয়ে কিছু গিফ্ট কিনে মিনিট দুয়েকের হাঁটা পথে তাঁদের বাড়িতে পৌঁছাব। সেই মতো আমি বাসে চড়ে মেট্রো স্টেশনে পৌঁছে সেখান থেকে দুটো মেট্রো বদল করে আমাদের নির্দিষ্ট স্টেশনে পৌঁছে দেখি তমাল দাঁড়িয়ে আছে।

স্টেশনের খুব কাছেই একটি ফ্রুট স্টল, আর সেখানে ফলের পাশাপাশি বিক্রি হচ্ছে সুন্দর তাজা ফুলের বুকে। সেখান থেকেই পনের ইউরো দিয়ে একটি সুন্দর বুকে নিয়ে একটু হাঁটা পথে পৌছে গেলাম লন্ডনের নামী হসপিটালের অর্থ সার্জন বাঙালী ডাক্তার সুখেন ব্যানার্জীর বিরাট আপার্টমেন্টের সুন্দর সাজানো গোছানো বড়ো একটি টু বি এইচ কে ফ্লাটে। একেবারে গেটের বাইরে থেকে ফ্লাটের নম্বর অনুযায়ী বেলের বটন টিপতে ডাক্তার বাবু নিজের ফ্লাট থেকেই গেট খুলে আমাদেরকে ভিতরে প্রবেশ করালেন। এরপর সিঁড়ি চড়ে উপরে উঠে আমরা ঠিক যেন সিনেমায় দেখা এমন চমৎকার একটি ফ্লাটে ঢুকলাম। ডাক্তার বাবু আর তাঁর মেয়ে থাকেন। প্রনাম পর্ব সেরে সেখানে বেশ কিছুক্ষণ গল্প গুজব করে আমরা সবাই একটি ইটালিয়ান রেস্টুরেন্টে গেলাম পিজ্জা খেতে। খাবার টা দারুণ টেস্টি ছিল। সেখান থেকে বেরিয়ে আমার বাড়ির পথ ধরলাম। সামনেই সারদ পুর্নিমা, পথে লন্ডনের রাতের ঝকঝকে আকাশে বিরাট বড়ো চকচকে রূপলী চাঁদ দেখতে দেখতে বাড়ি ফিরলাম। কি জানি কনো, চাঁদ দেখে মনে হলো আমাদের দেশের চেয়ে একটু বেশিই বড়ো আর চকচকে!

পরের দিন মহাসপ্তমী। আজকাল পৃথিবীর প্রায় সব প্রান্তে ছড়িয়ে আছে বাঙালী, আর যেখানে বাঙালী সেখানে একটা না একটা দূর্গা পূজা হবেই। কলকাতায় নেই তো কি হয়েছে, দূর্গা পূজা আর ঘুরতে বেরোবন তা ও কি হয়! তাই পরদিন সন্ধ্যায় আমি চুলে খোঁপা করে তাতে ফুল লাগিয়ে, পাটভাঙা বাসন্তী রঙের নতুন পাট্টু শাড়ি ও মানানসই গয়না ঝুমকা শাঁখা পলা চুড়ি বালা, কপালে বড় লাল টিপ আর তমাল ডিজাইনার হলদে ধুতি পাঞ্জাবি তার উপরে জহর কোট পরে পুরদস্তুর বাঙালী সেজে আমরা নর্থ লন্ডনের দূর্গা পূজা দেখতে গেলাম। তবে লন্ডনের ঠান্ডা থেকে বাঁচতে আমি একটা কোট ও কাঁধের উপর থেকে হালকা করে ফেলে নিয়েছিলাম।

মেট্রো স্টেশন থেকে বেরতেই দেখলাম সামনেই সুন্দর সাজসজ্জা ও রঙিন আলোয় পরিবৃত নর্থ লন্ডনের দূর্গা পূজার জায়গা। এবং মেট্রো স্টেশনের সামনে থেকে সুন্দর পোষাক পরিহিত দেশী বিদেশীদের লম্বা লাইন। আমরাও যথারীতি লাইনে দাঁড়িয়ে গেলাম। সবাই অধির আগ্রহে অপেক্ষা করছে মূল মন্ডপে প্রবেশ করার জন্য। পূজা কতৃপক্ষ মাত্র পাঁচ সাত জন করেই ভেতরে ঢুকতে দিচ্ছে। তাই প্রায় দু ঘন্টা লাইনে দাঁড়ানোর পর আমাদের নম্বর এলো।

একটা লম্বা করিডোর দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে সামনেই বড়ো একটা দরজা, দরজা থেকে ঢুকেই প্রথমে দানপেটি বা ডোনেশন বক্স, কে কত ডোনেশন দেবে সেটা জেনেই রসিদ কাটছে এবং রসিদের সাথে একটা করে লিচি জুসের বটল ও ধরাচ্ছিল।


এরপর বামদিকের একটা ঘরে চিরাচরিত নয়নাভিরাম একচালা মাতৃ মূর্তী তার মহিমাময় রূপ নিয়ে চার সন্তান এবং মহিষাসুর সহ প্রকাশ পাচ্ছন! পুরুত ঠাকুর তখনও বেদীতে উপস্থিত। যাঁরা অঞ্জলি দিতে চান তাদের হাতে ফুল দিয়ে মন্ত্র বলাচ্ছেন। আমরাও অঞ্জলি দিলাম। অবশ্য দু চারটি মন্ত্রেই পুষ্পাঞ্জলি শেষ হয়ে গেল! যাকগে তবুও ভাগ্যক্রমে অঞ্জলি তো দিতে পারলাম। অঞ্জলি শেষে পুরুত মশাই সবার হাতে প্রসাদী ফল ফুল তুলে দিচ্ছিলেন। সবই গোটা ফল। আমরা প্রসাদে আম আপেল কমলালেবু আর লাড্ডু পেয়েছিলাম। দেখলাম লোকে এখানে ফুলের বুকে নিয়ে মা কে দর্শন করতে আসেন। এরপর দু চারটে ফটো তুলে ভীড় কাটিয়ে বাইরের বড়ো হলটাতে গেলাম আমরা। পূজা উপলক্ষে ফুচকা, ঘুঘনি, চপ, সিঙাড়া কাটলেট, বিরিয়ানি ইত্যাদি বিভিন্ন দেশী খাবার ও শাড়ি গয়নার স্টল লেগেছে সেখানে। ব্যাপক ভীড় আর তেমনই দাম! সামনেই একটা স্টেজ বানানো আর সেখানে তখন বলিউড মুভির কুইজ চলছিল। অনুষ্ঠান টি লন্ডনের ঝকঝকে শাড়ি ও পাঞ্জাবি পরা বাঙালী অধিবাসীরাই চালাচ্ছিলেন। সেখানেও ভীড় বেশ ভালোই। স্টেজের সামনে রাখা চেয়ার গুলোর একটাও খালি নেই, সবই পূর্ণ! তবে সবাই কে খুব বেশিক্ষন দাঁড়াতে দিচ্ছিলনা, তাই আমরাও বেরিয়ে এলাম।

তবে এ ছিল দুধের সাধ ঘোলে মেটানোর মতই। কলকাতার পূজা ভীষণ মিস করছিলাম। সেদিন আমাদের বাড়ি ফিরতে প্রায় রাত্তির সাড়ে বারোটা বেজে গেছিল।

পরের দিন মহাষ্টমী, আমরা ঠিক করলাম ব্রিকলেনের বাজারে বেড়াতে যাব। ব্রিক লেন হল লন্ডনের বাঙালি টাউন। লোকালয় টি দেখতে একেবারে আমাদের গ্রাম বাংলা! যেদিকে চোখ যায় সব দোকান, গাড়ি, বাসস্ট্যান্ড বাড়ি সবদিকেই বাংলায় লেখা, লোকজন বাংলায় কথা বলছেন। মনেই হচ্ছ না যে আমরা লন্ডনে আছি। এমনকি welcome টা ও বাংলায় লেখা ' সু স্বাগতম' দেখে কি যে ভালো লাগছিল তা বলে বোঝাতে পারবনা! আমরা একটি মাছের দোকানে ঢুকলাম, রুই কাতলা ভেটকি, ইলিশ, চিংড়ি, কাঁকড়া ছাড়াও শোল, শাল, বোয়াল ল্যাঠা, কই, মাগুর, পাঁকাল, চুনো, পুঁটি, সব রকমের সুঁটকি মাছ.....কি নেই সেখানে, এমন কোন মাছ ছিল না যা আমাদের দেশে পাওয়া যায় না! দারুন লাগছিল।

বাঙালি মাছ দেখলে খুশী হবে এতো জানা কথা! তবে আমরা কোনমাছ কিনিনি। কারণ, এমনিতেই আমরা যেখানে থাকি সেখানে আমাদের রান্নার মশলার ঝাঁঝে আশপাশের লোকের মাথা খারাপ হবার দশা, তার উপর মাছ বানালে আর কি যে হবে............

এরপর দেয়ালের সুন্দর গ্রাফিটিং দেখতে দেখতে আমরা এগিয়ে গেলাম। বিভিন্ন রকম বাদ্যযন্ত্র বাজানো সিঙ্গার ভিখারির পাশ দিয়ে যাবার সময় লক্ষ্য করলাম প্রচুর মানুষ সেখানে দাঁড়িয়ে তার বাদ্যযন্ত্র এবং পপ গান উপভোগ করছেন। ঘুরতে ঘুরতে আমরা পৌঁছে গেলাম দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্ট্রিট ফুড সেন্টারে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের স্ট্রিট ফুড পাওয়া যায় এই দোকানে। সেখানে জাপানের টফু থেকে শুরু করে থাইল্যান্ডের সুসি, চাইনিজ মোমো, বাঙালি চপ, কলকাতার ভেজিটেবিল চপ, বাংলাদেশের চিতল বা ভেটকি মুইঠা, কি পাওয়া যায় না সেখানে! এখান থেকে গেলাম ব্রিক লেনের অ্যান্টিক মার্কেটে, যেখানে পাওয়া যায় পুরানো বিভিন্ন রকম বই, রাজা রাজরাদের পোশাক, অনেক প্রাচীন সমস্ত সব গহনা পত্র বাসন-কোষন ইত্যাদি আরো একটু এগোতেই চোখে পড়ল রাস্তার দুপাশে বিভিন্ন রকম স্ট্রীট ফুডের ঠেলা। যেখানে বিভিন্ন রকম স্ট্রীট ফুড সাথে বিভিন্ন রকম জুস বিক্রি হচ্ছিল যেখানে ভিড় ছিল বেশ চোখে পড়ার মতো। সবমিলিয়ে মার্কেটটার পরিবেশ বেশ অদ্ভুত।

পুরো বাজার টা ঘুরতে ঘুরতে দুপুর হয়ে গেছিল আর আমাদের খিদে ও পেয়ছিল খুব। তাই দেখেশুনে 'গ্রাম- বাংলা' নামে এক বাঙালি রেস্টুরেন্টে আমরা খেতে ঢুকলাম। বাংলাদেশের রেস্টুরেন্ট মালিক ভীষণ যত্ন এবং আত্মীয়তার সাথে আমাকে আপা সম্বোধন করে আমাদেরকে আতিথেয়তা করলেন।

সেখানে মাটির তৈরি থালা বাটি গ্লাসে আমাদের জন্য খাবার পরিবেশন করা হয়। ঝরঝরে সরু বাসমতি চালের ভাত, কাঁঠাল বিচি দিয়ে কচুর লতি, বোয়াল মাছের ঝাল, আর ভেড়ার মাংস দিয়ে আমাদের সেদিন দুর্গা পূজার খাওয়াটা খুব জমে গেছিল। যেমন আন্তরিকতা তেমন ছিল অপূর্ব সাদের রান্না, সত্যিই মনটা ভরে গিয়েছিল মনেই হয়নি যে বিদেশের মাটিতে বসে এমন খাবার খাচ্ছি!

( ইচ্ছে ছিল এই সংখ্যায় লেখাটা কমপ্লিট করব কিন্তু আর জি কর এর মতো একটা ঘটনা আমাকে লেখাটা কমপ্লিট করা থেকে বিরত রেখেছে, কারণ বর্তমানে আর জি কর এর প্রতিরক্ষার দায়িত্বে থাকায় কাজের চাপ ভিষণ তাই আপনাদের সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি, আগামী সংখ্যায় লেখাটা সমাপ্ত হবে)





ক্রমশ.......

আলোকচিত্র সৌজন্যে লেখিকা অদিতি মন্ডল