আমার প্রথম বিদেশ যাত্রা (পর্ব- ৪, শেষ অংশ)

অদিতি মন্ডল,

কলকাতা



পূর্ববর্তী অংশটি পড়ার জন্য লাইব্রেরি বিভাগে দেখুন...

লন্ডনের ঠাণ্ডা টা ঠান্ডা অবশ্যই তবে আমাদের দেশের মতো শীত নয়। আমাদের দেশের শীতের মজাটাই আলাদা। যেমন সকালে ঠান্ডা হিমেল বাতাস বেশ কাঁপিয়ে দেওয়ার মতো। এরপর একটু বেলা করে মিষ্টি হেসে মিঠে মিঠে রোদ একটু আদর করে তার নরম হাত বুলিয়ে দেবে গায়। সকালের কনকনে ঠান্ডা টা কে বিদায় নিতেই হবে। দুপুরে মা রোদে লেপ-কম্বল দিলে তার ওপর শুয়ে একটু ভাত ঘুম দেওয়া। এরপর ঠান্ডা ভাব নিয়ে আসবে সন্ধ্যা। মোটামুটি এমনটাই যায় আমাদের বাংলার শীতকাল। লন্ডনের শীত নিষ্ঠুর জেলারের মতো, খুব কড়া রুক্ষ। তাই আমেজ নেওয়ার মত ওয়েদার তেমন পাইনি। বিজ্ঞানী বাবু আমার অফিস করে বাড়ি এলে জমিয়ে আড্ডা মারি আমরা দুজনে। বাকি সারাদিন আশপাশটা আমি কখনো পায়ে হেঁটে কখনো বা বাসে চড়ে ঘুরে আসি একাই। রাস্তায় খিদে পেলে কিছু একটা কিনে খেয়ে নিই। বাসের দোতালায় একেবারে সামনের দিকের সিটে বসে ঝকঝকে কাঁচের ওপারের দৃশ্য সবটাই যেন একেবারে হাতের মধ্যে এসে পড়ে। বাড়ি ফিরে আসার দিন এভাবেই এগিয়ে এলো ধীরে ধীরে।

আমার বিজ্ঞানী বাবুকে ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের জন সস্ত্রীক নিমন্ত্রণ করেছিলেন ডিনারে। সেইমতো আমরা দুজনে রেডি হয়ে সন্ধ্যেবেলা হাতে ফুল নিয়ে দেখা করতে চলে এলাম নির্দিষ্ট রেস্টুরেন্টে। ছোটখাটো ছিমছাম রেস্টুরেন্ট, কয়েকটা টেবিল, তার উপরে ফুলের টব গাছ ইত্যাদি দিয়ে সাজানো। যেতেই জন সাদরে আমন্ত্রণ জানালো। আমাদেরকে বসালো একটা টেবিলে। জন তখন নিজের কোট খুলে সাধারণ প্যান্ট শার্ট পরে একজন হোটেলের সাধারণ ওয়েটারের মত কাজ করছিল। দেখে তো আমি যার পর নাই অবাক! এত বড় একজন বিজ্ঞানী যে কিনা একজন সাধারণ ওয়েটারের মত রেস্টুরেন্টে কাজ করছে! জনের কথাবার্তা চালু হলে বুঝলাম এটা জন দের নিজস্ব রেস্টুরেন্ট। জন পরিচয় করানোর জন্য তার স্ত্রী আর ছেলেদেরকে ডেকে পাঠালেন। মিসেস জন তখন কিচেন থেকে বেরিয়ে এলেন সাধারণ কাজ করা পোশাকে। কিচেনের অ্যাপ্রন তখনও তার গায়ে। হাতে মুখে ময়দা বেসন ইত্যাদি মাখা, চুল এলো, মাথায় শেফের টুপি পরা। এক ছেলে ক্যাশিয়ারে বসেছিল সেও এলো আর অন্য ছেলেটি মাকে কিচেনে হেল্প করছিল সেও এলো। আরো একটি অন্য ছেলে পুরো কিচেনটা সামলাচ্ছিল পরিচয় করিয়ে দিল তার সাথেও। জানতে পারলাম ছেলেটি বাংলাদেশের ছেলে, সে পার্ট টাইম হিসেবে জনের রেস্টুরেন্টে কাজ করে। তখন অন্য একটি ফ্যামিলি রেস্টুরেন্টে খাবার খাচ্ছিল, জন দেখলাম খুব যত্ন সহকারে সাদরে তাদের খাবার অর্ডার নিলো এবং সার্ভ ও করল। পরিবারটি ভারতীয় ছিল।

জনের ওয়াইফ একজন পাকিস্তানি পাঞ্জাবি। তিনি হিন্দিতেই কথা বললে আমাদের সাথে, যদিও তিনি লন্ডনেই বড় হয়েছেন। কথাচ্ছলে জানতে পারলাম রেস্টুরেন্টটি মিসেস জনের মায়ের। তার বয়স হয়েছে তাই তিনি রেস্টুরেন্টটি ঠিকমতো চালাতে পারছিলেন না। আর মিসেস জন তার মায়ের একমাত্র সন্তান হওয়ায় রেস্টুরেন্জ টি তারা নিজের নিজের কাজের ফাঁকে সবাই মিলে চালিয়ে নেন। কথাবার্তার ফাঁকে জন খুব সুন্দর দুটো মোজিটো বানিয়ে আমাদেরকে সার্ভ করল এবং সাথে স্টাটারে চিকেন রেশমি কাবাব ও শিক কাবাব দিল। বেশ ভালো টেস্ট। ততক্ষণে অবশ্য অন্য পরিবারটির খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। সবিস্ময়ে দেখলাম জন অবলীলাক্রমে অন্য টেবিল থেকে এঁটো কাঁটা তুলে টেবিলটি ঝকঝকে তকতকে করে পরিষ্কার করে দিল। মিসেস জন আমাদেরকে খেতে বসিয়ে আবারও বেসন নিয়ে কিচেনে চলে গেলেন কিছু ভাজাভুজি করার জন্য। আমরা জনকে আমাদের সাথে খাওয়ার জন্য রিকোয়েস্ট করলাম কিন্তু জন জানালো সে এসব কিছুই খাবার খাবে না, রাত্রে সে হালকা কিছু খাবার খায়। যাইহোক এরপর আমাদের জন্য এল বাটার নান, বাটার চিকেন, মিক্সড ফ্রাইড রাইস, আইসক্রিম, গুলাব জামুন ইত্যাদি আরো অনেক কিছু। বেশ ভালো স্বাদ ছিল সবগুলি খাবারের। আমাদের খাওয়ার মাঝে আরও এক বিদেশি দম্পতি রেস্টুরেন্টে খেতে ঢুকলেন এবং অবাক হয়ে দেখলাম তারা কিন্তু এসব ভারতীয় খাবারই অর্ডার করলেন। এবং তাদের টেবিলে খাবার পৌঁছালে বেশ তৃপ্তি সহকারে খাবারগুলি তারা খাচ্ছিলেন। এইসব নানান সাত সতেরো দেখতে দেখতে, জনের সাথে কথা বলতে বলতে রাত প্রায় নটা বেজে গেল। হাসি মজা গল্পকথায় এবং তার সাথে সুন্দর ভুরি ভোজে সন্ধ্যাটা দারুন কাটলো। বিদায় বেলায় মিসেস জন আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে আদর করলেন এবং আমার পরে যাওয়া সেদিনের শাড়ি গয়নার খুব প্রশংসা করলেন। এরপর আমরা বেশ তৃপ্তি মনে খুশি খুশিতে ফিরে এলাম আমাদের হোমস্টেতে।

পরের দিন বিজ্ঞানী বাবুর লন্ডনের শেষ দিন, আইডি জমা করার দিন। ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামে সেদিন বিজ্ঞানী বাবু আমাকেও সঙ্গে নিয়ে গেলেন। উনি চাইছিলেন ওনার স্টাফদের সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য এবং পুরো মিউজিয়ামটি সুন্দর করে ঘুরিয়ে দেখানোর জন্য। জন যেহেতু আগে থেকেই জানতো তাই খুব সহজেই আমার জন্য আগে থেকেই একটি ভিজিটর পাস বানিয়ে রেখে দিয়েছিল। আমিও ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামে পৌঁছে নিজের পাস টি গলায় ঝুলিয়ে নিলাম। জন তখনও এসে পৌঁছায়নি। জনকে তমাল ফোন করলে জানতে পারে যে সে তখনও রাস্তায় আছে, সাইকেলিং করে আসছে। আমি কথাচ্ছলে জানতে পারলাম যে জন এবং অন্যান্য অফিসাররাও এখানে নিজের সাইকেলে চড়ে আসেন। যতদূর বুঝলাম এখানে পার্কিংয়ের খুব ভালো ব্যবস্থা নেই আর দ্বিতীয়তঃ এরা সবাই সাইকেলিং এর ভীষণ অভ্যস্ত এবং আনন্দিতও বটে।

বিজ্ঞানী বাবু এরপর ঘুরিয়ে দেখালেন তার নিজের ডিপার্টমেন্ট, নিজের সেকশন। সাথে করে নিয়ে গেলেন কেমিস্ট্রি এবং বটানি সেকশনেও এবং পরিচয় করিয়ে দিলেন সমস্ত স্টাফেদের সাথে। স্টাফরা সবাই ভালোভাবে কথা বললেন কিন্তু বড্ড বেশি প্রাকটিক্যাল। কোথাও গিয়ে আমার মনে হল এদের মনটা কম আর মাথাটা বেশি কাজ করে। অনেকটা যেন মাথা দিলেই যেখানে সব বুঝতে পারা যাচ্ছে তখন মন দিয়ে মানুষের সাথে কথা বলা বা কথা বোঝার দরকার টা কি! হাই ,হ্যালো, হাউ আর ইউ, এইসব শব্দ ব্রেনের মধ্যে গাঁথা আছে আর সেগুলো ছাড়া এরা যেন এক্সট্রা কোন শব্দ ব্যবহার করতেই চায় না বা হয়তো বা মনকে গুরুত্বও কম দেয়। ভাবে মাথাটাই কাজের মনটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয় আর সেই জন্যই মনে হল প্রাচ্য বা প্রাচীন ভারত আধ্যাত্মিকতা বা স্পিরিচুয়ালিজম এবং পাশ্চাত্য মেটেরিয়ালিজমে অনেকটাই বেশি এগিয়ে আছে। মনের শক্তির কথাটা এদের ততটা জানা নেই, আর যাদের জানা আছে এটাকে "ল'স অফ ইন্ট্রোডাকশন"- বলে পয়সা ইনকাম করছে অথবা কেউ কেউ এর ভারতীয় মূল খুঁজতে শত প্রবৃত্ত হয়েছেন। এই মনের সন্ধানে বেরিয়েছেন ভারতের পথে পথে অথবা হিমালয়ের বাঁকে। ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট এ পোস্টিং থাকার সময়ই বিদেশী যাত্রীদের থেকে জানতে পেরেছি তাদের ভারত আগমনের হেতু। তারা অনেকেই ভারতের এই আধ্যাত্মিকতা বা ভারতীয় সংস্কৃতি ইত্যাদিকে ভালোবেসে আবার কেউ কেউ বা এইসব নিয়ে রিসার্চ করার জন্য বা কাছ থেকে এইগুলিকে জানার জন্য এদেশে আসেন।

এরপর বিজ্ঞানী বাবু নিয়ে গেলেন ক্যান্টিনে যে ক্যান্টিনে উনি এই এতগুলো দিন লাঞ্চ সেরেছেন। এখানে আমরা অর্ডার করলাম ব্রিটিশ ব্রেকফাস্ট। যাতে ছিল ব্রেড, বাটার, সসেজ, হ্যাম, অমলেট ও কফি। ইতিমধ্যে জন পৌঁছে গেছিল মিউজিয়ামে এবং জন ক্যান্টিনে আমাদের সাথে দেখা করলেন। এরপর জন নিজেই সাথে করে পুরো মিউজিয়ামটি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে খুব যত্ন সহকারে আমাকে দেখাতে লাগলো। লক্ষ্য করলাম এখানে সিকিউরিটি সিস্টেম ভীষণ কড়া কড়ি। যেহেতু জনের অবাধগতি এখানে, তাই আমাদের কোন বিল্ডিং এর কোন জায়গাতেই অসুবিধার মধ্যে পড়তে হয়নি। বিজ্ঞানী বাবুর এত স্টাফের মধ্যে জনকে আমার খুব ভালো লেগেছে। দেখলাম ও ব্রেন দিয়ে নয় মন দিয়ে কথা বলে এবং ওর কথার মধ্যে প্রাণ আছে। ও আর পাঁচজন ব্রিটিশের মতো নয় অনেকটাই আলাদা। প্রায় ঘন্টা দেড়েক এইভাবে ঘোরাঘুরি করার পর জন আমাদেরকে তার নিজের কেবিনে এনে বসালো। দেখলাম বেশ বড় রুম, ভেতরে বেশ বড় টেবিল। সেই টেবিলে বিজ্ঞানের পাশাপাশি অনেক হিস্ট্রি বুকস্ ও রাখা আছে এবং দেখলাম জনের বিজ্ঞানের পাশাপাশি হিস্ট্রিতেও গভীর জ্ঞান। প্রচুর সাল তারিখ মনে রেখেছে। এমনকি ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান হিস্টরি নিয়েও আমাদের সাথে অনেক আলাপচারিতা হলো।

কথার মাঝে জন আমাদের জন্য নিজে হাতে ভালো লেটে কফিও বানালো। কফি শেষে আমাদেরকে মিউজিয়ামের আরও অন্যান্য জায়গায় ঘোরার ব্যবস্থা করে দিয়ে জন আমাদেরকে বিদায় জানালো।

ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম একটি বিস্ময়কর মিউজিয়াম। কি নেই সেখানে! চাঁদ থেকে আনা পাথর, ডোডোর কঙ্কাল, ডাইনোসরের কঙ্কাল, জীবাশ্ম , এমন অনেক বিস্ময়কর জিনিস সেখানে বর্তমান। এই মিউজিয়ামটিতে চারটি কালার কোড অঞ্চল বা বিভাগ আছে। গ্রিন রেড ব্লু এবং অরেঞ্জ। প্রতিটি রং একটি আলাদা বিভাগকে ইন্ডিকেট করে। প্রতিটি অঞ্চল একটি আলাদা বিষয়কে প্রকাশ করে বানানো। যেমন গ্রীন জোনের বিস্তৃত পরিসর জুড়ে রয়েছে মন কাড়া সব পাখি, পোকামাকড়, প্রজাপতি, জীবাশ্ম, খনিজ পদার্থের সম্ভার। কাঁচের দেওয়ালের ওপাশে এত বৈচিত্রময় রংবেরঙের প্রজাপতি দেখে মনে হয় যেন প্রজাপতির দেশেই চলে এসেছি। এত ধরনের পাখি ছবি ছাড়া চোখের একেবারে সামনে এই প্রথম। কত জীবজন্তুর তো শুধু নামই শোনা, ছবিতেও হয়তো দেখিনি। এত কাছ থেকে এইভাবে এতসব নাম না জানা জীবজন্তুকে দেখতে পাবো ভাবতেই পারিনি! এত সব কিছু দেখে শুনে আমার একেবারে একটু অন্যরকম অনুভূতি হচ্ছিল।
রেড জোনে প্রকাশ হয়েছে পৃথিবী গ্রহ নক্ষত্র, মহাবিশ্বের সবকিছু। দেখে মনে হচ্ছিল প্রাচীন মহাবিশ্ব যেন একেবারে চোখের সামনে বিদ্যমান।

ব্লু জোন যা ডাইনোসরস, উভয়চর, জলচর, স্তন্যপায়ী ইত্যাদি বিভিন্ন জন্তু জানোয়ারে সমৃদ্ধ এবং সাজানো একটি জগত। সব থেকে প্রাচীনতম প্রাণীর স্টেগোসরাস ডাইনোসরের কঙ্কালও রয়েছে এখানেই। হোক নামের বিরল নীল তিমির বিরাট কঙ্কালের নিচে দাঁড়িয়ে নিজেকে খুব ক্ষুদ্র পিঁপড়ে মনে হচ্ছিল। এখানে পনেরো ইউরো দিয়ে আমরা আমাদের ছবি তোলাই। ডাইনোসরের জগতে যখন প্রবেশ করলাম বিভিন্ন রকম আলো ছায়া কৃত্রিম আওয়াজ ইত্যাদি দিয়ে এমনভাবে তৈরি করা ছিল মনে হচ্ছিল যেন পৃথিবীর আদিম থেকে আদিমতর দিনে আমরা প্রবেশ করে গেছি। মনে যেন খুশির হাওয়া লেগেছিল। মন বারবার ফিরে যাচ্ছিল ছোট্টবেলায় সেই গল্পের বই তে পড়া ডাইনোসরের কাহিনী গুলোর মধ্যে।

অরেঞ্জ জোন বন্যপ্রাণী উদ্যানের মধ্যে দিয়ে চলার জন্য। যদিও সেদিন বন্ধ থাকায় আমাদের আর তা দর্শন করা হয়নি।
তবে যা কিছু দর্শন করেছিলাম তাও কম কিছু নয়!
আর্জেন্টিনার ক্যাম্পো দেল সিলোতে 1783 সালে পাওয়া 635 কেজি (1,400 পাউন্ড) ওজনের ওটুম্পা লোহা উল্কা।

মিশর থেকে আসা নাখলা উল্কাপিন্ডের টুকরো , মঙ্গল গ্রহে জলীয় প্রক্রিয়ার লক্ষণ নির্দেশ করে প্রথম উল্কাপিন্ড

ল্যাট্রোব নাগেট , কিউবিক সোনার স্ফটিকগুলির বৃহত্তম পরিচিত ক্লাস্টারগুলির মধ্যে একটি

Apollo 16 চাঁদের পাথরের নমুনা 1972 সালে সংগ্রহ করা হয়েছিল

অস্ট্রো স্টোন, নিখুঁত নীল পোখরাজ রত্নপাথর যার ওজন 9,381 ক্যারেট , প্রায় 2 কেজি (4.4 পাউন্ড), এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড়।

অরোরা পিরামিড অফ হোপ , বিভিন্ন রঙের 296টি প্রাকৃতিক হীরার সংগ্রহ

মেরি অ্যানিং দ্বারা আবিষ্কৃত প্রথম ichthyosour উপাদান

প্লেসিওসরের প্রথম সম্পূর্ণ কঙ্কাল আবিষ্কৃত হয়েছে
ডেভিড অ্যাটেনবোরোর নামানুসারে প্লেসিওসর অ্যাটেনবোরোসরাস

রোমালিওসরাসের বিশাল কঙ্কালের কাস্ট
প্রথম ইগুয়ানোডন দাঁত আবিষ্কৃত হয়েছে
ম্যানটেলিসারাসের সম্পূর্ণ কঙ্কালের কাছাকাছি
এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে অক্ষত স্টেগোসরাস জীবাশ্ম কঙ্কাল (ডাকনাম সোফি)

একটি Triceratops এর বড় মাথার খুলি

Baryonyx এর কঙ্কাল

টাইরানোসরাস রেক্সের পূর্ণ আকারের অ্যানিমেট্রনিক মডেল

আর্কিওপ্টেরিক্সের প্রথম নমুনা, সাধারণত জীবাশ্মবিদরা এটিকে সবচেয়ে প্রাচীন পরিচিত পাখি বলে স্বীকার করেছেন

বিরল ডোডো কঙ্কাল, 1,000 বছরের বেশি পুরানো হাড় থেকে পুনর্গঠিত

ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জ থেকে গ্রেট আউকের একমাত্র জীবিত নমুনা , 1813 সালে অর্কনি দ্বীপপুঞ্জের পাপা ওয়েস্ট্রে থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল

একটি আমেরিকান মাস্টোডনের একটি সম্পূর্ণ কঙ্কাল
ব্রোকেন হিল স্কাল , মিডল প্যালিওলিথিক ক্র্যানিয়াম যা এখন হোমো হাইডেলবার্গেনসিসের অংশ হিসেবে বিবেচিত , যা জাম্বিয়ার ব্রোকেন হিল বা কাবওয়ের খনিতে আবিষ্কৃত হয়েছে

জিব্রাল্টার 1 এবং জিব্রাল্টার 2 , জিব্রাল্টারের ফোর্বসের কোয়ারিতে দুটি নিয়ান্ডারথাল মাথার খুলি

1893 সাল থেকে জাদুঘরে 1,300 বছরের পুরানো দৈত্যাকার সিকোয়ার ক্রস-সেকশন

জন জেমস অডুবনের দ্য বার্ডস অফ আমেরিকার বিরল অনুলিপি , যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ধরণের পাখির চিত্র রয়েছে

চার্লস ডারউইনের বিরল প্রথম সংস্করণ অন দ্য অরিজিন অফ স্পিসিস।

বিজ্ঞানী স্যার ডারউইন এর সংগ্রহশালা আমাকে অভিভূত করেছে। ক্ষণে ক্ষণে মনটা ভরে উঠছিল। থেকে থেকেই সমৃদ্ধ হচ্ছিলাম আমি। এত সুন্দর একটি জাদুঘর পরিদর্শন করতে পেরে আমার নিজেকে ধন্য মনে হচ্ছিল। আমার আনন্দ বিস্ময় ভালোলাগার সীমা ছিল না, তবে এত অল্প সময়ে খুঁটিয়ে খুটিয়ে দেখার সুযোগ হচ্ছিল না, কারণ ফেরার তাড়া আছে। আর আমাদেরকে প্যাকিং করতে হবে ফেরার জন্য।

এবার বাড়ি ফেরার পালা.....
গোছগাছ করতে হবে। রুমে ফিরে ফ্রেশ হয়ে একটু বিশ্রাম নিয়েই আমরা গুছানোর কাজ শুরু করে দিলাম। তবে এই প্যাকিং এর কাজটা তমাল বাবুই করেন। দেশে বিদেশে প্রায়ই ঘুরে বেড়ান, তাই প্যাকিংয়ের কাজটা উনি খুব ভালই বোঝেন এবং করতেও পারেন। সেইমত প্যাকিং এর কাজ সেরে রাতের খাবার খেয়ে নরম বিছানায় লন্ডনের শীতের রাতে কখন যে দুচোখ জুড়ে গভীর ঘুম নেমে এল জানতেও পারলাম না।

সকালে এলার্মের চিৎকারে ধড়মড়িয়ে ঘুম থেকে জাগলাম। তৈরি হয়ে প্রথমে আমরা একটি উবের বুক করলাম। সময় মতন এসেও গেল কিন্তু এসেই ক্যাব ড্রাইভারের প্রথম প্রশ্ন -কটা ব্যাগ?

যেমনই শুনলো ছ-টা ব্যাগ, কোন কথা না বলে আমাদেরকে না নিয়েই সে সোঁ করে বেরিয়ে গেল এবং যাওয়ার আগে আমাদেরকে বলে গেল যেন আমরা তার গাড়িটাকে ক্যান্সেল করে একটা বড় গাড়ি বুক করি। তবে গাড়িটার যা সাইজ ছিল তাতে অনায়াসে আমাদের সবগুলো ব্যাগ এবং আমরা খুব ভালোভাবে এসে যেতাম। এখানে বোধহয় এমনই রুল। যাইহোক অগত্যা আমরা ক্যান্সেল চার্জ পে করে আরো একটা বড় গাড়ি ভাড়া করলাম।

এয়ারপোর্টে পৌঁছে আমরা লাউঞ্জের খোঁজ করলাম। দেখলাম অনেকগুলোই লাউঞ্জ। তবে গুগলে খুঁজে দেখলাম আমাদের কার্ডে কোন লাউঞ্জের এক্সেস আছে। দেখলাম অ্যাক্সেস পাওয়া লাউঞ্জগুলো প্রায় বন্ধ, একটা তো খুঁজেই পেলাম না। শেষে এয়ারপোর্ট এর মধ্যেই গুগল ম্যাপ ধরে মাইল খানেক হাঁটতে পেয়ে গেলাম লাউঞ্জ।

আমাদের দিল্লি বা মুম্বাই এর মত এত বড় বা এত সুন্দর লাউঞ্জ নয়, একেবারেই সাধারণ লাউঞ্জ। অনেক কম ধরনের খাবার বা কোয়ালিটিও। টেস্ট বা দর্শনীয় তেমন কিছু নয়। কিছু ফ্রুটস গোটা গোটা রাখা ছিল আর জুস ক্যান ছিল। কোন রকমে চালিয়ে নিলাম আমরা। এরপর আমরা আমাদের নির্দিষ্ট গেটের সামনে এসে বসলাম। ফেরার সময়ও আমরা এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইটেই ফিরেছিলাম। আসার ফ্লাইটে যাওয়ার মতন আর উত্তেজনা ছিল না। ভালো মিউজিকের সাথে টাইম টু টাইম রিফ্রেশমেন্ট এটাই যা ভালো লাগছিল। বিজ্ঞানী বাবু বালিশ কম্বল নিয়ে বেশ ঘুম দেওয়া শুরু করে দিয়েছিল। রাত গভীর হতে হতে ভোর হয়ে গেল প্রায়। ফ্লাইটের কাঁচের জানলা ভেদ করে প্রথম সূর্য রশ্মি আমার চোখে চমক লাগালো। আমি সারারাত প্রায় জেগে মুভি দেখছিলাম। হালকা চোখ লেগেছিল, মিনিট দশেকের মধ্যে চোখ খুলেই প্রকৃতির এমন অপরূপ দৃশ্য দেখলাম যে ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। নিকষ কালো আকাশে সূর্যের উজ্জ্বল কমলা রশ্মি সেই অন্ধকারকে ভেদ করে বেরিয়ে আসছে। মনে পড়ে যাচ্ছিল রবি ঠাকুরের গান-

" অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলো
সেই তো তোমার আলো।
সকল দ্বন্দ্ব বিরোধ মাঝে জাগ্রত যে ভালো
সেই তো তোমার ভালো "-
এমনই হয় বোধহয় ভগবানের রূপ! এমন অসীম, এমন অনন্ত! ঘুম জড়ানো চোখে আমি যেন ভগবানকে সাক্ষাৎ করলাম। এমন কালো আঁধারের মাঝে ভাসমান অবস্থায়।
ছোটবেলায় মায়ের কাছে শেখা সূর্যের প্রণাম মন্ত্রটা আমি মনে মনে জপ করলাম-
" ওঁং নমঃ জবাকুসুম সঙ্কাশং কাশ্যপেয়ং মহাদ্যুতিং
ধ্বান্তারিং সর্বপাপঘ্ন প্ৰণতোঽস্মি দিবাকরং।"-
ও নিজের অজান্তেই কখন যে দুটো হাত জড়ো করে কপালে ঠেকিয়ে প্রণাম করেছি বুঝতেই পারিনি। আমার দিদিমা প্রায়ই বলতো-
- দেবতাদের মধ্যে সূর্য এবং চন্দ্রকেই আমরা একমাত্র চোখের সামনে দেখতে পাই!
আমারও তেমনি যেন মনে হল। মনের প্রতিটি কোষের রন্ধ্রে ভক্তি ও নিশ্চিন্ত শান্তি চাদর মুড়ে দিচ্ছিল ঈশ্বরের বাড়ি হতে আসা আশীর্বাদের মতো মনে হচ্ছিল। ধীরে ধীরে আমার দুচোখ জলে ভাসছিল আনন্দে। মন ভরছিল না যেন দেখে দেখে। শেষে বিজ্ঞানী বাবুকে ঠেলা মারলাম দেখার জন্য, উনিও ঘুম চোখে দেখে- ভালো লাগছে বলে, আবারও ঘুমিয়ে গেলেন বাচ্চাদের মত। আমার আর ঘুম আসেনি। উৎসুক চোখে দেখতে লাগলাম সূর্যদয় আর মনে মনে এমন সুন্দর একটি দৃশ্যের সাক্ষী হয়ে থাকার জন্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানালাম।

লন্ডনের ভ্রমণ আমার কাছে আমোদ প্রমোদ ভ্রমণ এবং শিক্ষনীয় হয়েছিল। সে দেশের আবহাওয়া, মানুষ- জন, আদব-কায়দা, বাড়িঘর, রুলস রেগুলেশন, ফেসিলিটি, সিকিউরিটি ইত্যাদি অনেক কিছুই আমি শিখেছি। আমি দেশের বাইরে থেকে আমার নিজের দেশকে দেখে অনেক বেশি গৌরব অনুভব করছিলাম। আমার দেশের ছবি আমার কাছে যেন আরও অনেক বেশি সুন্দর এবং মহান মনে হচ্ছিল। আর আমার মায়াময়ী সুজলা সুফলা শস্য-শ্যামলা বাংলায় ফিরে আসার জন্য মনটা ছটফট করছিল। এরপর দীর্ঘ পথ যাত্রা করার পর আমরা যখন বাড়ি ফিরলাম তখন মনের মধ্যে গান বাজছিল -"হোম সুইট হোম"





সমাপ্ত.......

আলোকচিত্র সৌজন্যে লেখিকা অদিতি মন্ডল