বোমাতঙ্ক
অনিন্দিতা গুড়িয়া,
নিউ-দিল্লি
শিয়ালদা স্টেশন থেকে ডাউন ক্যানিং লোকাল ছাড়তে তখন মিনিট তিনেক বাকি।
এরই মধ্যে কামরায় তিল ধারণেরও জায়গা নেই। বসার সিট গুলো তে তিনজনের
জায়গায় ছয় জন সাত জন পর্যন্ত বসেছে। জানালাগুলোতেও বাতাস আড়াল করে
লোক দাঁড়িয়ে আছে। চিৎকার চেঁচামেচি, বাচ্চার কান্না, মহিলাদের ঝগড়া,
হকারের সুরেলা আওয়াজ, অন্ধ ভিখারীর কৌটো বাজিয়ে গান, সব মিলিয়ে সে এক
বিষম অবস্থা।
এরই মধ্যে কে যেন বলে উঠল -ও দাদা এই ব্যাগটি কার?
সুন্দর কারুকাজ করা একটা মাঝারি সাইজের হ্যান্ডব্যাগ। সবাই উৎসুক হয়ে
দেখছে আর ভাবছে- কার ব্যাগ হতে পারে?
কিছুক্ষণ কেটে যাওয়ার পরও ব্যাগের মালিকানা নিতে কেউ এগিয়ে এলো না দেখে
যাত্রীদের মধ্যে একটু গুঞ্জন ও চাঞ্চল্য দেখা দিল। ট্রেনটা এইবার হুইসেল
দিল আর সাথে সাথে কেউ একজন বলে উঠলো- বম, বম হতে পারে!
আর যায় কোথায়? এ ওকে ঠেলে তার মাথা ডিঙিয়ে, কারুর ঘাড়ের উপর দিয়ে,
কারও পা মাড়িয়ে, সবাই সবার আগে বেরোতে চায় কামরা থেকে। দ্বিতীয়
হুইসেল বাজিয়ে ট্রেন দূলে ওঠার আগেই খালি হয়ে যায় পুরো কামরা।
এরপর হাঁকাহাঁকি- ছুটোছুটি পড়ে যায় স্টেশন চত্বরে। মুহূর্তে কন্ট্রোল
রুম থেকে দৌড়ে আসেন রেল পুলিশ। দৌড়ে আসে চেনে বাঁধা বড় বড় ডাল কুত্তা
সহ পুলিশ। দৌড়ে আসে ধরা চূড়া পরা বম স্কোয়াডের দল।
এদিকে দিল্লিগামী প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে অপেক্ষারত দুই ষাটোর্দ্ধ
স্বামী-স্ত্রী একে একে গুনে দেখে নিচ্ছেন তাদের ট্রলি ব্যাগ মালপত্র
ইত্যাদি। তখনও দিল্লির ট্রেন ছাড়তে প্রায় পঞ্চাশ মিনিট সময় বাকি। এমন
সময় স্বামী বলে উঠলেন- হ্যাঁ গো, আমার হ্যান্ড ব্যাগটা!
- কেন তুমি নামাওনি ট্রেন থেকে? বললেন স্ত্রী।
- না আমি ভাবলাম তুমি নামিয়েছো।
- সে কি, আমাকে কখন দেখলে তোমার ব্যাগ নামাতে! আর তাছাড়া তোমার
হ্যান্ডব্যাগ তাই নামানোর দায়িত্বও তোমার।
- হ্যাঁ হ্যাঁ, তা তো বলবেই। কোনদিন আমাকে মানুষ বলে ভেবেছ? আমি তো একটা
দুপেয়ে গাধা তাই না! ছোট থেকে দাদা -বৌদি, ভাইপো -ভাইজিদের মালপত্র বয়ে
এলাম। তারপরে এলে তুমি। তুমি আমার ঘাড়ে সব বোঝা চাপিয়ে দিব্যি নিজের
সাইট ব্যাগটা কাঁধে ফেলে ঘুরে বেড়াতে। তারপর একে একে ছেলে মেয়েরও
ঝোলাঝুলি লট বহর বইতে বইতে এখন এই বুড়ো বয়সেও রেহাই নেই। উনি চলেছেন
ছেলের বাড়ি, আর তাই ক্ষেতের সব্জি , গাছের নারকেল, পুকুরের মাছ, ঘরের
ধানের সরু চাল, ঘরে ভাজা মুড়ি, ছোলা, বাদাম, মটর, তার উপরে গুড়,
মিষ্টি, থোঁড়, মচা, মান কচু, গাঁদাল পাতা, দুনিয়া রাজ্যের জিনিস ভরে
ভরে সাত আটটা ব্যাগ সাজিয়েছে। আমি এই ব্যাগ গুলো গুছিয়ে নামাতে গিয়েই
তো তোমার হ্যান্ড ব্যাগটা ছেড়ে গেল। দুটো মানুষের সামান্য কিছু
কাপড়-চোপড় আর কিছু মিষ্টি নিলেই তো ফুরিয়ে যেত ঝামেলা। তা নয়; বিশ্ব
সংসারে একমাত্র ওনার ছেলে বউ নাতি নাতনিরা এই বিশুদ্ধ গ্রামের খাদ্য থেকে
বঞ্চিত। তাই ওনার মাতৃ হৃদয় বিগলিত করুণা আর আমি এই বয়সে দুই হাতে দুটো
ব্যাগ নিয়ে কুলির পিছনে পিছনে রীতিমতো দৌড়তে হচ্ছে!
কি যেন মনে পড়াতে ভদ্রমহিলা বলে ওঠেন- তোমার হ্যান্ড ব্যাগ টা গেছে তো ?
তা ভালই হয়েছে, আপদ বিদায় হয়েছে। এইবারে তুমি বুনো থেকে মানুষ হবে।
ফোঁস করে উঠলেন ভদ্রলোক, -ট্রেনের দুলুনিতে তোমার গা গুলায়, শরীর খারাপ
লাগে, তার জন্য তুমি লেবু পাতা, তুলসী পাতা এইসব নিলে তার কিছু নয়, আর
আমার জিনিসটাই হলো গিয়ে আপদ! ট্রেন ছাড়তে এখনো ঢের সময় বাকি আছে, আমি
একটু খুঁজে দেখে আসি। ততক্ষণ ব্যাগ গুলোর খেয়াল রেখো..........বলেই
ভদ্রলোক প্রায় দৌড়াতে লাগলেন। ছুটতে ছুটতে একজনকে জিজ্ঞেস করলেন- ভাই
ক্যানিং লোকাল.......
-কি সমস্যা হয়েছে কি জানি, সব ট্রেনই এখনো দাঁড়িয়ে আছে , যেতে যেতে
উত্তর দিলেন লোকটি। শিয়ালদা সাউথের দিকে স্টেশন চত্বরে এসে ভদ্রলোক দূর
থেকে দেখলেন কিছু একটা জিনিস নিয়ে খুব মনোযোগ সহকারে পুলিশ যন্ত্রপাতি
কুকুর ইত্যাদি দিয়ে পরীক্ষা করা হচ্ছে আর সাধারণ লোকেদেরকে বেশ দূরে
সরিয়ে রাখা হয়েছে। ভালো করে দেখার পর বুঝলেন- আরে হ্যাঁ ওটা তো তার
নিজের সেই হারিয়ে যাওয়া হ্যান্ডব্যাগ। ভদ্রলোক আনন্দে চেঁচিয়ে ওঠেন।
-আরে ওই তো আমার ব্যাগ!
সাধারণ যাত্রী থেকে পুলিশ মায় কুকুর পর্যন্ত সচকিত হয়ে উঠলো। এইবার দু
তিনজন রেল পুলিশ তাকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলেন। যখন তারা
নিশ্চিন্ত হলেন যে ব্যাগের মালিক তিনিই। তখন তাঁর ব্যাগে কি আছে জানতে
চাওয়াতে ভদ্রলোক কিছুতেই মুখ খুলতে রাজি নন। কিন্তু পুলিশ তাকে ছাড়বে
কেন? তবে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর পুলিশ বুঝলো যে ব্যাগে বম নেই। কিন্তু
ব্যাগের ভেতর কি আছে তা না জেনে পুলিশ তো ছাড়বে না। ভদ্রলোক যখন মুখ
খুললেন না তখন পুলিশ সবার সামনে সেই ব্যাগ খুলে উপর করে ফেলতে আদেশ
দিলেন। এইবার ভদ্রলোক কান্না কান্না গলায় বললেন- স্যার ওটা উপুড় করলে সব
নষ্ট হয়ে যাবে, প্লিজ উপুড় করতে বলবেন না ।
পুলিশ বললেন -তাহলে আপনিই বলে দিন ওটার ভেতরে কি আছে। এইবার ভদ্রলোক
লজ্জিত হয়ে মাথা নিচু করে জানালেন ওতে তাঁর মাজন আছে। আর ওতে দাঁত না
মাজলে ওনার মনে হয় মুখ দাঁত পরিষ্কার হয়নি। তাই কিছু খেতেও ইচ্ছে করে
না আর পেটও পরিষ্কার হয় না।
- একটা সামান্য মাজনের জন্য আপনি ন নম্বর প্লাটফর্ম থেকে এখানে আবার
দৌড়ে এসেছেন? এতক্ষণ তো এই ট্রেন ছেড়ে যাওয়ার কথা! আপনি তো মাজন
যেখানে সেখানে কিনে নিতে পারেন।
- স্যার এটা একটা স্পেশাল মাজন, সব জায়গায় পাওয়া যায় না।
- সব জায়গায় পাওয়া যায় না!
নাছোড়বান্দা পুলিশ না দেখে ছাড়বে না আর ভদ্রলোক ও দেখাতে রাজি নয়।
শেষে পুলিশের সামনে পরাজয় শিকার তাকে করতেই হল। এবং সবাইকে রীতিমতো অবাক
করে দিয়ে ব্যাগের ভেতর থেকে বেরোলো একটা কালো রঙের প্লাস্টিক পলিথিনে
সযত্নে বাঁধা কিছু পোড়া ঘুঁটের ছাই!