দ্রৌপদী ও তাঁর পঞ্চ স্বামী
বাপ্পাদিত্য গুড়িয়া,
নতুন দিল্লি
দ্রৌপদী কি প্রকৃতপক্ষেই পাঁচজন আলাদা - আলাদা পুরুষকে বিয়ে করেছিলেন?
তবে তিনি পঞ্চ সতীর এক সতী কিভাবে! হাস্যকর হলেও সত্যি যে এই যুগে এসেও
মানুষের পরের হাঁড়ির খবর সংগ্রহ আর তা নিয়ে সমালোচনা করার অভ্যাস যায়নি।
যে নারীর একাধিক সম্পর্ক আছে অথবা কোন কারণবশত যে নারী একাধিক স্বামী/বর
পরিগ্রহণ করেছেন তাকেই আমরা দ্রৌপদী বলে কটুক্তি করে থাকি। কিন্তু আসলেই
কি দ্রৌপদী পাঁচ জন আলাদা আলাদা পুরুষকে তাঁর জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে
নিয়েছিলেন? আসুন এর সত্যাসত্য আমরা একটু যাচাই করে নিই।
বৈদিক সাহিত্যে বৃত্রাসুরের বেশ ভালোই উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রজাপতি
ত্বষ্টার পুত্র ত্রিশিরা মাথা নিচে এবং পা উপরে রেখে ভীষণ কঠিন সাধনা
করছিল। সাধনার তেজ দেখে স্বর্গের রাজারও টনক নড়ে উঠল। গদি হারানোর ভয়
আসলে ব্যক্তি যেমন করে, স্বর্গের রাজার কাজেও তার তফাৎ দেখা গেল না।
দেবরাজ ইন্দ্র হত্যা করলেন ত্রিশিরাকে। খবর পেয়ে ক্ষুব্ধ প্রজাপতি
ত্বষ্টা শেষমেশ সৃষ্টি করলে অসুর বৃত্র-কে, যে এই কাল পর্যন্ত ইন্দ্র
শত্রু হিসাবে বিখ্যাত।
এদিকে স্বর্গরাজ বেশ চাতুরীর সাথেই ঋষিগণকে বুঝিয়ে ফেললেন যে বৃত্র জল ও
বৃষ্টির শত্রু। যে নদীগুলিকে আবদ্ধ করে রেখে পৃথিবীতে খরা সৃষ্টি করছে।
এবং মর্তবাসীর কল্যাণে বৃিত্রাসুর কে বধ করা একান্ত কর্তব্য হয়ে পড়েছে।
তার কথা শুনে ঋষি দধীচি অচিরেই তাঁর প্রাণ ত্যাগ দিলেন এবং বৃত্তাসুর বধ
হেতু ঋষি দধীচির অস্থি বা হাড় থেকেই তৈরি হলো বজ্র। যা দেবরাজ ইন্দ্রের
হাতে শোভা পায়। এখানেই দেবরাজ ইন্দ্র তার আসল রাজনীতির চালটা চাললেন।
ঋষি দধীচির অস্থি নির্মিত বজ্র দ্বারা ইন্দ্র বৃত্রাসুরকে হত্যা করল।
একটা কথা খেয়াল করো, স্বর্গের রাজার মনে যে অনেক শান্তি তা বলে লাভ নাই।
গদিতে বসলে সবাই গিরগিটি। কিন্তু দেবতা বলেই কি তার পাপ মাফ হবে? তা
কখনোই নয়। স্বর্গের রাজা হলেও তোমার পাপ পাপ-ই। দেবরাজ হওয়া সত্ত্বেও
ইন্দ্রেরও নিজের দুভাগ শক্তি এখানে হারাতে হলো।
প্রথমভাগে ত্রিশিরাকে হত্যা করে ব্রহ্মহত্যার পাপে দুষ্ট হলে সে ধর্মের
শক্তি হারায়, যেই শক্তি ধর্মরাজের কাছে সঞ্চিত থাকে।
দ্বিতীয়ভাগে সে বল হারায়, যা বায়ু দেবতার কাছে সঞ্চিত থাকে।
আর রামায়ণ পড়ে জানতে পারি ঋষি গৌতমের পত্নী অহল্যার কাহিনী, যেখানে
দেবরাজ ইন্দ্র ঋষি গৌতমের বেশ ধরে পরমা সুন্দরী ঋষি পত্নী অহল্যার সতীত্ব
হরণ করছেন। সেই ঘটনায় ইন্দ্র তার রূপ হারায়, যা সঞ্চিত থাকে দুইজন
অশ্বিনী কুমারের কাছে।
এই শক্তি ভাগগুলিই পরে ধর্মরাজের পুত্র যুধিষ্ঠির, বায়ুর পুত্র ভীম
হিসাবে জন্ম নেয় কুন্তীর গর্ভে। আর অশ্বিনীসূতদ্বয়ের পুত্র নকুল আর সহদেব
নামে মাদ্রীর গর্ভে জন্ম নেয়।
অর্জুন তো স্বয়ং ইন্দ্রের অংশ ছিলো তা মহাভারতেই ব্যাসদেব উল্লেখ
করেছেন।
শচীপতি যেহেতু জন্ম নিয়েছে, তাহলে শচীদেবীরও জন্ম হবে, এটাই স্বাভাবিক।
তাই রাজা দ্রুপদের যজ্ঞশালায় স্বর্গের রাণীর জন্ম হয় যাজ্ঞসেনী দ্রৌপদী
নামে। শচীপতি (ইন্দ্র) ঘটনাক্রমে পাঁচভাগে জন্ম নিলেও তো কিছু করার নেই,
পাঁচ জনের ভাগ্যে একজন পত্নীই। কারণ পাঁচজন মিলেই একজন পূর্ণাঙ্গ ইন্দ্র
দেব।
(মার্কণ্ডেয় পুরাণ, ৫ম অধ্যায়)