গুগি বুড়ি
সুলেখা ভান্ডারী,
বালিগঞ্জ, কলকাতা
এক যে ছিল গুগি বুড়ি থাকতো পাশের গাঁয়ে।
সবাই তাকে ডাকতো শুধুই গুগি গুগি বলে।
বিধবা বামনি আর সঙ্গে থাকতো মেয়ে।
স্বামী হারা মা মেয়ের চলবে কেমন করে?
বেছে নিল, ভিক্ষা বৃত্তি করে দিন কাটাবে।
গ্রাম শুদ্ধু ছেলেমেয়েরা সবাই যমের মতো ভয় পায়।
দেখতে কেমন বলছি শোনো, শোনো মন দিয়া,
যেমন ছিল লম্বা, তেমন ছিল রোগা,
চোখ দুটো তার রসগোল্লা।
মাথার উপর নটন বেঁধে রাখতো সব সময়।
কাঁধে থাকত ঝোলা ব্যাগ হাতে পুটুলি।
মুখটি ছিল কেমন যেন বীভৎস আকৃতি।
গলার আওয়াজ কেমন যেন একদম নয় ভালো।
মাগো দুটো ভিক্ষে দিবি? ভিক্ষে দিবি? বলতো বারবার।
বয়স তখন কত বা হবে, আট কিবা নয় দশ।
শুনতে পেলে গুগির গলা পেতাম কত ভয়।
পড়াশোনা না করে যদি করতাম শুধু খেলা-
মা কাকিরা বলতো সবাই ডাকবো ?
ডাকবো নাকি আবার।
বুঝিনা বাপু ভয় দেখিয়ে কি যে মজা পায়।
বোড়, বোলসিদ্ধি, নারায়ণপুর, বনবাহাদুরপুর আর
রত্নেশ্বরপুর এইসব গ্রাম ঘুরে ঘুরে ভিক্ষা মেদ্ধি খায়।
মাঝেমধ্যে মেয়েকে নিয়ে আসতো সঙ্গে করে।
কেউ দিতো দুটো চাল টাকা-পয়সা।
কেউ দিতো পুরনো জামা কাপড়।
কখনো কখনো দিতো সবাই গাছের শাকসবজি।
কত না খুশি হত তখন বিধবা বামনী।
ভাই-বোনেরা সবাই মিলে করছি হয়তো খেলা।
কানে যদি আসে বাবা গুগি বুড়ি গলা।
কে যে কোথায় লুকাবো পথ খুঁজে না পাই।
খেলতে খেলতে একদিন প্রায় সন্ধ্যা হয়ে যায়।
মা বলছে আর খেলিস না.... এবার উঠে আয়।
আমি বললাম, একটুখানি, আর খেলি না মা..…!
দেখবি, আমি ডাকবো? ডাকবো গুগিকে?
সত্যি সত্যি !! কোথা থেকে উদয় হলেন উনি।
উঠানেতে ঝাড়ছিল মা কুলো দিয়ে চাল।
বলল ওকে ধরে নিয়ে যাও শুনছে না মোটে কথা।
ভয়ে আমি শিউরে উঠে ছুটে পালাই ঘরে।
ওমনি বলে ওকে নেব আজ ঝোলায় করে ভরে।
কান্নাকাটি করছি আমি বলছি খেলব না আর।
কে কার কথা শোনে,
বলছে আজ নিয়েই যাব, বলছে বারবার।
অনেক পরে মা বলল, দুষ্টুমি আর করবি না তো বল?
আমি বললাম না মা, না মা.. করবো না।
মা বলল এবারটা তবে ওকে ছেড়ে দাও।
মনে হয় শুধু বারে বারে এই বুঝি এলে মোর দ্বারে,
কে তুমি? কে তুমি? আমায় ডাকো।
ছোটবেলাটা ভয়ে ভয়ে কাটিয়ে দিলাম পার।
শনিবার স্কুল ছুটির পরে আসছি সবাই বাড়ি।
হঠাৎ দেখি বাঁশ বাগানে বসে আছে বুড়ি।
সারাবেলার উপার্জন সে গুনছে মনোযোগে।
দেখে বলে এখন তো তোদের সঙ্গে নেই কেউ।
চল দেখি আজ নিয়েই যাব, নিয়ে যাব বাড়ি।
বাবা গো মা গো বলে পালাই অন্য রাস্তা ধরি।
আমার সঙ্গে কি ছুটতে পারে?
উম...আমায় ধরবে কে রে?
জোষ্ঠী মাসে ওই গ্রামেতে মা চন্ডীর মেলা।
সবাই বলে যাবি নাকি রে? আজ বুড়ির পাড়ায় মেলা।
জোরাজুরি করিস নে বাপু আমি যাব না।
তুই না গেলে আমরা কিন্তু কেউ যাব না।
ঠিক আছে চল, মেলায় গিয়ে সবাই মিলে
করছি কত মজা।
এমন সময় সামনে দেখি হাসছে বুড়িটা।
রাগে তখন গা টা আমার জ্বলে উঠছে ভারী।
কথায় আছে না যেখানে গেলে বাঘের ভয়
সেইখানে তে সন্ধ্যে হয়।
অনেকদিন হলো আর দেখছি আসছে না কারোর বাড়ি।
আমাদের তো ভাই বোনেদের মজা হলো ভারী।
হঠাৎ একদিন দাদা বলে শরীর খারাপ তার।
ওহো! তাই বুঝি আসছে না
অনেকদিন হয়ে গেল প্রায়।
কিছুদিন পর শুনছি মারা গেছে।
হায় !! হায় !!
শুনে আমরা খুশি হলাম
তবে যেন কষ্টও পেলাম ভাই।
বয়স আমার এখন অনেক হলো প্রায় ৬০ ছুঁইছুঁই।
তবু কেন ভয় পাই?
মাঝেমধ্যে কেন রে বাপু স্বপ্নে দেখা দেয়?
সকাল হলে ঘুম ভাঙলে চমকে ওঠে গা
ভাবি শুধু মনে মনে
মরেও তুমি কেন আমার মরণ কামড় দাও।
এবার তুমি আমায় ছেড়ে অনেক দূরে যাও।
আমায় তুমি একটুখানি শান্তি দিয়ে যাও।।