এই গরমে নিজেকে সুস্থ রাখুন
মনিকা পুরকাইত,
পোর্ট ব্লেয়ার, আন্দামান
অসহনীয় গরমে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। এ সময় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি হচ্ছে
হিট স্ট্রোকের। পরিবারের বয়স্ক, অসুস্থ সদস্য এবং শিশুরা থাকেন সবচেয়ে
বেশি ঝুঁকিতে। হিট স্ট্রোকের মূল কারণ জলশূন্যতা। বয়স্ক, অসুস্থ এবং
শিশুরা অনেক সময়ই এটা বুঝতে পারে না। তাই তাদের দিকে বাড়তি নজর রাখতে
হবে।
পাশাপাশি, গরমের সময় বেড়ে যায় ডায়রিয়ার প্রকোপ। এ ছাড়াও প্রচণ্ড গরমে
জ্বর, কাশি, শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া, টাইফয়েড ও জন্ডিস এবং চর্ম রোগের
প্রকোপ অনেক বেড়ে যায়।
প্রচণ্ড রোদে বের হওয়া খুব কঠিন হয়ে পড়ে। অতিরিক্ত তাপের কারণে অনেকেই
দুর্বলতা, ক্লান্তি এবং অলসতা অনুভব করতে শুরু করেন। কখনও কখনও, তাপ এবং
আর্দ্রতার কারণে, অনেকের মাথা ঘোরা এবং বমি হতে পারে।
* অতিরিক্ত গরমে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গেলে তাকে
হিট স্ট্রোক বলা হয়। এর ফলে ঘাম বন্ধ হয়ে গিয়ে শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত
বাড়তে শুরু করে। হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হলে মাথা ব্যথা ও মাথা ঘোরা এবং
চোখে ঝাপসা দেখতে পারেন ব্যক্তি । অস্বাভাবিক দুর্বলতা, মাশলে বা শিরায়
টান ও বমি অনুভব হয়। শেষ পর্যায়ে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া এবং খিঁচুনি হতে পারে।
* প্রাথমিকভাবে হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত ব্যক্তিকে অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা জায়গায়
নিয়ে গিয়ে শরীর থেকে যতটুকু সম্ভব কাপড় খুলে ফেলতে হবে। ফ্যান বা এসির
ব্যবস্থা থাকলে দ্রুত তা চালু করতে হবে। না হলে হাত পাখা বা ঐ জাতীয় কোন
কিছু দিয়ে রোগীর শরীরে বাতাস করতে হবে। ঠান্ডা জল দিয়ে শরীর মুছতে হবে।
প্রয়োজনে অতি দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে রোগীকে।
এ কারণে গ্রীষ্মে সুস্থ থাকতে কিছু বিষয় মাথায় রাখা খুবই জরুরি। গরমে
হিট স্ট্রোকের মতো সমস্যা থেকে নিরাপদ থাকতে যা করতে পারেন-
* শরীর হাইড্রেটেড রাখুন :
গরমের সময় শরীরে যেন জলের অভাব না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখুন। বেশি বেশি
জল খান, কারণ কম জল খেলে শরীর জলশূন্য হতে পারে। অনেকেরই জল কম খাওয়ার
অভ্যাস আছে বা জল খেতে ভুলে যান। এমন পরিস্থিতিতে ডিহাইড্রেশনের কারণে
স্বাস্থ্য সমস্যায় পড়তে হতে পারে। এ কারণে গরমে যতটা সম্ভব জল পান
করুন। বাইরে যাওয়ার সময় বা ভ্রমণের সময় সর্বদা আপনার সঙ্গে জলের বোতল
রাখুন। গ্লুকোজ ওয়াটার, দইয়ের শরবত, আম পানা, লস্সি, লেবু জল, এমনকি
বাটারমিল্কও শরীরকে হাইড্রেট করতে সাহায্য করে।
* বাইরে যাওয়ার সময় সাবধানতা :
প্রখর সূর্যালোকে অকারণে বাইরে যাওয়া এড়িয়ে চলুন। জরুরি কাজ থাকলেই
রোদে বের হবেন এবং আপনি যদি রোদে বের হন তবে আপনাকে অবশ্যই কিছু সতর্কতা
অবলম্বন করতে হবে। যেমন বাইরে যাওয়ার সময় হালকা কাপড়, হালকা রঙের
জামা, ঢিলেঢালা, সুতির কাপড় পরা উচিত। জলের বোতল, রোদচশমা, ছাতা, টুপির
মতো জিনিস নিয়ে বাইরে বের হন। এছাড়াও মনে রাখবেন, প্রচণ্ড গরমে শিশুদের
দিনের বেলা খেলার জন্য বাইরে যাওয়া থেকে বিরত রাখতে হবে।
খাবারের প্রতি বিশেষ যত্ন নিন:
* তীব্র গরমে কী ধরনের খাবার খাবেন:-
গরমের সময় ঘামের কারণে শরীর থেকে যে লবণ-জল বের হয়ে যায় তার ঘাটতি পূরণের
জন্য অতিরিক্ত তরল পান করতে হবে। তাই গ্রীষ্মকালীন ফল দিয়ে তৈরি তাজা
ফলের রস, ডাবের জল, লবণ- চিনির শরবত, গ্লুকোজ ওয়াটার বারে বারে খেতে হবে
এবং খেয়াল রাখতে হবে প্রস্রাবের গাঢ় রঙ কিন্তু শরীরের জল কম হয়ে যাওয়ার
লক্ষণ।
ঝিঙে, চালকুমড়া, লাউ, চিচিঙ্গা, শজনেডাঁটার তরকারি বা পাতলা ঝোল রান্না
করে খেলে শরীরে গরম কম অনুভূত হবে ও পেট ভালো থাকবে।
কাঁচা আমের শরবত খেতে পারেন। এতে প্রচুর ভিটামিন সি থাকে। পাকস্থলী সুস্থ
রাখার জন্য প্রতিদিন টক দইয়ের শরবত বানিয়ে খাওয়া যেতে পারে। এ ছাড়া শিশু
ও রোগীরা পাতলা করে সবজির স্যুপ খেলে তা শরীরের জন্য উপকারী।
* তীব্র গরমে কী ধরনের খাবার খাবেন না:-
কিছু খাবার আছে যেগুলো খেলে শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে গরম অনুভূত হতে পারে।
যেমন-
১. মশলাজাতীয় খাবার, ফুচকা, ফাস্টফুড, ডুবো তেলে ভাজা খাবার, তেল-চর্বি
জাতীয় খাবার, পোলাও, বিরিয়ানি, কোপ্তা কালিয়া এসব খাবার শরীরের
তাপমাত্রা বাড়িয়ে বদহজম করতে পারে।
২. চা বা কফির ক্যাফিন দেহকে জলশূন্য করে ফেলে শরীরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে
তুলতে পারে। তাই যথাসম্ভব চা কফি এড়িয়ে চলুন।
৩. গরমের সময় দুধ জাতীয় খাবার তাড়াতাড়ি নষ্ট হয় এবং ব্যাকটেরিয়া দ্রুত
বৃদ্ধি হয়। তাই দুধ জাতীয় খাবার খেলে সেটা তাজা খাওয়াই বাঞ্ছনীয়।
৪. আইসক্রিম ও কোক পেপসি জাতীয় বা কোল্ড ড্রিংকস খেলে শরীরে ঠান্ডা
অনুভূত হয় সত্যি, কিন্তু এসব খাবারে শরীরে জলশূন্যতা দেখা দেওয়ার ঝুঁকি
থাকে। তাই এসব এড়িয়ে যাওয়াই ভালো।
৫. অতিরিক্ত চিনি ও লবণ এ দুটি জিনিস এমনিতেই শরীরের জন্য ক্ষতিকর। তাই
এসব খাওয়া সীমিত রাখতে হবে।
* যা মনে রাখা সবচেয়ে জরুরী:
তীব্র গরমে বিশেষত শিশু ও কিশোর, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষ এবং খেটে খাওয়া
শ্রমিক ও মজুরদের কষ্ট ও ঝুঁকি বেশি। কর্মজীবী, শিক্ষার্থীসহ যাদের বাইরে
যেতে হয় এবং যারা ঘরে থাকেন তাদের কিছু সতর্কতা মেনে চলা উচিত। যেমন-
১. বাইরে বের হওয়ার সময় ছাতা বা ক্যাপ ব্যবহার করতে হবে। প্রয়োজনে গামছা
বা ওড়না জাতীয় সুতির কাপড়ে মাথা ও মুখ ঢেকে রাখা উচিত।
২. শরীরে জলশূন্যতা এড়াতে অতিরিক্ত জল ও শরবত খেতে হবে এবং বাইরে বের
হওয়ার সময় অবশ্যই বোতলে করে জল, শরবত বা গ্লুকোজ ওয়াটার সঙ্গে নিয়ে
যাওয়ায় উচিত।
৩. সরাসরি রোদ এড়িয়ে ছায়াযুক্ত স্থান দিয়ে চলার চেষ্টা করতে হবে।
৪. ভারি ও কালো কাপড় বাদ দিয়ে হালকা রং ও পাতলা বিশেষ করে সুতির ঢিলেঢালা
পোশাক পরতে হবে।
৫. ত্বককে সূর্যের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করতে সানস্ক্রিন এবং
প্রয়োজনে সানগ্লাস ও ছাতা ব্যবহার করতে হবে। বাইরে যাওয়ার সময় অবশ্যই
সানস্ক্রিন লাগান। মনে রাখবেন সানস্ক্রিন লাগানোর ১৫ মিনিট পর ঘর থেকে
বের হওয়া উচিত।
৬. কারণে- অকারণে বাইরে রোদে ঘোরাঘুরি হিট স্ট্রোকের কারণ হতে পারে। একই
সঙ্গে স্বাস্থ্য নষ্ট করতে পারে। তাই গরমে বিশেষ করে দুপুরের দিকে
অপ্রয়োজনে বাইরে বের হবেন না। খুব বেশি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে যাওয়ার
দরকার নেই। বিশেষত যারা হৃদরোগ, লিভার ও কিডনির রোগে ভুগছেন।
৭. সকাল ১১টা থেকে দুপুর ৩টা পর্যন্ত তাপমাত্রা সবচেয়ে বেশি থাকে। তাই
এই সময়ে বাইরের কাজ কমিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে।
৮. শ্রমিক ও রিকশাচালকদের মাথায় ক্যাপ কিংবা কাপড় ব্যবহার করতে হবে।
৯. একটানা কেউ রোদে কাজ করবেন না। কাজের মধ্যে কিছু সময় পরপর ছায়া জায়গা
দেখে বিশ্রাম নিতে হবে।
১০. বারবার মুখ ও শরীরে জলের ঝাপটা দিতে হবে, বারে বারে জল খেতে হবে।
হালকা লবণ মিশ্রিত জল কিংবা গ্লুকোজ ওয়াটার এক্ষেত্রে সবচেয়ে উপকারী।
১১. রাস্তা ও ফুটপাতের অপরিষ্কার ও নোংরা পরিবেশে তৈরি শরবত, চা বা
অন্যান্য খাবার খাওয়া একেবারে ত্যাগ করতে হবে।
১২. যাদের দিনে আউটডোর ব্যায়ামের অভ্যাস আছে তারা সময় পরিবর্তন করে
সন্ধ্যায় বা রাতে করতে পারেন।
আশা করি এই গরমে সুস্থ থাকতে অবশ্যই উপরের টিপসগুলি আপনারা মেনে চলবেন।
সবাই সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন, এই গরমে সবার সুস্থতা কামনা করি।