জীবন আজও কাঁদে

চিত্তরঞ্জন মন্ডল,

সোনারপুর, কলকাতা

চাকরি সূত্রে সুজয়কে বহু জায়গায় ঘুরতে হয়। এই ঘোরার সূত্রে বহু মানুষের তার কাছে আনাগোনা। তারপর চেনাশোনা। ধীরে ধীরে ভাব ভালবাসা খাতির। তাদের সবার সঙ্গে সম্পর্ক যে গাঢ় হয়েছে তাও নয়। তবু কিছু মানুষের কথা কখনও ভোলার নয়। জায়গাগুণে মানুষের ভাষা, উচ্চারণের ধরন, চলন, বলন সব আলাদা আলাদা রকমের। অথচ সবাই বাঙালি, মাতৃভাষা বাংলা। এখন দক্ষিণ ২৪ পরগণার এক নামকরা জায়গায় সুজয় পোষ্টিং পেল। নিকটবর্তী স্টেশন বলতে মথুরাপুর রোড। জমজমাট স্টেশন রোড। পিচ রাস্তার দুধারে ছোট ছোট কাতারে কাতারে দোকান। আপ ডাউন প্লাটফর্মে অজস্র হকারের উৎপাত। এখান থেকে বাস, অটো, ট্রেকার বিভিন্ন জায়গায় ছুটছে। কাকদ্বীপ, লক্ষ্মীকান্তপুর, মন্দিরবাজার, ডায়মন্ডহারবার, বিষ্ণুপুরে সব ন জায়গায় যাচ্ছে, যদিও ট্রেনপথে লক্ষ্মীকান্তপুর খুব কাছেই। নামখানা লোকাল লক্ষ্মীকান্তপুর হয়ে কাকদ্বীপ ছুঁয়ে নামখানায় পৌঁছাচ্ছে। হাতানিয়া-দোয়ানিয়া নদী পার হয়ে বাস ধরে বকখালি। নামকরা টুরিস্ট স্পট। ভোটো মথুরাপুর থেকে ঘোড়াদোল, বাপুলি চক মটর ভ্যান, অটো সবসময় যাচ্ছে। এত লোকজন এই স্টেশন থেকে যাতায়াত করে তা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। ভোর থেকে উঠে মেয়েরা দূরদূরান্ত থেকে এইসব ছোট গাড়ি চেপে স্টেশনে এসে বারুইপুর, সোনারপুর গড়িয়া, বাঘাযতীন, যাদবপুর, ঢাকুরিয়া বালিগঞ্জে সকালবেলা নামে। মূলত বেশিরভাগই এরা কলকাতা শহর ও শহরতলীর বাবুদের বাড়ির পরিচারিকা। কিছু আবার ব্যবসার জন্য যায়। অনেকে সেন্টারে নাম লিখিয়ে আয়ার কাজ করে। এদের বেশভূষা সাজগোজ দেখলে কিন্তু সহসা বোঝা যাবে না যে এরা এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। পরনে মোটামুটি ম্যাচিং করা শাড়ি ব্লাউজ, ম্যাচিং করা টিপ কপালে। শাড়ির রং এর সঙ্গে ম্যাচিং করা পুঁথির মালা গলায়। বেশিরভাগ মেয়েদের কাছে মোবাইল ফোন। মূলত বাবু-বাড়ির বউদিমণিরা তাদের ব্যবহৃত পুরানো সাজপোষাক এদেরকে দিয়ে দেয়। এরা এতে খুব খুশিও হয়। এবং মন দিয়ে তাদের সেবা করে। কার বউদিমণি কার দাদাবাবু কত ভাল তা এদের আলোচনায় কান পাতলে সব শোনা যায়। এখানে অফিসে যাতায়াতের সুযোগে সে শুধু এখানের ভৌগোলিক অবস্থান নয়, মানুষের বেঁচে থাকার জন্য যে দুঃসহ কঠিন লড়াই সেটা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে পেরেছে। সুজয় জানতে পেরেছে শুধু এই লক্ষ্মীকান্তপুর লাইন নয়, ডায়মন্ডহারবার এবং ক্যানিং লাইনেরও একই চিত্র। সেই মোরগডাকা ভোর থেকে সন্ধ্যে বেলায় বাড়ি ফেরা এই জীবন তারা অনোন্যপায় হয়ে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। শীত গ্রীষ্ম বর্ষা এই গতানুগতিক জীবিকাই তাদের ভরসা। তাদের মরদরাও নানা কাজের ধান্দায় কলকাতামুখী।

এখানে পোস্টিং না হলে জীবনের অনেক কিছুই তার অচেনা অজানা থেকে যেত। কসবার বাড়িতে বসে তার বউ ছেলে ছলে ও জীবন ভাবতেই পারবে না । আগে নাকি এখানে রাস্তাঘাট, হাসপাতাল, ভাল স্কুল কিছুই ছিল না। এখন চারিদিকে ঝাঁ চকচকে রাস্তা হয়েছে। হয়েছে বড় হাসপাতাল, হয়েছে পানীয় জলের ব্যবস্থা। বিদ্যুৎ গিয়েছে বাড়ি বাড়ি। আধুনিক জীবনের বিলাসের উপকরণগুলো আস্তে আস্তে সব বাড়িতে ঢুকছে। কিন্তু তাদের জীবিকার কোন পরিবর্তন হয়নি। যে কে সেই। এ এক অদ্ভুত ব্যাপার!

সুজয় এখানে থাকার কোয়ার্টার পেয়েছে। পেয়েছে মানে কয়েকজন মিলে যে ডাক্তার থাকে না তার ঘর

দুটো দখল করেছে। প্রতিদিন সবাই থাকে না। এক একদিন কেউ কেউ থেকে যায়। খাওয়া হোটেলে। এখানেই তার পরিচয় হলো সুনীতার সঙ্গে। বছর ৩৫ বয়স। মোটামুটি দেখতে ভালই। ওকে দেখলে রবীন্দ্রনাথের কৃষ্ণকলির কথাই মনে পড়বে।

সুনীতার রোগ বলতে পেটে প্রচন্ড ব্যথা। ডাক্তারবাবুরা নানারকম পরীক্ষা করতে বলে দিলেন। হাসপাতালে প্রয়োজনীয় সব পরীক্ষাই করা হলো। ধরা পড়ল গলব্লাডারে স্টোন। অপারেশন করতেই হবে। অপারেশনের দিন ঠিক হলো। হাসপাতালে এতদিন সে এসেছে একা একাই। অপারেশনের জন্য যখন হাসপাতালে ভর্তি হলো তখন তার স্বামী এলো না। গার্জেন হয়ে এলো তার ছোটবোন। বন্ডে সই করল সে। নাম অনীতা। মাথায় টকটকে লাল সিঁদুর। হাতে ধবধবে সাদা শাঁখা। ম্যাচিং করা শাড়ি ব্লাউজ। দিদির চেয়ে রং একটু ফরসা। মুখ খুব সুশ্রী। কথাবার্তায় দিদির চেয়েও চৌখশ। ব্যবহারে বিন্দুমাত্র জড়তা নেই। সোজাসুজি সুজয়কে বলল, কাল দিদির অপারেশন কটায় হবে?

সকাল দশটায়। আপনারা বাড়ির লোক আরো এক ঘন্টা আগে আসবেন।

আমিই আসব। আর কেউ আসবে না।

কেন? আপনার জামাইবাবু? উনি আসবেন না?

না, আসবে না।

কিন্তু কারণটা কি?

সেটা জেনে আপনার কি লাভ?

কৌতুহল তো একটা থাকেই। আপনার দিদির সিঁথিতে সিঁদুর রয়েছে, হাতে রয়েছে শাঁখা। স্ত্রীর এই রকম অপারেশনে স্বামী আসবেন না?

আমাদের সব কথা শুনলে আপনার ভাল লাগবে না মোটেই। মন খারাপ হয়ে যাবে।

আপত্তি না থাকলে বলতে পারেন।

জামাইবাবু আর একটা বিয়ে করেছে। তাই দিদি দুই ছেলেকে নিয়ে চলে এসেছে স্বামীর ঘর ছেড়ে।

ছেলেরা কত বড়?

যখন চলে আসে দিদি তখন স্বপনের বয়স সাত বছর আর তপনের বয়স পাঁচ বছর।

দিদি কোন কেস করেনি? খোরপোষের মামলা?

টাকা কোথায় পাবে? বাবা অনেক আগে মারা গেছে। আমরা তিন বোন এক ভাই। দাদা সবচেয়ে বড়। আমাদের তিন বোনের বিয়ে দিতে বাবার যেটুকু জমি জমা ছিল বিক্রি হয়ে গেছে। আমাদের এ অঞ্চলে মেয়ের বিয়ে দেওয়া মানে বাপের সর্বসান্ত হওয়া। দাদা কোনরকমে তিন ছেলে মেয়ে নিয়ে সংসার করছে। মা বেঁচেছিল বলে দাদার বাড়িতে মেজদিদির থাকার মতো জায়গা হল।

ছোটবেলা থেকে দেখছি মেজদি খুব খাটতে পারে। মাঠে মাঠে লোকের কাজ করে দাদার সংসারে টাকা দিত। সব সময় তো কাজ হয় না। তাই বাধ্য হয়ে কলকাতায় কাজ ধরল। কিন্তু যাতায়াতে অনেক খরচ, অনেক অসুবিধা। গড়িয়ায় আমাদের গ্রামের এক বউ ছেলে মেয়ে সমেত স্বামী-পরিত্যক্তা হয়ে ঘর ভাড়া নিয়ে থাকে। তাকে ধরে পাশে একটা ঘর ভাড়া নিয়ে বোনপো দুটোকে নিয়ে দিদি ওখানে চলে যায়। দাদাও রেহাই পেল, দিদিও বউদির গঞ্জনার হাত থেকে অব্যাহতি পেল। টালির একটা মাত্র ঘর, বারান্দায় রান্নাবান্না। কল পায়খানা একখানি। সোজা কথায় বস্তির ঘর। তখন মাসে ভাড়া দিতে হতো পাঁচশো টাকা। এরপর তিনজনের খাওয়া দাওয়া, জামা কাপড়। ছেলেদের ওখানের সরকারি প্রাইমারী স্কুলে ভর্তি করে দিল। মিড ডে মিল তখন প্রাইমারী স্কুলে ছিল না। দিদি সকাল বেলা এক বাড়িতে তোলা কাজ করত। তারপর সকাল আটটা থেকে সন্ধ্যে ছ'টা পর্যন্ত আয়ার কাজ। তারপর বাড়ি ফেরা। যেদিন আয়ার কাজ থাকত না সেদিন সোনারপুরের মাছ বাজারে মাছ কাটত।

সোনারপুর এখন লোকে লোকারণ্য। জংশন হওয়াতে প্রচুর ট্রেন এখান থেকে কলকাতা যাওয়ার জন্য পাওয়া যায়। সবচেয়ে বড় কথা, স্টেশন লাগোয়া কলকাতাগামী বাস রাস্তা। ট্রেন ফেল করলে বা কোন কারণে বন্ধ থাকলে বাস, অটো, ট্যাক্সি ধরে অফিস বা কাজে কলকাতা চটজলদি চলে যাওয়া যায়।

বেশিরভাগ বাবুরা মাছ কিনে কাটিয়ে নিয়ে বাড়ি যায়। অনেক বাবু স্বামী-স্ত্রী দুজনে চাকরি করে। মাছ d কাটার সময় না থাকার জন্য কাটিয়ে নিয়ে যায়। কেউ বা বটিতে বউ এর হাতকাটার ভয়ে মাছ কেটে রেডি করে বাড়ি ঢোকে। এতে সংসারে শান্তি বজায় থাকে। গিন্নি খুশি হয়। আবার মনে হয় কেউ বা বউ কে সামান্য কষ্ট দিতে চায় না। বড় বড় বটির সামনে আঙুল কাটে তো কাটুক মাছকাটা গরিব মেয়েদের।

কিন্তু তাতে তো এই মেয়েদের কিছু রোজগার হয়। তাদের সংসারে টাকাটা কাজে লাগে।

তা হয়ত লাগে। কিন্তু এক এক মেয়ের এক এক রকম দুঃখের কাহিনি। জানলে কঠিন-হৃদয় মানুষেরও বুক ফেটে যাবে।

আপনার কথা শুনে আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি।

আপনি ভাবুন তো এক অসহায় গরিব বাবা তার মেয়েকে পাত্রস্থ করতে দেনায় ডুবছে। তার ওপর জামাই যদি বদ হয়, তাহলে সেই বাবা মায়ের মনের অবস্থা কি হয় আর মেয়েটি বা কি করে কি খেয়ে বাঁচবে? আমার বড়দিরও একই অবস্থা। স্বামী বেঁচে আছে। ছেলে পুলে আছে। কিন্তু বড় জামাইবাবু মাতাল। দিদিকে মারধর করে প্রচন্ড। জোর করে বাইরে কাজে পাঠাবে। দিদি টাকা আনবে খেটে আর উনি মদ খেয়ে ওড়াবে। এত কষ্ট পেয়েও স্বামীর ঘর ছাড়ে নি বড়দি। এখন ছেলে মেয়েরা বড় হয়েছে। মারধোরটা অনেক কমে গেছে। দিদি গড়িয়াহাটায় এক বাবুর বাড়িতে আয়ার কাজ করে। তারা স্বামী-স্ত্রী দুজনে থাকে। বয়স হয়েছে। তাদের মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে অনেক দূরে। ছেলেও বউ নিয়ে বিদেশে থাকে। বড়দিকে তারা খুব বিশ্বাস করে। মেয়ের মত ভালবাসে। ভাল টাকা পয়সা, ভাল কাপড়চোপড় তারা দিদিকে দেয়। দিদির খাওয়া পরার কষ্ট নেই। কিন্তু আমরা মেয়েরা তো চাই, স্বামী ভাল হোক, আমাদের ডাল ভাত দিক। দুবেলা না জোটে সবাই মিলে একবেলা খাব। দরকার হলে আধপেটা খাব। কিন্তু স্বামী যেন ভাল হয়। খাটুন্তে হয়। বউকে রোজগার করতে বাইরে না পাঠায়। কিন্তু কি ভাগ্য আমাদের দেখুন! বড়দির গয়না গাঁটি সব বেচে টাকা নিয়েছে জামাইবাবু। বিয়ের দানসাজ-সে সবও সব নেশায় উড়িয়েছে। প্রতিবাদ করলে সীমাহীন মার জুটেছে। পাড়া পড়শিরা এসে মিটমাট করে দিয়েছে। বুড়িরা দিদিকে বুঝিয়েছে মেয়েদের কপালটা এই রকম রে। কি আর করবি। মাতাল হোক দাঁতাল হোক, স্বামী ছেড়ে কোথায় যাবি? বাপের বাড়ি? বাপ-মা যদ্দিন তদ্দিন ভাল থাকবি। তারপর ভাই বলো ভাজ বলো কেউ তোমার হবে না। পুরুষরা হল সোনার আংটি, বাঁকা হোক ট্যারা হোক, সোনা সোনা-ই। ছেলে মেয়ে বড় হয়ে গেলে, মরদের গায়ের বল কমে গেলে তখন আপনা আপনি ঢিট হয়ে যাবে। তখন বউয়ের কদর বাড়বে। বুড়োর তখন সেবা নেওয়ার দরকার হবে যে।

মেয়েদের ওপর অত্যাচার হয় এদিকে? মহিলা কমিশনের লোকজন এখানে আসে না?

সেটা আবার কি জিনিস? খায়, না গায়ে মাখে? না মাথায় দেয়?

মেয়েদের ওপর যাতে অন্যায় অত্যাচার না হয় সেজন্য সরকার থেকে মেয়েদের নিয়ে একটা কমিটি করা হয়। খুব উচ্চ শিক্ষিত বড় ঘরের মেয়েরা বা পার্টির নেত্রীরা এই কমিটিতে থাকে।

তাতে আমাদের গরিব ঘরের মেয়েদের কি? তাদের আমরা চিনি না, জানি না। আর এই অজ পাড়াগাঁয়ে তারা আসবে কোন দুঃখে? তাদের অফিস কোথায়?

খোদ কলকাতায়।

কোলকাতার ঐ বাবুমেয়েরা আমাদের কাছে আসবে কেন? তাদের গায়ে দামি দামি সেন্ট পাউডার। গায়ে দামি দামি শাড়ি গয়না। আমরা ভিখিরিরা যদি কেড়ে নিই? সেই ভয়ে কেউ অজ পাড়া গাঁয়ে পা মাড়াবে না। পুলিশই কিছু করে না তো বড় লোক মেয়েরা।

থানা পুলিশ করলে তবে তো পুলিশ আসবে।

অনেক জেদী মেয়েও তো আছে । যারা জীবনের পরোয়া করে না । তারা কেস করার পর পুলিশ এসেছে। ধরে নিয়ে গেছে। ঘা কতক দিয়ে কিছু টাকা নিয়ে ছেড়ে দিয়েছে। তারপর বাড়ি ফিরে আবার মার। A আগের চেয়ে চতুর্গুণ, বাঁচাবার কেউ নেই। যাদের মারাত্মক আঘাত হয় তাদের ক্ষেত্রে পুলিশ একটু হম্বিতম্বি করে। মানে বুঝে নিতে হবে যে কেস ভারী হলে টাকা বেশি লাগবে। তাছাড়া পাড়ার নেতারা পুলিশকে দেবার নাম করে মোটা টাকা নিয়ে ছাড়িয়ে নিয়ে আসে। কারণ ওদের ভোট দরকার।

বউটার ভোটটাও তো দরকার। তবে বউকে দেখে না কেন?

তারা জানে ওদের মরদ যা বলবে, যেখানে ভোট দিতে বলবে ওরা তাই করতে বাধ্য হবে। লাঠিবাজি করতে গেলে মরদ দরকার। বউ-ঝিদের দরকার নেই। সবাই বলে বাপ কা বেটা, বাপকা বেটি বা মা কো বেটি কেউ বলে না।

এখানকার পুলিশ শুধুই ঘুষ খায়?

পুলিশ ঘুষ খাবে না তো কি খাবে? গরু ছাগলের মতো ঘাস খাবে? খেয়ে খেয়ে ওদের ভুঁড়ির বহর দেখেছেন। ওদের সামনে দিয়ে চোর ডাকাত ছুট লাগালে ওরা ধরতেই পারবে না। কেন যে ওদের সরকার পুষে রেখেছে কে জানে।

পুলিশের ওপর তোমার এত রাগ কেন?

আমার একার না, খবর নিয়ে দেখুন গ্রাম বাংলার সকলের। কলকাতার বাবু মন্ত্রীরা কলকাতায় থেকে এসব বুঝবে না। আমাদের এখানে কারো বাড়িতে ডাকাতি হল। পুলিশ এল। পুলিশ তো রামধনু। যেমন বৃষ্টি এক পশলা হয়ে যাবার পর রামধনু ওঠে ঠিক তেমনি চুরি ডাকাতি হয়ে যাবার পর পুলিশের টিকিটি দেখতে পাওয়া যায়। আবার ওনারা এসে বাড়ির লোককেই জিজ্ঞেস করবে ওরা দলে ক'জন ছিল? কটা বন্দুক ছিল? কটা পাইপগান ছিল? কোন দিক থেকে এসেছিল? কোন দিক দিয়ে পালাল? বাড়ির মালিক তো হতভম্ব। সে বলল, ক'জন এসেছিল আমি জানব কি করে? তারা কি আমায় বলে কয়ে এসেছিল যে আমরা এতজন যাচ্ছি। বন্দুক না পাইপগান আমরা অন্ধকারে চিনব কি করে? আমাদের কি অস্ত্রের কারবার আছে?

অফিসার রেগে মেগে বলল, ইয়ার্কি হচ্ছে? আপনারা কিচ্ছু দেখেন নি হতে পারে? আপনারা সব লুকোচ্ছেন। ধমকের চোটে বাড়ির মালিক ভয়ে ভয়ে বলল, স্যার, আপনি তো সকালে এলেন। দিনের আলোয় আমাদের ধমকাচ্ছেন। রাতের অন্ধকারে এলে আপনিও পালাতেন। কিছু মনে করবেন না স্যার, চোর ডাকাত ধরা আপনাদের কাজ, আমাদের নয়। সারারাত আমাদের পরিবারের সকলের ওপর ধকল গেছে। আপনার যা মনে হয় তাই লিখে দিন। আমাদেরকে আর তেক্ত বেরক্ত করবেন না।

পাড়ার এক নেতা দাদা হাজির ছিল। উনি খুব বড় মাপের নন এই একটু ক্ষুদে মাপের আর কি। বলল, স্যার, কিছু মনে করবেন না। ওদের অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়ে গেছে, মারধোরও খেয়েছে। এখন ওদের মাথার ঠিক নেই। কি বলতে কি বলছে। আপনি ক্ষমা ঘেন্না করে দিন।

অফিসারটি তোষামোদে একটু খুশি হয়ে শুধু বলল হুম। আপনি বাড়ির মালিককে সঙ্গে করে পরে থানায় আমার সঙ্গে দেখা করবেন।

ঠিক আছে স্যার, ঠিক আছে। আমি বিকেলে ওনাকে নিয়ে থানায় যাচ্ছি। ওখানে সব কথা হবে।

পরে গ্রামের লোক জানতে পারল যে থানায় যা লেখা হলো ডাকাতির কেস নয় সেরেফ একটা চুরি। কারণ থানা এলাকায় বেশি ডাকাতি রেকর্ড হলে এলাকার দুর্নাম থানার দুর্নাম তো বটেই। অতএব এই থানা এলাকায় কোন ডাকাতিই হয় না। তাই থানার বাবুদের প্রমোশন হয়। শুনি নাকি সরকারের পক্ষ থেকে ভাল ভাল পুরস্কারও জোটে। যেমন পুলিশ, তেমনি সরকার, তেমনি দলের এই নেতারা। গু'এর এপিঠ আর ওপিঠ।

আপনি বাইরে এসব কথা বলবেন না কাউকে। বিপদ হয়ে যাবে। যা জানেন মনে মনে জানুন। যা করার ভোটের বাক্সে করবেন।

ভোট দিতে দিলে তো কিছু করব। আপনি কোন দেশে বাস করেন? আমাদের গাঁয়েতে মেরে গলা ধাক্কা দিয়ে কাউকে দাঁড়াতে দিল না। বলে কিনা ওদের দাঁড়াবার দরকার নেই।

অনিতা তো সেদিনের মত এইসব নানা ক্ষোভের কথা বলে দিদির সঙ্গে দেখা করে চলে গেল। কাগজ পড়ে, দৈনন্দিন খবর শুনে, বিভিন্ন বিশারদ পন্ডিতের টিভির আসরে চুলচেরা পক্ষপাতিত্ব বিশ্লেষণে বাস্তব-অভিজ্ঞতার সঙ্গে অমিল দেখে আমরা মুচকি মুচকি হাসি, কিন্তু কোন এক অদৃশ্য অঘোষিত সন্ত্রাসের বাতাবরনে আমরা চুপ মেরে যাই। অথচ এই মেয়েটি মনে হয় তথাকথিত অধ্যাপক পদবাচ্য স্বঘোষিত পন্ডিতের কোন বিশ্লেষণ কখনও না শুনে গ্রাম বাংলার বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে তার একরাশ ন্যায়সঙ্গত ক্ষোভ আমাকে ভাল

শ্রোতা পেয়ে উগরে দিল। সে এটাও জানে এখানকার স্বার্থপর প্রতিহিংসাপরায়ন রাজনৈতিক নেতাদের মত আমি ওর বিন্দুমাত্র ক্ষতি করবো না। পর্বতশিখর থেকে যেমন প্রবলবেগে ঝর্ণার জল সব বাধা সরিয়ে পথ করে নেয়, তেমনিই তার মগজে দীর্ঘ দিনের পুঞ্জিভূত ক্ষোভ-হতাশা উপযুক্ত পরিসর পেয়ে তরতর করে বেরিয়ে এসেছে। সে আমার কাছে নালিশ করতেও আসে নি, বিচার চাইতেও আসেনি। তাদের জটিল কঠিন জীবন সংগ্রামকে আমি কিছুতেই ছোট ভাবতে পারলাম না।

পরদিন সুনীতার অপারেশন হল। গার্জেন হিসেবে কাগজপত্তরে অনিতাই সই করেছিল। অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাবার পর বাড়ির লোকের আর কিছু করার নেই। পরে বেডে দিলে জ্ঞান ফিরলে দেখা সাক্ষাত-কথাবার্তা তখনই হয়। সে যাই হোক এই ফাঁকে অনিতাকে ডেকে জোর করে এক কাপ চা খাওয়ালাম। চা-টা আসলে ছুতো। ওর সঙ্গে কথা বলতে চাইছিলাম। ওদের জীবনের অজানা তথ্য জানতে চাইছিলাম।

আপনার মেজদিকে তো দেখলাম। আপনার বড়দি আসবে না? আপনার বড়দা?

বড়দি বিকেলে আসবে। মেজদির জন্য পরে কিছুদিন ছুটি নেবে। হাসপাতাল থেকে ছুটি দিলে মেজদিকে তারপর থেকে বড়দি দেখাশোনা করবে। বড়দি তো আয়ার কাজে এক্সপার্ট। বড়দা বউদির ভয়ে পা মাড়াবে না। তাছাড়া ভয় আছে- যদি টাকা দিতে হয়।

আপনি মেজদির সেবা করবেন না?

যে কদিন পারি করব। আমারও তো সংসার আছে। আমার স্বামীও আর এক গুণধর ওস্তাদ লোক। মস্ত জুয়াখোর। প্রতিবাদ করে কত যে মার খেয়েছি তার ইয়ত্ত্বা নেই।

ভাল করে না জেনে শুনে ওই পাত্রকে বিয়ে করলেন কেন?

অজ পাড়াগাঁয়ে মেয়েরা বিয়ে করে না। তাদের বিয়ে দেওয়া হয়। অভিভাবকরা যাকে মনে করবে তাকেই বর হিসেবে মেনে নিতে হবে।

তা বলে জেনে শুনে বাবা মা জুয়াড়ির সঙ্গে বিয়ে দেবে?

হেসে উঠল অনিতা। সে হাসি বড় করুণ বিষাদময় হাসি।

আপনি দেখছি আমাদের বাড়ির নাড়ি নক্ষত্র না জেনে ছাড়বেন না। আমি দেখতে শুনতে অল্প বয়সে খারাপ ছিলাম না।

আপনাকে এখন দেখলে সে কথা সত্যি বলেই মনে হবে।

আমার বয়স তখন বারো কি তেরো হবে। বাবা ধার দেনায় জর্জরিত। বড় জামাইবাবুর কীর্তি তখন ফাঁস হয়ে গেছে। বড়দি বাবার অবস্থা দেখে স্বামীর সংসার ইচ্ছা থাকলেও ত্যাগ করতে পারে নি। বাবাকে কষ্ট দিতে চায় না। তখনও আমার বিয়ে হয়নি। বাবা আমার বিয়ে ঠিক করল। বাবার কোন পয়সা কড়ি খরচ হবে না। ছেলে শুধু হাতে বিয়ে করে নিয়ে যাবে। শুনে আমার খুব আনন্দ হল। মনে হল আমার রূপ দেখে বোধহয় ছেলেটা আমাকে পছন্দ করেছে। আমাদের দেখতে তো সে আসেনি। অন্য আত্মীয় স্বজন দেখে গেছে। তাদের মুখে হয়ত আমার রূপের কথা শুনে মুগ্ধ হয়ে গেছে। তাই নিখরচায় আমার বিয়ে হচ্ছে। তখনকার দিনে এ সাহস কোন বাচ্চা মেয়ের ছিল না যে বর সম্বন্ধে কোন কথা বাবা-মাকে জিজ্ঞেস করে। বিয়ের দিন প্রথমে বরকে দেখি। পানপাতা সরিয়ে বর দেখে আমার ভিরমি খাবার জোগাড়। বয়স তার কমপক্ষে আমার তিনগুন। দেখতেও ভাল নয়। অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে মার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লুম। মাও পাগলের মত কাঁদছে। পাড়া পড়শিরা মা বাবাকে যা তা বলছে। জানা গেল এর আগেও বাবুর বিয়ে হয়েছে। বিয়ের বেশ কিছুদিন বাদে সেই বউ নাকি গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। তারপর পুলিশি টানাহাঁচড়া। এক বছর হলো জেল থেকে ছাড়া পেয়েছে। পেয়েই বাবুর কচি মেয়েকে বিয়ের সখ। অসহায় গরিব ঘর খুঁজতে খুঁজতে বাবাকে আবিষ্কার। আর বাবাও নিষ্কলঙ্ক হওয়ার জন্য ঐ বুড়ো জেল খাটা দামড়ার সঙ্গে আমার বিয়ে দিল।

আমাকে আপনি ক্ষমা করবেন। না জেনে আপনার ব্যথার জায়গায় আমি আঘাত করে বসলাম। আমি ভীষণ দুঃখিত।

কি ছিল আমার কথার মধ্যে কি জানি। অনিতার চোখ চিকচিক করে উঠল। বলল, আপনার তো কোন দোষ নেই। আমি তো আপনাকে সেচ্ছায় সব বলেছি। আপনার দরদি মন দেখে নিজেকে আর সংযত রাখতে পারিনি। এখানকার চারপাশের এলাকার ঘরে ঘরে এই সব কাহিনি। আজও মেয়েদের এই যুগে দুর্দশার অন্ত নেই। কিন্তু রেল যোগাযোগ-সড়ক যোগাযোগ বাড়ার জন্য মেয়েরা রোজগারের পথ খুঁজে পেয়েছে। তাই স্বামীরা এখন অনেক ঢিট হয়ে যাচ্ছে। মেয়েরা তাই বেপরোয়া হতে বাধ্য হচ্ছে। রাত থাকতে উঠে এত পথ কষ্ট করে গিয়ে বাবুদের মন যুগিয়ে তাদের মনের মতো কাজ করে ঘরে পয়সা আনতে হয়। তার উপর বাড়ি এসেও স্বামী-সন্তানদের খাওয়া-দাওয়া। তাদের জামাকাপড় পরিষ্কার করা, ঘরদোর সাফসুতরো করা অর্থাৎ জুতো সেলাই থেকে চন্ডীপাঠ সবই করতে হয়। বেশি কিছু বললে কর্তাদের উত্তর হচ্ছে তোমাকে 'বে' করে এনেছি কেন? এসব করার জন্যই তো। এগুলো তো মেয়েদের কাজ। মদ্দা লোক করবে কেন? বুঝুন ঠ্যালা।

আপনার স্বামী তো আপনার দিদিকে একটু সাহায্য করতে পারে।

কি শুনলেন এতক্ষন? সাতকান্ড রামায়ন পড়ে সীতা রামের মাসি! যেটাকা সাহায্য করবে সেটাকা দিয়ে জুয়া খেললে তার আনন্দ বেশি। কোন আত্মীয় স্বজনের বাড়ি নেমতন্ন করলে যায় না। গেলে উপহার লাগবে। আমাকে খেটে টাকা জোগাড় করে আত্মীয় কুটুম বজায় রাখতে হয়।

আপনিও বাইরে গিয়ে কাজ করেন?

করতে তো বাধ্য। মেজদি সোনারপুর বাজারে মাছ কাটার জায়গা করে দিয়েছে। ভোর বেলা বেরিয়ে মাছ কেটে একটা দু'টোর মধ্যে বাড়ি ঢুকি। ঢুকে রান্নাবান্না করে তারপর খাওয়া দাওয়া।

বাড়িতে আপনার আর কে আছে?

একটা মেয়ে আর একটা ছেলে। মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিয়েছি। ছেলেটা সিক্সে পড়ে। সে আর স্কুলে যেতে চায় না। মারধোর করেও কিছু হয় না। বাবা জুয়াখোর হলে ছেলে আর কি করে ভাল হবে? আমি তো ভোর থেকে বিকেল পর্যন্ত বাড়ির বাইরে। ওর বাবা জোগাড়ে কাজের নাম করে জুয়োর ঠেকে আড্ডা। ছেলেকে দেখবে কে? শাসন করবে কে? সংসার চলছে কি করে?

আমি যা রোজগার করি সব টাকা হাতড়ে ও বের করে নেবে। সেই জন্য এখন আমি কিছু টাকা সোনারপুরের ব্যাঙ্কে রেখে অল্প অল্প বাড়ি নিয়ে আসি। সেটাই ও সব নিয়ে নেয়।

আপনার ভিতরে এত কষ্ট, এত যন্ত্রনা তবুও মুখে হাসি রেখে চলাফেরা করছেন, এটা দেখে আমার খুব ভাল লাগল। দুঃখানলে জ্বলে জ্বলে তপ্ত-কাঞ্চন হয়ে গেছেন। আপনাদের মত অসহায় মেয়েদের এত দুর্গতি দিয়ে সৃষ্টিকর্তা কি যে আনন্দ পান বুঝতে পারি না।

আমার কথা ছাড়ুন। খারাপ হোক, যাই হোক আমার মাথার ওপর তবু একটা বুড়ো স্বামী নামক ছাদ আছে, শিয়াল কুকুরে ছিঁড়ে খেতে পারবে না। কিন্তু ভাবুনতো মেজদির কথা অথবা আমাদের গ্রামের সেই বউটির কথা যে মেজদিদিকে ঘর দেখে দিয়েছিল। এদের কারোরই মাথার ওপর কোন ছাদ নেই। কত ঝড় ঝাপটা ওদের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে। গড়িয়াতে এক মিনিবাসের ড্রাইভার দিদির পিছনে ঘুরঘুর করত। কু-ইঙ্গিত দিয়েছিল। মেজদি আর সেই বউটা দুজনে বটি নিয়ে তাকে তাড়া করে। স্থানীয় লোকজন ধরে ফেলে তাকে এমন বেধড়ক মার দেয় সে আর জীবনে গড়িয়া-মুখো হয়নি।

আর এই ঘটনার ফলে দিদিকে আর সেই বউটিকে কেউ আর কোনদিন ঘাঁটাবার চেষ্টা করে নি।

তোমার মেজদি আবার এখানে এল কি করে?

মা তখন খুব অসুস্থ। দাদাকে বলে মা দিদির জন্য কাঠাখানেকের উঁচু জমি দেয়। সেই জমিতে কোনরকমে সিমেন্টের পিলার আর দরমার বেড়া দিয়ে ঘিরে অ্যাসবেস্টাস চাপিয়ে দিদি থাকার ব্যবস্থা করে। বড়দি অনেক টাকা দিয়েছিল। আমিও সামান্য কিছু দিয়েছিলাম। এখান থেকে মেজদি সোনারপুর-

কলকাতা করতো। মাকে কাছে এনে রেখে মৃত্যু পর্যন্ত খুব সেবা যত্ন করেছে দিদি। সেইজন্য মেজদির ওপর আমাদের সকলের টান। ছেলেরা এখন বড় হয়েছে। বড়টার বয়স সতেরো বছর। সে ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়ে আর পড়ে নি । এখানকার এক লোককে ধরে এক ঠিকাদারের অধীনে কাজ করে। বেশিরভাগই বাইরে বাইরে কাজ। বাড়িতে আসে দু-তিন মাস অন্তর অন্তর। যা টাকা পায় মেজদির হাতে বেশ কিছু টাকা তুলে দেয়। কিন্তু আজকালকার ছেলে তো! বড় দামি ফোন কিনেছে। জিনসের প্যান্ট ছাড়া আর পরে না। সেইরকম সব উদ্ভট ধরনের চকরা বকরা ছোট ছোট জামা যেন মেয়েদের ব্লাউস পিস।

ছোট ছেলে কি করে?

ক্লাস টেনে উঠে আর স্কুলে যায় না। বাধ্য হয়ে মেজদি একটা সেকেন্ড হ্যান্ড ইঞ্জিন ভ্যান কিনে দিয়েছে। প্রায়ই খারাপ হয়। সারায় আর চালায়। সেও দাদার মত বাহাদুরি করে বেড়ায়। মাকে পয়সা দেয় না বললেই চলে। দিদি সবে একটু সুখের মুখ দেখছে সেই সময় এই অসুখ।

তোমার দিদির ভয়ের কোন কারণ নেই। তবে পাথর যখন ছোট ছিল তখন অপারেশন করলে মাইকো-সার্জারিতে হয়ে যেত। পেট কাটতে হতো না।

দিদি খুব সহ্যশীলা। নীরবে যন্ত্রনা সহ্য করে কাজকর্ম করেছে। যখন যন্ত্রনা বাড়াবাড়ি হয়েছে তখন আমাদের খবর দিয়েছে। তারপর তো এখানে চিকিৎসা হচ্ছে।

গল্পে গল্পে অনেক সময় চলে গেছে। দেখুন এতক্ষণ হয়তো আপনার দিদিকে বেডে দিয়েছে।

এরপর প্রতিদিন আমার সঙ্গে অনিতার দেখা হয়েছে। তার বড়দির সাথেও পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। সত্যিই এরা তিন বোন খুব ভাল। আমি প্রতিদিন বেশকিছু ফলমূল ও বিস্কুট গোপনে কিনে সুনীতাকে দিয়ে আসতাম। অপারেশনের পরের দিন দুটো বড় হরলিক্স এর প্যাকেট কিনে রেখে এসেছিলাম। ওদের ভাল লেগেছিল বলে এই কাজটা আমি গোপনে করেছিলাম। আমার বউকে কোন কিছু লুকোইনি। এ ব্যাপারে অঞ্জনা আমাকে খুব উৎসাহিত করেছিল। তাই ওদেরকে সামান্য সাহায্য করতে পেরে আমি খুব আনন্দ পেয়েছিলাম। ওরা আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল হরলিক্স, ফলমূল, এত বিস্কুট কে দিয়ে যায়? আমি বলেছিলাম আমি তো তোমাদের আত্মীয় স্বজনকে চিনি না। কেউ একজন দিয়ে যায়।

অনিতা খুব বুদ্ধিমতী। দিন ছয়েক পরে একা পেয়ে আমাকে বলল, সুজয়বাবু, একজন লোকই ফলমূল দিয়ে যায়- তাই না।

আমি সহসা বলে ফেললাম হ্যাঁ একই লোক দিয়ে যায়।


সে শুধু আপনাকে চেনে। তাই আপনার হাতে দিয়ে যায়। দিদিকে চেনে না। তাই দিদির কাছে দিয়ে আসে না। তাই তো?

আমি থতমত খেয়ে গেলাম। আমার অবস্থা দেখে হেসে ফেলল সে। তারপর বলল, ওই দেখুন সেই লোকটা ফলমূল নিয়ে আসছে বলে আমাকে পিছন দিকে দেখাল। যেই আমি পিছনের দিকে তাকিয়েছি অমনি দেখি সে টুপ করে আমাকে প্রণাম করে নিল।

আমি হতচকিত।

কই আশির্বাদ তো করলেন না।

তোমাদেরকে আশির্বাদ করার মত সৎসাহস আমার নেই।

আমরা গরিব অসহায় বলে ছলনার আশ্রয় নিয়ে আমাদের সাহায্য করছেন কেন? আপনি ভেবেছিলেন, আমরা ধরতে পারব না। বড়দি, মেজদি হাতড়ে বেড়াচ্ছে লোকটির জন্য। আমি কিন্তু ধরে ফেলেছি। ভয় নেই। ওদেরকে বলব না। আপনি বড় মনের মানুষ। তাই আপনাকে প্রণাম করলাম। এবার অন্ততঃ স্বীকার করুন সত্যটা।

আপনি তো ধরেই ফেলেছেন। আমার আর কি বলার আছে। আপনারা আমাকে ক্ষমা করে দেবেন।

একি বলছেন আপনি? এখনও যে কিছু ভাল পুরুষমানুষ আছে আপনাকে দেখে তা মালুম হলো। না হলে পুরুষ জাতটার ওপর আমার ঘেন্না ধরে গেছিল। যখন মাছ কাটতে যাই, তখন বাবুরা এমনভাবে তাকায় মনে হয় কোনদিন মেয়ে মানুষ দেখেনি। যেন গিলে খেতে চাইছে। কাজ করতে গেলে সবসময় কাপড় ঠিক থাকে না। হাঁ করে পুরুষগুলো সেদিকে তাকিয়ে থাকে। বুঝতে পেরে সঙ্গে সঙ্গে কাপড় ঠিক করে নিই। ট্রেনে যাতায়াতের সময়ও অনেক অসভ্যতার সম্মুখীন হতে হয়। সবাই আমাদেরকে খুব সস্তার মেয়েমানুষ ভাবে। আমরা যে কারোর স্ত্রী, করোর মা, কারোর শাশুড়ি এ খেয়াল তাদের থাকে না। কিছু ভাল মানুষ যে থাকে না তা নয়। তবে তা আজকের সময়ে সংখ্যায় খুব অল্প। সেই অল্পদের দলে আপনাকে মনে হয়েছে বলে আপনার পায়ে মাথা ঠেকালাম।

আনন্দে আমার মন ভরে উঠল। আজকের সেলাই কাটা হয়েছে। কাল বিকেলে সুনীতাকে ছেড়ে দেবে হাসপাতাল। সবাই খুব খুশি। আমিও সেদিন খুশি মনে বাড়ি ফিরে বউকে বললাম অনিতার চোখে ধরা পড়ার কথা। তারপর দুজনের কি হাসি।

পরের দিন সকালে হাসপাতালে গিয়ে দেখি একটা কান্নার রোল। গতরাতে হঠাৎই সুনীতার ম্যাসিভ হার্ট-অ্যাটাক হয়। কোন চিকিৎসার সুযোগ নাকি পাওয়া যায় নি। অনিতা, ওর বড়দি এবং আরো কয়েকজনের বুকফাটা কান্না। আমি আর এখানে দাঁড়াতে পারলাম না। এদের সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা আমার হারিয়ে গেছে। মাথা নিচু করে আমার ঘরের দিকে পালিয়ে গেলাম।

চাকরি একদিন সকলের শেষ হয়। আমারও হয়েছে। কিন্তু ভুলতে পারি নি ওই তিন বোনের জীবন-সংগ্রামকে। ভুলতে পারিনি আজও দুই অসহায় নাবালক বালকের করুণ আর্ত চিৎকারের কান্না - মাসি গো, এবার আমাদের কি হবে? বাবা তো থেকেও নেই মা'ও আমাদের ফেলে চিরতরে চলে গেল। এবার আমরা কি করে বাঁচব? তোমরা বলে দাও । ভগবান এতবড় নিষ্ঠুর । তারপর হাউ হাউ করে গগনভেদী কান্না যা উপরের ভগবানকে বিন্দুমাত্র বিচলিত করে না। সমাজ এগিয়ে চলে সভ্যতা এগিয়ে চলে তবুও পুরুষের দেওয়া চরম লাঞ্ছনা-গঞ্জনা মেয়েদের শেষ হয় না। কেউ স্বীকার করুক আর নাই করুক এটাই আমাদের পল্লী সমাজের নির্মম সত্য।।