জবাব
অনিন্দিতা গুড়িয়া,
নিউ-দিল্লি
বাপ-মা হারা মেয়েটা বিয়ে হয়ে প্রথম যেদিন এই বাড়িতে এলো কত ভয় লজ্জা
দ্বিধা দ্বন্দ্ব আর উৎকন্ঠা সাথে করে নিয়ে এসেছিল। কিন্তু অচিরেই তার সব
ভয় লজ্জা উৎকণ্ঠা কেটে গেল। প্রথম দিনই এক হাত ঘোমটা টেনে শ্বশুর মশাইকে
চা দিতে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল, তাড়াতাড়ি উঠতে গেল কিন্তু পারল
না, পায়ে বেশ লেগেছে। কি লজ্জা! কি ভয়! এই বুঝি শাসন ছুটে এলো ঝটিকা
তুলে.....
কিন্তু না! স্বয়ং রাশভারী শ্বশুর মশাই এসে হাত ধরে তুলে বসলেন সোফায়
এবং মাথা থেকে কাপড় একেবারে সরিয়ে দিয়ে সস্নেহে বলেছিলেন,
- দেখলে পাগলি মেয়ের কান্ড! এক হাত ঘোমটা টেনে চলতে কে বলেছিল? এখনই বড়
কিছু একটা ঘটতে পারতো, এমনটি আর করোনা। আমি আমার ছেলের বিয়ে দিয়ে ঘরের
বউ আনিনি এনেছি আমার মা। আমার এক জন্মদাত্রী মা, এক জগত জননী মা আর তুমি
হলে আমার ভালো মা। আজ থেকে আমি তোমার ছেলে, ছেলের সামনে মা কখনো ঘোমটা
টেনে থাকে?
ব্যাস্ , সেদিন থেকেই সে সবার ভালো মা। শশুর, শাশুড়ি, দাদু, ঠাকুমা,
মায় কাজের লোক পর্যন্ত তাকে ভালো মা বলেই ডাকে। শুধু ডাকে না তার স্বামী
সৌম্য আর দেবর শুভ । সৌম্য তাকে নাম ধরে গুঞ্জন বলেই ডাকে আর শুভ্র সেই
নামকে ছোট করে ডাকে গুঞ্জা বলে। সবাই হাঁ - হাঁ করে উঠেছিল
- ও না তোর বৌদি হয়, বৌদিকে কেউ নাম ধরে ডাকে?
- কেন আমি তো সৌম্যকে নাম ধরেই ডাকি, দাদা তো বলি না। তবে গুন্জার বেলায়
দোষ কোথায়!
মা বললেন
- সৌমতো তোর থেকে মাত্র এক বছরের বড়, তাই তোরা পিঠাপিঠি বলে তুইও কখনো
ওকে দাদা বলিস নি আর আমরাও কখনো তোকে দাদা বলতে চাপ দেই নি, বা সৌম্য ও
কখনো তোর উপর দাদাগিরি ফালায়নি। তাই বলে ওর বউকে তুই বৌদি বলবি না, এ কি
হয়?
- খুব হয়, আমি হিসেব করে দেখেছি ও আমার চেয়ে প্রায় ছয় বছরের ছোট।
সমস্যার সমাধান করে দিল সদা শান্ত হাসিখুশি লাজুক স্বভাবের সৌম্য, বলল
- থাক না, কেন ওকে চাপ দিচ্ছো বৌদি বলতে? ওর যা ভালো লাগে তাই বলুক ওকে।
ব্যাস এরপর আর কথা চলে না। সবাই জানে এরপর কারোর কথা শুভ্র কানেও নেবে না
উল্টে বুড়ো আঙুল দেখাবে।
দুই ভাইয়ের এত মনের মিল যে বলার নয়, একেবারে দুই বন্ধু। যেন হরিহর
আত্মা।
কিন্তু স্বভাবে একেবারেই উল্টো।
সৌম্য যেমন শান্ত, লাজুক, শুভ্র তেমনি দুরন্ত, ঠোঁটকাটা আর মারকুটে।
কিন্তু দুই ভাইয়ের মধ্যে লড়াই হতে দেখেনি কেউ কখনো।
এখন গুঞ্জনের সব ভয় দ্বিধাদ্বন্দ্ব কেটে গেছে, এখন সে রঙিন প্রজাপতির
মতো সারা বাড়ি নেচে বেড়ায়। কলেজে যায়, খায় দায়, আর কখনো মার আলমারি
খুলে শাড়ি পরে, কখনো ঠাকুমার গোপালের নাড়ু বের করে খায়, কখনো দাদুর
চশমা লুকিয়ে রাখে, আবার কখনো শুভ্র কে চিমটি কেটে দৌড় দেয়। সারা বাড়ি
মাতিয়ে রেখেছিল সে। পাড়া-প্রতিবেশীরা কেউ কিছু বললে বাড়ির লোকেরা বলে
- আহা, কচি বয়স; এইতো সবে উনিশে পড়েছে, এইতো ওর খেলে বেড়ানোর সময়।
বয়স হোক বাচ্চাকাচ্চা হলে আপনিই সব কমে যাবে, সংসারী হবে তখন।
এইভাবে কেটে যায় পাঁচটি বছর। ততদিনে তার কলেজ ইউনিভার্সিটির পড়াও শেষ
হয়েছে। তারপরেই শুরু হল সেই অধ্যায়.......
সারাদিন গুঞ্জন ভালো থাকে, কিন্তু সন্ধ্যা হলেই সৌম্যর ফেরার সময় হলেই ও
যেন কেমন জড়োসড়ো আরষ্ট হয়ে থাকে। সৌম্য ফেরার পর ওকে আর জোরে কথা বলতে
হাসতে বা লাফিয়ে লাফিয়ে চলতে দেখা যায় না। একটু যেন চুপচাপ থাকে। কেউ
কিছু জিজ্ঞেস করলে উত্তরও দেয় না।
এরপর একদিন সৌম্য বাড়ি ফিরল বেশ থমথমে মুখ নিয়ে। মা জিজ্ঞেস করল
- কি হয়েছে রে সৌম্য, মুখটা এমন ভার ভার কেন তোর?
তার উত্তর দেয়ার আগেই গুঞ্জন এলো চা নিয়ে। গুঞ্জনকে দেখেই যেন রাগে
ফেটে পরল সৌম্য।
- তুমি কেন এসেছ আমার সামনে! কতদিন না তোমাকে বলেছি আমার সামনে না আসতে!
ওর চিৎকারে সবাই ছুটে এলো। ঠাকুমার ঠাকুর ঘর থেকে মহাভারত ছেড়ে উঠে
এলেন, দাদু ছুটে এলেন পড়ার ঘর থেকে। বাবা তার অফিস ঘরে বসে ক্লায়েন্টের
কেস স্টাডি করছিলেন তিনি দৌড়ে এলেন, শুভ্র পরিমড়ি করে ছুটে এলো
ব্যালকনি থেকে, সে কারো সাথে ফোনে কথা বলছিল। কাজের মাসি রুটির জন্য আটা
মাখতে মাখতে দৌড়ে এলো, শুধু সেখান থেকে এক ছুটৈ নিজের ঘরে গিয়ে দরজা
বন্ধ করলো গুঞ্জন।
মা বললেন
- সৌম্য, তুই তো অমন করতিস না! কেন তুই মেয়েটাকে শুধু শুধু বকছিস?
- শুধু শুধু !
এইবার ফোঁস করে উঠলো সদা শান্ত ছেলেটি, উত্তেজনায় চোখ মুখ লাল হয়ে
উঠেছে, সে বলছে
- জানো অফিস আমার সাথে কি হয়েছে? প্রায়ই অফিসের স্টাফেরা মিষ্টি
খাওয়ায় তাদের ঘরের সুখবর আসে বলে, আর আড়ালে সবাই আমাকে নিয়ে হাসাহাসি
করে। আজকে তো সব থেকে চরম অপমানিত হয়েছি শুধু ওই মেয়েটার জন্য। জানো কি
হয়েছে, শুনতে চাও? শোন তবে, আজ আমাদের কোম্পানির একটা বিরাট অর্ডার
পাওয়ার ছিল, আর একটা সামান্য কারণে শেষ মুহূর্তে অর্ডারটা আমাদের হাত
থেকে বেরিয়ে যায়। মিটিং রুম থেকে বেরোতে বেরোতে মিস্টার দিনকর ভাইস
চেয়ারম্যান মিস্টার গোয়িঙ্কা কে বলছিলেন
- স্যার আপনি যদি পয়া - অপয়াতে বিশ্বাস রাখেন তবে নেক্সট মিটিং থেকে
সৌম্যকে বাদ দিন। ওর জায়গায় অন্য কাউকে প্রেজেন্টেশনের ভার দিন।
মিস্টার গোয়িঙ্কা বলেছিলেন
- কেন সৌমতো ওর দিক থেকে এক বিন্দুও ভুল করেনি তবে ওকে কেন দায়ী করছেন!
উত্তরে মিস্টার দিনকর বললেন - ও একজন বাঁজা স্ত্রী লোকের সাথে থাকে তাই
ওর হাত থেকে কোন ভালো কাজ আর সম্ভব নয়।
এখন তোমরাই বল আমি কেন গুনজনের উপর রাগ করবো না।
সব শুনে দাদু বললেন
- তোমার সন্তান হওয়া না হওয়া তো ভালো মার একার হাতে নেই, তাই আমার মনে
হয় তোমাদের দুজনকেই ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত।
গুঞ্জন এখন কেমন যেন শুকিয়ে যাচ্ছে। সৌম্যর বাক্যবানে ওর উপর থেকে যেরকম
ঝড় বয়ে যাচ্ছে তাতে তো এমনটাই হওয়ার ই ছিল ।
এরপর একদিন অফিস বেরোনোর সময় তাড়াহুড়োতে সৌম্যর হাতের ফাইলটা পড়ে গেল
গুঞ্জন তাড়াতাড়ি তা উঠিয়ে নিয়ে সৌমেন হাতে দিতে গেলে ঠিক সেই সময়
যেন প্রবল আক্রোশ বসে সৌম্য ফাইলটা ছিনিয়ে নেবার সময় ধাক্কা লেগে
গুঞ্জন পড়ে যায় এবং কপালে কেটে গিয়ে বেশ রক্তও পড়ে। এসব কিছু দেখেও
সৌম্য বেরিয়ে যেতে তৎপর হয় তখন বাবা তার অফিস ঘর থেকে বেরিয়ে এসে
বললেন
- আমার বাড়িতে এই ধরনের ব্যবহার আমি সহ্য করব না ।
সেইদিন সন্ধ্যায় সৌম্য বাড়ি ফিরে প্রায় জোর করে গুঞ্জন কে নিয়ে
অন্যত্র চলে যায় কি থেকে যে কি হয়ে গেল!!!¡
মা, ঠাকুমা কেঁদে কেঁদে আকুল হলেন। খোঁজখবর করে এক সপ্তাহ পর শুভ্র আর মা
গেলেন সৌম্য গুনজনের ফ্ল্যাটে। গিয়ে দেখেন এই কয়েকদিনের অত্যাচারে
গুঞ্জন যেন মৃত্যুর দিন গুনছে।
তখনই মা গুঞ্জন কে নিয়ে বাড়িতে এলেন এবং ডাক্তার ডেকে পরীক্ষা করলেন।
দুদিন বাদে রিপোর্ট এলে দাদু সৌম্য কে ডেকে পাঠালেন, এবং সৌম্য এলে পরে
ওর হাতে গুঞ্জন এর মাতৃত্বের সার্টিফিকেট এবং ডিভোর্স পেপার ধরিয়ে
দিলেন।
সৌম্য বিহ্বল এর মতো তাতে সই করে সেখান থেকে যেন নিজের লজ্জা ঢাকার জন্য
পালিয়ে বাঁচলো। এর ছয় মাস পর কোর্ট থেকে পাকাপাকিভাবে গুঞ্জন আর সৌম্যর
ডিভোর্স হয়ে গেলে বাড়ির সবাই আবার গুঞ্জনের বিয়ে দিল বাড়ির ছোট ছেলে
শুভ্র সাথে।
এর ঠিক এক বছরের মাথায় সব অপমান আর অত্যাচারের জবাব দিতেই যেনো গুঞ্জনের
কোল আলো করে ফুটফুটে এক কন্যা সন্তান জন্মালো। আবার সেই আগের মতো ভরে উঠল
বাড়ির পরিবেশ।