জোনাকির গল্প
চন্দ্রমা মুখার্জী,
সমর পল্লী, কলকাতা
ছোট্ট মেয়ে তিড়িং বাবা-মার সাথে শান্তিনিকেতনে বেড়াতে গেছে।
শান্তিনিকেতনে ঘুরতে এসে তিড়িং-এর তো খুব ভালো লাগছে। ও সত্যিই তিড়িং-
বিড়িং করে চারদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ওদের হোটেলের মধ্যে চারদিকে প্রচুর
গাছপালা, সেখানে প্রচুর পাখি কলরব করছে। বিশেষত, ভোরবেলা আর বিকেলবেলা
পাখিদের কলরবে সেখানে কান পাতা দায়। আবার হোটেলেরই একদিকে একটা পুকুর
আছে। সেই পুকুরে আবার ৬টা রাজহাঁস চরছে। পুকুরের গায়েই তাদের জন্য ঘর
রয়েছে। রোজ সন্ধ্যেবেলা ওরা ওই ঘরে ঢুকে যায়। আবার সকাল হলে পুকুরে নেমে
আসে।
সেদিন রাতে খাওয়া – দাওয়ার পর তিড়িংরা হোটেলের ক্যাম্পাসে ঘুরে
বেড়াচ্ছিল। হঠাৎ ও দেখে, একটা ঝোপের গায়ে কত ছোট ছোট আলো জ্বলছে – নিভছে।
ও ছুট্টে গিয়ে ধরতে গেল কিন্তু পারল না। ও বলল, ‘ঐ দেখো, আলোগুলো উড়ে
পালাচ্ছে। এটা কি গো বাবা? এরকম আলো উড়ে যায়?’
বাবা বললেন, ‘হ্যাঁ, এগুলোকে বলে জোনাকি, ইংরেজিতে বলে Firefly। এগুলো
একরকম পোকা। এরা নিজেদের শরীরে এইরকম আলো জ্বালাতে পারে। আগে তো শহরেও
অনেক জোনাকি দেখা যেত, আজকাল আর যায়না। তাই তুই চিনিস না। বাবুই পাখির
বাসা দেখিয়েছিলাম সেবার টাকী বেড়াতে গিয়ে মনে আছে?’
তিড়িং বলল, ‘হ্যাঁ, Weaver Bird বলে। মনে আছে।‘ বাবা বললেন, ‘হ্যাঁ, এই
বাবুই পাখি নিজের বাসা আলো করার জন্য জোনাকি পোকা তুলে আনে। প্রথমে গোবর
নিয়ে এসে বাসায় রাখে। তারপর জোনাকি এনে তাদের মুখগুলো ঐ গোবরে গুঁজে দেয়।
আর পিছনদিকটা আলো হয়ে থাকে। তাই বাবুইয়ের বাসাও আলোকিত হয়ে ওঠে।‘
তিড়িং বলল, ‘তাহলে তো ওরা মরে যাবে গো।‘ বাবা বললেন, ‘সে তো যাবেই। তখন
আবার নিয়ে আসবে। তুই কি জানিস তোর মা কি করেছিল ছোটবেলায়?’
তারপর মাকে বললেন, ‘বলো না।‘ তিড়িং অবাক হয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বলো
না মা। কি করেছিলে তুমি?’
মা এবার বলতে লাগলেন, ‘আমাদের ছোটবেলায় শহরেও জোনাকি দেখা যেতো। তখন
মাঝেমাঝে লোডশেডিং হত। আর সন্ধ্যেবেলা লোডশেডিং হলেই জোনাকি প্রায়ই ঘরে
ঢুকে আসতো। একবার আমি এরকমই ২টো জোনাকি ধরেছিলাম।‘
তিড়িং বলল, ‘তারপর কি করলে মা? ওদের পুষলে?’ মা বললেন, ‘হ্যাঁ, একটা
দেশলাই বাক্সে ওদের রাখলাম। জল দিলাম, কিন্তু খাওয়াবো কি করে বুঝলাম না।
আর কি খায় ওরা তাও জানি না। এভাবে দুদিন কেটে গেল। তারপর নিজেরই মন খারাপ
হয়ে গেল। তাই ওদের উড়িয়ে দিলাম। এখানেই আমার জোনাকি পোষার গল্পের
ইতি।‘
তিড়িং বলল, ‘জোনাকি কি খায়?’ বাবা বললেন, ‘ফুলে - ফুলে মধু খেয়ে বেড়ায়।
নাও চলো, জোনাকির গল্প তো হল। এবার ঘুমোবে চলো। রাত হয়ে যাচ্ছে। আবার কাল
সকালে আমরা ঘুরতে বেরবো।‘