কঠোপনিষদ - আত্মত্তত্ব জ্ঞান - ব্রহ্মবিদ্যা
সুব্রতকুমার মন্ডল,
কলকাতা
কঠোপনিষদ কৃষ্ণ যজুর্বেদীয় তৈতিরীয় শাখার কঠ ব্রাহ্মণ বা কঠ সংহিতার
অন্তর্গত। ইহাতে দুইটি অধ্যায় আছে, প্রত্যেক অধ্যায়ে তিনটি বিভাগ আছে।
উপনিষদ সমূহ ব্রহ্মবিদ্যা প্রকাশক। এই ব্রহ্মবিদ্যাই সংসার সাগরে নিমগ্ন
মানব গনের উদ্ধারের একমাত্র তরণী এবং ত্রিতাপ তাপিত মানবগণের শান্তি
লাভের একমাত্র মহৌষধ।
সেই দুর্বোধ্য ব্রহ্ম জ্ঞান সহজে বুঝবার জন্য উপনিষদ একটি সুন্দর
আখ্যায়িকার অবতারণা করিয়াছে। সরল স্বভাব শিশু ঋষি কুমার নচিকেতা এখানে
প্রশ্নকর্তা এবং স্বয়ং যমরাজ তাহার উত্তর দাতা। এইরূপে প্রশ্নোত্তরে
এখানে ব্রহ্মবিদ্যা সহজে বুঝানো হয়েছে।
মহর্ষি অরুণের পুত্র উদ্বালক ঋষি যিনি অন্ন দান করে যশস্বী হইয়াছেন,
তিনি রাজশ্রবাঃ নামেও পরিচিত। যজ্ঞের ফল লাভের দ্বারা স্বর্গলোক লাভের
ইচ্ছায় বিশ্বজিৎ নামক এক মহাযজ্ঞের অনুষ্ঠান করেন। এই বিশ্বজিৎ যজ্ঞে
যজ্ঞকারী কে তার সমস্ত সম্পদ দান করিতে হয়। ঋষি উদ্যালকের পুত্র নচিকেতা
দেখল পিতা যজ্ঞের দক্ষিণা স্বরূপ সমস্ত জরাজীর্ণ গাভি দান করছেন। যে সকল
গাভী শেষবারের মতো জল পান করিয়াছে, জন্মের মত তৃণভোজন করিয়াছে,
শেষবারের মতো দুগ্ধ দান করিয়াছে আর দুগ্ধ দিবে না, বা এই জন্মে সন্তান
উৎপাদনে অসমর্থ। সেই সকল জরা জীর্ণ বৃদ্ধ অকর্মণ্য গাভীগণকে যে যজমান
দক্ষিণা স্বরূপ দান করেন তিনি মৃত্যুর পর স্বর্গে তো গমন করেন না বরং
নিরানন্দময় দুঃখবহুল ঘোর নরকের গমন করেন।
শ্রদ্ধাবান নচিকেতা পিতার অনিষ্ট চিন্তায় উদ্বিগ্ন হইয়া তাহার
নিবারণার্থে পিতা কে বলিলেন, -
-পিতা আমাকে দক্ষিণাস্বরূপ কাহাকে দান করিবেন?
কিন্তু উত্তর না পাইয়া দ্বিতীয়বার, তৃতীয়বার ওই একই কথা জিজ্ঞাসা
করিলেন। তখন পিতা ক্ষুদ্ধ হইয়া বলিলেন-
- তোমাকে যমরাজের উদ্দেশ্যে দান করিলাম।
পিতার কথা ভাবিয়া নচিকেতা এই রূপে চিন্তা করিতে লাগিলেন। পিতার বহু
শিষ্যের মধ্যে আমি কখনো উত্তম বা মধ্যম হইয়া থাকি কিন্তু কখনো অধম বা
নিকৃষ্ট হই নাই। যমরাজের নিকট পিতার কি এমন প্রয়োজন আছে, যাহা তিনি আমার
দ্বারা সম্পাদন করিবেন?
এই রূপে চিন্তা করিয়া বালক নচিকেতা যম লোকে যাইবার জন্য প্রস্তুত হইলেন।
তাহা দেখিয়া তাহার পিতা দুঃখিত হইয়া তাহাকে যম লোকে যাইতে নিষেধ
করিলেন। তখন নচিকেতা পিতাকে বলিলেন-
- পিতা, আপনার পূর্ব পিতৃ পিতামহগণের সত্যনিষ্ঠার কথা বিশেষভাবে চিন্তা
করিয়া দেখুন, সত্য রক্ষা করিয়া আমাকে যমলোকে প্রেরণ করুন।
নচিকেতার কথা শুনিয়া তাহার পিতা তাহাকে যমালয়ে পাঠাইলেন। নচিকেতা
যমালয়ে গিয়া যমরাজের অনুপস্থিতির জন্য সেখানে তিন রাত্রি অনাহারে যাপন
করিলেন। পরে যমের সহিত সাক্ষাৎ হয়। অতিথি সৎকারের ত্রুটি হওয়ায় তাহা
পূরণের জন্য যমরাজ নচিকেতাকে তাহার ইচ্ছা অনুযায়ী তিনটি বরদান করেন।
প্রথম বরে নচিকেতা বলিলেন-
- হে যমরাজ আমাকে যমালয়ে পাঠাইয়া আমার পিতার যে দুশ্চিন্তা হইয়াছে
তাহা প্রশমিত হোক, চিত্ত প্রসন্ন হোক এবং তাহার প্রতি ক্রোধ যেন দূর
হয়।
নচিকেতা বলিলেন হে যমরাজ যে অগ্নিবিদ্যার সহায়ে লোকে স্বর্গে গমন করে,
সেই অগ্নির বিষয়ে আপনি সম্মক রূপে জানেন। শ্রদ্ধাবান আমাকে তাহা
সবিস্তারে বলুন। যাহারা মৃত্যুর পর স্বর্গলোকে গমন করেন তাহাদের অমরত্ব
লাভ হয়, আমি আপনার নিকট স্বর্গ লাভের সাধন ভূত সেই অগ্নিবিদ্যা জানিতে
ইচ্ছুক। দ্বিতীয় বরে ইহাই আমার প্রার্থনা।
মহাত্মা যমরাজ অগ্নিবিদ্যা ও অগ্নিয়েনো প্রণালী যোগ্য কর্ম সম্পাদনের
জন্য বিস্তারিতভাবে বলিলেন।
- হে নচিকেতা তুমি দ্বিতীয়বার যাহা প্রার্থনা করিয়াছিলে স্বর্গলোকে
প্রাপ্তির উপায় স্বরূপ সেই অগ্নিবিদ্যা রূপ বর তোমাকে দান করিলাম। এখন
তুমি তৃতীয় বর প্রার্থনা কর।
নচিকেতা বলিলেন-
- হে যমরাজ পরলোক সম্বন্ধে মানুষের মনে যে সন্দেহ রহিয়াছে আপনার নিকট
হইতে আমি আত্মজ্ঞান লাভ করিতে চাই।
নচিকেতা কে পরীক্ষার জন্য যমরাজ বলিলেন-
- নচিকেতা তুমি যে বিষয়ে বর প্রার্থনা করিয়াছো সে বিষয়ে দেবতারা ও
পূর্বে সংশয় প্রকাশ করিয়াছে, কারণ এই আত্মতত্ত্ব অত্যন্ত সূক্ষ্ম বা
দুর্বোধ্য বলিয়া লোকে সহজে ইহা জানিতে পারে না। তুমি অন্য বর প্রার্থনা
কর।
যমরাজের কথা শুনিয়া নচিকেতা বলিলেন-
- হে যমরাজ দেবগনেরও যখন এই বিষয়ে পূর্বে সন্দেহ উপস্থিত হইয়াছিল এবং
আপনি যখন বললেন যে এই আত্মতত্ত্ব সহজে বোধগম্য হয় না তখন এই আত্মতত্ত্ব
জ্ঞানে আপনার মত আর কাহাকেও পাওয়া যাইবে না, তাই আপনি আমাকে আত্মতত্ত্ব
জ্ঞান দান করুন।
নচিকেতার আত্মতত্ত্ব জ্ঞান লাভের অধিকার আছে কিনা তাহা পরীক্ষার্থে যমরাজ
তাহাকে প্রলোভন দেখাইয়া বলিলেন -
- হে নচিকেতা তুমি শতায়ু, পুত্র ও পৌত্রগণ প্রার্থনা করো, বহু গবাদি
পশু, অশ্ব, হস্তি এবং বিপুল স্বর্ণাদি ধন প্রার্থনা কর । এই পৃথিবীতে
বিশাল সাম্রাজ্য প্রার্থনা কর। তুমি বিশাল সাম্রাজ্যের রাজা হও। আমি
তোমাকে দিব্য ও লৌকিক সমস্ত কাম্য বস্তু সমূহের যথেচ্ছ ভোগের ক্ষমতা
প্রদান করিতেছি। যে সুখ দায়িনী অপ্সরা গন রথে আরোহন করিয়া এবং
বাদ্যযন্ত্রাদি লইয়া তোমার সম্মুখে রহিয়াছে ইহাদের মতো রমণী লাভ করা
মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। আমার প্রদত্ত এই সকল রমণীগণের দ্বারা তুমি
নিজের সেবা পরিচর্যা করাও।
মূমুখ্য নচিকেতা বলিলেন -
- হে যমরাজ আপনি যে সমস্ত ভোগ্য বস্তু আমাকে দিতে চাহিতেছেন সে সমস্ত
নিতান্তই ক্ষণস্থায়ী, এই সমস্ত ভোগ্য বস্তু মানুষের ইন্দ্রিয় শক্তি
ক্ষয় করে। আর আপনি আমাকে যে দীর্ঘ জীবন দিতে চান, অনন্তকালের তুলনায়
তাহা নিতান্তই স্বল্প। মানুষ কখনো বিত্ত বা ধনের দ্বারা তৃপ্তি লাভ করিতে
পারে না। আপনাকে যখন দর্শন করিয়াছি তখন আমার মনে আকাঙ্ক্ষা থাকলে
নিশ্চয়ই বিত্ত লাভ করিব। আত্মতত্ত্বের জ্ঞানই আমার একমাত্র প্রার্থনা।
এই নশ্বর সৃষ্টি প্রপঞ্চের মধ্যে যে অবিনশ্বর পর তত্ত্ব অন্তর্নিবিষ্ট
রহিয়াছে তাহা জানিবার নাম জ্ঞান আর সেই একই নিত্য পরম তত্ত্ব হইতে এই
বিবিধ নশ্বর পদার্থের উৎপত্তি কিরূপে হয় তাহা বুঝিবার নাম বিজ্ঞান।
যমরাজ শিষ্যকে নানা প্রলোভনের পরীক্ষা করিয়া তাহার যোগ্যতা আছে কিনা
বুঝিয়া তাহাকে আত্মতত্ত্ব বিষয়ে বলিতে প্রবৃত্ত হইলেন।
শ্রেয়োমার্গ ও প্রেয়োমার্গ ।
শ্রেয়োর প্রয়োজন মুক্তি লাভের জন্য আর প্রেয়োর প্রয়োজন ঐহিক ও
পরলৌকিক সুখ ভোগের জন্য। উভয়ই পুরুষকে আবদ্ধ করে। যিনি শ্রেয়োমার্গ
অবলম্বন করেন তিনি আত্মজ্ঞান লাভ করিয়া মুক্তি লাভ করেন। আর যিনি
প্রেয়ো মার্গ অবলম্বন করেন তিনি পরমার্থ হইতে বিচ্যুত হন। যে ব্যক্তি
বিবেকহীন সংসারে ও বিষয়ে আদিতে অতিশয় আসক্তি হেতু পরম পরমার্থ বিষয়ে
অনবহিত, যাহার চিত্ত ধনমহে আচ্ছন্ন তাহার নিকট পরলোক তত্ত্ব বা উহার
সাধনা স্পষ্ট প্রকাশিত হয় না।
আত্মজ্ঞান অতি নিপুণ ব্যক্তি, অর্থাৎ একমাত্র বিবেক ও বৈরাগ্যবান
ব্যক্তিই লাভ করিতে পারেন।
নচিকেতা আত্মজ্ঞান লাভে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ দেখিয়া অত্যন্ত সন্তুষ্ট হইয়া
যমরাজ বলিলেন-
- হে প্রিয়তম তোমার যে সদ্ বুদ্ধি হইয়াছে তাহা তর্কের দ্বারা পাওয়া
যায় না। সদ্ বুদ্ধি সম্পন্ন লোকই আত্মার বিষয়ে প্রকৃষ্ট জ্ঞান লাভ
করিতে পারে।
যমরাজ বলিলেন -
হে নচিকেতা বেদসমূহ বা উপনিষদ সমূহ সমস্ত তপস্যাদি যাহার প্রাপ্তির
সহায়ক এবং যাহাকে পাইবার জন্য সাধকগণ কঠোর ব্রহ্মচর্য ব্রত পালন করেন
আমি তোমাকে সেই প্রাপ্তব্য বস্তুর সম্পর্কে সংক্ষেপে উপদেশ করিতেছি। ইহা
ওঁ শব্দের বাচ্য এবং ওঁকার ইহার প্রতীক। ওঁকার রূপ অক্ষরই পরমব্রহ্ম
স্বরূপ। ব্রহ্মকে লাভ করিবার যত উপায় আছে তন্মধ্যে ওঁকার সর্বশ্রেষ্ঠ
উপায়।
আত্মার স্বরূপ সম্বন্ধে যমরাজ বলিতেছেন-
- এই আত্মার জন্ম নাই, মৃত্যু নাই। এই আত্মা কোন কিছু হইতে উৎপন্ন হয়
নাই এবং ইহা হইতে কিছু উৎপন্ন হয় নাই। আত্মা জন্ম রোহিত চিরন্তন
অপরিবর্তনীয় এবং চির বিদ্যমান। আত্মা সূক্ষ্ম হইতে সূক্ষ্মতর আবার বিশাল
হইতে বিশালতর। যিনি সমস্ত কামনা-বাসনা ত্যাগ করিয়াছেন এবং মন ও
ইন্দ্রিয়গণ যাহার সংযত ও বিশুদ্ধ হইয়াছে তিনি এই আত্মার উপলব্ধি করিতে
পারেন।
শরীরে অবস্থিত জীবাত্মাকে রথস্বামী এবং শরীরকে রথ বলিয়া জানিবে। বুদ্ধি
কে সারথি বা রথ চালক এবং মনকে লাগাম বলিয়া জানিবে। বিবেকী জ্ঞানী
ব্যক্তিগণ মানুষের ইন্দ্রিয়গণকে দেহ রথের অশ্ব এবং ইন্দ্রিয় ভোগ্য
বিষয় সমূহ কে অশ্বগণের গমনের পদ বলিয়া থাকেন।
শরীর, ইন্দ্রিয় মন সংযুক্ত জীবাত্মাকেই ভোগ কর্তা বলিয়া থাকেন। যাহার
বল্গা রুপী মন সংযত এবং ইন্দ্রিয়গণকেও দমন করিতে সমর্থ্য তিনি সংসার
মার্গের পরপার স্বরূপ সর্বোত্তম ব্রহ্ম পদ লাভ করেন। যিনি শব্দ স্পর্শ
রূপ রস ও গন্ধ গুণ বর্জিত, যিনি শাশ্বত ও অবিনাশী অনাদি ও অনন্ত, যিনি
মহত্তত্ব হইতেও শ্রেষ্ঠ সেই আত্মাকে সাধক জানিতে পারিলে- সাধক জন্ম
মৃত্যুর বন্ধন হইতে চিরতরে মুক্ত হইয়া যান। পরমাত্মা এক, তিনি সকলের
নিয়ন্তা, তিনি সমস্ত প্রাণীর অন্তরাত্মা। এই পরমাত্মাই এক হইয়াও নিজেকে
বহুরূপে প্রকাশ করেন। চক্ষু বা কোন ইন্দ্রিয় দ্বারা ব্রহ্ম দর্শন হয়
না, একমাত্র নিশ্চল বিশুদ্ধ মনের দ্বারাই অমৃত স্বরূপ আত্মার উপলব্ধি
করিতে পারেন।
!! মনুষ্যাণাং সহস্রেষু কশ্চিদ্ যততি সিদ্ধয়ে ।
যততামপি সিদ্ধানাং কশ্চিন্মাং বেত্তি তত্ত্বতঃ !!
(শ্রীমদ্ভগবদগীতা, সপ্তম অধ্যায় তৃতীয় শ্লোক)
সহস্র সশস্ত্র মানুষের মধ্যে হয়তো একজন মদ বিষয়ক জ্ঞান লাভের জন্য যত্ন
করেন আবার যাহার যত্ন করিয়া সিদ্ধি লাভ করিয়াছেন মনে করেন তাহাদিগেরও
সহস্রের মধ্যে হয়তো একজন আমার প্রকৃত স্বরূপ জানিতে পারে।