খাজিয়ারের খাজানা
মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী,
বালি, হাওড়া
দেবায়নদের অ্যানুয়্যাল পরীক্ষা শেষ। এবার ও ক্লাস এইটে উঠবে। ওদের
স্কুলে পরীক্ষা শেষ হয়ে রেজাল্ট বেরোনোর সময় পর্যন্ত টানা ছুটি থাকে।
এই ছুটিটা বাড়িতে বসে থাকার কোন অর্থ হয়না। বাবা মা আর দেবায়ন তাই
চলেছে ডালহৌসি ধরমশালা। হিমগিরি এক্সপ্রেসে টানা দুদিনের বোরিং
জার্নি।
দেবায়নের কাছে জার্নিটা বোরিং হলনা, কারণ সে বাইরের দৃশ্য দেখার সঙ্গে
সঙ্গে ট্রেনের ভিতরে গোটা কম্পার্টমেন্ট জুড়ে ঘোরাফেরা করে। ওদের এসি টু
টায়ার। আর তারসঙ্গেই লাগোয়া ফার্স্ট ক্লাস। দেবায়ন ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ
করেই একটা ফার্স্ট ক্লাস কুপের আধখোলা দরজা দিয়ে তিনজনকে দেখতে পেল।
যাদের একজন বেশ লম্বা ও সুপুরুষ চেহারা, বয়েস ত্রিশের কোঠায়, আর একজন
কলেজে পড়া ছেলে, আর তৃতীয় জন মাথায় টাক, নাকের নীচে গোঁফ, ধুতি
পাঞ্জাবী পরনে।
দেবায়ন চট করে কুপের মধ্যে ঢুকে গিয়ে আচমকা তৃতীয় ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস
করল, "আপনিই কি প্রখ্যাত রহস্য উপন্যাস লেখক লালমোহন গাঙ্গুলী ওরফে
জটায়ু?"
ভদ্রলোক তার দিকে পিটপিট করে তাকিয়ে একটু হেসে বললেন, "হ্যাঁ"।
বিস্ময়ে চোখ ছানাবড়া হওয়ার কথা ছিল দেবায়নের। কিন্তু গতবছরই তার
প্রফেসর শঙ্কুর সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটেছে, তাই সে খুব একটা বিস্মিত বোধ করল
না। তবে সে এও জানে এই কথাগুলো এখনই বাবা মাকে বলা যাবেনা, কারণ তাঁরা
এখনও শঙ্কুর কথাটাই বিশ্বাস করে উঠতে পারেননি।
লম্বা ভদ্রলোক দেবায়নের দিকে হাত বাড়িয়ে বললেন, "আমাদের পরিচয়টা আর দিতে
হবে না আশাকরি।"
দেবায়ন সজোরে মাথা নেড়ে না জানাল। তারপর তপেসদাদার পাশে বসার অনুমতি
চাইল এবং পেয়েও গেল। দেবায়নের নামধাম জানার পর ফেলুদা বললেন, "আচ্ছা,
তুমি আমাদের দেখে অবাক হলেনা তো?"
দেবায়ন তখন ওর ফেলুদার সব কাহিনী কীর্তি পড়ে ফেলার কথা শোনাল। আর
প্রফেসর শঙ্কুর সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা ও জানাল। সব শুনে ফেলুদা বললেন,
"আসলে তুমি আমাদের খুব পছন্দ করো তো, তাই তোমার আমাদের সঙ্গে দেখা হয়ে
যায়। আমাদেরও খুব ভালো লাগছে তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে। "
" এবারেও কি আপনারা কোনও তদন্তে যাচ্ছেন নাকি শুধুই বেড়াতে?" দেবায়ন
জিজ্ঞেস করে।
"শুধুই বেড়াতে।"
"আপনার সঙ্গে কোল্ট অটোম্যাটিক রিভলবার রয়েছে? "
" হ্যাঁ ।আমার সঙ্গে ওটা সবসময়ই থাকে। তবে এবারে আর সেই পুরোনো রিভলবার
নয়। আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করছি। এগুলোয় আটটা করে গুলি ভরা
যায়।"
" তাহলে এবারেও আপনি কোন একটা রহস্যে ঠিক জড়িয়ে পড়বেন। আর যদি সেরকম
কিছু হয়, আমাকে আপনার সাথে নেবেন তো? নাকি আপনার আপত্তি আছে? "
" একেবারেই না। তুমি যথেষ্ট বুদ্ধিমান। "
এরপর আর বেশিক্ষণ দেবায়ন ওখানে না থেকে নিজের সিটে ফিরে আসে। নাহলে বাবা
মা সন্দেহ করবেন।
যথাসময়ে পাঞ্জাবের চাক্কিব্যাঙ্কে নেমে ওরা ডালহৌসি ক্লাবে পৌঁছে গেল।
ফেলুদারাও এখানে উঠেছেন, বারান্দার শেষ প্রান্তে। দেবায়নের বাবা মা
ওঁদের খেয়াল করতে পারেননি।দেবায়ন ও কিচ্ছু বলেনি বাবা মা কে। এখানে আসার
পর প্রথম দুইদিন বেশ নির্বিঘ্নেই কাটল। আর সেজন্যই দেবায়নের মনটা খুব
একটা ভালো নেই। এমন একজন বিশ্ববিখ্যাত গোয়েন্দা থাকা সত্ত্বেও ট্যুরটা
বোধহয় নিরামিষই হবে।
তৃতীয়দিনে পরিস্থিতি হঠাৎ করেই অন্যরকম হয়ে গেল। ঘরে ভালো লাগছিল না
বলে দেবায়ন ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে দূরের বরফাচ্ছন্ন পিকগুলোর দিকে তাকিয়ে
ছিল। বাবা মা ঘরে গল্প করছেন। শীতটা জব্বর পড়েছে। দেবায়ন দেখল জটায়ু
ওর দিকেই আসছেন। মুখ বেশ গম্ভীর।
"কাল তোমরা খাজিয়ারের হিড়িম্বার মন্দির দেখতে গিয়েছিলে নাকি?"
"হ্যাঁ ।গেছিলাম তো। আপনারা ও গেছিলেন? কই? দেখলাম না তো?"
ওর কথার উত্তর না দিয়ে জটায়ু বললেন "ওখান থেকে একটা মহামূল্য মরকত মণি
চুরি হয়েছে।"
"সেকি! কখন?"
"সম্ভবতঃ কাল রাত্রে। মন্দিরের পূজারী আজ পুজো করতে এসে দেখেন মণি নেই।
"
দেবায়নের মুখে হাসি ফুটবল।
"তুমি হাসছো? "জটায়ু রীতিমত অবাক।
" হাসবো না? আমাদের এই ট্যুরটা আর নিরামিষ রইল না। রীতিমত থ্রিলিং হবে।
তাই হাসছি। "জটায়ু আর কিছু না বলে ঘরে চলে গেলেন। আর ঠিক তখনই মা বেরিয়ে
এলেন, আর ঠান্ডা লাগছে বলে চেঁচামেচি করে দেবায়নকে একটা টুপি পরিয়ে
দিলেন জোর করে।
দুপুরের আগেই ফেলুদা আর তপসেদাকে হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে যেতে দেখেছিল
দেবায়ন। তারমানে জটায়ু ঘরেই আছেন। ও গুটিগুটি জটায়ুর ঘরের দিকে এগোল।
দরজা আধ ভেজানো, তাই ও নক না করেই ঢুকে পড়ল। ঘরে কেউ নেই। বাথরুম থেকে
জলের আওয়াজ আসছে, মানে উনি ওখানে। ঘরটা একটু এলোমেলো হয়ে আছে। একপাশে
দেয়ালে জটায়ুর সাইডব্যাগটি ঝুলছে। দেবায়নের অনেক দিনের শখ জটায়ুর
ঝোলায় কি কি থাকে দেখবে। আজ মহা সুযোগ উপস্থিত। ও আস্তে আস্তে ঝোলাটা
নামিয়ে দেখতে লাগল।
দেখল' অতলান্তিক আতঙ্ক', 'বোম্বাইয়ের বোম্বেটে' রয়েছে। এছাড়া একটা
ছোট্ট ছাতা, সুপুরির কৌটো, চশমার খাপ, ব্যুমেরাং... এইসব দেখতে দেখতে
হাতে ছোট মত কি যেন ঠেকল। দেবায়ন তাড়াতাড়ি সেটা বের করে আনতেই বাইরের
সূর্যাস্তের আলোতেই তার রঙ ঠিকরে পড়ল। দেবায়ন তো হতবাক। তার মানে
সর্ষের মধ্যেই ভূত! জটায়ু কিনা চোর? ছিঃ! ছিঃ! ফেলুদা তাহলে এতদিন
বুঝতেই পারেননি যে এত সাধাসিধে দেখতে মানুষটি আসলে চোর। মনটা খুব খারাপ
হয়ে গেল তার। সে বোকার মত মণি হাতে কেঁদে ফেলল। স্বপ্নের হিরোদের একজনকে
চোর ভাবতে কারোর ভাল লাগে?
এমন সময় বাথরুম থেকে জটায়ু বেরিয়ে এসে ওকে দেখেই খুব জোরে লাফিয়ে উঠে
বললেন, "এই তো পেয়েছি। তাহলে তুমিই চুরি করেছিলে?"
দেবায়ন বলল, "মানে!"
জটায়ু আবার একটা লাফ দিয়ে বললেন, "ওসব মানে ফানে জানিনা। তোমার হাতে মণি
এল কোথা থেকে অ্যাঁ? তার মানে' ঘুঘু' তুমিই ।"
দেবায়ন যত বলতে যায়, "না, না, আমি চোর নই।" ততই জটায়ু একটা করে লাফ
দিতে থাকেন, আর বলেন," ওঃ! এবার আর ফেলু মিত্তিরকে চোর ধরতে হলনা, আমিই
ধরে ফেললুম।"
দেবায়ন এবার হাপুস নয়নে কাঁদতে থাকে। কি মুশকিলে সে পড়ে গেছে। এবার কে
তাকে বিশ্বাস করবে? এমন সময় কাঠের সিঁড়ি বেয়ে অনেকগুলো জুতো পরা পায়ের
আওয়াজ ওপরে আসছে, সে শুনতে পেল। একে একে ফেলুদা, তপসেদা, ডালহৌসি
ক্লাবের ম্যানেজার জগদীশজী, আর দুজন পুলিশ ভেতরে ঢুকল ঘরের। ওরা আসতেই
জটায়ু আরও উঁচু লাফ দিয়ে উঠে বললেন, "এই দেখুন ফেলুবাবু, চোর ধরা পড়ে
গেছে। দেখুন, এইটুকু ছেলে, ক্লাস এইটে সবে উঠেছে, সে চোর। আপনাকে আর কষ্ট
করতে হবে না, চোর আমিই ধরে ফেলেছি।" দেবায়ন এবার ভেউ ভেউ করে কেঁদে
ফেলল।
ফেলুদা হা হা করে হেসে বললেন, "না, মিস্টার জটায়ু। এবারেও আপনি ফেল।
দেবায়ন খুব ভালো ছেলে। ও চুরি করেনি। চুরি করেছিল আমাদেরই ড্রাইভার
বিষ্ণু। ও এখানের সব আগে থেকেই জানে, তক্কে তক্কে ছিল। কাল সুযোগ কাজে
লাগিয়েছে। আর মণিটা ও আপনার ব্যাগে টুপ করে ফেলে দিয়েছে। ওকে তো আমরা
ধরমশালা পর্যন্ত রেখেছিলাম, ও সুযোগ বুঝে আপনার ব্যাগ থেকে নিয়ে ওটা
পাচার করে দিত। আমার সন্দেহ হতেই ওকে আগে জেরা করতেই ও সব স্বীকার করে
নিয়েছে। ও এখন জেলে। দাও দেবায়ন, মণিটা খাজিয়ারের মন্দিরে ফেরত দিতে
হবে। "
ফেলুদারা সকলে তখনই থানার উদ্দেশ্য রওনা হয়ে গেলেন। যাবার আগে জটায়ু
বারবার করে ওর কাছে ক্ষমা চেয়ে নিলেন। একটা 'বোম্বাইয়ের বোম্বেটে' সই
করে উপহার ও দিয়ে গেলেন। কিন্তু তাকে চোর বলার শোধ দেবায়ন নেবে। এই
গল্পটা আগেই লিখে স্কুল ম্যাগাজিনে দিয়ে দেবে। যাতে জটায়ু আর লিখতে না
পারেন।
ওদিকে পরদিন সকালে ফেলুদা মণিটি মন্দিরের প্রধান ট্রাস্টির হাতে তুলে
দিলেন। সব মিটিয়ে ও়ঁরা তিনজন যখন খাজিয়ারের লেকের ধারে গরম কফিতে
চুমুক দিচ্ছেন তখন লেকের জলে সূর্যের আলোকে জ্বলজ্বলে মরকত মণির মত
লাগছিল।
দেবায়নের সঙ্গে আর ওদের দেখা হয়নি। দেবায়নরা আগেই ধরমশালা রওনা হয়ে
গেছিল। দেবায়নের বাবা মা ও এসব কিছুই জানতে পারেননি। তোমরা যেন আবার
বলতে যেও না।