কি যে হলাম
অভিজিৎ মুখোপাধ্যায়,
নতুন দিল্লি
কি যে হলাম !
সরস্বতী পুজোর আগের দিন রাতে ক্লাবঘরে মুখাবৃত মূর্ত্তির চারপাশটা
সুসজ্জিত করা হচ্ছিল । পরের দিন সকাল হতেই লোকজন আসবে, প্রশংসা করবে এই
মনোভাব নিয়ে । ইংরেজী ভাষায় যার নাম – ‘ফাইনাল টাচ’ । মাইকে প্রখ্যাত
কণ্ঠশিল্পী শ্রদ্ধেয় মাণ্ণা দে-র রেয়াজি এবং সুললিত কণ্ঠে গান বাজছিল –
“কি চেয়েছি আর কি যে পেলাম” ....
অদীপ এক জায়গায় চুপ করে বসে খুব মন দিয়ে গানটা উপভোগ করছিল । অক্ষয়
অনেকক্ষণ যাবৎ দূর থেকে নিরীক্ষণ করছিল তাঁকে । একসময় কাছে এগিয়ে এসে বলে
– কিরে, তোর শরীর খারাপ লাগছে ?
--- না, গানটা শুনতে ভালো লাগছে তাই মন দিয়ে শুনছি ।
--- এই গান তো বহু পুরনো গান । হঠাৎ কি হলো তোর ? অক্ষয় জিজ্ঞাস করে ।
--- একটু মনোযোগ দিয়ে শোন ‘কি যে পেলাম’ কথাগুলোর পরিবর্তে যদি ‘কি যে
হলাম’ কথাগুলো লাগিয়ে দেওয়া যায় তাহলেও ছন্দ একই থাকে কিন্তু জীবনের রঙটা
যায় পাল্টে । ছোটবেলায় স্কুল শিক্ষকরা অনেক সময় ছাত্রদের প্রশ্ন করে
তাঁদের মনোভাব জানতে চান – বল তো বড় হয়ে তোরা কি হতে চাস ? বুক ফুলিয়ে
কোন ছাত্রই কিন্তু বলে না—মাস্টারমশাই, আমি বড় হয়ে বোকা হতে চাই । কারণ
বোকা হলে কাউকে শোষন কিম্বা ঠকানো যাবে না যে । পৃথিবীতে এমন একটা
প্রফেশনের নাম বলতে পারবি না তুই যেখানে ঠকানোর সুযোগ নেই । যতই ভাবিস না
কেন খুঁজে পাবি না । তাই এই সংসারে কেউ বোকা হতে চায় না । সবাই একে
অন্যকে ঠকিয়ে ধনী হতে চায় ।
অক্ষয় সব শুনে বলে -- তুই তখন থেকে এসব কথাই ভাবছিস বুঝি বসে বসে ?
--- হ্যাঁ রে ! আমরা জ্ঞানদায়িনী বিদ্যার দেবী মা সরস্বতীকে প্রতি বছর
পুজো করি । তারপর বিদ্যা শিক্ষার অন্তিমে জীবিকান্বেষণের তাগিদে ঘর ছেড়ে
বাইরে নামি ছলে-বলে-কৌশলে একে অন্যকে বোকা বানানোর উদ্দেশ্যে ।
অক্ষয় সন্মতি জানিয়ে বলে – কথাটা তুই ঠিকই বলেছিস । যে যত চালাক তাঁর
পক্ষে মানুষকে বোকা বানানোর ততই সুবিধে ।
--- শুধু মানুষকে বোকা বানানো নয় । আমরা অদৃশ্য বিধাতা পুরুষকেও বোকা
বানাতে কম কসুর করি না । লক্ষ্য করে দেখবি, যে লোকটি জীবদ্দশায় কোনদিন
গীতা ছুঁয়েও দেখেনি তাঁর মৃত্যুতে তাঁর মরদেহের উপর গীতা রাখা হয় দেবলোকে
স্থান পাওয়ার অভিপ্রায় । মরা মানুষের উপর গীতা রাখলে যে গীতা অপবিত্র হয়ে
যায় সেই দিকে কারো ভ্রুক্ষেপ নেই । অদীপ একটু থেমে আবার বলে ওঠে,
সর্বক্ষেত্রে প্রতারণা ! এটা স্থির নিশ্চিত এই সংসারে মানুষের সমস্ত আচরণ
মিথ্যে এবং মেকি । তাই নিষ্পাপ বোকারাই একমাত্র দেবলোকে বসবাস করার
অধিকারী । আমরা নই । যেমন লাভপুর শীতলগ্রাম প্রাথমিক বিদ্যালয়ের খুদে
পড়ুয়া রিক ছেলেটি নির্দ্বিধায় হাসতে হাসতে স্যারকে বলেছিল– ‘আমি বোকা হতে
চাই’ । আমাদের কারোর মধ্যে বোকা হওয়ার মতো সৎ সাহসটুকু পর্যন্ত নেই ।
আমরা প্রত্যেকে লেখাপড়া জানা আস্ত ঠকবাজ ।