কৈশোরের স্মৃতি

রঘুনাথ বায়েন,

সোনারপুর, কোলকাতা

আজ থেকে অনেক বছর আগের কথা। তখন আমি শিয়ালদহের বঙ্গবাসী কলেজের বি এস সির প্রথম বর্ষের ছাত্র। আর এখন আমি একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। বাড়ি থেকে কলেজ অনেক দুর বলে গড়িয়ার একটি মেসে থাকতাম। দশজন ছাত্রের থাকার ব্যবস্থা। খুব আনন্দে দিন কাটতো। মেসের পাশেই একটা বড় খেলার মাঠ ছিল। বিকাল হলেই ফুটবল, ক্রিকেট খেলতাম। এখনকার মতো স্বার্থপরতার জীবন ছিলনা। এখনকার ছেলেমেয়েরা তো সারাদিন মোবাইলে ব্যস্ত থাকে। কারোর সঙ্গে কথা বলার সময় নেই। অনেক পরিবারে শুনি স্বামী, স্ত্রী, ছেলেমেয়েদের মধ্যে প্রায়ই কথা হয়না বললেই চলে। এ প্রসঙ্গে একটা কথা মনে পড়ে গেল। এক বৃদ্ধা বৃদ্ধাশ্রমে থাকেন। তিনি জানতে পারলেন বাড়ি থেকে ছেলে বউমা নাতি নাতনী সবাই তাঁকে দেখতে আসছেন। তিনি আনন্দে আত্মহারা। অনেকদিন পরে ছেলে, বউমা, নাতি নাতনীদের সঙ্গে জমিয়ে গল্পো করা যাবে। কখন আসবে কখন আসবে করে অধৈর্য হয়ে পড়েছেন। বাড়ির সবাই এসে বৃদ্ধার সঙ্গে সৌজন্য বিনিময় করে সবাই সেলফোনে ব্যস্ত হয়ে গেলেন। বৃদ্ধার সঙ্গে কথা বলার সময় নেই। বৃদ্ধা সেই একাই রয়ে গেলেন। মনে মনে বললেন এরা না এলেই বরং ভালো হতো। যাক এ প্রসঙ্গ আমার বলার উদ্দেশ্য ছিলোনা। আমাদের সময় ফোন ছিলোনা। জমিয়ে আড্ডা দিতাম। প্রত্যেকে প্রত্যেকের সঙ্গে সারাদিনের অভিজ্ঞতা শেয়ার করতাম। খুব আনন্দে কাটছিলো মেস লাইফ। এবার আসল কথাতে আসি। হঠাৎ একদিন রান্নার মাসী এলোনা। এখন কী হবে, সবাইকে হোটেলে খেতে হবে। অনেক টাকা খরচ। তখন আমি বললাম যে আমি রান্না করবো। সবাই খুব খুশি হলো। তখন কয়লার উনুনে রান্না হতো। আমি যথারীতি উনুন জ্বালাতে শুরু করলাম। কিন্তু জানিনা কীভাবে উনুন জ্বালাতে হয়। রান্নার মাসী প্রতিদিন উনুন জ্বালায়, কিন্তু কীভাবে জ্বালায় দেখিনি। আমি যথারীতি উনুনে কয়লা ভরে উপরে ঘুঁটে দিয়ে আগুন দিলাম। ঘুঁটে পুড়ে গেল। কিন্তু কয়লায় আগুন লাগলোনা। আবার ঘুঁটে দিলাম। এই করতে করতে ঘুঁটে শেষ হয়ে গেল। এখন কী করবো ভাবছি। দেখি নারকেল ছোবড়া পড়ে আছে। সেগুলো দিয়ে হাওয়া দিতে থাকলাম। নারকেল ছোবড়া ধোঁয়ায় ঘর ভরে গেলো। আর চোখ নাক দিয়ে জল পড়তে শুরু করলো। উনুন আর জ্বালানো সম্ভব হলোনা। সেদিন আর রান্না করাই হলোনা। অনেকে বলেছিল আগে ঘুঁটে দিয়ে তার উপর কয়লা দিতে। কিন্তু আমি তাদের কথা পাত্তা দিইনি। পরদিন রান্নার মাসী কীভাবে উনুন জ্বালায় ভালো করে দেখে নিলাম। এর কিছুদিন পর আবার একদিন মাসী এলোনা। আমি বললাম আমি রান্না করবো। কেউ কেউ বললো তোর আগেরবার রান্না করতে গিয়ে শিক্ষা হয়নি। আমি বললাম এবার আমি পারবো। সবাই রাজী হলো। আমি যথারীতি আগে ঘুঁটে সাজিয়ে তার উপর কয়লা দিয়ে উনুন জ্বালিয়ে ফেললাম। সবাই জিগ্গেস করলো কি রান্না করবি। আমি বললাম আলুভর্তা আর ঝিঙ্গা দিয়ে ডাল হবে। তাই করলাম। প্রথম রান্না করছি। কোনো অভিজ্ঞতা নেই। যথারীতি ভাত ফুটছে। মাঝে মাঝে দেখছি ভাত হলো কিনা। এবার দেখলাম ভাত কেমন যেন গলে গেছে। মাড় বেরোচ্ছেনা। কি করবো ভাবছি। এমন সময় মনে পড়লো, হোটেলে দেখেছি ভাত হয়ে গেলে কিছুটা জল ঢেলে দেয়। তাতে মাড় সহজে বেরিয়ে যায়। আমিও তাই করলাম। কিন্তু মাড় বেরোলো না। আবার ভাত ফোটাতে থাকলাম জল কমানোর জন্য। কিন্তু সে ভাত আর ভাত হলোনা। ভাত গলে পায়েস হয়ে গেল। আমি তো খুব ভয়ে ভয়ে আছি। ভাবলাম আজ হয়তো এদের কাছে খিস্তি শুনতে হবে। কিন্তু না আমার ধারণা ভুল। ঐ গলা ভাত সবাই পরম আনন্দের সঙ্গে খেলো এবং আমার খুব প্রশংসা করলো।

আমাদের কলেজটি তিনটি বিভাগে হতো। সকাল, দুপুর ও সন্ধ্যা। আমি ছিলাম সন্ধ্যা বিভাগে। যথারীতি কলেজ জীবন খুবই আনন্দে কাটছিলো। অনেক নতুন নতুন বন্ধু জুটে গেলো। একদিন কলেজ থেকে বেরিয়ে শিয়ালদহ স্টেশনে এলাম বাড়ী ফেরার জন্য। তিন বন্ধু মিলে তিনটি চায়ের অর্ডার দিলাম। দোকানদার কাচের গ্লাসে চা দিল। চা খাচ্ছি এমন সময় আমাদের ট্রেন ছেড়ে দিল। কি করবো ভাবছি। এমন সময় এক বন্ধু চায়ের গ্লাস নিয়ে ট্রেনে উঠে পড়লো। তাকে দেখে বাকি দুজন গ্লাস নিয়ে ট্রেনে উঠে পড়লাম। গ্লাস ফেরত দেওয়া তো দূরের কথা পয়সা ও দেওয়া হলোনা। এমন ঘটনা বহুবার ঘটেছে। আমাদের কলেজের হেড ক্লার্ককে আমারা বড়বাবু বলতাম। তিনি ছিলেন খুব খিটখিটে আর বদমেজাজি। একদিন একটা ফর্ম জমা দেওয়ার জন্য আমরা বড়বাবুর কাছে জড়ো হয়েছি। তিনি তো কাজ করেই যাচ্ছেন। তবে বড্ড ধীরগতিতে। এমন সময় পিছন থেকে কেউ একজন বললো দাদু একটু হাত চালিয়ে কাজ করুন। আর যায় কোথা। বড়বাবু ক্ষেপে গিয়ে কাজ বন্ধ করে উঠে দাঁড়িয়ে বলতে লাগলেন কে বললো কে বললো। তোর বাবাদের বলতে পারিসনা। কে বলেছে কেউ কি আর স্বীকার করে। তারপর অনেক অনুরোধের পর আবার কাজে বসলেন। আর একটা ঘটনার কথা বলি। তখন আমি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। আমি স্টাইপেন্ড পেতাম। স্টাইপেন্ড দেওয়ার দিন যখন এলো আমরা অর্থাৎ যারা স্টাইপেন্ড পাব সবাই লাইন দিয়ে দাঁড়ালাম। আমার যখন লাইন এলো, তখন আমাকে বললো আমার টাকা আসেনি। আমিতো বিশ্বয়ে স্ট্যাচু হয়ে গেলাম। জিজ্ঞাসা করলাম আমার টাকা কেন আসেনি। স্টাইপেন্ড বিভাগে ছিলেন কল্লোলদা বলে একজন কর্মচারী। তিনি বললেন আমার ফর্ম ফিলাপে ভুল ছিল। তাই আমার ফর্ম পাঠায়নি। আমি শুনে রাগে অগ্নিসর্মা হয়ে প্রশ্ন করলাম আমাকে জানাননি কেন? তিনি বললেন ভুল হয়ে গেছে। আমি তো ওনার চোদ্দ পুরুষ উদ্ধার করে ছাড়লাম। সেই থেকে উনি আমাকে খুব সমীহ করে চলতেন। প্রথম বর্ষের স্টাইপেন্ড নয় শত টাকা বলে কথা। এতো টাকা হাতে পাওয়া মানে আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার মতো। তারপর কল্লোলদার কাছ থেকে ফর্মটা নিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম কোথায় জমা দিতে হবে। উনি বললেন বিকাশ ভবনে জমা দিতে হবে। আমি ফর্মটা নিয়ে বিকাশ ভবনে গেলাম। যথারীতি সময় পেরিয়ে গেছে বলে কোনো অফিসার ফর্ম জমা নিলেন না। অনেক অনুরোধ করলাম কিন্তু কোনো কাজ হলোনা। শেষে ফিরে আসবো ভাবলাম। এমন সময় এক দিদি আমার অবস্থা দেখে আমাকে কাছে ডেকে জানতে চাইলেন কী হয়েছে। আমি সব ঘটনা বললাম। ঐ শ্রদ্ধেয় দিদি সস্নেহে বললেন আমাকে দাও। আমি জমা করে দেব। আমি ফর্মটা দিদির হাতে দিয়ে নিশ্চিন্ত হলাম। আর ঐ দেবদূতের মতো দিদিকে মনে মনে শত শত প্রনাম জানালাম। একটা কথা বলে রাখা ভাল। আমি ছিলাম নির্ভিক। কোনো অন্যায়ের সঙ্গে আপোস করতাম না।পুজোর সময় কলেজ ছুটি। কিন্তু অফিস খোলা থাকতো। আমি মাঝে মাঝে কলেজে যেতাম স্টাইপেন্ডের খোঁজ নিতে। একদিন একটা মর্মান্তিক ঘটনা ঘটলো আমার সঙ্গে। তখন আমাদের জুতো বলতে অজন্তার হাওয়াই চপ্পল। বৃষ্টি হয়ে কলেজ যাওয়ার রাস্তা প্যাচপ্যাচানি নোংরা হয়ে গেছে। পায়ে নোংরা লেগে গেছে। কলেজে গিয়ে বাথরুমের পাশে পাইপ ফেটে পড়া জলে পা পরিষ্কার করতে লাগলাম। এমন সময় দেখি এক ভদ্রলোক আমার পাশে দাঁড়িয়ে ড্রেনে বাথরুম করছে। আমি ভাবলাম কোনো অভিভাবক হবে। আমি বললাম দাদা পাশেই বাথরুম। উনি আমার উপর প্রচন্ড রেগে বললেন আমাকে শেখাতে এসোনা। আমি সব জানি। আমি এখানকার স্টাফ। আমি বললাম জানেন যদি, তাহলে এভাবে ড্রেনে কেন করছেন। তিনি আরো রেগে গিয়ে বললেন লাইট আছে? তুমি এতো কথা বলছো কেন? তুমি অফিসে চলো। তোমার ব্যবস্থা হবে। আমি তখন একটু ভয় পাওয়ার অভিনয় করলাম। আমি বললাম প্লীজ স্যার আমাকে অফিসে নিয়ে যাবেন না।উনি আমাকে আরো জোর করতে লাগলেন। তোমাকে অফিসে যেতেই হবে। আমি ও এটাই চাইছিলাম। অফিসে না গেলে তোমার মুখোশটা খোলা যাবেনা। যথারীতি ওনার সঙ্গে অফিসঘরে গেলাম। ভদ্রলোকের নাম কুন্ডু বাবু। আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন তুমি এখন কলেজে এসেছো কেন? বললাম স্টাইপেন্ডের খোঁজ নিতে। কুন্ডু বাবু সঙ্গে সঙ্গে আমার স্টাইপেন্ড বন্ধ করার কথা বললেন। আমি আবার একটু অভিনয়ের আশ্রয় নিয়ে বললাম, স্যার আপনাদের হাতে যা ইচ্ছা করার ক্ষমতা আছে। প্লিজ আমার স্টাইপেন্ড বন্ধ করবেন না। উনি আরো ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন তোমার স্টাইপেন্ড বন্ধ করে দেব। দেখি তুমি কি করতে পারো। এবার আমি স্বমহিমায় নিজ মুর্তি ধারন করে বললাম আপনার কেমন ক্ষমতা আছে আমার স্টাইপেন্ড বন্ধ করে দেখান। আপনি কি জানেন কোথায় থেকে স্টাইপেন্ড আসে। এবার সব স্টাফেরা আমায় জিজ্ঞাসা করলো কি হয়েছে। আমি সবিস্তারে ঘটনাটা খুলে বললাম। শুনে সবার মাথা হেঁট হয়ে গেল। সব স্টাফেরা মিলে আমাকে কলেজের বাইরে নিয়ে এলো। আর বললো দেখ বাবা আমরা বুঝতে পারছি কুন্ডু বাবু মারাত্মক অপরাধ করেছেন। কিন্তু কি করবো বলো উনিতো আমাদের স্টাফ। আমরা ওনার হয়ে তোমার কাছে ক্ষমা চাইছি। তুমি কিছু মনে করোনা বাবা। তারপর আমি আমার বাসায় ফিরে এলাম। তারপর কি ঘটেছে জানিনা। আবার এক সপ্তাহ পর কলেজে গেলাম। আমি যাওয়ার কিছুক্ষন পর দেখছি কলেজের মধ্যে হুলুস্থুল কাণ্ড শুরু হয়েছে। একাধিক স্টাফ আমার দিকে এগিয়ে আসছে আর বলছে কোন ছেলেটা কোন ছেলেটা? তাদের মধ্যে একজন আমাকে দেখিয়ে দিল। আমিতো অবাক। কি এমন ঘটলো। ছাত্র বলতে আমি একা আছি কলেজে। স্টাফেরা সবাই আমাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে গেল তিন তলায় প্রিন্সিপালের কাছে। প্রিন্সিপাল আমায় পাশে বসিয়ে সস্নেহে গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন তুমি খুব ভালো কাজ করেছো। তোমার কি বলে প্রশংসা করবো ভেবে পাচ্ছিনা। আমি বললাম স্যার আমি আমার কর্তব্য করেছি মাত্র। আমার জায়গায় অন্য কেউ হলে একই কাজ করতো। এতে প্রশংসা করার কিছু নেই। তখন স্যার আমার মাথায় বুলিয়ে বললেন, বাবা সারাজীবন সততার সঙ্গে অন্যায়ের প্রতিবাদ করবে বলে আমাকে বিদায় জানালেন। এখন তিনি আর বেঁচে নেই। আমি এমন প্রিন্সিপালের জন্য চিরকৃতজ্ঞ। যাক এবার আমার স্টাইপেন্ডের কথায় আসা যাক। টাকা এসেছে জেনে কলেজে গেলাম। আবার লাইন দিয়ে দাঁড়ালাম। দেখি সব ছাত্রের থেকে চল্লিশ টাকা নিয়ে তবেই চেক্ দিচ্ছে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম কিসের জন্য টাকা নিচ্ছেন? বললো স্টাইপেন্ড পাস করাতে কিছু খরচ হয়। তাই এই টাকা নেওয়া হচ্ছে। আমি বললাম আমার স্টাইপেন্ডের জন্য কোথায় কি খরচ করেছেন। আপনাদেরকে এক পয়সাও দেবনা। এই নিয়ে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু হয়েছে। এমন সময়ে কল্লোলদা বলছে এই ওর থেকেটাকা নিওনা। তারপর আমার চেক্ দিয়ে দিল। আমি বাইরে বেরিয়ে চল্লিশ টাকার জায়গায় একশো টাকার মিস্টি কিনে কল্লোলদার হাতে দিয়ে বললাম আপনারা সবাই খাবেন। আর বললাম দেখবেন আপনাদের সামান্য ভুলের কারণে কোনো ছাত্রের ক্ষতি না হয়।