মহাকুম্ভমের উৎস সন্ধানে
অভিজিৎ মুখোপাধ্যায়,
নতুন দিল্লি
ঋষি দুর্বাসা প্রদত্ত অভিশাপঃ
একবার ঋষি দুর্বাসার গমন পথে স্বর্গরাজ্যের অধিশ্বর দেবরাজ ইন্দ্রের সাথে
অতর্কিতে তাঁর দেখা হয়ে গিয়েছিল । দেবরাজ ইন্দ্র বিনম্রতা পূর্বক করজোড়ে
নমস্কার জানানোর পরে ঋষি দুর্বাসা স্নেহবশতঃ নিজের গলা থেকে একটি মালা
খুলে দেবরাজ ইন্দ্রের হাতে সমর্পণ করেছিলেন । ইন্দ্র সেই মালাটি অহঙ্কার
বশতঃ তার বাহন হস্তির শুড়ে পরিয়ে দেওয়ার সময় ঋষি সমর্পিত মালাটি
অসাবধানতায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েছিল । ফলঃস্বরূপ সেই মুহূর্তে মালাটি হাতির
পদদলিতও হয়েছিল । সেই দৃশ্য সন্দর্শনে ঋষি দুর্বাসা অতিশয় ক্রুদ্ধ হয়ে
দেবরাজ ইন্দ্রকে ব্রহ্মশাপ দিয়ে বলেছিলেন—তোমার এত অহঙ্কার ! তাহলে এই
মুহূর্ত থেকে সমগ্র দেবতা কূলের শক্তি নিস্তেজ হয়ে পড়ুক । ঋষি দুর্বাসা
প্রদত্ত অভিশাপে আক্রান্ত দেবতারা সত্যি সত্যি দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন । তখন
অসুররাজ বলি স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল জুড়ে রাজত্ব করছিলেন ।
সমুদ্র মন্থনের পরিকল্পনাঃ
তারপর সমস্ত দেবতারা একত্রিত হয়ে সেই অভিশাপ থেকে পরিত্রান পাওয়ার জন্যে
এবং হারানো শক্তি পুনরায় ফিরে পাওয়ার আগ্রহে তাঁরা শ্রীবিষ্ণু সমীপে
উপস্থিত হয়েছিলেন । শ্রীবিষ্ণু তাঁদের ইঙ্গিত পূর্বক আভাষ দিয়ে বলেছিলেন
দুধের মধ্যে যেমন মাখন লুকিয়ে থাকে সেই প্রকার কোন উপায় খুঁজে বের করতে
হবে । সেকালে যাবতীয় প্রয়োজনীয় বস্তু সমূহ সবই ছিল প্রকৃতির দান । একালের
দিনেও সেই একই নিয়ম প্রচলিত । আমাদের সকল খাদ্যবস্তু সবই প্রকৃতি থেকে
উৎপণ্ণ হয়ে থাকে । সেই সময় সুমেরু পর্বত ছিল দেবতা ও গন্ধর্বদের বিচরণ
ভূমি । একবার সেই পর্বতের মন্দার নামক চূড়ায় বসে দেবতারা নিজেদের মধ্যে
অমৃত লাভের উদ্দেশ্যে সমুদ্র মন্থনের কথা আলোচনা করছিলেন । দেবতারা
ভেবেছিলেন মন্দার পর্বতটিকে তুলে নিয়ে নিজেরাই সমুদ্র মন্থন করবেন অসুরা
তাহলে এই বিষয়ে কিছুই জানতে পারবে না । অমৃত লাভের পরে সেই অমৃত রস পান
করে তাঁরা হয়ে উঠবেন দ্বিগুন শাক্তিশালী ও চিরঅমর । সেই ভাবে তাঁরা
প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন । কিন্তু পরিশেষে সমুদ্র মন্থনের জন্য প্রয়োজনীয়
মন্দার পর্বতটিকে উত্তোলন করতে তাঁরা একেবারেই অসমর্থ ছিলেন ।
দেবতা ও অসুর কর্তৃক সমুদ্র মন্থনঃ
দেবতাদের মনের কথা জানতে পেরে শ্রীবিষ্ণু তারপর পরমপিতা ব্রহ্মাকে নিজের
অভিমত প্রকাশ করে বলেছিলেন-- দেবতা ও অসুররা মিলে একসঙ্গে সমুদ্র মন্থন
করলেই অমৃত পাওয়ার সম্ভাবনা । শ্রীবিষ্ণু অনন্ত নামক সর্পকে সেই
গুরুদায়িত্ব দেওয়ার পরে তিনি পর্বতস্থিত সর্বসমেত মন্দার পর্বতটিকে তুলে
নিয়ে দেবতাদের সমর্পণ করেছিলেন । দেবতারা স্বীয় কর্তব্য পালন পূর্বক
সমুদ্র মন্থনের পূর্বে সমুদ্রের কাছে যথারীতি অনুমতি চেয়ে নিয়েছিলেন ।
অতঃপর কুর্মরাজ সমুদ্র মন্থন হেতু মন্দার পর্বতের তলদেশে আশ্রয় গ্রহণ
করেছিলেন । ইন্দ্র বজ্রের আঘাতে পর্বতের নীচের অংশটি সমান করে দিয়েছিলেন
। অবশেষে মন্দার পর্বত পরিণতি লাভ করেছিল মন্থন দন্ড রূপে আর নাগ বাসুকি
পালন করেছিলেন মন্থন দড়ির ভূমিকা । নাগ বাসুকির মুখের দিকটা ধারণ করেছিল
অসুরেরা আর তাঁর ল্যাজের দিকটা ধারণ করেছিলেন দেবতারা ।
সমুদ্র মন্থন দ্বারা উৎপণ্ণ বিষয় সমূহঃ
দেবতা ও অসুরদের দ্বারা সমুদ্র মন্থন পর্বটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল কার্ত্তিক
মাসের কৃষ্ণপক্ষের ত্রয়োদশ তিথিতে । সেই সমুদ্র মন্থন কালে সমুদ্রগর্ভ
থেকে উৎপণ্ণ হয়েছিল নানাবিধ অমূল্য বস্তু ও রত্ন সম্ভার যেমন কামধেনু
গাভী, সূর্যের উচ্চৈঃস্রবা শ্বেতবর্ণ অশ্ব, ইন্দ্রের ঐরাবত হস্তি,
কৌস্তুভমণি, কল্পবৃক্ষ, রম্ভা নামক স্বর্গের অপ্সরা, দেবী ধনলক্ষ্মী, দেব
চিকিৎসক ধন্বন্তরী, চন্দ্র, স্বর্গের পারিজাত বৃক্ষ, পাঞ্চজন্য শঙ্খ
ইত্যাদি । সবকিছুই দেবতারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছিলেন । সম্মিলিত
দেবতারা সর্বসন্মতিক্রমে চন্দ্রটিকে দেবাদিদেব মহাদেবকে সমর্পণ করেছিলেন
। মহাদেব চন্দ্রটিকে তাঁর শিরোভূষণ করে রাখেন । সেই থেকে মহাদেবের বিশেষ
নামগুলির সঙ্গে শশীভূষণ নামটি যুক্ত হয়ে গিয়েছিল । এরপরে উঠে এসেছিল কলস
ভর্ত্তি হলাহল অর্থাৎ গরল । কিন্তু উভয় পক্ষই হলাহল পূর্ণ কলসটি গ্রহণ
করতে অস্বীকার করেছিল । অবশেষে দেবাদিদেব মহেশ্বর সকলের মঙ্গল সাধনের
উদ্দেশ্যে সেই গরল নিজ কণ্ঠে ধারণ করেছিলেন । তাতে তাঁর কণ্ঠদেশ নীলবর্ণ
ধারণ করে । তাই শিবের আরেক নাম নীলকণ্ঠ । সর্বশেষ উঠে এসেছিল একটি অমৃত
পূর্ণ কলস । সেই অমৃত পূর্ণ কলস সন্মিলিত দেবতারা মিলে শ্রীবিষ্ণুর নিবাস
ভূমি বৈকুণ্ঠে রেখে এসেছিলেন ।
কদ্রু ও বিনতার কাহিনীঃ
এখানে বিশেষ একটি ঘটনার কথা উল্লেখ না করলে বিষয়টা পরিস্কার হবে না
পাঠকের কাছে । ব্রহ্মার মানসপুত্র প্রজাপতি দক্ষের দুই কন্যা ছিল কদ্রু ও
বিনতা নামে । তাঁদের বিবাহ সম্পণ্ণ হয়েছিল ঋষি কাশ্যপের সাথে । ঋষি
কাশ্যপ হিমালয়ে তপস্যায় যাওয়ার প্রাক্কালে স্বীয় দুই পত্নীকে তাঁদের
মনোবাসনা অনুযায়ী বর চাইতে বলেছিলেন । কদ্রু চেয়েছিল পুত্র রূপে তাঁর যেন
এক সহস্র পরাক্রমী বিষধর সর্প হয় । কদ্রুর কথা শুনে বিনতা বলেছিল আমার
সহস্র পুত্রের পরিবর্তে এমন দুটো পুত্র দিন যারা অতীব তেজস্বী ও
শক্তিশালী হয় । ঋষি কাশ্যপ তাঁদের দু’জনকেই এবম অস্তু বলে হিমালয়ের পথে
রওনা হয়েছিলেন ।
সর্প ও গরুড়ের জন্মঃ
কদ্রুর যথাসময়ে এক সহস্র ডিম প্রসব করেছিল এবং যথাসময়ে ডিম থেকে জন্ম
হয়েছিল এক হাজার বিষধর সর্প আর বিনতা মাত্র দুটো ডিম প্রসব করেছিল ।
কিন্তু সময় অতিক্রান্ত হয়ে যাওয়ার পরেও ডিম ফেটে বাচ্চার জন্ম হচ্ছিল না
। বিনতা অধৈর্য হয়ে একটা ডিম ইচ্ছাকৃত ফাটিয়ে দিয়েছিল । দুর্ভাগ্য বশতঃ
সময়ের আগে ডিমটা ফাটিয়ে দেওয়ায় শিশুটি পূর্ণতা লাভ করতে পারেনি । শরীরের
নিম্নভাগটা অসম্পূর্ণ থেকে গিয়েছিল । সে তাঁর মা’য়ের উদ্দেশ্যে মনের
ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিল-- এ তুমি কি করলে মা ? আমি তো তোমার কোন উপকারেই
আসতে পরবো না । তবে একটা কথা শুনে রাখ, তুমি দ্বিতীয় ডিমটি অকালে ফাটিয়ো
না । যদি তেজস্বী ও শক্তিশালী পুত্রের মা হতে চাও তাহলে ধৈর্য ধর । সময়
হলে সে স্বয়ং আত্মপ্রকাশ করবে । এই কথা বলে সে আকাশ পথে সূর্যের দিকে
এগিয়ে যায় । সূর্যোদয়ের সময় প্রতিদিন যে লাল আভা আমরা দেখতে পাই তার নাম
অরুণ । বিনতার প্রথম পুত্রের নাম ছিল অরুণ ।
ইতিমধ্যে একদিন আকাশ পথে উড়ে যাওয়া সূর্যের শ্বেতাভ উচ্চৈঃস্রবা ঘোড়াটিকে
দেখে দুই বোন কদ্রু ও বিনতা তার রূপের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করতে থাকে ।
কদ্রু কথাপ্রসঙ্গে হঠাৎ বলে ওঠে-- ঘোড়াটি সাদা হলেও সম্পূর্ণ সাদা নয় ওর
ল্যাজটি কিন্তু কালো । বিনতা প্রতিবাদ করে সেই মন্তব্যে । অবশেষে দুই বোন
সাদা-কালো বিষয় নিয়ে বাজি ধরে । স্থির হয় যে পরাজিত হবে সে অন্যের
দাসীবৃত্তি গ্রহণ করবে । কদ্রু ছিল বিনতার তুলনায় অতিশয় ধূর্ত । সে তার
সর্প পুত্রদের আদেশ করে তাঁরা যেন সূক্ষ্ম শরীর ধারণ পূর্বক উচ্চৈঃস্রবা
ঘোড়ার ল্যাজটিতে আশ্রয় নিয়ে কৃষ্ণবর্ণে পরিণত করে দেয় । তাহলে সে বাজি
জিতে যাবে এবং বিনতা তাঁর দাসী হতে পারবে । এই অন্যায় প্রস্তাবে কিছু
সর্প তাঁদের মাতৃ আদেশে স্বীকৃতি দিলেও কিছু সর্প মাতৃ আদেশ পালনে
অস্বীকার করেছিল । কদ্রু তাঁদের প্রতি রুষ্ট হয়ে বলেছিলেন-- তোমরা তাহলে
জন্মেজয়ের সর্প যজ্ঞের আগুনে পুড়ে ভস্ম হয়ে যাও । পরের দিন তাঁরা
জয়-পরাজয় নির্ণয় করতে গিয়ে দেখতে পায় ঘোড়ার ল্যাজটি সত্যিই কালো । পূর্ব
শর্ত অনুযায়ী সেই মুহূর্ত থেকে বিনতাকে কদ্রুর দাসীবৃত্তি গ্রহণ করতে
হয়েছিল ।
গরুড় দ্বারা অমৃত কুম্ভ অপহরণঃ
এই ঘটনার বহুকাল পরে নির্দিষ্ট সময় অনুযায়ী অবশিষ্ট ডিম থেকে জন্ম হয়
বিনতার দ্বিতীয় পুত্র গরুড়ের । তাঁর শরীর ছিল মানুষের মতো আর মস্তকটি
পক্ষী সদৃশ । সে যখন আকাশে ভ্রমন করতো সূর্য ঢাকা পড়ে যেত এমন বিশাল ছিল
তাঁর শরীর । তাঁর স্বভাবটি ছিল অতি নম্র এবং দয়ালু । ক্রমে সে দেবতাদের
মিত্র ও অসুরদের শত্রু হয়ে উঠেছিল । দেবতাদের মিত্র হওয়ার কারণে তাঁর
বৈকুণ্ঠ পর্যন্ত অবাধ যাতায়াত ছিল । একদিন মাতা বিনতার দাসীবৃত্তির কথা
জানতে পেরে সে তাঁর বিমাতা কদ্রুর সর্প পূত্রদের জিজ্ঞাসা করেছিল-- কি
করলে আমার মা বিনতা দাসীবৃত্তি থেকে মুক্তি পাবেন ? সর্প পূত্ররা
জানিয়েছিল—যদি স্বর্গ থেকে অমৃত এনে দিতে পার তাহলেই তোমার মা মুক্তি
পাবেন । গরুড় তাঁর মায়ের মুক্তির উদ্দেশ্যে বৈকুণ্ঠ থেকে অমৃত কলস বল
পূর্বক অপহরণ করার সময় সকল দেবতাদের দ্বারা বাঁধা প্রাপ্ত হয়েছিল ।
কিন্তু দেবতারা অমৃত পূর্ণ কলসটি রক্ষা করতে পারেননি । গরুড় বল পূর্বক
কলসটি ছিনিয়ে নিয়ে গিয়েছিল । অতঃপর শ্রীবিষ্ণু তাঁর কাছে অমৃত কলস নিয়ে
যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে গরুড় বিস্তারিত ভাবে তাঁর মাতৃদেবীর দুর্দশার
কথা শ্রীবিষ্ণু সমীপে বর্ণনা করে । সব শুনে শ্রীবিষ্ণু তাঁকে অমৃত কলস
নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে একটি শর্ত রাখেন যদি গরুড় তাঁর বাহন হতে রাজি হয় ।
গরুড় সেই প্রস্তাবে এক কথায় রাজি হয়ে গিয়েছিল । অবশেষে গরুড় সেই অমৃত
পূর্ণ কলস সর্প ভাইদের হাতে তুলে দিয়েছিল মাতৃদেবীকে দাসত্ব থেকে মুক্ত
করার জন্য । শ্রীবিষ্ণু তারপর মোহিনী রূপ ধারণ করে সেই কলস সর্প রাজ্য
থেকে পুনরায় স্বর্গের দেবতাদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন ।
জন্মেজয়ের সর্প যজ্ঞঃ
অভিমন্যুর পুত্র পরীক্ষিৎ একবার বনে বিচরণ করার সময় ক্লান্ত ও তৃষ্ণার্ত
হয়ে পড়েছিলেন । সেই বনের মধ্যে এক পর্ণ কুটির দেখতে পেয়ে সেইদিকে এগিয়ে
যান । সেই কুটিরে ঋষি সমীক বাস করতেন । পরীক্ষিৎ তাঁর কাছে তৃষ্ণা নিবারণ
হেতু জল চেয়েছিলেন । সেই সময় ঋষি সমীক ধ্যানে মগ্ন ছিলেন । রাজার কথা
তিনি শুনতে পাননি । পরীক্ষিৎ ক্রোধের বশে নিকটস্থ একটি মৃত সাপ ঋষি
সমীকের গলায় ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন । ঋষিপুত্র শৃঙ্গি পিতার অপমানের কথা জানতে
পেরে রাজা পরীক্ষিৎকে অভিশাপ দিয়েছিলেন যে, উক্ত ঘটনার ঠিক সাতদিনের
মধ্যে যেন সর্প দংশনে তাঁর মৃত্যু হয় । পরীক্ষিতের পুত্র জন্মেজয় পিতার
মৃত্যুর কথা জানতে পেরে সর্প যজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন । সেই যজ্ঞের প্রভাবে
কদ্রুর অভিশপ্ত সর্প পুত্ররা যজ্ঞের আগুণে পুড়ে ভস্মভূত হয়ে গিয়েছিল ।
(২) কুম্ভ মানে কলস । দেবতাদের তুলনায় অসুররা ছিল মহাপরাক্রমশালী ।
অসুররা যদি সেই অমৃত পান করে অমর হয়ে যায় তাহলে স্বর্গরাজ্য থেকে
দেবতাদের বিদায় করতে তাদের বেশি সময় লাগবে না । পুরাকালে এমনিতেই কারণে
অকারণে এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘর্ষ লেগেই থাকতো । দেবতাদের এই কপট
অভিসন্ধি অবগত হওয়ার পরে অসুররা দেবতাদের পিছু নিয়েছিল অমৃতের ভাগ নেওয়ার
জন্যে । মর্ত্ত্যভূমি থেকে স্বর্গরাজ্যে পৌঁছোতে দেবতাদের গণনা অনুসারে
সময় লেগেছিল বারো দিন অর্থাৎ আমাদের হিসেব অনুযায়ী দীর্ঘ বারো বছর । সেই
কারণে মর্ত্ত্যে একটি পূর্ণকুম্ভ অনুষ্ঠিত হতে সময় লাগে বারো বছর ।
কলস পূর্ণ অমৃত নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় ভারত ভূখন্ডের যে চারটি বিশেষ
স্থানে একেক ফোঁটা অমৃত ছিটকে পড়েছিল সেই পবিত্র স্থানগুলির আধুনিক নাম
যথাক্রমে-- প্রয়াগ, হরিদ্বার, উজ্জয়িনী ও নাসিক । এই চারটি স্থানই নদী
কেন্দ্রিক । প্রয়াগে ত্রিবেণি সঙ্গম অর্থাৎ তিনটি নদীর মিলন স্থল যথা
গঙ্গা-যমুনা-অন্তঃসলিলা সরস্বতী । হরিদ্বার কলুষনাশিনী পবিত্র গঙ্গা তীরে
অবস্থিত । উজ্জয়িনী শিপ্রা নদীর তীরে অবস্থিত আর নাসিক গোদাবরী নদীর তীরে
অবস্থিত । সেই কারণে ভারতের চারটি ভিণ্ণ ভিণ্ণ স্থানে নির্দিষ্ট সময়ে
কুম্ভমেলার আয়োজন করা হয় । বাংলায় জাফর থাঁ-এর আক্রমনের ফলে দীর্ঘ ৭০০
বছর বন্ধ থাকার পরে সম্প্রতি ২০২২ সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার
বাঁশবেড়িয়া অঞ্চলে স্থিত হুগলি-সরস্বতী-যমুনা নদীর ত্রিবেণি সঙ্গমে
কুম্ভমেলার পুনরারম্ভ হয়েছে । যদিও বাঁশবেড়িয়া অঞ্চলের কুম্ভমেলা
অনুষ্ঠানটিকে এখনো ইউনেস্কো স্বীকৃত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায়
অন্তভূক্ত করা হয়নি । ২০১৭ সালে ইউনেস্কো ভারতবর্ষে অনুষ্ঠিত
কুম্ভমেলাটিকে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে ভূষিত করে । হিন্দু
ধর্মাবলম্বী প্রত্যেকটি দেশবাসীদের জন্যে এই শিরোপা একটি পরম গৌরবের বিষয়
। অতীব তাৎপর্যময়পূর্ণ একটি ঘটনা।
কুম্ভমেলার স্থান ও তিথি নির্ধারণঃ
কুম্ভমেলার স্থান নির্ধারিত হয় বৃহস্পতি ও সূর্যের অবস্থান অনুসারে ।
হিন্দুশাস্ত্রে বৃহস্পতি গ্রহকে কল্যান ও সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে গণ্য
করা হয় । মানব জীবনে বৃহস্পতির গুরুত্ব অসীম । সেই কারণে বৃহস্পতি বৃষ
রাশিতে আর সূর্য কুম্ভ রাশিতে অবস্থান করলে ত্রিবেণি সঙ্গম তীরবর্তী
প্রয়াগে অনুষ্ঠিত হয় কুম্ভমেলা । সূর্য মেষ রাশিতে অবস্থান করলে
কলুষনাশিনী পতিতপাবনী পবিত্র গঙ্গা তীরবর্তী অঞ্চল হরিদ্বারে অনুষ্ঠিত হয়
কুম্ভমেলা । সূর্য বৃশ্চিক রাশিতে অবস্থান করলে কুম্ভমেলা অনুষ্ঠিত হয়
শিপ্রা নদীর তীরবর্তী স্থল উজ্জয়িনীতে । বৃহস্পতি ও সূর্য সিংহ রাশিতে
অবস্থান করলে কুম্ভমেলা অনুষ্ঠিত হয় গোদাবরী তটস্থ নাসিকের ত্রম্বকেশ্বরে
। ১৮৩৮ সালে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে মনোমালিন্য সৃষ্টি হওয়ার ফলে একটি
বিশেষ নিয়ম চালু হয়েছিল যার ফলঃস্বরূপ নাসিকের গোদাবরী নদীর তীরে দুইটি
ভিণ্ণ স্থানে পুণ্যস্নান করা হয় । বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের সণ্ণ্যাসীরা স্নান
করেন নাসিকের রামকুন্ডে আর শৈবরা স্নান করেন নাসিক থেকে ৩০ কি.মি. দূরে
ত্র্যম্বকেশ্বর নামক স্থানে ।
সূর্য, চন্দ্র ও বৃহস্পতির রাশিগত অবস্থান অনুযায়ী মেলা আয়োজনের তিথি ও
তারিখ নির্ণয় করা হয় । বিশেষ বিশেষ তিথিতে পুণ্যস্নানই হলো নদী কেন্দ্রিক
জনসমাগমের প্রধান অঙ্গ । যেমন মকর সংক্রান্তি তিথিতে গঙ্গাসাগরের মেলাটিও
সেই একই বার্তা বহন করে । পিতৃপক্ষের দিনগুলিতেও বিদেহী পিতৃপুরুষদের
উদ্দেশ্যে উত্তরপুরুষদের তিল-জল তর্পণের বিধিটিও একই নিয়মে বাঁধা অর্থাৎ
খোলা আকাশের নীচে কোন জলাশয়ের ধারে । একদা মানব সভ্যতার উৎস স্থলটিও ছিল
পঞ্চনদের তীরে । বলাবাহুল্য মানুষের দৈনন্দিন জীবন চর্চ্চার ক্ষেত্রে
নদীর অবদান অপরিসীম ।
জ্যোতির্বিজ্ঞান অনুসারে সূর্যকে পূর্ণ প্রদক্ষিণ করতে বৃহস্পতির সময়
লাগে দীর্ঘ বারো বছর । তাই প্রতি বারো বছর অন্তর অনুষ্ঠিত হয় পূর্ণকুম্ভ
। বারোটি পূর্ণকুম্ভ অনুষ্ঠিত হওয়ার পরে মহাকুম্ভের আয়োজন করা হয় । সেই
মহাকুম্ভমেলার একমাত্র স্থান প্রয়াগ অর্থাৎ এলাহাবাদ ত্রিবেণি সঙ্গমে ।
এছাড়া প্রতি তিন বছর অন্তর অনুষ্ঠিত হয় সাধারণ কুম্ভমেলা । প্রতি ছয় বছর
অন্তর অনুষ্ঠিত হয় অর্ধ কুম্ভমেলা শুধুমাত্র প্রয়াগ ও হরিদ্বারে । চলতি
বছর ইংরেজি ২০২৫ সালের ১৩ই জানুয়ারী দিনটিকে ধার্য করা হয়েছে প্রয়াগে
অনুষ্ঠিত মহাকুম্ভ । কথিত আছে প্রত্যেক বারো বছর অন্তর নির্দিষ্ট সময়
ঘোষিত হওয়ার পরে উক্ত নদীর জল অমৃতের রূপ ধারণ করে । সেই কারণেই
দুর-দূরান্তের গিরিগুহায়, লোকালয়হীন জনশূন্য অরণ্যে বসবাসকারী দশনামী
সাধু-সন্তরা সকল বাঁধা অতিক্রম করে কুম্ভমেলার দুর্বার আকর্ষণ অনুভব করে
ছুটে আসেন তৃষিত, তাপিত জনসাধারণকে অভয়দান করতে এবং নিজেকে আরো বেশি
পবিত্র করার বাসনায় । দৈব ইঙ্গিতের সাহায্যে তাঁরা অনুধাবন করতে পারেন
কুম্ভমেলার ডাক । তাঁদের পুণ্য প্রভাবে মানুষ ধন্য হয়ে যায়, ধরিত্রী হয়ে
ওঠে পবিত্র । মহাত্মাদের দর্শনে জাগতিক বস্তু সমূহকে সাধারণ মানুষের
সাময়িক ভাবে অনিত্য বলে মনে হয় । হৃদয় গভীরে এক অনাস্বাদিত আন্দোলন
সৃষ্টি হয় । সেইজন্যই হয়তো বলা হয় সৎসঙ্গে স্বর্গবাস । এবারের মহাকুম্ভে
পুণ্যস্নানের দিনগুলি যথাক্রমে – ১৩/১/২০২৫ পৌষ পূর্ণিমা, ১৪/১/২০২৫ মকর
সংক্রান্তি, ২৯/১/২০২৫ মৌনী অমাবস্যা, ৩/২/২০২৫ বসন্ত পঞ্চমী, ১২/২/২০২৫
মাঘী পূর্ণিমা ও ২৬/২/২০২৫ মহাশিবরাত্রি ।
কুম্ভমেলায় নাগাসাধুদের প্রাধান্যঃ
কুম্ভমেলায় পুন্যস্নানের প্রথম অধিকার নাগা সাধুদের । তারপর অন্য সকল
সম্প্রদায় ভূক্ত সাধুদের । নাগা সাধুদের ইষ্ট দেবতা হলেন যোগীরাজ শিব ।
শিবের বাসস্থান কৈলাশ পর্বতে সেই কারণে নাগা সাধুরা থাকেন হিমালয়ে,
গিরিগুহায় জনবিরল স্থানে নির্জন এলাকায় । মাতৃ জঠরে শিশুরা যেমন ভাবে
বেঁচে থাকে নাগাসাধুরা বেঁচে থাকেন প্রকৃতির কোলে ঠিক তেমন করে । তাঁরা
বস্ত্র পরিধান করেন না কখনো । নগ্ন অবস্থায় তাঁদের জীবন অতিবাহত হয় ।
তাঁরা খাদ্য বস্তুও গহণ করেন না । তাঁদের আত্মীয়-পরিজন ও স্বয়ং নিজ সমেত
সর্বমোট ১৭টি পিন্ডদান করে দীক্ষা নিতে হয় । শুধু তাই নয় দীক্ষার পূর্বে
তাঁদের পূর্বজন্মের কথা জেনেই তাঁদের দীক্ষিত করা হয় । যোগ্য পাত্র
বিবেচিত না হলে তাঁকে দীক্ষিত করা যায় । দীর্ঘ বারো বছর কঠোর সংযম পালন
করতে হয়ে দীক্ষা নেওয়ার পূর্বে । দীক্ষা নেওয়ার পর মুহূর্ত থেকে তাঁরা
প্রকৃতির কোলে আত্মসমর্পণ করেন এবং দেবাদিদেব মহাদেবকে ইষ্ট দেবতা জ্ঞানে
হৃদয়ে ধারণ করেন । যেহেতু তাঁদের আজীবন নগ্ন অবস্থায় জীবন ধারণ করতে হয়
সেই কারণে তাঁরা লোকচক্ষুর অন্তরালেই থেকে যান । একমাত্র কুম্ভমেলাতেই
তাঁদের প্রকৃত দর্শন পাওয়া যায় । লোকালয়ের বাইরে থাকেন বলেই তাঁদের প্রতি
মানুষের কৌতূহল বেশি থাকে । কিন্তু তাঁরা কোথায় থাকেন কেউ জানতেই পারে না
। অজানা রহস্যাবৃত তাঁদের জীবনযাত্রা । সাধারণ মানুষের ধারণায় তাঁরা চির
রহস্যময় হয়ে বিরাজ করেন । সমাজের কোন কাজেই তাঁরা এগিয়ে আসেন না । যদিও
তাঁদের উপাসনার একমাত্র উদ্দেশ্য জীব জগতের কল্যান সাধন । নাগাসাধু হয়ে
যাওয়ার পরে তাঁদের নিজের বলতে কিছুই অবশিষ্ট থাকে না । যারা আখাড়ায় থাকেন
তাঁদের দিনে সাতটি ঘর থেকে তন্ডুল সংগ্রহ করতে হয় মাধুকরী করে । যদি
কিছুই না জোটে তাঁদের অনাহারে থাকতে হয় সারাটা দিন । নাগাসাধুরা শাস্ত্র
ও অস্ত্র উভয় বিদ্যাতেই বিশেষ পারঙ্গম হন । অষ্টম শতাব্দীতে আচার্য শঙ্কর
(অনেকের মতে সন ৭৮৮ সালের বৈশাখী শুক্লা পঞ্চমীতে শঙ্করের জন্ম) তৎকালীন
ভারতবর্ষ পদব্রজে পরিভ্রমণ করে চারটি ধাম চিহ্নিত করেছিলেন । সেই সময়
বৌদ্ধ ও তান্ত্রিকদের প্রবল প্রতাপ ছিল । তাই সনাতন হিন্দু ধর্মকে
বিধর্মীদের আক্রমন থেকে সুরক্ষিত করার উদ্দেশ্যে তিনি নাগাসাধুদের
সাহায্য প্রার্থনা করেছিলেন । হিন্দুধর্ম রক্ষার্থে তাঁরাই হবেন প্রধান
রক্ষী । তাছাড়া আচার্য শঙ্কর দ্বারা চিহ্নিত দশনামী সণ্ণ্যাসী
সম্প্রদায়কে তিনি একটি বিশেষ সময়ে প্রয়াগ তীর্থে একত্রিত হতে বলেছিলেন ।
আচার্য শঙ্করের অভিপ্রায় ছিল ভারতবর্ষের বুকে সমুদয় সণ্ণ্যাসী
সম্প্রদায়ের মধ্যে যেন চিরকালীন একটি সৌহার্দ বজায় থাকে । সেই প্রচলিত
প্রথার পরম্পরগত রীতি আজও আমাদের ভারতবর্ষে স্বমহিমায় স্রোতস্বিনী নদীর
ধারার মতো সতত বহমান । বর্তমান ভারতবর্ষে আনুমানিক পাঁচ লক্ষাধিক
নাগাসাধুর অবস্থান । তাঁরা যে যেখানেই অবস্থান করুন কেন, কুম্ভমেলা
তাঁদের কাছে পরম আধ্যাত্মিক বিষয় । প্রযুক্তি বিদ্যার কোন প্রকার সাহায্য
ব্যতীতই তাঁরা কুম্ভমেলার আহ্বানে সাড়া দেন । এ এক পরম আশ্চর্যের বিষয়
এবং নিঃসন্দেহে অতীব রহস্যজনক ।
আকবর যখন মহারানা প্রতাপের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে তখন নাগাসাধুরা
মহারানা প্রতাপের পক্ষে থেকে মুঘোল সম্রাট আকবরের বিপক্ষে অস্ত্রধারণ
করেছিলেন । সেই যুদ্ধে আকবর পরাজিত হয়েছিল । আফগানিস্থানের অন্তর্গত
দুরানি রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা এবং শাসনকর্তা আহমেদ শাহ আব্দালি ১৭৪৮ থেকে
১৭৬১ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে পাঁচবার ভারত আক্রমন করেছিল । ১৭৫৭ সালে
চতুর্থবার ভারত আক্রমনের সময় মথুরা বৃন্দাবন ধ্বংস করার পরে সে যখন সৈন্য
সমেত গোকুলের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল তখন নাগাসাধুদের দ্বারাই সে প্রতিহত
হয়েছিল এবং ফলঃস্বরূপ গোকুল রক্ষা পেয়েছিল । বলা যায় নাগাসাধুরাই সনাতন
হিন্দুধর্মের প্রধান ও একমাত্র ধারক ও বাহক । ভারতবর্ষের ইতিহাসে
নাগাসাধুদের অবদান অনস্বীকার্য । কিন্তু আপামর জনসাধারণের মানসিকতায়
তাঁরা নিতান্তই অবহেলিত এবং উপহাসের পাত্র হিসাবে বিবেচিত । পূজনীয়
নাগাসাধুদের প্রতি সহানুভূতিশীল ও যোগ্য সন্মান প্রদর্শন করা আমাদের
বিশেষ কতব্য বলে মনে করি ।
সাধারণ মানুষ কেন যানঃ
দূর-দূরান্ত থেকে হিন্দুধর্মাবলম্বী পুণ্যার্থীরা আসেন এই পবিত্র মেলায়
অংশগ্রহণ করতে । আসেন আধ্যাত্মিক জ্ঞানে আরুঢ় সাধু সঙ্গ লাভের অভিলাষা
নিয়ে । আত্মোণ্ণতির অভিপ্সা চরিতার্থ করতে । অর্থাৎ ক্ষ্যাপা খোঁজে ফেরে
পরশ পাথর । যে কারণে স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন—One touch one glance
can change a whole life । সেই অপার্থিব বস্তু যার স্পর্শে চৈতন্যের উদয়
সম্ভবপর হয়ে ওঠে এক লহমায় । যেমন ১৮৮৬ সাসে ১লা জানুয়ারী কাশীপুর উদ্যান
বাটিতে শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব হঠাৎ কল্পতরু অবস্থায় যাদের প্রতি
কৃপা করে বলেছিলেন – ‘তোমাদের চৈতন্য হোক’ । সেই পরম বস্তু যা পাওয়ার পরে
মানুষের আর কিছুই পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকে না । কারণ আধ্যাত্মিক গুণ
সম্পণ্ণ না হলে পরলোকে গিয়েও অশেষ কষ্ট পেতে হয় । মৃত্যুর পরে পৃথিবীর
একটি কণাও কারো পক্ষে সাথে নিয়ে পরলোকে যাওয়া সম্ভব নয় একমাত্র জীবদ্দশায়
প্রাপ্ত অধীত সংস্কার ছাড়া । মন যদি কামনা-বাসনা বর্জিত না হয়, ঈশ্বর মু
খি না হয় তা হলে প্রতি নি য় ত ভো গ ঐ শ্বর্যে র প্র তি ম ন আ কৃ ষ্ট হয়ে
থা কবে তাতে মৃত্যু র পরে সুখের চেয়ে দুঃখের আধিক্যটাই বেশি অনুভূত হওয়াই
স্বাভাবিক । ঈশ্বর প্রাপ্তির একটা মহৎ উদ্দেশ্য এই যে, পরলোক গমনের পরে
তাঁকে মৃত্যু যন্ত্রনা আর ভোগ করতে হয় না এবং তাঁকে বারম্মার
জন্ম-মৃত্যুর কবলে পড়ে কষ্ট পেতে হয় না । মহাপুরুষরা আসেন আপামর
জনসাধারণকে মায়াময় সংসার থেকে উদ্ধার করতে । তাঁরা আসেন মায়া ঘেরা সংসারী
মানুষদের আপন ত্যাগ, তিতিক্ষা, বৈরাগ্য ও ভোগ ঐশ্বর্য বর্জিত জীবনের
সাহায্যে অনুপ্রাণিত করতে । জীবনে বেঁচে থাকার পক্ষে খাওয়া পরাও যে
বিলাসিতার অঙ্গ সেই পাঠ শেখাতে আসেন । জীবনের সবকিছু তুচ্ছজ্ঞানে
পরিত্যাগ করে নিজে আচরি ধর্ম অপরকে শিক্ষা দিতে তাঁরা প্রত্যেক
কুম্ভমেলায় অংশগ্রহণ করতে আসেন । আমরা দেহ সর্বস্ব জীব ভোগ লালসার প্রতি
এতটাই আশক্ত যে পরলোকের কথা আমরা একবারের জন্যেও চিন্তা করি না । আমাদের
কানেই ঢোকে না তত্ত্ব কথা । আমাদের ধারণা পৃথিবীটা আমার এবং আমি এই
পৃথিবীর চিরস্থায়ী বাসীন্দা । আমার লয় নেই ক্ষয় নেই । আমি অজেয় অমর
আমাদের মৃত্যু নেই । হয়তো একদিন আক্ষেপের সুরে খৃষ্টান কবির মতো বলতে হবে
–“আশার ছলনে ভুলি কি ফল লভিনু হায় তাই ভাবি মনে” ! অথবা সাধক রামপ্রসাদ
যেমনটি বলেছিলেন-- “এমন মানব জীবন রইলো পতিত আবাদ করলে ফলতো সোনা” ।
একবারও ভেবে দেখি না যে, কত শত মহাপুরুষেরা এই ধরণীর বুকে জন্মগ্রহণ করেও
মানব কল্যান হেতু জাগতিক ভোগ ঐশ্বর্য থেকে স্বেচ্ছায় কেন নিজেদের দূরে
সরিয়ে রাখেন । কিসের জন্যে তাঁদের এই আত্মত্যাগ ? আসলে তাঁরাই হলেন
প্রকৃত দূরদর্শী সম্পণ্ণ ব্যক্তি । কারণ বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে তাঁরা
দূরের জিনিষ অনুধাবন করার বিশেষ ক্ষমতা রাখেন । জন্মের পরে মানুষের স্থান
হয় ইহলোকে । মৃত্যুর পরে তাঁকে যেতে হয় পরলোকে । অথচ সেই পরলোক আমাদের
ভাবনায় অলীক স্বপ্নবৎ মনে হয় । সণ্ণ্যাসীরা সেই অদৃশ্য পরলোকের কথা
চিন্তা করেই ইহজন্মে কৃচ্ছ্রসাধন অবলম্বন পূর্বক জীবন অতিবাহিত করেন ।
আমাদের মতো বদ্ধজীবদের ধারণায় যা অতিশয় কল্পনাতীত ব্যাপার । তাই বলা যায়
সাধারণ মানুষ কেবল দ্বিপদ গৃহপালিত জন্ত ছাড়া আর কিছু নয় । যারা ভবিষ্যৎ
চিন্তা করে না তাঁরা যে নিতান্তই পশু তুল্য !
সাধু মহাত্মাদের অবদানঃ
আমাদের দেবভূমি ভারতবর্ষে সাধু মহাত্মাদের অবদান অনস্বীকার্য । তাঁরা
গুপ্তযোগী, তাঁদের সকল ক্রিয়াকর্মই মানুষের কল্যানে নিয়োজিত অথচ সবই
অনুষ্ঠিত হয় লোকচক্ষুর অন্তরালে অতি গোপনে । তাঁরা কখনোই প্রকাশ্যে আসেন
না । আধ্যাত্মিক জগতে হিন্দু ধর্মের তুলনায় সকল ধর্মকেই শিশু বলা যায় ।
মানব সভ্যতার উন্মেষ কাল থেকে হিন্দু ধর্মগ্রন্থে যা কিছু লিপিবদ্ধ করা
আছে তা নিঃসন্দেহে অতি বিস্ময়কর । যে ধর্মের কোন নির্দিষ্ট প্রর্বতক নেই
এবং মানুষের সার্বিক কল্যানে যা নিবেদিত তাকেই বলা হয় সনাতন । তাই হিন্দু
ধর্মই একমান সনাতন পদবাচ্য । সমগ্র বিশ্ব জুড়ে আজ হরিনাম সংকীর্তনে মানুষ
মেতে উঠেছে অথচ আমরা কখনো কারোর উপর আধিপত্য বিস্তার করতে যাইনি ।
ভারতবর্ষ কখনোই সাম্রাজ্য বিস্তারের পক্ষপাতী ছিল না বা বিধর্মীদের জোর
করে ধর্মান্তরকরণেও তারা আদৌ বিশ্বাসী নয় । এই ঘৃণ্য বিষয়ে
হিন্দুধর্মাবলম্বী প্রত্যেকটি মানুষের ঘোর আপত্তি । তৎসত্ত্বেও ভারতবর্ষ
নিজস্ব স্বকীয়তা এবং চারিত্রিক স্বভাব গুণে আজও জগৎশ্রেষ্ঠ । আধ্যাত্মিক
জ্ঞানে সে সকল দেশের সেরা । ভারতবর্ষকে শোষণ ও শাসন করবে বলে
অঙ্গীকারবদ্ধ কত শত বিধর্মী যোদ্ধাদের আগমন হয়েছিল এই ভারতবর্ষের বুকে
কিন্তু কেউই ক্ষুণ্ণ করতে পারেনি তাঁর ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি । যেমন ৩৭৬
খ্রিষ্ট পূর্বাব্দে সুদূর মেসিডোনিয়া থেকে আগত গ্রীক সম্রাট মহামান্য
আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট থেকে শুরু করে হাল আমলে ১৯৪৭ সালে স্বভূমে
প্রত্যাবর্তনকারী বিগত তিনশো বছরের সাম্রাজ্যলোভী বর্বর ব্রিটিশ । আজ
তারা সকলেই ইতিহাসের পাতায় চির অবহেলিত । অথচ আজও ভারতবর্ষের বুকে
স্বমহিমায় ও সগর্বে অনুষ্ঠিত হয়ে চলেছে সনাতন রীতি-নীতি । সমস্ত জগৎবাসীর
কাছে কুম্ভস্নান এক বিস্ময়কর ঘটনা । পবিত্রতম কুম্ভমেলাকে কেন্দ্র করে
কোটি কোটি জনসমাবেশ একমাত্র পূন্যভূমি ভারতবর্ষ ব্যতীত পৃথিবীর আর কোন
ধর্মালম্বীদের উৎসবকে কেন্দ্র দেখা যায় না ।
হিন্দু ধর্মগ্রন্থে কুম্ভমেলা সম্পর্কে কোন উল্লেখ নেই । যদিও
প্রয়াগতীর্থে পুন্যস্নান উপলক্ষে সাধু সমাবেশ বহু প্রাচীন একটি রীতি ।
ভারতবর্ষে খৃষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে মৌর্য বংশের রাজত্ব চলাকালীন
গ্রীক পরিব্রাজক মেগাস্থিনিস তাঁর ‘ইন্ডিকা’ নামক দিনলিপিতে পর্যন্ত একটি
প্রাচীন পুন্যস্নান পর্বকে কেন্দ্র করে বর্ণনা করে গিয়েছেন । কনৌজের
অধিশ্বর হর্ষবর্দ্ধনের রাজত্বকালে (৪/৬/৫৯০ – ৬৪৭) ৬৪৪ খৃষ্টাব্দে তিনিই
সর্বপ্রথম প্রয়াগে আজকের কুম্ভমেলা সদৃশ বৃহত্তম জনসমাবেশের সূত্রপাত
করেছিলেন । সেই থেকে আজ পর্যন্ত ভারতবর্ষের মাটিতে পুণ্যস্নান পর্বকে
কেন্দ্র করে সগর্বে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে পৃথিবীর বৃহত্তম জনসমাগম কখনো
কুম্ভমেলা নামে কখনো বা গঙ্গাসাগর মেলা নামে ইত্যাদি । সপ্তম শতাব্দীতে
চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাং পর্যন্ত তাঁর দিনলিপিতে উল্লেখ করেছিলেন
তৎকালীন ভারতবর্ষে প্রয়াগতীর্থে অনুষ্ঠিত আজকের দিনের মতোই একটি
জনসমাবেশের কথা ।
যদিও উনিশ শতকের আগে কুম্ভমেলা নামে সাধু সমাগমের কোন প্রামাণিক ঐতিহাসিক
তথ্য পাওয়া যায় না । গবেষক কামা ম্যাকলিনের মতানুসারে ১৮৫৭ খৃষ্টাব্দে
সিপাহী বিদ্রোহের পরে ওরিয়েণ্টালিজমের প্রতিক্রিয়া হিসেবে প্রাচীন মাঘী
পূর্ণিমার পুণ্যস্নান পর্বটিকেই আধুনিক কালে কুম্ভমেলা নামে চিহ্নিত করা
হয়েছে বলে তিনি মনে করেন । ২০১৩ সালে কুম্ভমেলাকে কেন্দ্র করে প্রায় বারো
কোটি মানুষের সমাগম হয়েছিল । অনুমান করা হচ্ছে যে ২০২৫ সালে কুম্ভমেলায়
জনসমাবেশ দাঁড়াবে চল্লিশ কোটির উপর ।
কুম্ভমেলা নিঃসন্দেহে আধ্যাত্মিক ও সামাজিক অনুষ্ঠান যা পৃথিবীর ইতিহাসে
বিরল । প্রকৃতি ও মানবতার পবিত্র মিলন ক্ষেত্র কুম্ভমেলার প্রাঙ্গন ।
একজন সনাতন হিন্দুধর্মাবলম্বী হিসেবে কুম্ভমেলা অবশ্যই আমাদের জন্যে
প্রকৃত অর্থে গর্বের বিষয় । পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শান্তিপূর্ণ জনসমাবেশ ঘটে
কুম্ভমেলাকে কেন্দ্র করে । কুম্ভমেলায় নিরাপত্তার কোন সমস্যা নেই তবুও
ভারত সরকারের পক্ষ থেকে জনসাধারণের স্বার্থে বিশেষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার
প্রতি তার সজাগ দৃষ্টি থাকে তা অস্বীকার করা যায় না । পূর্বে কুম্ভমেলা
যেরূপ অনুষ্ঠিত হতো আজও সেই একই নিয়মে পালিত হয় । পাপ স্খলনের আশায় কয়েক
কোটি পুণ্যার্থী অমৃত তুল্য নদীর জলে ভক্তি-নম্র চিত্তে অবগাহন করে
মানসিক শান্তি ও ইহজন্মের পুণ্য অর্জন করেন ।
প্রসঙ্গতঃ বলে রাখি কুম্ভমেলার প্রথম বাঙালি পরিচালক ছিলেন ১০৮
শ্রীরামদাস কাঠিয়াবাবার শিষ্য শ্রীসন্তদাস কাঠিয়াবাবা তাঁর পূর্ব নাম ছিল
তারাকিশোর চৌধুরী । (3362)