লেবু বৃত্তান্ত
অনিন্দিতা গুড়িয়া,
নিউ-দিল্লি
আমার দাদুর গাছপালার ভীষণ শখ। একবার স্থানীয় এক বড় কৃষি মেলার
এক্সিবিশনে আমার দাদুর হাতের বিভিন্ন ধরনের লেবুর গাছ ফার্স্ট প্রাইজ
পায়। আমাদের সকলের সে কি আনন্দ! সেই সময় আমাদের ফাইনাল পরীক্ষা চলছিল
তাই সাত দিন ধরে চলা মেলা ও এক্সিবিশনের শেষ দিনে আমরা মেলায় উপস্থিত।
ঘুরে ঘুরে সব কিছু দেখার পর দাদুর ফার্স্ট প্রাইজ পাওয়া সাধের লেবু
গাছের কাছে গেলাম।
বিভিন্ন লেবু গাছের বিভিন্ন সাইজের পাতা এবং ডাল বিন্যাস ও ফলের রং এবং
আকার দেখে আমরা নানান ধরনের প্রশ্ন করি দাদুকে। সকলের সব প্রশ্নের উত্তর
দিয়ে দাদু সবাইকে বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন -
এই বড় লেবুটার নাম বাতাবি লেবু, এটা কমলালেবু, এটা মুসাম্বি, এটা
পাতিলেবু, এটা গোঁড়া লেবু, এটা গন্ধরাজ লেবু আর সবশেষে এইযে দেখছো
সুন্দর সবুজ রঙের লম্বা ধরনের রসে ভরা এই লেবু গুলি, এর নাম কাগজি লেবু।
আমাদের মধ্যে সবার ছোট নন্তু, বয়স এই বছর পাঁচেকের মতো। হঠাৎ ফিক্ করে
হেসে বিজ্ঞের মতো সে বললে -
এমা এটা কেমন নাম, কাগজি !
এটাতো কাগজের তৈরি নয় বা কাগজের মত দেখতেও নয়, তবে এর নাম কাগজি হল কি
করে!
তখন তাকে নামের বৃত্তান্ত বোঝাতে গিয়ে দাদুর মুখে যে গল্প আমরা
শুনেছিলাম তাই লিখছি । আমার দাদু শুরু করলেন তার গল্প।
তার আগেই অবশ্য আমাদের প্রত্যেকের হাতে হাতে এসে গিয়েছে মেলা থেকে কেনা
সদ্য ভাজা জিলিপি, কচুরি, আর খাস্তা গজায় ভরা ছোট ছোট ঠোঙা। সেগুলির
সদ্ব্যবহার করতে করতে আমরা শুনছিলাম দাদুর গল্প। দাদু বলতে শুরু করলে তার
গল্প।
-আমার মামার বাড়িতে ছিল বিরাট একটি ফলের বাগান। সেই বাগানে কি ফল ছিল
না, আম জাম কাঁঠাল লিচু চালতা জামরুল বাদাম পেয়ারা আতা ডালিম পেঁপে
সবেদা কলা আর ছিল একটি ঝাঁকড়া লেবুর গাছ। প্রচুর লেবু হতো সেই গাছে।
আমাদের মামার বাড়ির ভোজপুরি দারুন রামু সব সময় বাগানে চৌকিদারি করতো।
একটা ফলেও হাত দিতে দিতো না বাইরের কাউকে।
একবার হল কি একসময় বেশ কিছুদিন ধরে খুব কাকের উৎপাত হলো সে অঞ্চলে।
ভোরবেলায় আসে আর সারাদিন ধরে জিনিসপত্রে ঠোঁট মেরে মেরে জিনিসপত্র নষ্ট
করে সবাইকে একেবারে নাস্তা নাবুদ করেমার ছিল। সেই কাকেদের দিকে তাক করে
ঢিল ছুঁড়লে বা চিৎকার করলে এমনকি বন্দুকের আওয়াজে বা টিনের
ক্যানেস্তারা বাজিয়েও কোন কিছুতেই যখন কাক বাবাজীদের অত্যাচার কমে না
তখন দারোয়ান রামসিং আমার দিদান কে বললে-
"মাইজি কৌয়া এই সবে ভাগবে না, লাগছে উকে তুষামুদি করতে লাগবেক"।
একে কাকের জালা, তার ওপরে রামু সিংয়ের হিন্দি বাংলা মেশানো খিচুড়ি
ভাষায় দিদান বিরক্ত হয়ে বললেন-
যা করতে হয় করগে, আর তো পারা যায় না।
এরপর রামু সিং করল কি একটা বড় বাঁশের আগায় কিছু ছেঁড়া কাপড় কাগজ
ইত্যাদি দিয়ে বেঁধে ঝালরের মত করে তাতে বেশ কিছু ভাঙ্গা শামুকের মালা
করে বেঁধে দিলে। এতে করে যখনই সেই বাঁশের ঝালর ধরে রাম সিং নাড়া দেয়
তখনই কাপড় আর কাগজ নড়ে ঝপাৎ ঝপাৎ করে আর সাথে ভাঙ্গা শামুকের মালার
বিশ্রী শব্দ ওঠে ঘটাং ঝনট কটাং ইত্যাদি।
সব জায়গা থেকে তাড়া খেয়ে কাকগুলো মামাদের ঘন ফলের বাগানে আশ্রয় নিত
আর সবচেয়ে বেশি বসতো একটু নিচু ঘন ঝুপসি লেবু গাছটার ডালে। তাই রাম সিং
সেই লম্বা বাঁশের ঝালর নিয়ে সেই লেবু গাছটি কে ঘুরে ঘুরে চিৎকার করে তার
দেশোয়ালী ভাষায় কিছু বলতো, যার মধ্যে কাকের তোষামোদির জন্য বোধ হয়
কাকের সাথে জি শব্দটা যোগ করে চিল্লাতো- 'কাকজি', 'কাগজি' ইত্যাদি! আর
দেখতে না দেখতে এর দিন দুয়েকের মধ্যে কেমন করে না জানি সব কাক একেবারে
সেই তল্লাট ছেড়ে পালালো। ব্যাস সেই থেকে ওই লেবু চাইলেই রামসিং জিজ্ঞেস
করত-
" কোন সা দিব বাবু, কাগজি বালা? "
সেই থেকে ওই যে লেবুটার নামকরণ হয়ে গেল আজও তা চলে আসছে।
দাদুর গল্প শেষ, আমাদের ঠোঙাও খালি! আমি ক্লাস সেভেনে পড়ি, বেশ বড়। তাই
দাদুর গল্পটা যে বানানো গল্প এটা বেশ বুঝতে পারলাম। কিন্তু নন্তু আর বাকি
সব কচিকাঁচারা সেই গল্পই বিশ্বাস করল। তবে দাদুর সেই গল্প আমরা সবাই বেশ
উপভোগ করেছিলাম।