লুলুং-এর প্রথম আলো (সলতে পাকানোর পর্ব)
গৌরাঙ্গ বন্দ্যোপাধ্যায়,
কলকাতা
বেড়ানোর নেশা আমার চিরকালের। তবে হ্যাঁ, সাধ আর সাধ্যপূরণের ফাঁকটুকু
ভরাট করতে পারার অপারগতায় সেটা অনেক সময়ই সম্ভব হয় না বা পিছিয়ে যায়। তাই
বাবা রেল কর্মচারী এবং পাস হোল্ডার হওয়া সত্ত্বেও কলেজ জীবনে প্রবেশের
আগে পর্যন্ত আত্মীয়স্বজনের বাড়ি বাদ দিয়ে অন্যত্র ভ্ৰমণ আমার দু'বারের
বেশি হয়ে ওঠেনি - একটি নবম শ্রেণীতে বাঙালির প্রিয় 'দীপুদা' র অন্তর্গত
পুরী এবং অপরটি ১৯৭৮ সালের সেপ্টেম্বর অক্টোবরে ভয়ংকর বন্যার সময় ইস্ট
কোস্ট বরাবর দীর্ঘ ১৫ - ২০ দিনের দক্ষিণ ভারত ভ্ৰমণ - মাদ্রাজ (অধুনা
চেন্নাই), ব্যাঙ্গালোর (অধুনা বেঙ্গালুরু), মাইসোর (অধুনা মহীশূর),
কোয়েম্বাটোর, তাঞ্জোর (অধুনা থাঞ্জাভুর), ত্রিচি (অধুনা তিরুচিরাপল্লী),
মাদুরাই, রামেশ্বরম, কন্যাকুমারী, বিজয়ওয়াদা ও পুরী। এছাড়াও স্কুলে
পড়াকালীন আত্মীয়ের বাড়ি বিলাসপুর (তথা অমরকণ্টক), ধানবাদ - ঝরিয়া এবং
মুর্শিদাবাদের বেলডাঙা ও বর্ধমানের পূর্বস্থলীতে বেড়াতে যাওয়াকে ভ্ৰমণ
হিসাবে ধরা গেলেও যেতে পারে। আজ অবসর জীবনে প্রবেশ করার পর সেই সব কথা
খুব মনে পড়ে।
সে যাই হোক, ১৯৮০ সালের প্রারম্ভে কলেজ জীবনে প্রবেশের কয়েক মাস আগে
বেলুড় পাবলিক লাইব্রেরিতে আমার হাতে আসে শ্রী সুবোধ কুমার চক্রবর্তী
মহাশয়ের লেখা 'রম্যানি বীক্ষ - প্রথম পর্ব'। আমি তখন বেলুড় রামকৃষ্ণ মিশন
বিদ্যামন্দিরের দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্র। পড়ার খুব চাপ। কিন্তু তা সত্ত্বেও
বইটি যাকে বলে 'গোগ্রাসে গিললাম'। এরপর শুরু হল আমার মানস ভ্ৰমণ। স্টাডি
টাইম এ হোস্টেল সুপারিনটেনডেন্ট মহারাজের চোখ ফাঁকি দিয়ে, বিকেলবেলা মাঠে
খেলতে না গিয়ে ছাদে বসে ও অন্যান্য বিভিন্ন সময়ে চলল ঐ বই পড়া। শুধু
প্রথম খন্ড নয়, একের পর এক বেশ কয়েকটা খন্ড পড়া হল। কিন্তু এরপর উচ্চ
মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হল। বেলুড়ের হোস্টেল থেকে বাড়ি ফিরে গেলাম। দু'এক
মাসের মধ্যেই আবার চলে এলাম শিবপুর B E College এর হোস্টেলে। 'রম্যানি
বীক্ষ' র সঙ্গে আমার যোগসূত্র ছিন্ন হল কয়েকমাসের জন্য। যেহেতু আমি
ন্যাশনাল স্কলারশিপের টাকায় পড়াশুনা করতাম (হোস্টেল খরচ বাবা খুব কষ্ট
করেই দিতেন), তাই কিছু পাঠ্য বই কেনা সম্ভব হলেও, গল্পের বই বা ভ্ৰমণ
কাহিনী কেনার কথা চিন্তা করাও ছিল অসম্ভব। তবে ইচ্ছাশক্তির একটা দাম আছে।
তাই বোধহয় আমার এক ঘনিষ্ঠ সম মানসিকতার বন্ধু বেলুড় বিদ্যামন্দিরে
ফিজিক্স অনার্সে ভর্তি হল এবং বেলুড় পাবলিক লাইব্রেরি থেকে 'রম্যানি
বীক্ষ' পেতে লাগল। আমি সপ্তাহান্তে গিয়ে তার থেকে বই নিয়ে আসতাম ও পরের
সপ্তাহে ফেরত দিতাম। এইভাবে একে একে আমার সবকটি খন্ডই পড়া হয়ে গেল। আর
যথারীতি সারা ভারতবর্ষ ভ্ৰমণও সম্পন্ন হল। অবশ্যই মানস ভ্ৰমণ।
এরপর ১৯৮৪ সালের জুন মাসে যখন কর্মজীবনে প্রবেশ করলাম, ছয় মাসের ট্রেনিং
পিরিয়ড শেষ হবার পর আমি পোস্টিং নিলাম সার্ভিস ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে
কাস্টমার সার্ভিস সেক্শনে। এর দুটি প্রধান কারণ: (১) যত শারীরিক কষ্টই
হোক না কেন, যতই পরিবারের থেকে দূরে থাকতে হোক না কেন, আমি কর্মজীবনের
অধিকাংশ সময় ভারতবর্ষের বিভিন্ন শহরে, গ্রামে বা গঞ্জে কর্মসূত্রেই ঘুরতে
পারব এবং কাজের ফাঁকে সময় বের করে ঠিক নতুন নতুন দ্রষ্টব্য খুঁজে বের
করতে পারব। যার সুবাদে আমি ভারতের দু'একটি রাজ্য বাদে সর্বত্রই ভ্ৰমণ
করবার সুযোগ পেয়েছি প্রথম ১০ বছরের কর্মজীবনে। এবং (২) আমার কর্মজীবনে
প্রবেশের আগেই বাবা অবসর গ্রহণ করায় বাড়ির বড় ছেলে হবার সুবাদে আমাকেই
সংসারের হাল ধরতে হয়েছিল। অফিস ট্যুরের কিছু অর্থকরী সুযোগ সুবিধা বেশি
থাকায় সংসারের হাঁ বোজানোর কাজটাও কিছুটা সহজ হবার কথা। এবার আমার
কর্মজীবনের একটি স্থানের ভ্ৰমণ সংক্রান্ত কয়েকটি টুকরো স্মৃতি পরিবেশন
করি।
সৌরকোষের ছ্যাঁকা, পাগমার্ক-পটিমার্ক ও চুলকানি (লুলুং, সিমলিপাল,
ময়ূরভঞ্জ জেলা, ওড়িশা) সময়টা ১৯৯০ সালের জানুয়ারী মাস। বাবুঘাট থেকে
ভোরবেলা C S T C র বাস ধরে আমরা চলেছি ওড়িশার বারিপদা শহর অভিমুখে।
গন্তব্য সেই সময়ের অতি বিখ্যাত পোষ্য বাঘ 'খৈরী' (তখন মৃত) খ্যাত
সিমলিপাল জঙ্গলের অন্তর্গত নতুন একটি স্থান 'লুলুং'। সেখানে নতুন
ইকো-ট্যুরিজম গেস্ট হাউস (এখন নাম লুলুং অরণ্য নিবাস) তৈরী করার কাজ
চলছে। আমরা - অর্থাৎ আমাদের ওয়েবেল অফিসের সোলার সেল (সৌরকোষ) প্রজেক্টের
পুরো দল। অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রজেক্ট ম্যানেজার পোস্টে প্রমোশন পাবার পর
এটিই আমার প্রথম ট্যুর। তাও আবার মাত্র ২৬ বছর বয়সে, চ্যাটার্জির সঙ্গে
জয়েন্ট টীম লিডার হিসাবে। আমার টীম মেম্বারদের একজন বাদে বাকি সবাই বয়সে
আমার থেকে সিনিয়র। একজন আমার সহপাঠী,বন্ধু ও আমার থেকে এক বছরের বড় -
চ্যাটার্জি। তবে বয়সে জুনিয়রমোস্ট মেম্বার গাঙ্গুলির পরিশ্রমক্ষমতা,
কর্মদক্ষতা, প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব ও যে কোন পরিস্থিতিতে মানিয়ে নেবার
ক্ষমতা অসাধারণ। আমি ওর অনেক গুণ আহরণ করার চেষ্টা করেছি, তবে ওর বেপরোয়া
স্বভাবের জন্য মাঝে মাঝে সমস্যাতেও পড়তে হয়েছে। এছাড়া টীম মেম্বারদের
মধ্যে যাঁরা ছিলেন তাঁদের মধ্যে একজনের কথা পরে বারবার বলব - সরকারদা।
তবে সে কথা যথাসময়ে।
বাস ভাল ছন্দেই চলছিল, কিন্তু বিহার (অধুনা ঝাড়খন্ড), পশ্চিমবঙ্গ ও ওড়িশা
সীমান্তে অবস্থিত গঞ্জে (নাম মনে নেই) পৌঁছে সব গেল তালগোল পাকিয়ে। বিশাল
লরির জ্যাম। বাস ড্রাইভার কন্ডাক্টার বললেন "কতক্ষনে জ্যাম ছাড়বে কে
জানে? দেড় - দু ঘন্টার কম নয়। আবার তিন চার ঘন্টাও হতে পারে।" মিনিট
পনেরোর মধ্যেই ওনারা জানালেন যে এখানেই লাঞ্চ ব্রেক দেওয়া হল, এরপর
বারিপদার আগে বাস কোথাও আর দু তিন মিনিটের বেশি দাঁড়াবে না। তাই মাত্র দু
আড়াই ঘন্টা আগেই কোলাঘাটে আমরা সবাই ভরপেট প্রাতরাশ করা সত্ত্বেও
সেখানকার ঝুপড়ি দোকানগুলোর মধ্যে একটিকে খুঁজে বের করলাম যেখানে ভাত
পাওয়া যাচ্ছে। সেখানেই ডিম-ভাত দিয়ে মধ্যাহ্নভোজ সারলাম।
অবশেষে দুপুরের দিকে বাস সচল হল। এবার প্রায় আধ ঘন্টাটাক ধু ধু মাঠের
মধ্যে দিয়ে বাস যাবার পর হঠাৎ ড্রাইভার বাসটিকে সরু পিচ রাস্তার একপাশে
সুরকির সরু অংশের উপর দাঁড় করিয়ে কেবিন থেকে নেমে আলপথ ধরে দে ছুট। কয়েক
মিনিটের মধ্যেই দূরের কলাগাছ আমগাছে ছাওয়া জায়গার মধ্যে সে ভ্যানিশ। সব
যাত্রীরাই হতভম্ব। কন্ডাক্টারকে জিজ্ঞেস করতে সে ঠোঁট উল্টাল। কেউ কেউ
উৎকন্ঠিত হয়ে জানতে চাইল "এখানে ডাকাত-টাকাত আসবে না তো!" সংক্ষিপ্ত
উত্তর "না।" প্রায় মিনিট পনের - কুড়ি কাটার পর অধিকাংশ যাত্রী ক্ষিপ্ত
হয়ে কন্ডাক্টারকে গালিগালাজ করতে শুরু করল। যাত্রীরা বলল "ড্রাইভার বলল
কোথাও দু তিন মিনিটের বেশি দাঁড়াবে না। এদিকে নিজেই ২০ মিনিটের উপর
হাওয়া। কী ব্যাপার কী! ড্রাইভার যদি না থাকে তবে তুমিই আমাদের বাস চালিয়ে
নিয়ে চল।" কন্ডাক্টার মুচকি হেসে বলল "নিয়ে তো যেতেই পারি। কিন্তু তাতে
আপনাদের বারিপদা পৌঁছানোর থেকে উপরে পৌঁছানোর সম্ভাবনা বাড়বে। রাজি আছেন
তো!" উৎকলবাসীদের সঙ্গে ওড়িয়া ভাষায় ওনার কিছুক্ষন কথা কাটাকাটি হল। আমি
ওনাকে ভিড় থেকে আলাদা করে টেনে নিয়ে গিয়ে যখন ভালোভাবে জানতে চাইলাম
"ড্রাইভার কোথায় গেছে সত্যিই কী আপনি জানেন না?" তখন উনি মুচকি হেসে
বললেন "বাসে ওঠার সময় দিলীপ বলছিল পেটে মোচড় দিচ্ছে। ও মনে হয় বড়বাইরে
গেছে, এখনই এসে পড়বে।" এই কথা শেষ হতে না হতে দূরে গাছপালার মধ্যে
ড্রাইভারের অবয়ব চোখে পড়ল। যত দ্রুত নিষ্ক্রান্ত হয়েছিল ততটাই স্লো মোশনে
প্রশান্ত মুখে সে এগিয়ে আসছে বাসের দিকে। যাত্রীদের হৈ হল্লা শুনে সেই
গতি একটু দ্রুত হল ঠিকই, কিন্তু এরপর দিলীপ ড্রাইভার সম্পূর্ণ বধির সেজে
সব কোলাহল উপেক্ষা করে বাস ছুটিয়ে দিলেন।
বেশ কিছুক্ষন পর একটি বেশ বড় গঞ্জে বাস থামল। জায়গাটির নাম বেশ অভিনব -
বিষয়ী। বিষয়ী মানুষ হয় জানতাম, কোন স্থানও যে বিষয়ী হতে পারে জানা ছিল
না। এখানকার অধিবাসীরা কি সবাই অতিমাত্রায় বিষয়ী? কে জানে? আরো বেশ
কিছুক্ষন পর একটা ছোট পাহাড় টপকে বিকেল চারটে নাগাদ আমরা পৌঁছে গেলাম
বারিপদা। সিনিয়রমোস্ট হিসেবে আমাদের দলের ট্যুর ম্যানেজার হয়েছিলেন
মালাকারদা। উনি বাস থেকে নেমেই তিন-চার জনকে (তার মধ্যে সরকারদাও ছিলেন)
সঙ্গে নিয়ে আমাদের আগামী দিন সাতেকের রেশন কেনার জন্য বেরিয়ে পড়লেন। কারণ
এরপর আমরা জঙ্গলের মধ্যে ঢুকব, যেখানে খাবার থেকে শুরু করে অন্য সব
প্রয়োজনীয় জিনিস জোগাড় করে নিয়ে যেতে হবে। এদিকে আমি চ্যাটার্জি ও
গাঙ্গুলিকে নিয়ে আমাদের সমস্ত যন্ত্রপাতি, টুলকিট, ফার্স্ট এইড বক্স,
ইত্যাদি বাসের ডিকি থেকে নামিয়ে ওয়েটিং শেড-এ জড়ো করলাম। তারপর অন্যদের
জিনিসের পাহারায় রেখে আমি ও গাঙ্গুলি গেলাম জীপ ঠিক করতে। গাঙ্গুলি সবরকম
গাড়ি চালাতে জানত, তাই ওর অভিজ্ঞতার উপর ভরসা করে একটা 10-seater
মাহিন্দ্রা জীপ ভাড়া করলাম। ড্রাইভার মধ্যবয়স্ক। স্থানীয় মানুষ। ঐ জঙ্গল
লাগোয়া একটি গ্রামের অধিবাসী। নাম বেহেরা।
আমাদের সব ব্যবস্থা আধ ঘন্টার মধ্যেই শেষ। ওয়েটিং শেড-এ ফিরে এসে দেখি
তখনও মালাকারদা তাঁর টীম নিয়ে বাজার করে ফেরেননি। আরো ১৫ মিনিট কাটার পর
বেহেরা বলল যে আর ১৫ মিনিটের মধ্যে আমরা স্টার্ট না করলে আজ লুলুং পৌঁছতে
পারব না। তখন আমি বেহেরাকে নিয়ে আবার পাশের বাজারে ছুটলাম। সেখানে পৌঁছে
দেখি মালাকারদা আর সরকারদার মধ্যে ঝগড়া হচ্ছে। কী ব্যাপার! না সরকারদা
বলছেন যে ওনার প্রতিদিন অন্তত ১ লিটার করে দুধ লাগবে, কারণ উনি
নিরামিষাশী। আমি ড্রাইভার বেহেরার চেতাবনি ওনাকে শুনিয়ে বললাম যে, হয়
আপনি এখনই গিয়ে জীপে উঠবেন, নয়ত আপনাকে এখানে রেখেই আমরা লুলুং চলে যাব।
তখন অবশেষে গোঁজমুখ করে মাত্র ৩ লিটার দুধ নিয়েই সরকারদা আমাদের সঙ্গে
যাত্রা শুরু করলেন।
বারিপদা বাস স্ট্যান্ড থেকে লুলুং দূরত্ব ২৫ কিমিরও কম। ১০ কিমি পরে এক
সুন্দর গ্রাম (নাম সম্ভবত রাঙ্গামতিয়া) অতিক্রম করার পর বনের সীমানা
শুরু। এতক্ষনের সুরকির রাস্তা এরপর কিছুটা কাঁচা ও কিছুটা পাথুরে রাস্তায়
পরিণত হল। তার ওপর দিয়ে লাফাতে লাফাতে আমরা চললাম। এরপর দুবার রাস্তার
মাঝে নালা পড়ল, নালার নিচু জমিতে রাস্তা নেমে গিয়ে আবার উঠে এসেছে সমতলে।
আমাদের গাড়ি ঠিকঠাক পেরিয়ে গেছে বেহেরার ড্রাইভিংয়ের কল্যাণে। কিন্তু
তৃতীয়বারে যখন নালা পড়ল সেই নালার আগেই জীপ দাঁড় করিয়ে বেহেরা বললেন
"আপনারা সবাই নেমে যান, নাহলে এটা ক্রস করা যাবে না।" এই নালাটি আগের
দুটির থেকে অনেকটা বেশি গভীর। তখন সূর্য অস্ত গেছে কিনা জানি না, তবে
জঙ্গলের মধ্যে খুব হালকা আলো চুইয়ে এসেছে। আমরা বিনা বাক্যব্যয়ে গাড়ি
থেকে নেমে জল ও পাথর লাফিয়ে পার হয়ে ওপারে গিয়ে দাঁড়ালাম। বেহেরা জীপটি
প্রায় ১৫০ মিটার ব্যাক করে নিয়ে গিয়ে তারপর কি কায়দায় কে জানে ঐ গভীর
নালাটি পেরিয়ে এপারে এনে দাঁড় করালেন। আমরা আবার জীপে উঠে বসলাম। আমি
ভাবতে থাকলাম যে, এতক্ষন পর্যন্ত যে কটি ছুটন্ত বা পিছন উল্টান খরগোশ,
উড়ন্ত মৌমাছির ঝাঁক ও মাতাল করা গন্ধের মহুয়া গাছের আড়ালে আবছা কালো
ভালুকের অস্তিত্বর মাধ্যমে এই জঙ্গল আমাদের চর্মচক্ষে ধরা দিয়েছে, সেই
প্রকৃতিদেবী আমাদের জন্য আরো কী কী বিস্ময় নিয়ে অপেক্ষা করে আছে, কে
জানে।
আরো আধঘন্টা পরে গভীর অন্ধকারের বুক চিরে হেডলাইটের আলোয় জীপ যখন আমাদের
নির্মীয়মান লুলুং ইকো-ট্যুরিজম গেস্ট হাউসে পৌঁছে দিল তখন মাথার উপর চাঁদ
ও তারার মেলা। একটু আগেই পাখিদের ঘরে ফেরার কলতান থেমেছে। এখন চারদিকে
একটানা ঝিঁঝিঁপোকার শব্দ। তারা নাকি হাঁটুতালি দিয়ে এই শব্দ করে। মাঝে
মাঝে কয়েকটা গাউর, শিয়াল ও অন্য অনেক অজানা বুনো জন্তুর ডাক এবং অল্প
কয়েকটা পাখির বিচ্ছিন্ন ডাক ভেসে আসছে। চারদিকে একটা বুনো বুনো গন্ধ।
রাস্তার দুপাশের গাছগুলো যেন ভূতের মত দুদিক থেকে হাত বাড়িয়ে আছে।
অবশেষে বেশ কয়েকবার গাড়ির তীক্ষ্ণ হর্নের শব্দ শুনে ভেতর থেকে জোরালো
টর্চ হাতে একজনের আবির্ভাব হল গেটের সামনে। ওড়িয়া ভাষায় কয়েকটি বাক্য
আদানপ্রদানের পর সামনের বড় লোহার গেটটি খোলা হল। সামনে হেডলাইটের আলোয়
দেখলাম একটা প্রায় আট ফুট চওড়া ছ ফুট গভীর পরিখা। এবার ঘড় ঘড় ঘটাং ঘট করে
পুলি দিয়ে একটি লোহার ব্রিজ ভিতর থেকে নামিয়ে পরিখার এপাশের রাস্তায় আটকে
দেওয়া হল। আমাদের গাড়ি ঢুকে যাবার পর ঐ ব্রীজ তোলা হল এবং গেট বন্ধ হল।
ড্রাইভার বেহেরা আমাদের নিয়ে গেস্ট হাউসের সামনের বারান্দায় পৌঁছে
দিলেন।
এই U shaped গেস্ট হাউসের একতলার বাম ও মাঝের বাহুর নির্মাণ প্রায়
সম্পূর্ণ। ওনারা জানালেন ডান বাহুর ঘরগুলোর ভিতরের কাজ এখনও বাকি। বাম
বাহুর শেষ প্রান্তে গেটের নিকটবর্তী কিচেন লাগোয়া ডাইনিং হল, তারপর দুটি
4-bed রুম। মাঝের অংশে চারটি 2-bed রুম। ডানদিকের চারটি 2-bed রুম ও একটি
ডরমিটরির অন্দরসজ্জা তখনও অসম্পূর্ণ ও সেগুলি আসবাবহীন। গেস্ট হাউসের
কেয়ারটেকার ও অন্য দুজন কর্মচারী মাঝের বাহুর ডান কোণার দুটি ঘরে আগেই
বিরাজমান। আমাদের জন্য দেওয়া হল বাম দিকের দুটি 4-bed রুম ও মাঝের বাহুর
বাম কোণার 2-bed রুম। আমি আর চ্যাটার্জি 2-bed রুমটি নিলাম। বাকিরা 4-bed
রুম দুটি নিল।
আকাশে পূর্ণচন্দ্র জ্বলজ্বল করছে। সম্ভবত পূর্ণিমা বা তার কাছাকাছি কোন
তিথি। সব দিকেই কাঁটাতারের পাঁচিল ও পরিখা। তার ওপাশে অনুচ্চ পাহাড় ও
জঙ্গল। কেয়ারটেকার মহাপাত্র বললেন সেদিনের জন্য আমাদের রেশন বের করার
প্রয়োজন নেই। ওনারাই আমাদের রাতের খাবার তৈরী করে দেবেন। ঘন্টা দুয়েকের
মধ্যেই আমাদের ডাইনিং হলে যেতে বলে দিলেন। এখানে রাত নটার মধ্যে
হ্যাজাকের আলোয় খাবার পাট চুকিয়ে ফেলা হয়। জঙ্গলে শীত একটু বেশি তবে খুব
কষ্টকর কিছু নয়। শুনলাম এলাকাটা অনেকটা বড়। কাল সকালে সব ঘুরে দেখব ঠিক
করলাম। মুখ হাত ধুয়ে বারান্দায় বসে চ্যাটার্জি গান ধরলো 'চাঁদের হাসি
বন্ধ ভেঙ্গেছে উথলে পরে আলো / ও রজনীগন্ধা তোমার গন্ধ সুধা ঢালো'। এরপর
আরো অনেক হিন্দি গান। গান চলতে চলতেই খাবার ডাক এল। একটু পরেই খাওয়া
দাওয়া সেরে আমরা সবাই বিছানায়। কিন্তু পথশ্রমে ক্লান্ত থাকা সত্ত্বেও এই
অদ্ভুত পরিবেশের মায়ায় ও সেটিকে অনুভব করতে করতে ঘুম আসতে দেরি হল।
পরদিন খুব ভোরে ঘুম ভাঙল অজস্র পাখির কলকাকলিতে। কত নাম না জানা পাখি
ডাকছে। জানলা দিয়ে তাদের কয়েকটিকে দেখতেও পাচ্ছি, কিন্তু বেশিরভাগই চিনতে
পারছি না। সূর্য ওঠেনি এখনও তবে অন্ধকার কেটে ভোরের স্নিগ্ধ আলো ছড়িয়ে
পড়েছে চারিদিকে। গায়ে চাদর জড়িয়ে বারান্দায় এলাম। মনে পড়ল আমার সদ্য
বিবাহিত স্ত্রীর কথা, কদিন আগেই প্রথম বিবাহ বার্ষিকীর অনুষ্ঠান কাটিয়ে
এসেছি। ও খুব ভয় পাচ্ছিল আমার এরকম জায়গায় আসার কথা শুনে। ও জঙ্গলকে খুব
ভয় পায়, তবে ও আমার থেকে অনেক নরম মনের মানুষ ও প্রকৃতি প্রেমিক এবং অনেক
বেশি গাছপালা ও পাখি চেনে। না-মানুষদের প্রতি ওর অপরিসীম ভালোবাসা ও
সহানুভূতি। তাই আমি নিশ্চিত যে জঙ্গলের ভয় জয় করে ও যদি ভবিষ্যতে কখনও
জঙ্গলে রাত কাটায় তবে নিশ্চয় যথেষ্ট উপভোগ করবে।
ঘন্টাখানেক পরে সূর্য ওঠার পর আমি চ্যাটার্জিকে সাথে নিয়ে ঐ গেস্ট হাউসের
এক কর্মচারীর সঙ্গে পুরো চৌহদ্দিটা ঘুরে দেখতে বেরোলাম। গেস্ট হাউসের বাঁ
দিকে প্রায় ৩০-৪০ ফুট দূরে কাঁটাতারের বেড়া ও পরিখা। সেদিকে অনেক গাছ
লাগানো রয়েছে যার মধ্যে চিনতে পারলাম কাঁঠাল, আম, জাম, জামরুল, শিমুল,
জারুল, অশ্বত্থ ও মহুয়া। গেস্ট হাউসের পিছন দিকে কাঁটাতারের বেড়ার আগের
অংশের জঙ্গল, ঝোপঝাড় এখনও পরিষ্কার করা হয়নি। তাই ওদিকটায় না গিয়ে আমরা
ডানদিকে গেলাম।
ক্রমশ.........