লুলুং-এর প্রথম আলো (সলতে পাকানোর পর্ব),দ্বিতীয় ভাগ

গৌরাঙ্গ বন্দ্যোপাধ্যায়,

কলকাতা


পূর্ববর্তী অংশটি পড়ার জন্য লাইব্রেরি বিভাগে দেখুন...


গেস্ট হাউসের ডানদিকে অন্তত ১৫০ মিটার (৫০০ ফুটের বেশি) খোলা জায়গা। গেস্ট হাউসের লাগোয়া একটা ছোট একতলা বাড়ি। সেটা হবে আমাদের সোলার পাওয়ার প্লান্টের কন্ট্রোল রুম। ওটাই আমাদের আগামী ১৫ দিনের কর্মক্ষেত্র। তার ওপাশে বিশাল খোলা এলাকা। ঐ মাঠে মাত্র দুটি গাছ কেটেই অনেকটা জায়গা পাওয়া গেছে, বাকিটা ফাঁকাই ছিল। তাই ঐ জায়গাটি নির্বাচিত হয়েছে সোলার সেল লাগানোর জন্য। ওখানে সোলার সেল লাগানোর জন্য লোহার স্ট্রাকচার রেডি করা হচ্ছে। ঐ মাঠেই সোলার সেল ছাড়াও এনিমোমিটার, পাইরানোমিটার ও আরো নানা যন্ত্রপাতি বসবে। আর ঐ একতলা বিল্ডিংয়ের বড় ঘরটি হবে ব্যাটারি রুম ও ছোট ঘরটি হবে কন্ট্রোল রুম। ব্যাটারি ও কন্ট্রোল রুমের সমস্ত ইকুইপমেন্ট যথা UPS, DCS, DAS ইত্যাদি আগেই এসে গেছে। আমাদের কাজ সোলার সেল লাগিয়ে ট্রেঞ্চের মধ্যে দিয়ে cable ফেলে ব্যাটারি ও কন্ট্রোল রুমে নিয়ে গিয়ে বিদ্যুৎ তৈরী করা। তার সাহায্যেই গেস্ট হাউস ও সংলগ্ন এলাকায় সব ঘরে ও রাস্তায় আলো জ্বালানো হবে। এছাড়াও stand alone আরো ১০টি সোলার ল্যাম্পপোস্ট রেডি করতে হবে যাতে ইমার্জেন্সি পরিস্থিতিতে পাওয়ার প্রব্লেমের সময়ও কিছু অংশ আলোকিত থাকে।


ঘুরতে ঘুরতে আমরা ডানদিকের একদম শেষ প্রান্তে মাঠের ওপারে গিয়ে দেখলাম ঐদিকটায় কাঁটাতারের ফেন্সিং নেই, পরিখাটাও কিছুটা কম গভীর। ঐ পরিখার শেষ প্রান্তে মনে হল বিশাল ওজনের কিছু জন্তুর দাপাদাপির চিহ্ন রয়েছে। জায়গাটাও একটু ভিজে ভিজে। সঙ্গী কর্মচারীর থেকে জানতে পারলাম তিনদিন আগে অল্প বৃষ্টি হয়েছিল এখানে। তারপর হাতির দল ওদিক দিয়ে ঢুকতে এসেছিল। কিন্তু পরিখা দেখে পিছিয়ে যায়। ঐসময় কোনোভাবে একটি বাচ্চা হাতি পরিখাতে পড়ে যায়। ঘন্টাদুয়েক ধরে হাতিদের বৃঙহন ঐ এলাকা সরগরম করে রেখেছিল। পরে ভোরের দিকে অন্য হাতিরা বাচ্চা হাতিটাকে পরিখা থেকে উদ্ধার করতে পারে। হাতির হাঁটু গেড়ে বসার দাগ এবং কিভাবে শুঁড় দিয়ে টেনে বাচ্চা হাতিটাকে উদ্ধার করেছিল সেটা সে আমাদের দেখাল।

পরের নটা দিন আমাদের উদয়াস্ত (ভোর ছটা থেকে সন্ধে ছটা) পরিশ্রমে সোলার সেল ইন্টারকানেকশন, ব্যাটারি কানেকশন হয়ে একটি UPS (বিদ্যুৎ উৎপাদন যন্ত্র) চালু হয়ে গেল। অবশ্য প্রথম দিনেই আমরা stand alone সোলার ল্যাম্পপোস্টগুলি চালু করে দিয়েছি। তাই প্রথম রাত বাদে আমাদের অন্য কোন রাতেই সম্পূর্ণ বিদ্যুৎহীন হয়ে কাটাতে হয়নি। তবে সপ্তম দিন রাত থেকে প্রতিদিন আমরা আমাদের ঘরেও ঘন্টা কয়েকের জন্য আলো জ্বালাতে পারলাম। এর মধ্যে একদিন মালাকারদা গাড়ি নিয়ে গিয়ে বারিপদা থেকে রসদ নিয়ে এসেছেন, তবে সরকারদার জন্য প্রতিদিন আধ লিটারের বেশি দুধ বরাদ্দ করা হয়নি। এই কদিনের মধ্যে ঘটে যাওয়া উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলি হল –

(১) সোলার সেলের ছ্যাঁকা: পঞ্চম দিনে বিকেলের দিকে সমস্ত সোলার সেল কানেকশন ও cable কানেক্শনের কাজ শেষ হয়ে কন্ট্রোল রুমের DC SWITCH এ চলে এসেছে। ২২০ ভোল্ট DC সিস্টেমের open circuit voltage তখন ২৫০ ভোল্টের বেশি। তবে বিকেলের দিকে সূর্যালোক স্তিমিত হয়ে যাওয়ায় তার কারেন্ট ক্যাপাসিটি হয়তো কিছুটা কম। সেই সময় কানেকশন করতে গিয়ে কোনভাবে গাঙ্গুলি ইলেকট্রিক শক খেয়ে গেল।

হঠাৎ আঁ আঁ শব্দ শুনে ওর দিকে তাকিয়ে দেখি ওর হাতে ফ্লাশিং হচ্ছে, ওর মুখটা বেঁকে গেছে। সবাই ভয় পেয়ে ওর থেকে আরো দূরে সরে যাচ্ছে। আমি সামনে একটা তিন চার ফুটের মোটা বাঁশ পেয়ে সেটা নিয়ে গিয়ে ওর হাত ও cable এর মাঝে সজোরে মারলাম। ও নিজেও তখনি রাবার ইন্সুলেটেড জুতো পড়া পা দিয়ে প্যানেলে লাথি মারল। তারপর অজ্ঞান হয়ে ছিটকে পড়ল দেয়ালের দিকে। আমাদের সবার পায়েই রাবার ইন্সুলেটেড জুতো, কিন্তু তা সত্ত্বেও ওর হাত একই সঙ্গে প্যানেল ও সোলার cable এর ডগা স্পর্শ করাতেই এই বিপত্তি। হাতের কব্জির কাছটা পুরো কালো হয়ে গেছে। ভেতরে একটু গর্ত হয়ে মাংস বেরিয়ে এসেছে। ওকে ধরাধরি করে রুমে নিয়ে যাওয়া হল।


এবার মুখে চোখে জল ঝাপ্টা দিতেই ওর জ্ঞান ফিরে এল। দ্রুত ফার্স্ট এইড বক্স নিয়ে সরকারদা ওর হাত ভাল করে পরিষ্কার করে এন্টিসেপটিক লাগিয়ে ব্যাণ্ডেজ বেঁধে দিল ও একটা পেন কিলার খাইয়ে দিল। তারপর নিজের থেকেই বলল এখনই বেশ কিছুটা দুধ (সেদিনই সরকারদার জন্য ৩ লিটার দুধ এসেছে) একটু গরম করে আন, আমি ওকে খাইয়ে দিই।

(২) বিচিত্র পোকামাকড়ের মুখোমুখি: তখনও পর্যন্ত হলিউডের JAWS ও KING KONG বাদ দিয়ে অন্য কোন বিশাল আকৃতির প্রাণীর সিনেমা আমরা দেখিনি, স্পিলবার্গের ডায়নোসর সিরিজ বা এনাকোন্ডা সিনেমা তখনও ভবিষ্যতের গর্ভে। তাই ওখানে যেসব মেগা সাইজের প্রাণীর সঙ্গে আমাদের মোলাকাত হল সেসব বেশ ভীতিপ্রদ ঠেকলো। তাদের মধ্যে কয়েকটা হল –

(i) তেঁতুলে বিছে - ৬ ইঞ্চি স্কেলের মত লম্বা ও প্রায় ৪ ইঞ্চি চওড়া লালচে হলুদ, সবুজাভ, ধূসর ও কালো শতপদী প্রাণীটি দেখেই সবার গা ঘিনঘিন করে ও সবাই আতংকিত হয়ে পড়ে। এর কামড় সাংঘাতিক যন্ত্রণাদায়ক তবে প্রাণঘাতী নয়।

(ii) কাঁকড়া বিছে (বৃশ্চিক) - এটি ৬ ইঞ্চির একটু কম লম্বা ও চওড়া প্রায় ৩ ইঞ্চি তবে মাথাটা তেঁতুলে বিছের চেয়েও অনেকটা চওড়া। আর তার লেজের হুল দুটি দেখে মনে হল ৪-৫ কেজি ওজনের রুই মাছ ধরার দুটি বঁড়শি এনে লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। কালো রঙের এই প্রাণীটিকে দেখে অতটা আতঙ্ক হয়নি তবে ওখানের লোকেরা বলল ঐ প্রাণীটির হুলের খোঁচা খেলে বাচ্চা ছেলেমেয়েদের মারা যাবার সম্ভাবনা থাকে এতটাই বিষাক্ত। এটিকে দেখে আমার শ্রী নারায়ণ সান্যালের লেখা 'না-মানুষী বিশ্বকোষ' এর 'মিনা' র কথা মনে পড়ে গেল।

(iii) গুবরে পোকা - পূর্ণবয়স্ক মানুষের হাতের মুঠোর থেকেও বেশি বড় সাইজের চকচকে কালো রঙের গুবরে পোকা দেখা যেত। তার আবার ছোট ছোট ডানা আছে। ঘরের মধ্যে ঘুপঘাপ উড়ে এর ওর গায়ে বসে পরার সম্ভাবনাও আছে। দেখলে একটু ভয় লাগে ঠিকই, তবে শুনলাম এটা খুব বিষাক্ত নয়। চামড়ায় বসলে একটু জ্বালা করে মাত্র। আমারও গায়ে একবার বসেছিল। তবে আমাদের কয়েকজন বীরত্ব সহকারে দু তিনটি এই প্রাণী নিধন করেছে লুলুং এ থাকাকালীন।

এরপর আর দুটি ঘটনার কথা বলে এই লুলুং পর্বের কাহিনী সমাপ্ত করব। আমাদের গেস্ট হাউস কমপ্লেক্স থেকে বেরিয়ে তিন চার মিনিটের হাঁটা রাস্তায় একটি পাথুরে নদী বা নালা (নাম সম্ভবত পলপলা) ছিল, যেটি তার একটু দূরে অবস্থিত একটি ঝোরা বা অনুচ্চ ঝর্ণা থেকে উৎপন্ন। শীতকালে জলধারা ক্ষীণ তবে স্নান করার পক্ষে যথেষ্ট। আমরা দেখতাম আশেপাশের কিছু মানুষ ওখানে স্নান করত। তাই আমরাও ঠিক করেছিলাম স্নান করব কারণ এক বালতি তোলা জলে স্নান করে আমাদের সবার আশ মিটত না। তাই শেষ দুদিন আমাদের মধ্যে তিনজন (আমি, চ্যাটার্জি ও গাঙ্গুলি) ওখানকার কেয়ারটেকার মহাপাত্রের নিষেধ না শুনেই স্নান করেছিলাম। তার ফলশ্রুতি বুঝতে পেরেছিলাম লুলুং থেকে ফিরে আসতে আসতে। ওদের দুজনের সেরকম সমস্যা না হলেও আমার সারা গায়ে লাল লাল চাকা চাকা চুলকানি বেরিয়ে গেল। বাড়ি ফেরার পর স্কিন স্পেশালিস্ট ডাক্তার দেখিয়ে ওষুধ খেয়ে তারপর সুস্থ হলাম। যথারীতি স্ত্রীর কিছু বাক্যবাণও সহ্য করতে হল।


শেষের আগের দিন আমরা কাজ থেকে ছুটি নিয়ে বেহেরা ড্রাইভারকে সঙ্গে নিয়ে গাড়িতে জঙ্গল ঘুরতে বেড়িয়েছিলাম বিকেলের দিকে। গাউর, হরিণ, ভালুক, বানর, হনুমান, ময়ূর ও অন্যান্য অনেক ছোট জন্তু ও পাখি দেখার পর আমরা যেখানে গিয়ে পৌঁছলাম সেখানে রাস্তা শেষ। বেহেরা বলল 'মনে হচ্ছে কাছাকাছি বাঘ থাকতে পারে।' তার দু এক মিনিট আগেই 'কল' শোনা গেছে। তারপর ও দেখাল ঐ রাস্তার ডানদিকে দু তিনটে পাগমার্ক জঙ্গলের গভীরে চলে গেছে। তার পাশেই কিছুটা টাটকা পটি। ঠোঁটে আঙ্গুল দিয়ে চুপ করে থাকার ইশারা করে গাড়ি ওখান থেকে আধ কিমি দূরে আনার পর বেহেরা জানাল যে সম্ভবত একটি বাঘ ওখানে পটি করছিল। আমাদের গাড়ির শব্দে জঙ্গলের ভিতর ঢুকে গেছে। আমার মনে হয় আমাদের সৌভাগ্য যে আমরা তাঁর দর্শন পাইনি। কারণ আমাদের সঙ্গে অভিজ্ঞ কোন গাইড ছিলেন না। আমরা বড় বিপদে পড়তে পারতাম।

পরবর্তীকালেও একবার লুলুং থেকে বিশেষ জরুরি কারণে সন্ধেবেলায় গাড়িতে করে ফিরতে হয়েছিল। সেবারেও এক জায়গায় এসে হালকা বোঁটকা গন্ধ আমাদের নাকে লেগেছিল। আমাদের গাড়ির সামনের সিটে বসা একজন ও ড্রাইভার মুহূর্তের মধ্যে একটি বাঘ জাতীয় জন্তুকে রাস্তার এপার ওপার করতে দেখেছিল। আমি শুধু দুটি চোখকে জঙ্গলের মধ্যে মিলিয়ে যেতে দেখেছিলাম। তাই লুলুং এ ব্যাঘ্র দর্শন আমার অদেখাই থেকে গেছিল।

তবে প্রাপ্তির ভাঁড়ার মোটেই কম ছিল না। বিশেষ করে আসার আগের দিন রাতে গেস্ট হাউসের ছাতে উঠে জঙ্গলের যে রূপ আমরা দেখেছি সেটা ভোলার নয়। প্রথমে সন্ধের পর ঘন কালো আকাশের চাঁদোয়ায় চুমকি বসানো তারাদের দেখে আশ মিটছিল না। চারিদিকে আঁধারের মধ্যে গেস্ট হাউসের স্ট্রিট লাইটগুলো মনে হচ্ছিল না জ্বললেই যেন ভাল হত। তাই একটু পরে আমাদের অনুরোধে সেগুলো নিভিয়ে দেওয়া হল। আমাদের গানের আসর কিছুক্ষন চলার পর প্রকৃতির এই রূপের সামনে আপনা থেকেই সবাই নির্বাক হয়ে গেল। আর তার একটু পরেই জঙ্গলের এক কোণে হালকা একটু লাল শিখা দেখা দিল, যেটা ক্রমশ বাড়তে লাগলো। আমাদের একজন নিচের লোকদের থেকে শুনে এল যে বনে দাবানল লেগেছে। অপূর্ব সে দৃশ্য, কিন্তু আমরা সবাই প্রার্থনা করছিলাম যেন খুব দ্রুত সে আগুন নিভে যায়, কারণ ১০ - ১৫ মিনিটের মধ্যে কয়েকটি পশুর ও পাখির ত্রস্ত ডাক আমাদের কানে আসছিল। অবশেষে প্রায় ৪৫ মিনিট পরে সে আগুনের শিখা কমে একটু পরে নিভে গেল। তার পরদিন আমরা লুলুংকে 'আলবিদা' জানিয়ে কলকাতায় ফিরে এলাম।






সমাপ্ত.........