মা যেখানে থেকো ভালো থেকো

সুপ্রভা আদক ,

হায়দ্রাবাদ

আমি সুপ্রভা, আজ আমি তোমাদের সাথে আমার জীবনের সবচেয়ে দুঃখজনক ঘটনা শেয়ার করবো। আমরা মেয়েরা যতই বড় হয়ে যাই না কেন আমাদের জীবনে মায়ের ভূমিকাটা যে কি তা বোধ হয় কারো অজানা নয়। আমরা ছোট হই বা বড়, সব সময় যেন মা কাছে থাকলে আমাদের খুব ভালো লাগে। কেননা একটা মেয়ের কাছে তার মায়ের থেকে ভালো বন্ধু আর কেউ হতেই পারে না। প্রতিটা মুহূর্তে আমাদের মায়ের দরকার হয়। যে কথাগুলো আমরা বাবা-দাদা, ভাই বা অন্য কারোর সাথে শেয়ার করতে পারি না সে সব কথা কিন্তু আমরা অনায়াসে মায়ের সাথে বলতে পারি।

আমি যখন সবেমাত্র ক্লাস সেভেনে পড়ি তখন আমার সেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনীয় চিরদিনের বন্ধু আমার মা আমাদের ছেড়ে চিরদিনের মত হারিয়ে গেলেন না ফেরার দেশে। আমার দাদা তখন সবে ক্লাস নাইন আর ছোট বোনটা ক্লাস ফোর। সেই দিনটার কথা ভাবলেও আমার বুকের ভেতরে জমাট বাঁধা কান্নার আগ্নেয়গিরি টার অগ্নুৎপাত বারংবার হতে থাকে। মা যেদিন আমাদেরকে ছেড়ে চলে গেল সেই দিনের সেই অনুভূতি আমি ভুলবোনা কোনদিনই। সেদিন যেন আমাদের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়েছিল। পুরো পৃথিবীটা আমার কাছে অন্ধকার মনে হয়েছিল। যদিও আমাদের একান্নবর্তী পরিবারে ঠাকুরমা তখনো বর্তমান। সেই সাথে জেঠু, বড়মা, দাদা- দিদিরা, বাবা, কাকু, ছোট মা, ছোট ছোট বোনেরা সবাই ছিল। তবুও সবার মাঝে কি যেন নেই! দুটো চোখ সর্বত্র কি যেন খুঁজে বেড়ায়! দুর্বল মুহুর্তে নিজের দুটো হাত আর কারো দুটো ভরসার হাতের জন্য হাতড়ে বেড়ায়।

তখন আমি সবে মাত্র ক্লাস সিক্স থেকে সেভেনে উঠেছি, আমার তখন বয়ঃসন্ধিক্ষন। যে সময়ে মেয়েদের পাশে মায়েদের দরকার প্রতি মুহূর্তে ঠিক সেই সময়ই মাতৃ হারা হলাম। কখনো কেউ কিছু বললে বা মনে কষ্ট পেলে মায়ের ফটোটা বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতাম। এরকম একটা দিন নয়, আমার জীবনে অনেক দিনই একইভাবে কান্না করেছি। কখনো বা মায়ের ফটোর সামনে দাঁড়িয়ে মায়ের সাথে কথা বলেছি- "মা তুমি কেন এত তাড়াতাড়ি চলে গেলে আমাদেরকে একা ফেলে রেখে! কত কথা তোমাকে বলার ছিল, কত কি তোমার থেকে জানার ছিল, আজ যদি তুমি থাকতে তাহলে হয়তো আমাদের জীবনের গল্পটা অন্যরকম হতো"।

মায়ের স্নেহের আঁচল খুব কম সময়ের জন্যই আমাদের মাথায় ছিল, আজ ও তার ঘ্রাণ আমার মন মস্তিষ্কে ছেয়ে আছে। আমার মা খুব কম বয়সে প্রায় ১৩-১৪ বছর বয়সে বিয়ে হয়ে আমাদের বাড়িতে এসেছিল। পাড়ার সবাই মাকে খুব ভালোবাসতো। মা সবাইকে নিয়ে হৈচৈ করতে খুব ভালবাসতেন। কোজাগরি লক্ষ্মী পূজায়, কালী পূজায়, সারাদিন উপোস থেকে সন্ধ্যেবেলায় বাড়িতে পূজো করে মা আবার পাড়ার সার্বজনীক পূজা মন্ডপে যেত। পাড়ার সব মহিলারা মায়ের জন্য অপেক্ষা করত। মা যাওয়ার পর সারারাত্রি পূজা মন্ডপ এর সামনে বড় খামারে হ্যাজাক জেলে গজিকোট, বউ বাসন্তী ইত্যাদি খেলা হত। পুজো পার্বণে পাড়ার মেয়ে বউ দেরকে নিয়ে নাটক যাত্রা করতে ও মা ছিল বিশেষ পটু। মায়ের হাতের লেখা ছিল একেবারে ঝকঝকে বাঁধানো। তেমন সুন্দর মা আলপনা দিতে পারতো। পাড়ার বিয়ে বাড়িতে পুজো মন্ডপে মাকে আলপনা দিতে বউ সাজাতে ডাকত সবাই। তখন তো আর এখনকার মত বিউটি পার্লারে গিয়ে সাজার চলছিল না। আমার মা নিজেও সাজতে গুজতে খুব ভালবাসতেন। মায়ের মাথায় চুল ছিল প্রচুর, মাথা ভরা ঘন কালো চুল, লম্বায় প্রায় হাঁটুর সমান। মাকে দেখতাম প্রতিদিন বিকেল বেলায় সাবান দিয়ে গা ধুয়ে স্নো পাউডার মেখে কাচা কাপড় আর চওড়া করে সিঁদুর আলতা পরে আয়নার সামনে লম্বা চুল বাঁধতে বসতো। চুলে কাঁটা গুঁজে জাল লাগিয়ে কত রকমের কত সুন্দর সুন্দর খোঁপা বাধতো মা। আমাদেরকেও খেলতে খেলতে ধরে বেঁধে নিয়ে এসে জোর করে বসিয়ে মাথায় তেল লাগিয়ে টেনে টেনে চুল বেঁধে দিত। কোন কোন দিন বিকেল বেলায় মা ও আমাদের সাথে খেলায় যোগ দিত। তখন আমরা সবাই, গৌরাঙ্গদা, কার্তিক দা, সীমা, মানসী, মালতী, ছোড়দা, সুজাতা দি, আমরা সবাই মিলে কখনো লুকোচুরি আবার কখনো কুমির ডাঙা খেলতাম। মায়ের সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো ভুলতে পারিনা কিছুতেই। মা যেমন কোমল ছিল তেমনি কঠোর ছিল। যেমন ভরপুর স্নেহ ভালবাসা আদর দিয়েছে তেমনই একটু এদিক-ওদিক হলে, মায়ের কথা আমরা না শুনলে, পিঠে চ্যালা কাঠ ভাঙতে ও দ্বিধা করত না।


আমার সেই মা কিভাবে হঠাৎ করে চলে গেলেন সেই কথাটাই বলি আপনাদের। আমি যখন খুব ছোট্ট তখন থেকে শুনে আসছি মায়ের হার্টের সমস্যা আছে। যখন মায়ের খুব বেশি শরীর খারাপ হতো তখন বাবা ডক্টর দাসের নার্সিংহোমে মাকে ভর্তি করে দিত। দু'একদিন হসপিটালে কাটিয়ে আবার মা যথারীতি হাসতে হাসতে বাড়িতে ফিরে আসতো। এভাবেই চলছিল দিনগুলো। ডক্টর দাসের নার্সিংহোমে মা বারবার ভর্তি হতেন সেই জন্য ডক্টর দাসের সাথে বাবার বেশ একটা ভালো বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু শেষবার যখন মায়ের খুব বেশি শরীর খারাপ হয়েছিল তখন মাকে ডায়মন্ডহারবার মহাকুমা হসপিটালে ভর্তি করা হয়েছিল। ওখানে তিন চার দিন ভর্তি থাকার পরও যখন মায়ের শারীরিক উন্নতি হচ্ছিল না তখন ডাক্তাররা পরামর্শ করে মাকে কলকাতার বড় হসপিটালে রেফার করে দেন। বাবা ডায়মন্ড হারবার থেকে অ্যাম্বুলেন্সে করে মাকে নিয়ে কলকাতার পিজি হসপিটাল এ নিয়ে যান। বাবার মুখে শুনেছি, রাস্তায় মায়ের অসুস্থতা অনেক বেড়ে গিয়েছিল, শ্বাস নিতে মায়ের খুব কষ্ট হচ্ছিল। সেই সময় মা-বাবার হাত দুটো ধরে বারবার করে বলেছিল- "আমি যদি আর না ফিরি, তবে তুমি কিন্তু আমার জায়গায় আর কাউকে এনো না, তুমি বাবা এবং মা দুজনের ভূমিকা পালন করে স্নেহ ভালোবাসা দিয়ে আমার বাচ্চাদেরকে মানুষ করো"।

বাবা মায়ের সেকথা রেখেছিল, আজীবন দ্বিতীয়বার দার পরিগ্রহণ করেননি।

মাকে কলকাতার পি জি হসপিটালে ভর্তি করা হলো। মায়ের ট্রিটমেন্ট শুরু হল, ধীরে ধীরে মা সুস্থ হতে লাগলেন। কিন্তু যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মায়ের হার্টে একটা অপারেশন করতে হবে, সে কথা ডাক্তাররা স্পষ্টই বাবাকে জানিয়ে দিলেন। সপ্তাহখানেক পরে মা তখন বেশ সুস্থ, নিজে নিজে উঠে হাঁটাচলা করে, প্রায় হাঁটু অবধি লম্বা চুল আঁচড়ায়, নিজে নিজে খাবার খায়, সবার সাথে কথা বলে, আশেপাশের অন্যান্য পেশেন্টদের সাথেও হাসি মজা করে। মা আমার সাজতে গুজতে খুব ভালোবাসতো, তার ওপরে সদা প্রাণচঞ্চল, প্রাণ উচ্ছাসে ভরপুর। ডাক্তার বাবুরাও মায়ের সাথে খোলাখুলি কথা বললেন, মাকে জানালেন যে দু-একদিনের ভেতরে মায়ের হার্টে অপারেশন করে পেসমেকার বসানো হবে। মাও মনে মনে চাইছিল যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সুস্থ হয়ে বাচ্চাদের কাছে ফিরে আসতে। তাই মা ডাক্তারদের কাছ থেকে জেনে নিয়ে শনিবার বিকেলে বাবা যখন মায়ের সাথে দেখা করতে এলেন তখন মা বাবাকে বললেন -
-"ডাক্তারদের কথা মতো সোমবার তো আমার অপারেশন, জানিনা আবার বাচ্চাদের সাথে দেখা হবে কিনা! তাই আজ আর রাতের বেলায় তোমার হসপিটালে থেকে কাজ নেই। তুমি আজকেই বাড়ি চলে যাও আর আগামীকাল রবিবার তুমি বরং বাচ্চাদেরকে একবার আমার কাছে নিয়ে এসো, অনেকদিন হয়ে গেল বাচ্চাদেরকে দেখিনি। ওদের জন্য মনটা বড় আনচান করছে"।

-"কি যা তা আজেবাজে কথা বলছো তুমি, অপারেশন করে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যাবে, এসব আজেবাজে চিন্তা মাথা থেকে একেবারে দূরে সরাও"।

-"সুস্থ হওয়ার চিন্তা ভাবনা আমার মাথায় পুরোপুরি আছে, আমিও চাই সুস্থ হয়ে বাচ্চাদের কাছে ফিরে যেতে, তবুও যদি.............
আর তাছাড়া অপারেশনের পরেও তো বেশ কিছুদিন হসপিটালে থাকতে হবে, তাই লক্ষীটি তুমি কালই একবার বাচ্চাদেরকে নিয়ে এসো।"

মায়ের কথা মতো সেই দিন রাত্রেই বাবা বাড়িতে আসে। আমরাও ভীষণ খুশি। বাবা প্রায় এক সপ্তাহ পরে বাড়ি ফিরেছে। আবার কালকে আমাদেরকে নিয়ে মায়ের সাথে দেখা করাতে নিয়ে যাবে, যার জন্য আমাদের খুশির অন্ত ছিল না।

মাকে সুস্থ-সবল দেখে আসার জন্য বাবা বাড়ির সবার জন্য সেদিন অনেক মিষ্টি আর ভালো ভালো খাবারও নিয়ে এসেছিল। ভাগ্যচক্রে সেদিন দাদাও বাড়িতে ফিরেছিল হোস্টেল থেকে। দাদা বরাবর পড়াশোনায় খুব ভালো, ভীষণ ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট। কিন্তু পড়াশোনার থেকে ফুটবল খেলায় দাদার মন অনেক বেশি আর ফুটবলটা দাদা খেলতো ও দারুন। তাই মা বাবা দাদার পড়াশোনার জন্য দাদাকে রাজনগর হোস্টেলে দিয়ে আসে। সেই সময় আমি আর বোন রামকৃষ্ণ মিশন সারদা মন্দিরে পড়তাম। ঠিক হলো পর দিন সকাল সকাল বাবার সাথে আমরা তিন ভাইবোন আর আমাদের বড় মা ও যাবে মাকে দেখতে।

রাত্রে যেন ভালো করে ঘুমও হলো না। মনের মধ্যে এক প্রবল ছটফটানি। রবিবার খুব সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে তাড়াতাড়ি স্নান করে তৈরি হয়ে গেলাম, মা কে দেখতে যাব। ভীষণ আনন্দ হচ্ছে, কতদিন পরে মাকে দেখব। সময়মতো হসপিটালে পৌঁছেও গেলাম আমরা। আমরা হসপিটালে পৌঁছানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই ভিজিটিং আওয়ার্স শুরু হয়ে গেল, কিন্তু তাও কেউ আমাদেরকে মায়ের কাছে নিয়ে যাচ্ছেনা। এক এক করে আমাদের সাথে বসে থাকা অনান্য রোগীর বাড়ির লোকজনেরা গেট দিয়ে ঢুকে যাচ্ছে, আবার কেউ কেউ ভর্তি থাকা রোগীর সাথে দেখা করে বেরিয়ে ও আসছে। আমাদের মনটা ছটফট করছে মাকে দেখার জন্য, কতদিন মাকে দেখিনি, কত কথা বুকের ভেতর জমা হয়ে আছে মাকে বলার জন্য। কিন্তু কিছুই বুঝতে পারছিলাম না, কেন আমাদেরকে মায়ের কাছে নিয়ে যাচ্ছে না। বাবার কয়েকজন বন্ধু ও হসপিটালে পৌঁছে গেছেন। রবিবার থাকায় তারাও দেখা করতে এসেছেন। আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি, এমতাবস্থায় বাবার দুজন বন্ধু এসে বাবাকে একপাশে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে কীসব যেন বলছে ফিসফিস করে। আমার বুকটা কেমন ধরাস করে উঠলো, তারপর থেকে বুকের ভেতরে কেমন একটা চিন চিন করে ব্যথা অনুভব করতে লাগলাম। দাদা আর বড় মা চুপ করে বসে আছে। ওদের মধ্যে যে কি চলছিল আমি বুঝতে পারছিলাম না। শুধু ছোট বোনটা, সে বারবার এসে আমাকে বলছে আমাদেরকে মায়ের কাছে নিয়ে যাচ্ছে না কেন রে দিদি! এতক্ষণ তো হয়ে গেল আমরা এসেছি! কতদিন মাকে দেখিনি, কখন যাব রে আমরা মায়ের কাছে? আমি বোনটাকে কিচ্ছু বলতে পারছিলাম না, শুধু মনে মনে বুঝতে পারছিলাম অঘটন যা ঘটার ঘটেই গেছে। বুকের মধ্যে জমানো কথা আর বুঝি বলা হবে না মাকে।

মনের আশঙ্কাই সত্যি হলো, মা চলে গেছে না ফেরার দেশে। আমরা মাকে একবার শেষ দেখা দেখতেও পেলাম না! কত কি বলার ছিল মাকে। মনের কথা মনেই রয়ে গেল! শেষবারের মতো মাকে যখন সিঁদুর আলতা বেনারসি শাড়ি ফুলের মালা পরিয়ে আমাদের সামনে আনা হলো তখন শুধু বুকফাটা কান্না নিয়ে ভগবানকে দোষারোপ করলাম। কেন ভগবান আমাদের সাথেই এমন কেন করলে? কেন আমাদের মাকে কেড়ে নিলে! কি অপরাধ আমাদের! কি এমন পাপ করেছি আমরা, যে আমাদের কাছ থেকে আমাদের মাকেই কেড়ে নিলে তুমি!

আজ প্রায় ৪০ বছর হয়ে গেল মা আমাদের সাথে নেই, আজ আমিও দুই সন্তানের মা। তবুও মাকে ভীষণভাবে মিস করি। বিশেষ করে আমি যখন প্রথমবার সন্তান সম্ভবা হই। ঠাকুমা গত হয়েছেন, জেঠুর ট্রান্সফারের চাকরি, বড়মা ও জেঠুর সাথে সাথে বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র বাসা বেঁধেছে, মাঝেমধ্যে আসেন। কাকু অন্যত্র বাড়ি করে ছোট মা আর বোনেদের কে নিয়ে উঠে গেছে। জ্যাঠাত বড় দুই দাদার বিয়ে হয়েছে আমার বিয়ের আগে, কিন্তু বৌদিদের ও বাচ্চা ছোট। তারা আর আমায় যত্ন করবে কিভাবে!

আমি দেখতাম, যার মা আছে তাকে কত যত্ন করে, সে কি খাবে, কি না খাবে, কিসে তার ভালো হবে, কত রকম স্পেশাল কেয়ার। তারপরে সাথে করে যত্ন করে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যাওয়া, সবকিছুই......

আমি এসব কিছু থেকেই বঞ্চিত!

আমি যত্ন পাইনি বললে ভুল বলা হবে, বাবা দাদা বোন আমাকে খুব যত্ন করত কিন্তু আমার দুচোখ মাকে খুঁজে বেড়াতো, বারে বার আমার মনে হতো, মা থাকলে বোধহয় আরো একটু বেশি যত্ন পেতাম, আরও একটু স্পেশাল কেয়ার হতো আমার।

দেখতে দেখতে আমার ডেলিভারির ডেট এগিয়ে এল, বাবা দাদা মিলে আমাকে হসপিটালে নিয়ে গেল। আমার ডেলিভারি হল। যেহেতু আমার বেবি সিজারে হয়েছিল তাই আমাকে বেশ অনেকদিন হসপিটালে থাকতে হয়েছিল। প্রতিদিন বিকেলবেলা দেখতাম অন্যান্য পেশেন্টের মা তাদের সাথে দেখা করতে এসেছে, কত গল্প করছে, গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, জিজ্ঞাসা করছে কি কষ্ট হচ্ছে, না হচ্ছে। আমি দেখতাম আর আমার দুচোখ জলে ভরে যেত। প্রায় প্রতিদিনই নিয়ম করে আমার বাড়ি থেকে বৌদিরা, বোনেরা, দাদা আসতো আমায় দেখতে। বাবা তো সারাদিনই হসপিটাল এর বাইরেই পড়ে থাকতো। একদিনের জন্য ও বাড়ি যায়নি। আমার কি অসুবিধা হচ্ছে না হচ্ছে, কি লাগবে না লাগবে, তার জন্য সদা সর্বদা তৎপর থাকতো বাবা। কোনদিন এতোটুকু অসুবিধা হয়েছে বলে আজকে আমার মনে পড়ে না, কিন্তু তবুও সবার মাঝে কি যেন নেই! অসহায়ের মতো আমার দুচোখ মাকে আতিপাতি করে খুঁজতো। মায়ের গায়ের একটু গন্ধ, মায়ের একটু স্পর্শ পাওয়ার জন্য মনটা আকুলি বিকুলি করত। স্বর্গ থেকে মা আমার এই কষ্ট এই যন্ত্রণা অনুভব করত কিনা কে জানে!!