কৃষ্ণময় মায়াপুর
অদিতি মন্ডল,
কলকাতা
ছুটি একজন সৈনিকের জীবনে কতটা ভূমিকা রাখে তা আমি বেশ বুঝি। ছুটি বরাদ্দ
থাকলেও তা নেওয়ার সুযোগ কই! CL ছুটি যা বছরটা গেলে নষ্ট হয়ে যায় তাও
পাওয়াটা ভগবানের দর্শনের মতো। ফৌজের কথায়- "আরাম হারাম হ্যায়", তা সে
সব কথা ট্রেনিংয়ে ওস্তাদদের সঙ্গে আওড়াতে হয় বৈকি। তবে ভেতর থেকে মনটা
ছুটির জন্য যে কতটা কাঁদে তা এই ইউনিফর্ম পরে ব্যক্ত করি কি করে!
আমি কেন্দ্র বাহিনীর একজন অফিসার, আবার বিবাহ হয়েছে যে পুরুষটির সাথে
মানে আমার স্বামী, তিনি আবার কেন্দ্র সরকারের মস্ত বড় বিজ্ঞানী।
দেশ-বিদেশ জুড়ে তার বেশ খ্যাতি। আমার সেই বিজ্ঞানী বাবু, তাঁর বরাদ্দেও
ছুটি রয়েছে। তবে তিনি কর্মযোগী মানুষ। ছুটিতে খুব একটা বিশ্বাসী নন।
আমার এখানের পরিস্থিতিতে নিজের ছুটি পাওয়া আবার বিজ্ঞানী বাবুকে ছুটি
নেওয়ার জন্য তোষামোদ করা, আবার সঙ্গে সঙ্গে প্ল্যানিং করা কোথাও বেড়াতে
যাওয়ার জন্য। যাই হোক বেশ একটা অলিক কল্পনাই হয়ে যায়। তাই কোথাও
বেড়াতে যাব বলে, মাসখানেক ধরে যে আলোচনা প্ল্যান প্রোগ্রাম করবো, আয়েশ
করে সেই সব জায়গা সম্বন্ধে কল্পনা করবো, নিজের মনের মতো করে ঘোরার
প্ল্যান করব, তা আর হয়ে ওঠে না। তবে বিজ্ঞানী বাবু মানুষটা ভালো, তিনি
আমার দুঃখ কষ্ট বোঝার চেষ্টা করেন। প্রয়োজনে কাজ ফেলে তাঁর কাঁধ এগিয়ে
দেন আমার নৈরাসার দিনে দু ফোঁটা জল ফেলার জন্য।
যাইহোক এমনই কাজের চাপের মধ্যে অফিসে সি এল ছুটির apply করেই ফেললাম। আর
অবিশ্বাস্যভাবে পেয়েও গেলাম। এই সময়ে তেমন পূজা আচ্ছার দিনও নেই।
দুর্গাপূজা আর লক্ষ্মী পূজার ঠিক পরেই, তাই ছুটিটা পেয়েও গেলাম। আর কি,
সঙ্গে সঙ্গে চিন্তা করতে লাগলাম বিজ্ঞান বাবুকে বুঝিয়ে কোথাও বেড়িয়ে
আসার জন্য। বাবা মানে আমার শ্বশুর মশাই রিটায়ার্ড স্কুল শিক্ষক, তিনিও
বেশ আমুদে মানুষ। বয়স ৮২ বছর হলে কি হবে, এই বয়সেও এখনো বেশ শক্ত
সমর্থ। আমি বেড়াতে যাওয়ার কথা বললেই বাবা বাচ্চাদের মত খুশি হন।
পরিবারে আমরা এই তিনজন। যদিও আমাদের সাথে অবিবাহিত আমার এক কাকা শ্বশুরও
থাকেন, তবে বেড়াতে যাওয়ার ব্যাপারে তাঁর প্রবল অনীহা। জোর যার করে
কোথাও এক বেলার জন্য গেলেও রাত কাটাতে চান না কোনমতেই।
ছুটি পাও মাত্রই মনে পড়ল -
"চিরসখা, ছেড়ো না মোরে ছেড়ো না।
সংসারগহনে নির্ভয়নির্ভর, নির্জনসজনে সঙ্গে রহো ॥
অধনের হও ধন, অনাথের নাথ হও হে, অবলের বল।
জরাভারাতুরে নবীন করো ওহো সুধাসাগর।।"-
তা এমন সুধাসাগরে ডুব দিতে দেশ-বিদেশ থেকে তো অনেক লোক আসেন আমাদের এই
কাছেই ইসকন মায়াপুরে, ইন্টারন্যাশনাল সাইন্স অফ কৃষ্ণ কনসাসনেস। তা
আমরাইবা বাকি থাকি কেন?
"দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া
একটি ধানের শীষের উপর
একটি শিশির বিন্দু"-
এ যেন অনবদ্য হয়ে উঠলো। সেই মতো বিজ্ঞান বাবুকে আমার ভক্তি রসে স্নাত
করিয়ে রাজি করালাম আমরা। আমরা মানে আমি আর বাবা মানে আমার শ্বশুরমশাই।
আগামীকালই যাওয়ার দিন ধার্য করা হলো। ইন্টারনেটের যুগে জানা এবং অজানার
মধ্যে ব্যবধান বড় কম হয়ে গেছে, শুধু বাকি রয়ে যায় জানতে চাওয়া ইচ্ছে
টুকু।
'The Genie story'-র "Your command is my wish" -এর মতো Google-এ কমেন্ট
দিতেই বেরিয়ে পড়ল সব ইনফরমেশন। জামা কাপড় গোছানো, বাবাকে বলা, কেমন কি
নেব ইত্যাদি করতে করতে সেদিনের রাতের খাবারটা সবাই মিলে সমাধা করলাম।
রাত্রে বিছানায় শুয়ে বারবার মনে হল আমরাও সেখানেই যাব যেখানে নিমাইয়ের
দেশের আকাশে হরেকৃষ্ণ নাম মাখা থাকে! যেখানকার পবিত্র মাটি কৃষ্ণ নাম
মাখা! যেখানকার বাতাসে ও রাধা কৃষ্ণ নামের সুবাস মন্ডিত থাকে! উত্তেজনায়
যেন ঘুম আসছিল না। যদিও আমি তীর্থযাত্রা বা মন্দিরে মন্দিরে ভ্রমণের তেমন
বিশ্বাসী নই। আমি প্রকৃতি ভালোবাসি। মানুষের কৃতীমতায় প্রকৃতির নিষ্কলুষ
নগ্ন সৌন্দর্যটা থাকে না। তবুও কৃষ্ণ আমার চির সখা, তাই মায়াপুরে
যাওয়ার এমন প্রবল কৌতূহল।
মনে পড়ল যেবার শ্রীধাম বৃন্দাবনে প্রথম গেছিলাম, সেদিনের আগের রাত্রেও
এইরকমই ঘুম আসছিল না। যাইহোক শারীরিক ক্লান্তিতে এমন জাদু থাকে যে
উত্তেজনার পারদ নামিয়ে স্নিগ্ধ ঘুমের দেশে নিয়ে যায় অচিরেই। ভোর ভোর
রওনা দেওয়া গেল কৃষ্ণ কৃষ্ণ বলে। শিয়ালদহ স্টেশনে যখন পৌছালাম,
কৃষ্ণনগর লোকাল টা ছাড়তে তখনো মিনিট দশেক বাকি আছে। বাবাকে হাত ধরে ভিড়
ঠেলে আমি এগিয়ে নিয়ে যেতে লাগলাম। আর বিজ্ঞানী বাবু আমাদের ছোট ট্রলি
ব্যাগ দুটো টেনে নিয়ে চললেন। নয় নম্বর প্লাটফর্মে তখন ভিড় খুব বেশি
একটা ছিল না, কারণ বেশিরভাগ যাত্রী ইতিমধ্যে ট্রেনের কামরায় স্থান করে
নিয়েছেন। তখন অবশ্য আমাদেরই মতো দু চারজন যাত্রী এবং ঠেলা ওয়ালাদের
মধ্যে হন্তদন্ত ভাব পরিলক্ষিত হচ্ছিল। জানলার পর জানলা উঁকি ঝুঁকি মেরে
বসার ঠিকমতো জায়গা না দেখতে পাওয়ায় আমরা এগিয়ে চলছিলাম। ট্রেনের ডেলি
প্যাসেঞ্জারদের একজন আমাদেরকে দেখে জানলা থেকে উঁকি মেরে জানালো সামনের
দিকে কামরায় সিট আছে বসার জন্য। তাই তার কথামতো আমরা আরেকটু এগিয়ে
গেলাম আর সত্যি সত্যিই একটা কামরায় জানালার পাশে খালি সিট দেখে আমরা
ট্রেনে চড়লাম এবং বসে গেলাম। বিজ্ঞানী বাবু সিটের নিচে ট্রলি ব্যাগ দুটো
গুছিয়ে ঢুকিয়ে দিলেন এরপর আমরা সিটে ঠিকমতো গুছিয়ে বসার প্রায় সাথে
সাথেই ট্রেন হুইসেল দিয়ে দূলে উঠলো। এর পর একটু একটু করে স্পিড বাড়াতে
বাড়াতে ছুটতে শুরু করল ট্রেন। দু-একটা স্টেশন পার করার পরেই ধীরে ধীরে
শহুরে ভাবটা কমতে শুরু করল আর শহরটা ধীরে ধীরে দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ
ধানক্ষেতের মাঝে যেন বিলীন হয়ে যেতে লাগলো। ধীরে ধীরে ফুটে উঠল এক
অকৃত্রিম মনোরম গ্রাম্য পরিবেশ। ট্রেনের সাথে পাল্লা দিয়ে প্রকৃতিও যেন
ছুটে চলেছে। পূজা শেষ, তবে এখনো আকাশে বাতাসে পূজার সুবাস। আকাশে পেঁজা
তুলো মেঘ, সোনা গলানো রোদ্দুর, নরম ঘাসের উপর একটা দুটো শিশিরের ফোঁটা,
কাশফুলের সমাহার, পূজা পূজা সেই রেশটা যেন লেগেই আছে। মনটা বলে উঠল
"ওই দেখো নীল নোয়ানো সবুজ ঘেরা গাঁ
কলাপাতায় দোলায় চামোর শিশির ধোয়া পা"-
শিশির সিক্ত মাটির গন্ধে বণ্য বাতাস বারবার জানলা দিয়ে ঢুকে কপালে মুখে
সুড়সুড়ি দিচ্ছিল, আর সামনের চুলগুলোকে এলোমেলো করে ঘেঁটে দিচ্ছিল। বেশ
লাগছিল! অনেকদিন পর শহুরে জীবন, চাকরির ঘেরাটোপ ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে।
এভাবে বাইরের প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে দেখতে কখন যেন প্রায় ১০০ কিলোমিটার
পথ পেরিয়ে এলাম। মাঝে মাঝে স্টেশন এলে ট্রেনের থামা, লোকজনের ওঠা নামা,
হকারের চিৎকার, ইত্যাদির সাথে আমরা পৌঁছে গেলাম কৃষ্ণনগর জংশনে।
ট্রেন থেকে নেমেই পেটের ভেতরটা কেমন যেন চনমনিয়ে উঠলো। তাই আর দেরি না
করে সামনেই পুরস্কার পরিচ্ছন্ন একটা দোকান দেখে নরম তুলতুলে পরোটা, ডিম
কারি আর শসার কুচি দিয়ে সকালের ব্রেকফাস্টটা সেরেই ফেললাম। স্টেশনের
বাইরে বেরিয়ে সারি সারী দাঁড়ানোর টোটোর থেকে একটা টোটোকে রিজার্ভ করে
আমরা বেরিয়ে পড়লাম মায়াপুরের উদ্দেশ্যে। স্টেশন সংলগ্ন দোকানপাট বাজার
হাটের হই হট্টগোল পেরিয়ে এসে পড়লাম বেথুয়া দহরীর এন এইচ টুয়েলভ
হাইওয়ে উপর। হাইওয়ে ধরে আমরা এগিয়ে চললাম। হাইওয়ের বাঁ দিক বরাবর
একটি সিঙ্গেল রেললাইন এগিয়ে চলেছে। টোটো ওয়ালা দাদা জানালেও যে ওটা
লালবাগ যাওয়ার লাইন। যদিও লক্ষ্য করে দেখলাম রেললাইনটা লতানে গাছপাতা
ঝোপজংগলে প্রায় ঢেকে ফেলার উপক্রম করে চলেছে, দেখে মনেই হলো না যে ওই
লাইনের ট্রেন চলে। কিন্তু তাও টোটো ওয়ালা দাদা বললেন যে মাঝেমধ্যেই
লালবাগের ট্রেন এই লাইন দিয়েই চলে। আরো একটু পরেই বাঁ দিক দিয়ে জলঙ্গি
নদীটাও আমাদের সাথে সাথেই যেন চলা শুরু করল তার স্নিগ্ধ গতি নিয়ে।
জলঙ্গীর দুই তীরে কাশের বনে লেগেছে যৌবনের জোয়ার। তাদের নধর হৃষ্টপুষ্ট
দেহে শরতের দোলা মাতামাতি করছে, আর তাইতে লেগেছে শরতের সোনা গলানো রোদের
আভাস। আর স্বেত শুভ্র কাশফুলের চমক যেন এতে করে আরো কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।
মাঝে মাঝে আমাদের টোটো গাড়িটাকে সাইডে রেখে শোঁ শোঁ করে তীব্র গতিতে
ছুটে চলছিল কিছু প্রাইভেট গাড়ি, ট্রাক বাস লরি ইত্যাদি। পথের ডানদিকে
অনেক গাছ-গাছালিতে ভরা। সেখানে অর্জুন গাছের প্রাচুর্যটাই যেন বেশি চোখে
পড়ল। এখানে অর্জুন গাছ যেন ফলবতী রূপে আত্মপ্রকাশ করেছে। গাছে গাছে ভরা
থোকা থোকা অর্জুন ফল। অর্জুন, সেগুন, শাল, আরো বিভিন্ন রকমের বড় বড়
বৃক্ষরাজি যেন সাদর আপ্যায়নের জন্য দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার দুপাশে।
সুন্দর মনোরম বুনো গন্ধ মাখা বাতাস যেন আমার ভোর জাগানো চোখের পাতা
ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছিল, আমার দুচোখ জুড়ে আদুরে ঘুম নেমে এলো কখন আমি
জানতেও পারলাম না। কখন বাবার কাঁধে আমার ঘুমন্ত মাথা দিয়ে বেশ কিছুটা পথ
অতিক্রান্ত করেছি বুঝতেই পারিনি। ঘুমের রেশ কাটলো বিজ্ঞানী বাবুর ডাকে।
দেখলাম রাস্তার দুপাশের চিত্র বদলেছে। ইতিমধ্যেই জলঙ্গি নদীটাও কখন যে
বিদায় জানিয়েছে লক্ষ্য করিনি। পথের দুপাশে নানা রকমের হোটেল, খাবার
দোকান ইত্যাদি তাদের পসরা সাজিয়ে বসে আছে। পাশাপাশি চলেছে মানুষের ঢল।
তাদের প্রত্যেকেরই যেন একই রকমের পোশাক। পুরুষ হলে ধুতি, ছোট পাঞ্জাবি,
মাথায় শিখি, কপালে তিলক আর গলায় কোনটি কোন্ঠী, তুলসীর মালা। আর মহিলারা
শাড়ি, চুরিদার, লেহেঙ্গা চলি, বা গোপি পোশাক পরে আছেন। মাথায় লম্বা
বেনি সঙ্গে তিলক কাটা। এমন হরে কৃষ্ণ পরিবেশে বেশ লাগলো আমাদের, আর সেই
সঙ্গে লক্ষ্য করলাম মানুষের একে অপরের মধুর সম্ভাষণ 'হরে কৃষ্ণ'। এসব
কিছু লক্ষ্য করতে করতে আমাদের টোটো টা এগিয়ে চলল আর এসে থামলে রাজকীয়
ধরনের জানলা লাগানো একটি বিল্ডিং এর সামনে। টোটো দাদা বললেন নেমে পড়ুন,
গদাভবন এসে গেছি।
ব্যাগ পত্র নিয়ে নামা মাত্রই দুজন মহিলা এসে আমাদেরকে তিলক সেবা করে
গেলেন, মনটা কেমন যেন ভক্তিতে গদগদো হয়ে উঠলো। এইবারে আমরা জানতে পারলাম
গদাভবন বা অন্যান্য কোন ভবনের কক্ষই আমাদের আবাসের জন্য ফাঁকা নেই।
অগত্যা আর কি করা যায়, বাবাকে ব্যাগ দুটো নিয়ে একটি নিম গাছের তলায়
ছায়ায় বসিয়ে আমরা দুজনে বেরিয়ে পড়লাম হোটেল খোঁজার উদ্দেশ্যে।
কয়েকজন টোটো ওয়ালা হোটেল পাইয়ে দেবে বলে, আগে পিছে বিস্তর ঘুরতে
লাগলো। এদের কেউ কেউ আবার হোটেলের ছবি ও দেখালো। কিন্তু বিজ্ঞানী বাবুর
এদের কোন হোটেলই পছন্দ হলো না। তাই নিজেরাই আমরা বেরিয়ে প্রায়
ঘন্টাখানেক ধরে হোটেলের খোঁজ করতে লাগলাম। এরপর গদাভবনের ঠিক উল্টো দিকের
হোটেল নিকারীতে আমাদের ঠাঁই নেওয়া হলো। একটু বেশি ভাড়া যদিও তবে
অন্যান্য হোটেল গুলোর তুলনায় এটা আমাদের পছন্দসই। বড় এসি ঘর, সোফা,
এটাচ্ড আধুনিক বাথরুম, টি টেবল, টিভি সমেত সুন্দর মডার্ন রুম। আর সব
চাইতে ভাল ছিল এর পূর্ব দিকের দেওয়াল, অর্থাৎ রাস্তার দিকের পুরো
দেওয়াল টাই কাঁচের, আর তাতে লম্বা ভারী পর্দা টাঙানো। চেয়ার টেনে বা
সোফা টেনে বসে পর্দা সরিয়ে দিলে রুমের ভেতর থেকেই মন্দিরের দৃশ্য সুন্দর
চোখে দেখা যায়। আর প্রায় কাছেই গৌড়ীয় মঠের সুন্দর হরিনাম সংকীর্তন
রুমের মধ্যে বসেই পরিষ্কারভাবে শোনা যাচ্ছিল। রুম টুম ঠিক করে বিজ্ঞানী
বাবু বাবাকে আর আমাদের বাক্স দুটোকে নিয়ে এলেন হোটেলে। রুমের মধ্যে
জিনিসপত্র ঠিকঠাক গোছ গাছ করে, হাত পা মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে, বেলা যখন
প্রায় 1:30 টা আমরা তড়িঘড়ি করে চললাম দ্বিপ্রাহরিক ভোজনের নিমিত্তে।
টোটো তো করে আসার সময় রাস্তায় দেখে এসেছিলাম একটি ভালো দোকান, তা
প্রায় আমাদের হোটেল থেকে 400 মিটারের মতো দূরত্বে। তা হোক, আমরা হোটেলের
সামনে থেকে একটি টোটো ধরে সেই দোকানে গিয়ে উপস্থিত হলাম দুপুরবেলার
খাবার খাওয়ার জন্য। এখানেই রাধেশ্যাম প্রসাদ পাওয়া যায়, আর দোকানের
নামও 'রাধেশ্যাম প্রসাদম'। দোকানের মালিক তার পরিবার-পরিজন নিয়ে দোকান
চালাচ্ছেন। তিলক সেবা করা শাড়ি পরিহিতা মেয়ে কাগজের থালায় সুন্দর করে
পরিবেশন করলো, ভাত পাতলা ডাল, পাপড় ভাজা, আলুভাজা, সয়াবিনের তরকারি ও
পটল পনির। একটি বাটিতে করে কাঁচা লঙ্কা এনে রাখলো সামনে, ইচ্ছে হলেই
সেখান থেকে কাঁচা লঙ্কা নিয়ে খাওয়াই যায়। এভাবেই প্রসাদ পেয়ে দুপুরের
ভোজন সারা গেল। ফেরার পথে হোটেলের সামনেই ঠেলাগাড়িতে করে জিভে জল আনা
কাঁচা তেঁতুল বাটা, পেয়ারা বাটা, কয়েৎ বেল বাটা ইত্যাদি নানা ধরনের
কাঁচা ফল সবজির তৎক্ষণাৎ আচার বিক্রি হচ্ছিল। আমি একটা বেলের আচার বানাতে
বলতেই, বেল লবণ কাঁচা লঙ্কা বিভিন্ন রকম মসলা ইত্যাদি একটা পাত্রে নিয়ে
একটা কাঠের দণ্ড দিয়ে থেঁতলে ভালোভাবে মেখে তৎক্ষণাৎ আচার সেই বেলের
খোসাতে করেই আমার হাতে পরিবেশন করলেন। আয়েশ করে তিনজন মিলে এই বেল
মাখাটা খেলাম। এরপর ভালোভাবে হাত মুখ ধুয়ে আমরা মন্দির পরিদর্শনে
পরিকল্পনা করলাম। কিন্তু শুনলাম, মন্দির দুপুরবেলা বারোটা থেকে চারটে
পর্যন্ত বন্ধ থাকে। তাই আমরা স্থির করিলাম দুপুরবেলাটা আমরা হোটেলের রুমে
বিশ্রাম নিয়ে সন্ধ্যেবেলা একেবারে মন্দিরের আরতি দর্শন করতে যাব।
ক্রমশ..............
আলোকচিত্র সৌজন্যে লেখিকা অদিতি মন্ডল