কৃষ্ণময় মায়াপুর (অন্তিম পর্ব )
অদিতি মন্ডল,
কলকাতা
পূর্ববর্তী অংশটি পড়ার জন্য
লাইব্রেরি
বিভাগে দেখুন...
বিজ্ঞান বাবু টিকেট নিয়ে এলে স্টিলের রেলিং এর সরু রাস্তা ধরে আমরা
এগিয়ে চললাম, ও এসে পড়লাম এক সরু ব্রিজ এর ওপরে। দুদিকে জলের ফোয়ারা
উঠছে ও হালকা হালকা জলের কণা তাই গায়ে এসে পড়ছে। ব্রিজ থেকে নেমে সামনে
এগিয়ে গেলে বানানো কৃত্রিম গুহা রাস্তা। হাত দিয়ে বুঝলাম ফাইভারের উপরে
কাপড় লাগিয়ে তাতে ছাই ও কালো রং করে পাথরের রুপ দেওয়া হয়েছে। এখানে
একটু অন্ধকার পরিবেশ, তবে খুব বেশি নয়। পাঁচ থেকে দশ মিটারের মত। এরপর
এগোতেই সুন্দর বাগানের রাস্তায় চারিদিকে হেঁটে যাওয়ার সংকেত। বাগানে
নয়নাভিরাম নানা রংবেরঙের ফুলের চাষ করা হয়েছে আর এরই মাঝে বিভিন্ন রূপে
নিমাই বা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর মূর্তি বিরাজমান। এটা দেখার পর আমরা আরও
বেশ কিছুটা পথ অতিক্রম করে পৌঁছে গেলাম মিউজিয়ামের সামনে। ভিতরে ঢুকে
দেখলাম বিভিন্ন ঠাকুরের বিভিন্ন মূর্তি। এখানেই পরিলক্ষিত হল একটি বাল
গোপালের বড় মূর্তি একটি সুন্দর দোলনায় বসানো। আমরা ঘন্টা নেড়ে দড়ি
ধরে দোলনায় কে বার কয়েক দুলিয়ে গোপালকে দোল দোল করে দুলিয়ে দিলাম।
এই ঘরটা থেকে বেরোলেই এসে পড়তে হয় বিশাল আকার নিমাই মূর্তির পাদদেশে।
এটি উচ্চতায় প্রায় বেশ লম্বা, হলুদ রঙের আর অভয় মুদ্রায় রয়েছেন
তিনি। তাঁর মাথায় ছাতা, পরনে ধুতি আর পায়ে রয়েছে খড়ম। প্রণাম সেরে
আমরা তৃপ্ত মনে বেরিয়ে এলাম। এখানে এই প্রচন্ড গরমে ঠান্ডা কুলারের জলের
মেশিন দেখে আমরা নিজেদেরকে ধরে রাখতে পারলাম না, মন প্রাণ ভরে জল খেয়ে
বেরিয়ে এলাম।
আবার টোটো চলতে লাগলো নিমাইয়ের দেশের রাস্তায়। রাস্তাগুলো মায় ছোট ছোট
অলিগলি অবধি এখানে সব হয় কংক্রিটের না হয় পিচের। মানস চোখে কল্পনা
করছিলাম যে এমনই সব রাস্তায় ধুলোমাখা পায়ে দুই হাত উপরে করে চোখে
বারিধারা নিয়ে কৃষ্ণ নাম করতে করতে নেচে নেচে ছুটে চলেছেন আমার নিমাই।
এমন ভাবনাও যেন শরীরে শিহরণ জাগাচ্ছে, যেন মনে হচ্ছিল আমার প্রাণের নিমাই
এই মাটিতেই ছুটে বেরিয়েছেন তাই এই মাটি আমার কাছে অনেক বেশি পবিত্র,
পুণ্যভূমি। এখানকার বাতাস হরিনামের গুনে পবিত্র।
এরপর আমরা এসে পড়লাম নিমাইয়ের বাড়ি। চুন সুরকি দিয়ে গাঁথা দোতলা
বাড়ি। দেখলাম নিমাই অর্ধাঙ্গিনী বিষ্ণুপ্রিয়ার বাড়িও। দোকানদারকে
জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম এখানকার সকলের পদবী মিশ্র, দোকানদার নিজেও
মিশ্র পদবিধারী মানুষ। এটা মিশ্র পাড়া।
এরপর চলে এলাম আরেকটি মন্দিরের সামনে। এখানে শচীমাতা ঠিক যেন মা ষষ্ঠীর
মতন বসে আছেন। প্রধান মন্দিরের সামনের উঠোনের ঠিক বাঁদিকে ছোট মন্দিরটাতে
আছেন শচীমাতা। এর চারপাশ দিয়েও প্রদক্ষিণ করা যায়। মন্দিরের বাইরের
দিকের রেলিং লাগানো সরু প্যাসেজটাতে জমা হয়েছে ভক্তদের মানসিক করা লাল
দড়ি। প্রধানমন্দীরে তখন বৈষ্ণবগগণ এক সুরে ভগবত গীতা পাঠ করে চলেছেন,
শুদ্ধ সংস্কৃত উচ্চারণের সাথে গীতা পাঠ শুনতে আমার বেশ ভালো লাগলো।
কিছুক্ষণ গীতা পাঠ শোনার পর আমরা চলে এলাম অন্য একটি মন্দিরে। পান্ডার
থেকে জানতে পারলাম একমাত্র এই মন্দিরেই ভগবান জগন্নাথ দেবের প্রসাদ
পাওয়া যায়। সেইমতো আমরা মন্দিরে পূজো দেওয়ার পরে প্রসাদ নিয়ে নিলাম।
এরপর আমরা এলাম সোনার গৌরাঙ্গ দর্শন করতে। টিকিট কেটে এগোলেই একটা পর্দা,
পর্দা সরিয়ে আরো একটু গেলে সিঁড়ি দিয়ে মন্দিরের ওপরে উঠে পৌঁছে গেলাম
একেবারে বিগ্রহের সামনে। যদিও বিগ্রহ লোহার শক্ত রেলিং দিয়ে ঘেরা। ভিতরে
পুরোহিত পূজা করছেন, কিছু চাওয়ার থাকলে ভিতরের ছোট লোহার গেট থেকে হাত
বাড়িয়ে নিচ্ছেন। গৌরাঙ্গ তার গৌরবর্ণ রূপ নিয়ে মাথায় মুকুট পড়ে
দাঁড়িয়ে আছেন, যদিও মুকুটটা সোনার বলেই মনে হলো, ঈতবে গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু
বিগ্রহটি সোনার তৈরি বলে মনে হলো না একেবারেই। কাউকে জিজ্ঞেস করে
বিশ্বাসকে আর আঘাত করতে চাইলাম না। পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা অন্যান্য
মানুষদের কে দেখার সুযোগ করে বেরিয়ে এলাম। আমরা এরপর এসে পড়লাম অন্য
একটি মন্দিরে যেখানে বিদেশী বৈষ্ণবগগণ ভক্তিভাবে সামনের অন্যান্য বিদেশী
ভক্তগণকে ভগবত গীতার সারমর্ম বুঝিয়ে চলেছেন।
হোটেলে ফিরে আর বেরোতে ইচ্ছে করলো না, আগামীকালই আমাদের ফেরার কথা।
বিজ্ঞানী বাবু তাই আমাদের সবার জন্য খাবার আনতে বাইরে চলে গেল। আমি হালকা
গরম জলে স্নান করে হোটেলের বিছানার নরম গদিতে গা ডুবিয়ে সারাদিনের ঘুরে
বেড়ানোর স্মৃতি রোমন্থন করতে লাগলাম। এক বুক ভরা সতেজ অক্সিজেনের সাথে
মাথার মধ্যে একের পর এক ভিড় করতে লাগলো সারাদিনের সমস্ত মন্দির এবং
বিগ্রহগুলি। আর বিশেষ করে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর মায়াবী মুখমন্ডল কি
অপূর্ব সরলতা আধ্যাত্মিকতা এবং উদারতার মূর্ত প্রতীক। বিগ্রহের মায়াময়
চোখ দুটি দেখেই মনটা টানে তার হরে কৃষ্ণ নামের মধ্যে। আমার মনে হল
নবদ্বীপ বা মায়াপুর শুধু যেন দর্শনীয় কোন স্থান নয় এ যেন আধ্যাত্বিক
অনুভূতির উৎস। এই চার দিনের স্বল্প সময়ের ভ্রমণটা কেমন যেন 'ছোট গল্প'
হয়ে রইল, ঠিক যেন- "শেষ হয়েও হইল না শেষ"।
ছুটি শেষ, হোটেলের চেক আউট আর ট্রেন ধরার তাড়াহুড়োর মধ্যে কেমন যেন
নিমাই এর মাটির দেশের হাওয়া জল মানবিকভাবে শোষনের তৃষ্ণা অনুভব করছিলাম।
মায়াময় কৃষ্ণ কে; দয়াময় ঈশ্বরকে ছেড়ে আসতে একেবারেই মন করছিল না।
মনে হচ্ছিল আমার কৃপাময় ইস্ট দেবতার চরণে আরো দুদন্ড বসি, আরো কিছুক্ষণ
কৃষ্ণময় হয়ে থাকি। বাস্তব জগতের ক্লান্তি ব্যস্ততা ব্যয়বহুলতার জীবন
ছেড়ে আরো কিছুক্ষণ থাকি তার এই ভুবন ভুলানোর রূপের সামনে। মন আমার কৃষ্ণ
মাঝে হারিয়ে যেতে চাইছিল বারবার। ইসকন মন্দির বা শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর
মন্দির নয়, আমার মন শুধু তাতেই ডুবতে চাইছিল। মন্দিরের বাইরের পরিবেশ
আকাশে বাতাসে প্রতিমান। তার চরণে প্রণাম সেরে বারবার ধন্যবাদ জানাতে
চাইছিলাম আমার এই মানব জীবনের জন্য, কারণ এই মানুষরূপেই জন্মেছি বলে আমি
তার এই অপরূপ রূপের আশ্বাদন করতে পারছি। আর হৃদয়ে তাকে ধরে রাখতে পারছি।
বাড়ি ফিরলাম অনেকটা দূর মায়াপুর থেকে, তবে কৃষ্ণের থেকে নয়। মনে মনে
গাইলাম "তোমায় হৃদ মাঝারে রাখিবো ছেড়ে দেব না"।
সমাপ্ত..............
আলোকচিত্র সৌজন্যে লেখিকা অদিতি মন্ডল