এক আশ্চর্য সাক্ষাৎ

অরিন্দম চট্টরাজ,

ধানবাদ, ঝাড়খন্ড

মাত্র কয়েক দিন আগে বাড়ি ফেরার পথে হাওড়া স্টেশন থেকে রাজধানীতে ওঠার সময় আমার শাখার এক বরিষ্ঠ ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে আমার দেখা হয়। গভীর ও অর্থপূর্ণ কথোপকথনের সাথে তাঁর সঙ্গে ট্রেন যাত্রা ছিল এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। আমরা কয়েকটি বিষয়ে কথা বলেছিলাম এবং আমার মা ও আমাদের সাথে কথোপকথনে জড়িত হয়েছিলেন। যেহেতু আমি আবেগ প্রবন হয়ে পড়েছিলাম তাই ভদ্রলোক আমাকে যে নামগুলি বলেছিলেন তা আমি এই মুহূর্তে বসে মনে করতে পারছি না। তিনি অত্যন্ত দয়ালু ও মিশুকে প্রকৃতির ছিলেন এবং আমার মধ্যে লুকিয়ে থাকা লেখকসত্তাকে চিহ্নিত করেছিলেন। তিনি আমাকে ম্যাগাজিনের জন্য লিখতে বলেছিলেন যা আমি এখন লিখছি।

তিনি এত ভাল যে, তিনি তাঁর জলখাবারও আমার সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছিলেন, যা আমি না না করে ও গ্রহণ করেছিলাম।

তাঁর পোষ্য গোল্ডেন রিট্রিভার তাঁর সবচেয়ে ভালো বন্ধু ছিল, তাকে হারিয়ে তিনি কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন। । প্রিয়জনকে হারানোর কথা বলতে বলতে তাঁর চোখ লাল হয়ে যায়। তিনি প্রায় কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন। কিন্তু তারপর আমার মা তাঁকে সান্ত্বনা দেন।

তিনি বলেছিলেন যে টমি (কুকুরের নাম) বমি করছিল এবং তার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিলো। বমি করার সাথে সাথে টেনে শ্বাস নেওয়ার কারণে বমির কিছুটা অংশ টমির ফুসফুসে চলে যায়। এর ফলে টমির শ্বাস নিতে আরও বেশি কষ্ট হয় আর তার শ্বাস প্রায় আটকে চোখ বেরিয়ে যায়। টমিকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যায়। হাসপাতালে 20 হাজার টাকা জমা দেওয়ার পর পশুচিকিৎসক তাঁর চিকিৎসা করেন, তবে টমিকে বাঁচাতে পারেনি। টমি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এর পরে তিনি যথাযথ শ্রদ্ধা পূর্বক মৃত কুকুরটির অন্তেষ্টিক্রিয়া করেন। দেশের আইন অনুসারে কেউ কোন খালি স্থান বা নালা - নদীর তীরে কোন মৃত কুকুরকে পুড়িয়ে ফেলতে পারে না। তাই তিনি টমির শব দেহটি একটি বৈদ্যুতিক চুল্লীতে পুড়িয়ে দেয়। তিনি টমির শেষ দেহাবশেষ বা অস্হি বিসর্জনের জন্য ত্রিবেণীতে যান। তিনি 13 দিন ধরে অশৌচের সমস্ত নিয়ম-কানুন মেনে চলেন এবং বিধিবৎ শ্রাদ্ধ ও করেন। এই কথা শুনে আমার মা বললেন যে টমির কুকুরের জীবন এখন শেষ হয়ে গেছে। টমি এখন মানুষের মধ্যে জন্মগ্রহণ করবে।

তিনি দিল্লির দিকে যাচ্ছিলেন, কিন্তু আমরা ধানবাদে নামলাম। যা হাওড়ার পরে মাত্র 2টি স্টেশন ছিল। আমরা পরস্পর ফোন নম্বর, ঠিকানা এবং আরও কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য বিনিময় করেছি। আমাদের পছন্দ-অপছন্দ নিয়ে কথা বলেছি। আমরা রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আরও কিছু বিষয় নিয়ে কথা বলেছি। আমি ধানবাদে নেমে তাঁর কামরার কাছে কয়েক কদম এগিয়ে গিয়ে বিদায় নিলাম।

আমি প্রায়শই ভাবি যে কেন আমরা এই ধরনের সাক্ষাৎকার বা চেনা পরিচয় হয়! তাঁর সঙ্গে কি আমার কোনও অসমাপ্ত কাজ ছিল? নাকি; এটি সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের বড় চিত্রের একটি অংশ মাত্র?