মিছিলের ঠিক পরের ট্রামটা

শাশ্বত বোস,

শ্রীরামপুর, হুগলী

পৌষের নতুন শীতের ভোরের সোঁদা গন্ধটা, পাড়াটাকে সাদা ধুলোর মত জাপ্টে ধরেছে, যেন নতুন পাখির বাসায় কুমোরে পোকার মুখের লালা, জমতে জমতে ঢিবির আকার নিয়েছে ক্রমশঃ। আশেপাশের বাড়ি থেকে অনিবার্যভাবে যে হ্যাঁচ্চোটার ভেসে আসার কথা ছিল, সেটার ঘুম ভাঙেনি এখনও। রেডিওটা থেকে নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কে একটা একটানা বাক্যরাজি বেরিয়ে আসতে চেয়েছে অনেক আগেই, তবু গুড়ের চায়ের গন্ধটা ওকে চুপ করিয়ে দিয়েছে আগুপিছু বছর তিরিশের জন্য। একটা প্রলম্বিত ধূলিকণার শরীর বেয়ে, উল্টোদিকের বাড়িটায় নয়, মৃদুলার অনভ্যস্ত চোখ চলে যায় ঠিক তার পাশের বাড়িটায়।

নব্বইয়ের দশকের কোন এক জানুয়ারী মাস, ওখানে শেষবারের মত মানুষের মুখ দেখেছিল মৃদুলা। লম্বা লম্বা গরাদ পেরিয়ে মুখটা চেয়েছিল একবার আকাশের দিকে আরেকবার সরু গলির রাস্তার দিকে। সেই থেকে মৌলালির মোড়ে, সমান্তরাল ট্রাপিজের দড়ির মত বিছিয়ে থাকা ট্রামলাইনটার ওপর দিয়ে, একটা পুরোনো লোহার শরীর ঝাঁকানো ঘন্টি মেরে চলে গিয়েছে ট্রামটা, কত শত বার! ট্রামের জানলা দিয়ে উঁকি মেরে গেছে একটা আবছা মুখ, কখনও মৌলালী বাবার দরগার দিকে, কখনও বা গোড়ার দিকটা সরু হয়ে ঢুকে যাওয়া এস এন ব্যানার্জী রোডের দিকে। দরগা থেকে শত শত সাচ্চা মুসলমানের নামাজ, আয়াত আর দোয়ার পাঁচমিশালী একটা হাওয়া উঠে ছুটে গেছে ট্রামটার পেছন পেছন। ঠিক সেই সময়ের ফ্রেম থেকেই যেন একটা ছবি ভেসে উঠতে চাইলো মৃদুলার চালশে ধরা চোখের কুঁচকে যাওয়া চামড়ার কোণ থেকে, আর কানের কাছে রিনরিনে একটা শব্দ করে ভেসে এলো ভাগ্যহত একটা ট্রামের ঘন্টি। শব্দটা ওর কানের কাছে এসে ধাক্কা খেয়ে চারপাশের মহাকরুণার মত নৈঃশব্দ্যের মাঝে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেলো যেন। বড় রাস্তার উপর দিয়ে শেষ কবে চলে গিয়েছিল ট্রামটা, মৃদুলা জানে না। আজ এই ভোরের সময় আকাশের ঠিক কোন কোণা থেকে ভেসে এলো এই আত্মকণ্ঠ? আওয়াজটা ছায়ার মত মিলিয়ে যাবার পর আন্দাজ করে সেই দিকে তর্জনী নির্দেশ করে চেয়ে থাকে মৃদুলা। গতকাল রাত বারোটায় ফতেমা শিরিনের বড়দিনের ঘন্টাটাও একইরকম ভাবে শুনেছে ও। পদ্মপুকুর বস্তির বিফ টিকিয়া পোড়ানো, মসলা মাখা মাংস ঝলসানো একটা গন্ধমাখা জামাকাপড় পরে থাকে আওয়াজটা! ঘন কুয়াশার সরের ভেতর দিয়ে আওয়াজটা যেন ঠিক এক পা এক পা করে হেঁটে চলে আসে ওর দিকে।
খুব ভালোভাবে এগিয়ে আসতে জানে আওয়াজটা, যেন কোন যথার্থবাদী দার্শনিকের ধীর দাগে আঁকা গভীর রেখা বেয়ে ভেসে আসে। মুহূর্তে মনে হয় খোলা ময়দানের বুকে ফুটন্ত দুধ চায়ের গন্ধে পাগল হয়ে যাওয়া কাকদুটো বসে ছিল ট্রামটার মাথার ওপর, পর্ণমোচী মানচিত্র এঁকে দেওয়া ওভারহেড তারে আওয়াজটার কম্পাঙ্কে ট্রামরেলের ধাক্কায় ছিটকে গেল সেখান থেকে। বাড়িটার দিকে আবার ফিরে তাকাল মৃদুলা। সময়টাই এমন যেন মনের কোণে জমে থাকা সব সুখ দুঃখ এলোমেলো হয়ে পড়ে থাকে বাড়িটার জেদী শরীরখানা জুড়ে। বেশ কয়েকটা রোদ-জল-বসন্ত পিছিয়ে গিয়ে বাড়িটার গা বেয়ে মাথা তুলেছিল যে জীবন্ত বটের চারা জাগতিক সব মাধ্যাকর্ষণকে অগ্রাহ্য করে, তার শিকড় এখন দুমড়ে মুচড়ে গিয়ে ফোঁসহীন অজগরের মত পেঁচিয়ে ধরেছে বাড়িটাকে। ট্রামটার চলে যাওয়ার দৃশ্য দেখে উঠতে পারেনি বাড়িটা, শুধু বুকের ভিতর জন্ম দিয়েছে কত অর্বাচীন কথকতার! পটারি রোড থেকে বড়পিসিমার যে মেয়ে এসে ফলটা, মিষ্টিটা দিয়ে যেত ওর স্বামীর অসুখের সময় সেও ট্রামটাকে চলে যেতে দেখেছিল হয়তো! মৃদুলা মফঃসল লের মেয়ে। ওর বাবা মারা যাবার পর এই বড়পিসিমাই ওকে নিজের কাছে এনে রেখে, এই বাড়িতে বিয়ে ঠিক করে খবর পাঠিয়ে দিয়েছিলেন ওর মায়ের কাছে। রীতিমত সাহেবী কেতাদুরস্তের বাড়ি, কিন্তু লোকগুলো আদ্যন্ত বাঙালী। বিয়ে করে এসে বিশাল দোতলা বাড়িটার দক্ষিণ দিকে আলগোছে বেরিয়ে থাকা ছাদটা থেকে জীবনে প্রথম গোলা পায়রা ওড়াতে দেখেছিল মৃদুলা ওর বড় ভাসুরমশাইকে। ছাতের ঘরের এক কোণে পায়রাগুলো খাঁচায় রাখা থাকত। ওদের দেখভালের জন্য আলাদা একটা মুসলমান আবদালি রাখা ছিল। ওর ভাসুরের রঙ্গীন জীবনযাপনের শেষ দিন অবধি নিজের স্বামীর মুখে মৃদুলা শুনেছিল, উনি নাকি জাহাজে মাল সাপ্লাই করতেন।
কি মাল, কোথা থেকে আসে কোথায় যায়, এসব প্রশ্ন মৃদুলার নরম মনে এসেছিল হয়তো কখনো কিন্তু ও কাউকে জিজ্ঞাসা করেনি। চোখের সামনে ওর ভাসুর ঠাকুরকে রংচঙে একটা কেউকেটা মার্কা জীবন থেকে চূড়ান্ত নিঃসঙ্গ অসফল একটা মাটিতে আছড়ে পড়তে দেখেছিল মৃদুলা। বড় মায়া হয়েছিল ওর, যখন ব্যবসায় ডুবতে থাকা জাহাজের মাস্তুল হাতড়ে আরেকবার ঘুরে দাঁড়াতে চেয়েছিলেন মানুষটা। নিজের ভাইয়ের হাত দিয়ে মৃদুলার বিয়ের গয়নাগুলো চেয়ে পাঠিয়েছিলেন। সেদিন মনে মনে না চাইলেও মুখে কিছু বলেনি মৃদুলা। বলবার উপায়ও হয়তো ছিল না ওর। ওর স্বামীর একটা মাড়োয়ারি কোম্পানিতে চাকরী। সকাল নটার মধ্যে নাকে মুখে কিছু গুঁজে দৌড়োনো একটা জীবন কাটিয়ে, যৌথ সংসারের পাতাবিহীন গাছটার মস্ত ডালপালা জুড়ে এই যে একটা প্রকান্ড বিস্তার, সেতো মৃদুলার বড় ভাসুর ওই ‘কাকাই’এর জন্যই! গয়নাগুলো মৃদুলার মায়ের গয়না। ওজনে প্রায় কুড়ি ভরি! ওর মা হয়তো পেয়েছিলেন তাঁর দিদিমার কাছ থেকে। ‘নিনি’র খুব প্রিয় ছিলেন ওর মা। সেটা দেখেছিল মৃদুলা। এই গয়নাগুলোই ছিল ওর মায়ের শেষ সম্বল! এগুলো যে ওর মা ওকে বিয়েতে সব দিয়ে দিয়েছিলেন ওর দুই ভাইকে প্রায় বঞ্চিত করে, সেটা ভালো বুঝতে পেরেছিল ও। তবু মুখ ফুটে ও কোনদিন কিছু বলেনি। আসলে কোনোদিনই খুব গোছানো নয় ও। নিপুণ ঘরকন্যা বলতে যা বোঝায় সেটা কোনোদিনই ও পেরে ওঠেনি। বিয়ের পর ওর ঘর আলমারি গুছিয়ে দিতেন ওর খুড়শাশুড়ি। খুব ছোটবেলায় ওর স্বামী তাঁর মাকে হারান। জ্ঞান হবার পর থেকে তিনি এই ‘কাকিমা’কেই মা বলে জানতেন। খুব আধুনিকা মহিলা ছিলেন মৃদুলার এই খুড়শাশুড়ি, তেমনি শৌখিন। মৃদুলা আবার বড় হয়েছে খুব রক্ষণশীল একটা পরিবারে। এ বাড়িতে আসা ইস্তক প্রায় প্রতি সন্ধ্যেবেলা একটা বিশাল আড্ডা বসতে দেখেছে মৃদুলা। সেই আড্ডায় যোগ দিতেন এমনকি এই বাড়ির মেয়ে বউরাও! ব্রোচ দিয়ে পরা শাড়ি, হাফ স্লিভ ব্লাউজ এসব দেখে প্রথম দিকে হাঁ হয়ে থাকত ও। বগল দেখা যায় এরকম ব্লাউজও আবার হয়! ওর মাকে তো ও সারাজীবন সাধারণ আটপৌরে সাজেই সংসারে দেখে এসেছে। মৃদুলা সন্ধ্যের সেই আড্ডাতে হয়তো একদিন চলে এলেন প্রখ্যাত ‘কামদারঞ্জন মুখোপাধ্যায়’ ওরফে ‘কামু মুখার্জী’। হ্যাঁ সেই সোনার কেল্লার বিখ্যাত ভিলেন মন্দার বোস। নাক দিয়ে টেনে সিগারেট ভ্যানিশ করার খেলাটা দেখাচ্ছেন এ বাড়ির বাচ্চাদের। দেখাচ্ছেন, দেখিয়েই চলেছেন। কর্মজীবনের শুরুর দিকে তিনি মৃদুলার ভাসুর মশাইয়ের ব্যবসা দেখভাল করতেন। আড্ডাটা শেষ হয়েছে হয়তো রাতের খাবার দিয়ে। সেখানে হয়তো কেউ হাতে করে কোনদিন পার্ক স্ট্রিট থেকে খাবার নিয়ে এসে যোগ দিল কিংবা বাড়ির ঠাকুরকে বলা হল ঝাল ঝাল করে মুরগীর রোস্ট রাঁধতে। কেউ বা অফিস ফেরত এন্টালি মার্কেটের ভিতরের বিখ্যাত ধাবা থেকে নিয়ে এল রুমালি রুটি-তড়কা। ক্রমে রাত বাড়ল, আড্ডা গড়াল মদের আসরে। বাড়ির মেয়ে বৌয়েরা ততক্ষণে যে যার ঘরে চলে গিয়েছেন। কেউ বা পর্দার আড়াল থেকে শানিত দৃষ্টি দিয়ে রেখেছেন নিজের কর্তার দিকে। রীতিমত দামী স্কচ হুইস্কির ফোয়ারা! সদ্য কাল বিকেলে খিদিরপুর ডকে ভেরা জাহাজটার পেটের ভেতর সেঁধানো VAT69 এর নেশায় চুর হয়ে হয়তো তখন কামু কাকাইয়ের পায়ের গোড়ায় বসে সমানে বলে চলেছেন, “গুরু হো তো আইসা!” মৃদুলার বুক কেঁপেছে এসব দেখে। ঘরে এসে কুলুঙ্গিতে রাখা মা কালির ছবিটার সামনে মাথা ঠুকেছে সমানে।
বুক ভরা দীর্ঘ্যশ্বাস ফেলেছে যে ভাগ্যিস ওর স্বামী ওসব খান না! বিয়ের দিন বড় পিসেমশাই ওর মাকে বর দেখিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “জামাই পছন্দ হয়েছে বড় বৌঠান? আপনার মেয়ের জন্য রাজপুত্রের মত বর এনে দিয়েছি, এবার আমাকে কি রেঁধে খাওয়াবেন বলুন?” বলেই হো হো করে হেসে উঠেছেন। দেখতে ওর স্বামী রাজপুত্রের মতোই ছিলেন বটে যৌবনকালে! যেন সিনেমার হিরোকেও হার মানায়। বয়সের অনেকটা তফাৎ তবু মৃদুলা যেন কখনও সেটা টের পায়নি। শুধু প্রাণ ভরে ভালোবেসে গেছে। এই আসরেই হয়তো একদিন বাড়ি ফিরে মৃদুলাকে উত্তম সুপ্রিয়ার গল্প শুনিয়েছে কচি। এই ‘কচি’ নামেও কচি আবার মনের বয়সেও কচি। মৃদুলার স্বামীর ঠিক ওপরের ভাই। বাড়ির ছেলে বুড়ো সবার কাছেই সে শুধু ‘কচি’। মৃদুলাকে তিনি স্নেহ করতেন নিজের বোনের থেকেও বেশী। এ.জি.সি বোস রোডের উপর মল্লিকবাজার ক্রসিংয়ে নোনাপুকুর ট্রাম ডিপোর উল্টোদিকে সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়ির শোরুম ছিল, ‘অটো সেন্টার’, পার্টনারশিপের ব্যবসা। চার মালিকের মধ্যে অন্যতম ছিলেন এই ‘কচি’, রবীন ঘোষ। ষাটের দশকের শেষ থেকে সত্তরের দশকের মাঝামাঝি অবধি কলকাতার হেন নামী লোক নেই যে এঁকে চিনতেন না। তা সে রঞ্জি খেলা ক্রিকেটারই হোক, নামী লেখক কিংবা বিলেত ফেরত ডাক্তার, বিদায়ী মন্ত্রী বা উঠতি নায়ক নায়িকা থেকে মহানায়ক, প্রায় সবাইকেই গাড়ি বেচেছেন এই কচি। এদের সবার হাড়ির খবর গড়গড় করে বলে চলতেন তিনি মৃদুলাকে আর মৃদুলাও সেসব গালগল্প গোগ্রাসে গিলতো। মনের ভেতর দোল খেতে থাকা সাদা কালো পর্দা সরিয়ে, আসা যাওয়ার পথের মাঝে যত্ন করে হাতড়ালে মৃদুলা দেখতে পায় শীত আসা শীত যাওয়ার ব্যবধানে বয়ে চলা গল্পগুলো অনন্ত চালচিত্রের ছবি হয়ে এক আকাশ রামধনুর মত জেগে আছে আজও।

ঘন্টির শব্দটা আবার আসবে বিকেলের দিকে। তখন হয়তো এন্টালি মসজিদে নামাজ পড়া চলছে। আয়াতের শব্দের সাথে ধুপ আতরের খুশবু হয়ে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে থাকবে আওয়াজটা। বাপের বাড়ি থাকতে মৃদুলা কলকাতার ট্রামের অনেক গল্প শুনেছে বাবা কাকাদের মুখে। ওর ন কাকা নিউজিল্যান্ড ইন্স্যুরেন্সে চাকরি করতেন। হাওড়া ব্রীজের ওপর দিয়ে ট্রামে চেপে আপিস যেতেন। তখন ট্রামে ফার্স্ট ক্লাস ছিল। বিয়ের পর একদিন বরের সাথে শিয়ালদার জগৎ সিনেমা থেকে ট্রামে করে মৌলালী অবধি এসেছিল মৃদুলা। তখনও ও জানত না নদীর মত এঁকে বেঁকে বয়ে চলা ট্রামলাইনগুলো আর কিছুদুরের মধ্যে পার্ক সার্কাস ট্রাম ডিপোয় গিয়ে শেষ হয়েছে। মাঝে সান্ধ্যকালীন রাগিনীর মত কিছু লাইন চলে গেছে নোনাপুকুর বেনেপুকুরের দিকে। চার নম্বর পোল পেরিয়ে গোবরায় একটা গোরস্থান আছে বলে শুনেছিল মৃদুলা। ওদিকটা দিয়েই আগে বড় পিসিমার বাড়ির দিকে যেত ও কিন্তু কবরগুলোকে কখনও নিজের চোখে দেখেনি। বিয়ের পর এ পাড়াতে এসে প্রায়ই দমবন্ধ হয়ে উঠত মৃদুলার। সরুগলির মধ্যে বাড়ি। গায়ে গায়ে ঘেঁষাঘেঁষি করা দুটো বাড়ির মধ্যে দিয়ে আবার একটা সরু গলি ঢুকে গিয়ে পরের বাড়িটার শ্যাওলা ধরা কার্নিশ থেকে গড়িয়ে পড়া রোদটাকে এঁটো করে দিতে চাইছে যেন সর্বভুক বুদ্বুদের মত। তবু সময়ে অসময়ে পুরো পাড়াটা যেন একটা পরিবারের মত। অবচেতনে কবরস্থানটাকে দেখে শিখতে চেয়েছে মৃদুলা, কিভাবে অনন্তকাল ধরে মাটি আঁকড়ে পড়ে থাকতে হয়, কিভাবে খোলা আকাশের নীচে একটা বাউন্ডুলে ঘুড়ির মত কান কেটে গোত্তা খেতে থাকা একটা গৃহস্থ বাড়িতে পাঁচমিশালি কাওতালির ভিতর অস্ফুট স্বর ম্লান ম্লান হয়ে, এক বুক অভিমান নিয়ে শিকড় গাড়তে হয়। সমস্ত আয়না, সমস্ত জাদুঘড়ি উধাও করে বিয়ের সময় থেকে দেখে আসা রংচঙে দিনকালটার গা থেকে উড়ে আসা শুকনো পাতাগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে মৃদুলা। ওকে ঘিরে কুন্ডলী তৈরী করে সেগুলো ‘পৃথিবীর গায়ের সব ফাঁক ফোঁকর বুজিয়ে দেবে’ এই শপথ নেয়।

সেটা ৬৭ সালের মে জুন মাস। এই মৌলালির চার রাস্তার মোড়ে ভাড়া এক পয়সা বাড়ানোর প্রতিবাদে দাউ দাউ করে জ্বলেছিল গোটা একটা ট্রাম। না সে আগুন শুধু কলেজ পাড়াতেই থেমে থাকেনি। এমন অনেক আম-আদমির না জানা কথা বিয়ের পর মৃদুলা শুনেছে উল্টো দিকের বাড়ির গোলগাল চেহারার অম্বুজা মামার কাছে। ভদ্রলোক সিইএসসিতে চাকরী করতেন, মৃদুলার ছেলেকে বড় ভালোবাসতেন। এবাড়ির আরো দুই ছেলে মেয়ের থেকে বরাবরই ওর নিজের ছেলে একটু বেশী আদর একটু বেশী লাই পেয়ে এসেছে চিরকাল আর সেটাই হয়তো কাল হলো ছেলেটার জীবনে! এ বাড়ির রংচঙে জৌলুসদার জীবনের ঘোর লেগে গেল ওর চোখে। চারিদিকে কত মানুষ তখন, কত আশ্রয়! আদতে বখে যেতে যেতে স্কুল ড্রপ আউট হয়ে গেল ছেলেটা। এখন একটা সরকারি সমবায়ে দারোয়ানের চাকরি করে। দয়ার চাকরি তাই কোন ইজ্জত নেই! ঘোষ বাড়ির ছেলে দারোয়ান! মৃদুলার খুড় শাশুড়ি বেঁচে থাকলে হয়তো অপমানে আত্মঘাতীই হতেন। ‘ক্লাস এইট পেরোতে পারেনি যে ছেলে, দুবেলা দুমুঠো ভাতের জোগাড় করে নিতে পারছে এটাই ভাগ্য!’, এক বেলা থেকে আরেক বেলার দিকে চলে যেতে যেতে ভাবে মৃদুলা!

একাত্তরের অশান্ত কলকাতায় মাঘের কোন এক বিকেলে বিয়ে হয়ে এ বাড়িতে এসেছিল মৃদুলা। মৌলালি ক্রসিংয়ে একটা সমান্তরাল পৃথিবীর বুকে ভনভন করতে থাকা মানুষজনের মেলায়, যুগের সেন্টিমেন্ট হয়ে চলে যেতে দেখেছিল ট্রামটাকে। কংক্রিটের রাস্তার উপর অদৃশ্য জাদুওয়ালার মত বিভিন্ন ফর্মের ইন্দ্রজাল বুনতে চাওয়া শাণিত ইস্পাতের লাইনগুলো ডিঙোতে গিয়ে, ওদের গাড়িটা হোঁচট খাচ্ছিল বেশ কয়েকবার। লাইনটা আজ শুয়ে আছে অনন্ত শয্যায়, শুধু গায়ের চামড়ায় মরছে ধরেছে। লাইনগুলো যেন কাটাকুটির অঙ্ক কষে, শেষের আগের ট্রামটা কখন ওদের মাড়িয়ে চলে যাবে সেই অপেক্ষায়! ওর বউভাতের দিন রাত্রে গলির মুখ থেকে বোমাবাজির শব্দ ভেসে আসতে শুনেছিল মৃদুলা। সেটা নকশাল আমল। ওর মন কেমন করে উঠেছিল বাড়ির জন্য, ওর মায়ের জন্য আর সেদিন মৌলালির মোড়ে দেখা সেই ট্রামটার জন্য। ওদের শরীরে যেন কোন আঁচ না আসে এটাই চেয়েছিল মৃদুলা। যেমনটা ও চায় আজও। ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া শুকনো ফুলের মত বয়সের সাথে সাথে ঝুরঝুরে হয়ে গেছে বাড়িটা, জৌলুস হারিয়েছে। নির্মোহ আপেক্ষিকতার নিয়মে বদলে বদলে গেছে সাতপুরনো দিনকাল। মোড়ের মাথায় ধোপার দোকানটা বন্ধ হয়ে গেছে। লাগোয়া বাড়িটা ভেঙে কর্পোরেশন রুল লঙ্ঘন করে গায়ে চেপে ফ্ল্যাট তুলে দিয়েছে উঠতি প্রোমোটার। ছাতের ঘরের পায়রাগুলো হয়তো বা উড়ে গেছে গোবরার গোরস্থানের দিকে কিন্তু ফেলে আসা মাটির ভেতর ডুবে যেতে যেতেও বুকের ভিতর ট্রামের ঘন্টির শব্দটা যেন ভুলতে চায়নি কেউই। নব্বইয়ের দশকের কোন এক নিঝুম সন্ধেবেলা, এন্টালি বাজারের মুখটাতে গুলি চলার আওয়াজ শোনা গেছিল আর ওদের এই গলিটা দিয়ে যুব কংগ্রেসের কিছু তরুণ নেতাকে ছুটে পালাতে দেখেছিল মৃদুলা। তাঁদের কেউ কেউ আবার বর্তমান সরকারের মন্ত্রী! সেই সন্ধ্যেয় মৌলালি মোড়ের ট্রামলাইনে দু একটা ছেলের লাশও পড়ে থাকতে দেখা গেছিল হয়তো! ট্রামটা হয়তো নিথর শরীরগুলো এড়িয়ে ভারী ধাতুর ঘর্ষণে ছিটকে আসা স্ফুলিঙ্গে একটা রংমিলন্তি মানচিত্র এঁকে নির্জনতার দিকে এগিয়ে যেতে চেয়েছিল, কিন্তু পারেনি। বাহকহীন পালকির সেই নির্জনতায় হয়তো রাত দশটার পরই নেমে আসে মৃত্যুর জটিল হীমশীতলতা। মৃদুলা সেটা উপলব্ধি করতে পারে কিন্তু দেখতে পায় না। গত পরশুর টিভির খবরে মৃদুলা শুনেছে ট্রাম নাকি একেবারে মুছে যাবে এই মহানগরীর বুক থেকে।

শনিবারের বিকেলে শেষ হয়ে যাওয়া দুঃখের পৃথিবীটার সব ফেলে আসা গর্হিত পাপবোধ বুকে নিয়ে মাটি ছেড়ে শূন্যে ঝুলতে থাকা দরজাটাকে, ক্যাঁচ করে ঠেলে ভিতরে ঢুকে আসে কেউ।

“মা দরজাটা দাওনি? তোমায় নিয়ে আর পারলাম না। বলেছি না দরজা সব সময় দিয়ে রাখবে। কাল রাতে পাশের বাড়িতে চোর এসেছিল! দুম করে কোনদিন কেউ ঢুকে পড়বে বুঝবে মজা! কেটে রেখে যাবে একদম।” টানা ৪৮ ঘন্টা ডিউটি করে ফেরে মৃদুলার আত্মজ। ছেঁড়া জুতোটা পা থেকে কোনরকমে খুলে বসার ঘরে ঢুকে খাটের ওপর শুয়ে পড়ে।

“এই সোনু যা! এমা! গু গোবরের প্যান্টে এসে খাটে শুয়ে পড়লি?” রে রে করে ওঠে মৃদুলা। বরাবরই একটু শুচিবাইয়ের বাতিক আছে ওর। দিনের শেষ রোদ এসে তখন পড়েছে শহরের সমস্ত সিগন্যালে।

“কর্পোরেশন থেকে সায়েংশনটা এবার পেয়ে যাবো বুঝলে মা, বাড়িটায় এবার হাত দিতে হবে।”

আধখোলা শার্টের ভেতর থেকে বুকের চুলগুলো একটা মেঘহীন রোদজলহীন ব্যস্ত অভ্যাসে পাকাতে পাকাতে নিখুঁত ব্যালেন্স এ ঝুলে থাকা কড়ি বড়গাগুলোর দিকে চেয়ে বলে ওঠে সন্দীপ, মৃদুলার ছেলে। আকাশভাঙা দুঃখের ভিতর আনন্দের গভীরতম উৎসকে জেনে ফেলেছে, যন্ত্রণার গহীন গভীরে গিয়ে জীবনের প্রাণের স্পন্দন পেয়েছে, এমন একখানা বিস্ময় মাখা মুখ নিয়ে ছেলেকে জিজ্ঞেস করে মৃদুলা, “তুই হাত দিবি? পয়সা পাবি কোথায়?”

“আমি না পাই যার টাকা আছে সে সারাবে। আমি শুধু আমাদের ভাগের একখানা ঘর আর বাথরুম একটু একটু করে ছোড়দাভাইকে টাকা পয়সা দিয়ে সারিয়ে নেব। তবু সায়েশনটা পেলে এই শর্মার ভাগ্যে মনে রেখো! ছোড়দা তো পাশের ফ্ল্যাটের প্রোমোটারের এগেইন্সটে কেস করে নিজেই বাঁশ নিয়েছিল। হুঁ হুঁ অফিসে কদিন ধরে টাইমস অফ ইন্ডিয়ার ম্যাগাজিনে লিখছে Leo will make certain settlement in property related litigations। এখন তুমি ভাত বাড়োগে যাও, আমি যাই ওপরে গিয়ে বৌদিকে বলে আসি। সন্ধ্যেবেলা ছোড়দাভাই ফিরলে বলতে হবে লাইন ধারের ছেনো মিস্ত্রিকে খবর দিতে। এসে দেখে যাক সবকিছু।” সটান উঠে বসে আধখোলা জামাটা গায়ে দিয়ে সিঁড়ির দিকে হাঁটা লাগায় সন্দীপ। মৃদুলা ওর দিকে চেয়ে থাকে শুধু। মুখের ইংরিজি শুনে কে বলবে একসময় এলাকার নাম করা ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া ছেলেটা ক্লাস এইটের গন্ডি পেরোয়নি! আজ রাতে নিজেই ছুটবে এন্টালি বাজারের দোকান থেকে রুটি তড়কা আনতে। দুই ভাই মিলে খাওয়া হবে অথচ মাথা গরম হলে এই ছেলেকেই আর রাখা যায় না। মৃদুলার সেজ ভাসুরের ছেলেকে প্রায় মারতে যায় আর কি! সরু গলিটায় এই ভরা শীতে একটা কুলফির গাড়ি ঢুকে পড়েছে, “কুলফি, কু-ল-ফি মা-লা-ই”, গলা ফাটানো আওয়াজটা বাড়িগুলোর জীর্ণ দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফেটে গড়িয়ে পড়ছে যেন! ঘোরলাগা বিশাল অন্ধকার রান্নাঘরটায় পায়ে পায়ে ঢুকে আসে মৃদুলা। একসময় দিনে তিনরকম ব্রেকফাস্ট টিফিন রান্না হত এখানে। বাড়ির এক এক বাবুর জন্য এক এক রকম। দুধে গোলা ফ্রেঞ্চ টোস্ট এখানে এসেই প্রথম দেখেছিল মৃদুলা। তারপর রান্নাঘরটা তিনভাগে ভাগ হল, মাঝখান দিয়ে তিনটে বিশাল বিশাল পাঁচিল। যে যার হাঁড়ি আলাদা। মনে মনে হাসে মৃদুলা, “কি লাভ হল?” পঞ্চাশ জনের গমগমে বাড়িতে আজ লোকসংখ্যা মোটে পাঁচ, তাও ওর সেজভাসুরের বৌমা অর্ধেকদিন এবাড়িতে থাকেন না। ওই পাগল ছেলে সোনু বাড়িটা বেঁচতে দিল না। বলে, “মা তুমি চলে গেলে তো আমার আর কেউ থাকবে না। অন্তত বাড়িটা থাকুক!” মৃদুলা ভাবে, এই শহরটা ক্রমশঃ দলছুট মানুষদের, এই শতাব্দীটা ক্ৰমশঃ বাড়িছুট মানুষদের হয়ে যাচ্ছে। পৃথিবীর এই অসুখটা সারাবার মত একটা হাওয়া উঠবে হয়তো আর কদিন পরে। সেই হাওয়াতে এই বাড়িটারও সব অসুখ সেরে যাবে। সব ক্লেদ সরে গিয়ে পাহাড়চূড়া থেকে ঠিকরে আসবে একটা আলো। যে আলোটা হয়তো জন্মেও দেখেনি মৃদুলার শেষবারের দেখা ট্রামটা। হয়ত রাগ আর দুঃখের আলো আঁধারিতে মুখভার করে দাঁড়িয়ে আছে যে ট্রামটা ওকেও মুছে যেতে হবে না সেদিন। ছাতের পায়রার ঘরে তখন নীলচে পেখম, বুকের কাছটা সাদা এমন একটা পাখি সদর্পে চলে বেড়াচ্ছে! মা ফ্লাইওভারে তখন কর্পোরেট জ্যাম, উল্টোদিকের বাড়িটার পাশে তখন জানলা জুড়ে পৌষমাস নেমে আসে।