মোহময়ী মধ্যপ্রদেশ (তিক্ত অভিজ্ঞতা) প্রথম পর্ব
মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী,
বালি হাওড়া
গতমাসের কন্যাকুমারীর সমুদ্রের নোনা জল চুলে এখনও জড়িয়ে আছে। তারমধ্যেই
চেপে বসলাম শিপ্রা এক্সপ্রেসে। আসলে পায়ের তলায় রীতিমত চুলকানি হচ্ছে
রোজ। আর কে না জানে, পায়ের তলায় চুলকানি হলেই বেরিয়ে পড়তে হয়। এবারও
পুত্র আসবে বলে আসতে পারল না। ওর জন্যেই বান্ধবগড় টাইগার রিসার্ভের
মধ্যে MP Tourism Hotels and Resorts এর কটেজ বুক করা হল। কিন্তু পুত্রের
এবারেও আসা হল না। যাইহোক, গল্প বলতে হলে প্রথম থেকে বলাই দস্তুর। শিপ্রা
এক্সপ্রেসে উঠলাম তো। অভিজ্ঞতাটা এবার বর্ণনা করা যাক। পিলো দেখে মনে হয়
শ্মশানের ফেলে দেওয়া পিলো, তুলে আনা হয়েছে, তাও আবার পিলোকভার ছাড়া।
কভার এতদিন জানতাম Attendantরা পরিয়ে দেন। এক্ষেত্রে তিনি একমুখ পানমশলা
মুখে ঠুঁসে আমাদের হাতে কভার ধরিয়ে কেটে পড়লেন। কথা বাড়াতে সাহস হল না,
পাছে মুখ থেকে পানের পিক ছিটকোয়! তাছাড়া চেহারাটা একেবারে চম্বলের
সন্তানের মতন। যাই হোক।
এবার আসা যাক বাথরুম প্রসঙ্গে। এসি টু টায়ার ।কিন্তু সকলের জন্য অবারিত
দ্বার। সকলে উঠছে, নামছে, বাথরুমের সামনে বসে আছে যতক্ষণ না তাদের স্টেশন
আসে। Attendantদের কিছু বলতে গেলে বলে "টিটি কে বলুন।" বাথরুমে ট্রেনে
ওঠার কিছুক্ষণের মধ্যেই জল নেই। "টিটিকে বলুন।" বলা হল। উত্তর এল -
সামনের স্টেশনে ভরা হবে।
জল ভরা হয়েছে কিনা জানি না। কারণ পরদিন সকালে কাটনি মারওয়া স্টেশনে
নেমে গেলাম। মুক্তি পেলাম যেন। এই একই অভিজ্ঞতা হয়েছে ফেরার সময়ও।
ফেরার পথে যেহেতু ইন্দোর থেকে ওঠা, তাই দুদিন ওই ট্রেনে থাকা। ফেরার পথে
Attendant অবশ্য পরিষ্কার বেডসিট, পিলো দিয়েছে। মুশকিল হল বাথরুম নিয়ে।
কম্পার্টমেন্টে চারটির বদলে তিনটি বাথরুম এবং একটু পরেই জল উধাও। কোন
বেসিন নেই। জায়গার অভাব। ভয়ে জল পর্যন্ত না খেয়ে সকলে থাকার চেষ্টা
করছে।
আমার সামনের বার্থে ছিলেন পোল্যান্ড থেকে উজ্জয়িনীর মহাকালেশ্বরে পুজো
দিতে আসা বাঙালি পরিবার। ওদের ছোট্ট বাচ্চাটি এইরকম অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে
অসুস্থ হয়ে পড়ল। এবারেও মুখে কমপ্লেন করে কিছু হল না। আমরা টিটিকে বলে
একটা নাম্বার পেলাম, তাতে কমপ্লেন বুক করা হল। আর পোল্যান্ড থেকে আগত
ভদ্রলোক মিনিস্ট্রি অফ রেলওয়েতে টুইট করে দিলেন। ফল মিলল হাতেনাতে।
বাথরুম পরিষ্কার হল। কিন্তু জল ধরে রাখার ক্ষমতা নেই লিকেজ কলের।
জিনিসপত্র প্রায় সব ভাঙাচোরা। তার ওপর মানুষ, যারা নিজেরাই বাথরুমে গিয়ে
নোংরা করে চলে আসছেন। নিজেরাই যদি নোংরা হই, তো কে কাকে শোধরাবে? এভাবেই
এবারের যাওয়া এবং আসার অভিজ্ঞতা।
এবার আসি মধ্যপ্রদেশের গাড়ির সারথির বিষয়ে। আমার পায়ের তলায় সর্ষে আছে
কিনা জানি না, তবে বেড়াতে ভালবাসি এবং মানুষের খোঁজ করি। বহু জায়গায়
গেছি, সব জায়গাতে গাড়ি আর সারথি এই দুটো ঠিক না হলে সমস্যার সৃষ্টি হয়।
তবে ভাগ্যের ব্যাপার এ পর্যন্ত দুটি জায়গা ছাড়া আর সব জায়গাতে গাড়ি এবং
সারথি দুটোই খুব ভাল পেয়ে এসেছি। সব সারথির সঙ্গেই দোস্তি হয়ে ওঠাটা যেন
খুব স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। আর তাতে ঘোরার আনন্দ দ্বিগুণ হয়ে যায়।
কিন্তু দুটি জায়গা আমাকে হতাশ করেছে। এক নৈনিতাল। দুই মধ্যপ্রদেশ।
নৈনিতাল ভ্রমণ অনেক বছর আগের ব্যাপার। তারপর আবার ওর ওপর দিয়ে মায়াবতী
শ্যামলাতাল যাওয়া হয়েছে। মায়াবতীর সারথির কোন তুলনা নেই। মধ্যপ্রদেশের
বান্ধবগড়ের MP Tourism এর গাড়ি বা তাদের সারথি নিয়ে কোন অভিযোগ করার
জায়গা নেই। বান্ধবগড় জঙ্গলে যারা গাইড হয়ে নিয়ে যান তাদের ব্যবহারের
জন্য জঙ্গলে ঘোরা আরও মধুময় হয়ে ওঠে। মুশকিল মধ্যপ্রদেশের সাধারণ
ড্রাইভার ও তাদের মালিকদের নিয়ে। তারা না জানে তাদের দেশের সম্পদকে, না
কৃষ্টিকে।
কেন বলছি একথা? বলছি এ কারণে, যে কোনটা পর্যটকদের ভাল লাগবে না লাগবে
সেটাও তারাই নির্ধারণ করে দিতে চায়। কোনটা পর্যটকদের দর্শনের তালিকায়
অগ্রাধিকার পাবে সেটাও নাকি তারাই জেনে বসে আছে। কোন হোটেলে থাকতে হবে বা
কোন হোটেলে ভ্রমণের মাঝে খাবার জন্য যেতে হবে সেটাও তারা নির্ধারণ করে
দেয়। না এতে দোষের কিছু নেই। সমস্ত জায়গাতেই এটা হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে
বোঝা যায় কোথায় ইচ্ছা করে আপনাকে ঠকানো হচ্ছে। এবার বুঝতে পেরে যদি
বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হয় তবে... হ্যাঁ নেওয়া যেতেই পারে। কিন্তু তাহলে
এই গোটা ট্যুর আপনি যে গাড়ি এবং সারথির সাথে থাকবেন, তার সঙ্গে এক
অঘোষিত যুদ্ধের জন্য তৈরি থাকুন। কারণ, সে নানাভাবে আপনাকে বিব্রত
করবে।
কিভাবে? যেমন যে স্থানে আগে না গেলে একটা সময়ের পর বন্ধ হয়ে যায়,
সেখানে সবথেকে পরে নিয়ে যাবে। যাতে আপনি বন্ধ গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে
হাহুতাশ করতে পারেন। আর তাকে কিছু বললে তার উত্তর রেডি আছে। "ওহ্ দেখনে
কা চিজ্ নেহি হ্যায়। খন্ডহর্ হ্যায়। আপ রামমন্দির চলিয়ে। বহৎ আচ্ছি
জায়গা।" এভাবে বহু মুসলিম স্থাপত্য না দেখাবার চেষ্টা করবে। কোন অঞ্চল
দিয়ে যাবার সময় অযথা বলবে
"ইস জাগা আচ্ছে নেহি হ্যায়। উসলোগ রহেতে হ্যায়। হামলোগ ইধার সে নেহি
যাতে।" উসলোগের অর্থ বুঝে নিতে হবে। প্রত্যেক দর্শনীয় স্থানের পৌঁছবার
আগেই গাইড এবং পুজো দেবার পন্ডিত নেবার জন্য জোরাজুরি চলবে। না accept
করলেই 'আপনি বাঙালি' , এরকম মন্তব্য এদিক ওদিক থেকে হালকা করে ভেসে আসবে।
কোন দোকান থেকে আপনি স্থানীয় জিনিস কিনবেন সেটাও ওরা ঠিক করে দেবার
প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাবেন। আপনি বাগড়া দিলে ফল আপনাকে ভুগতে হবে
বৈকি।
গোটা মধ্যপ্রদেশ কেবলই আপনাকে মন্দির দেখাবে, দেখাতে চাইবে। আপনি অন্য
কিছু দেখতে চাইলে হয় বলবে 'কিছু দেখার নেই' নয় বলবে 'চিনিনা'। এইভাবে
আমাদের উজ্জয়িনীর মানমন্দির দেখা হয়নি। যে উৎসাহ নিয়ে সন্দীপন পাঠশালা
দেখতে গেছি, দেখার পর ভয়ংকর অবসাদ এসেছে। মনে হয়েছে কিসের জন্য ঘুরছি!
কেন ঘুরছি! কেন অযথা সময় এবং অর্থ দুটোরই অপপ্রয়োগ করছি!
তারপর আবার সাংঘাতিক খুশি হয়ে উঠেছে মন। মনে হয়েছে আবার আসা যায়।
বিশেষ করে অরণ্য। সেখানকার মানুষ। ঘুরতে ঘুরতে একটা জিনিস মনে হয় যে,
যেখানে যাপন অত্যন্ত কঠিন, প্রকৃতি রুক্ষ, সেখানের মানুষ পোশাকের রঙ দিয়ে
ঝলমলে করে রাখে। আর যেখানে প্রকৃতির সজল কোমল রূপ, সেখানের মানুষের
পোশাকে রঙের অত প্রয়োজন পড়ে না। সঙ্গীতের ক্ষেত্রেও তাই। রুক্ষ মাটিতে
চেরা গলায় চেঁচিয়ে লোকসঙ্গীত আর নদীতে নরম গলার সুরেলা ভাটিয়ালি।
বাঙালি ঝালে ঝোলে অম্বলে খাওয়া দাওয়া করতে ভালবাসে। তাই প্রথম পাতে তেতো
দিয়ে মুখের স্বাদ ফিরিয়ে নেয়। আমিও তাই তেতো দিয়ে শুরু করলাম। শেষপাতে
নাহয় পায়েসের আয়োজন করা যাবে।
ক্রমশ..............