ওঙ্কার - নিত্য ব্রহ্ম

সুব্রতকুমার মন্ডল ,

কলকাতা

মন্ডুক উপনিষদ অথর্ববেদের অন্তর্গত, ই হাতে মাত্র বারোটি শ্লোক আছে। ওম পরমব্রহ্মের বা পরমাত্মার নাম। ওম শব্দকে আবার ব্রহ্মের প্রতীক বলে মনে করা হয়। ব্রহ্মই একমাত্র নিত্য সত্য। তিনি অক্ষয়, তাহার কোন ক্ষয় নাই। তিনি অবিনাশী, যাহার সৃষ্টি আছে তাহার বিনাশ আছে কিন্তু যাহার সৃষ্টি নাই তিনি অবিনাশী। ব্রহ্মই একমাত্র সৃষ্ট নন। সুতরাং তিনি অবিনাশী। ছান্দোগ্য উপনিষদে বলা হয়েছে -

'সর্ব ঋল্বিদং ব্রহ্ম' -এই সমস্ত ব্রহ্ম। সেই ব্রহ্ম হইতে এই জগত উৎপন্ন হয়েছে তাতে জীবজগৎ জীবিত থাকে এবং পরিশেষে তাহাতেই বিলীন হয়।

সর্বং হ্যেতদ ব্রহ্ম; অয়মাত্মা ব্রহ্ম;
সোহয়মাত্মা চতষ্পাৎ । ১/২

এখানে এই আত্মা ব্রহ্মা ইনি জিবাত্মা ও পরমাত্মা উভয়ই যিনি অন্তর্যামী রূপে আমাদের হৃদয়ে থাকেন ও আমাদের পরিচালনা করছেন তিনি আবার সমগ্র জগত ব্যাপিয়া আছেন যিনি জীবদেহে অন্তর আত্মারূপে আছেন তিনি জীবাত্মা আর যিনি সমস্ত জগৎ ব্যাপিয়া সর্বত্র বিরাজিত তিনি পরমাত্মা। তাহাকেই আত্মা ব্রাহ্ম পরমাত্মা পরমহ মহেশ্বরম প্রভৃতি নামে অভিহিত করা হয়।

ভোক্তারম্ যজ্ঞ-তপসম সর্ব-লোক-মহেশ্বরম্
সুহৃদম্ সর্ব-ভূতানম্ জ্ঞাত্বা মম শান্তিমৃচ্ছতি!! (গীতা ৫/২৯)

মুক্তযোগই পুরুষ আমাকে যোগ্য ও তপস্যা সমূহের ভোক্তা সর্বলোকের মহেশ্বর ও সর্বলোকের সুর হিট জানিয়া পরম শান্তি লাভ করেন।

এই আত্মাই ব্রহ্ম, পরোক্ষভাবে যাহাকে ব্রহ্ম বলা হয়েছে, প্রত্যক্ষভাবে তিনি আত্মা। সমগ্র আত্মা বা ব্রহ্ম সম্বন্ধে একত্রে উপদেশ দিলে আত্মা বা ব্রহ্মকে উপলব্ধি করা কষ্টকর মনে করিয়া আত্মাকে বুঝাবার জন্য চারি ভাগে ভাগ করা হইয়াছে। স্হুল, সূক্ষ্ম, সূক্ষ্মতর, সুক্ষ্মতম।

(১) স্হুল - বৈশ্বানর - জাগ্রত
(২) সূক্ষ্ম - তৈজস - নিদ্রা
(৩) সুক্ষ্মতর - প্রাজ্ঞ - সুষপ্তিনিদ্রা
(৪) সুক্ষ্মতম - তুরীয়

বৈশ্বানর - বিশ্ব + নর
যিনি জাগ্রত অবস্থায় বহির্বিষয়ের এই স্থূল জগতকে উপভোগ করে, অর্থাৎ পাঁচ কর্ম ইন্দ্রিয়, পাঁচ জ্ঞান ইন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি, আত্মা, এই স্থূল জগতকে উপভোগ করে।

তৈজস - নিদ্রা
যিনি স্বপনাবস্থায় অন্তর বিষয়ে জ্ঞাতা। শুধুমাত্র মন কাজ করে। স্বপ্নাবস্থায় এই স্বপ্রকাশ দ্রষ্টা আত্মা মনের সংস্কার বা কামনা-বাসনা অনুভব করে।

প্রাজ্ঞ - সুষপ্তিনিদ্রা এই প্রাজ্ঞই সমস্ত জগতের অধীশ্বর বা নিয়ন্তা। সকল জ্ঞানের উৎস, সেজন্য তিনি সর্বজ্ঞ। তিনি অন্তর্যামী, কারণ তিনি আমাদের সকলের অন্তরে থাকিয়া তাহাদের নিয়ন্ত্রিত করেন। স্হুল ও সুক্ষ সকল প্রাণী ইহা হয়তো উৎপন্ন হইয়া পুনরায় ইহাতেই বিলীন হয়।

"যতো বা ইমানি ভূতানিজায়ন্তে।
যেন জ্ঞাতানি জীবন্তি, মৎপ্রয়ন্তিভিসংবিশন্তি। ( তৈত্তিরীয়-৩/১)
যাহা হইতে এই ভূত সমূহ জাত হয়, যাহার দ্বারা জাত ভূতসমূহ জীবিত থাকে পরিশেষে যাহাতে গমন করে ও যাহাতে প্রবেশ করিয়া বিলীন হয় তাহাকেই বিশেষ রূপে জানতে ইচ্ছা কর ইনিই ব্রহ্ম।

তুরীয়
তিনি বহির বিষয়ের জ্ঞাতা নহেন, অন্তর বিষয়ের জ্ঞাতা নহেন, জাগ্রত ও স্বপ্নাবস্থার মধ্যবর্তী ও নহেন, তিনি সুষুপ্ত অবস্থায় প্রজ্ঞানগণ ও নহেন সর্বজ্ঞ নহেন, অচৈতন্য নহেন তিনি দৃষ্টি অগোচর লৌকিক ব্যবহারের অতীত ইন্দ্রিয় গণের অগ্রাহ্য অনুমানের অযোগ্য মনের অগোচর প্রমাণের অতীত কেবলমাত্র আপনার রূপে তিনি অনুভবযোগ্য। জগৎ চরাচর হইতে ভিন্ন শান্ত শিব ও অদ্বিতীয় ইহাকেই বিবেকীগণ তুরীয় বলিয়া মনে করেন তিনি আত্মা ইহাকে জানিতে হবে।

যো মামজমনাদিং চ বেত্তি লোকমহেশ্বরম্
অসংমূঢ়ঃ স মর্ত্যেষু সর্বপাপৈঃ প্রমুচ্যতে।। (গীতা১০/৩)
যিনি জানেন যে আমার আদি নাই, জন্ম নাই, আমি সর্ব লোকের মহেশ্বর, মনুষ্য মধ্যে তিনি মোহ শূন্য হয়ে সর্ব পাপ হতে মুক্ত হন।

সেই আত্মাকে যখন অক্ষর দ্বারা বর্ণনা করা হয় তখন তিনি ওঙ্কার। এই ওঙ্কারের চারটি মাত্রা, অ উ ম এবং চতুর্থ মাত্রা তুরীয়।

বৈশ্বানর - জাগ্রত - অ

তৈজস - স্বপ্ন (নিদ্রা) - উ

প্রাজ্ঞ - সুষপ্তি নিদ্রা - ম

তুরীয় - শিব - ওঁ

অ - জাগরিত স্থান বৈশানর আত্মার প্রথম পাদ। আর ওঙ্কারের প্রথম মাত্রা অ। অ-কার যে রূপ বর্ণমালার প্রথম বা আদি অক্ষর, বৈশ্বানর ও সেই রূপ আত্মার প্রথম পাদ। এরূপ জ্ঞান যাহার আছে তিনি সকলের মধ্যে আদি ও প্রথম হন।

উ - আত্মার দ্বিতীয় পাদে তৈজস, ওঙ্কারের দ্বিতীয় মাত্রা উ-কার। কারণ তৈজস বৈশ্বানর হইতে উৎকৃষ্টতর বৈশ্বানর স্হুল বিষয় উপভোগ করেন আর তৈজস সুক্ষ বিষয় উপভোগ করেন। বৈশ্বানর বহির্মুখ আর তৈজস অন্তর্মুখ। তৈজস আত্মার তিন পাদের মধ্যবর্তী।

ম - সুষুপ্তি স্থান প্রাজ্ঞ ই ওঙ্কারের তৃতীয় মাত্রা ম-কার। ইনি বিশ্ব ও তৈজস আত্মার পরিমাপক ও বিলয় স্থান। যে সাধক এই রূপ তত্ত্ব রহস্য জানেন তিনি বিশ্ব জগতের প্রকৃত স্বরূপ জানিতে পারেন এবং সকলের আশ্রয়স্থল হন।

সেইরূপ ওঙ্কারের ওম উচ্চারণের সময় যেন ম-কারে প্রবেশ করে লীন হয়।

তুরীয় - আত্মার চতুর্থ পাদ মাত্রাহীন ওঙ্কার (অ, উ, ম, বিহীন অমাত্র মাত্রা ) এই অ-মাত্র ওঙ্কার যাহার মাত্র নাই, যিনি বাক্যের অগোচর, মনের অগোচর, যেখান হইতে জগৎ প্রপঞ্চ উদ্ভূত ও উপশমপ্রাপ্ত, সেই দ্বৈত ভাবহীন বিজ্ঞান ত্রিপাদ ত্রীমাত্র ওঙ্কারই আত্মা।

এইভাবে অক্ষর ব্রহ্ম স্বরূপ ও ওঙ্কারের তত্ত্ব রহস্য মান্ডুক উপনিষদই বিশেষভাবে কীর্তন করিয়াছেন। অন্যান্য প্রায় সকল উপনিষদ গীতায় পুরানা দিতে প্রণব তত্ত্বের ওঙ্কারের মাহাত্ম্য আলোচিত হয়েছে।

সর্বদ্বারাণি সংযম্য মনো হৃদি নিরুধ্য চ ।
  মূর্ধ্ন্যাধায়াত্মনঃ প্রাণমাস্থিতো যোগধারণাম্ ॥(গীতা-৮/১২)

ওঁ ইত্যেকাক্ষরং ব্রহ্ম ব্যাহরন্মামনুস্মরন্ ।
  যঃ প্রয়াতি ত্যজন্ দেহং স যাতি পরমাং গতিম্ ॥(গীতা-৮/১৩)