পারিজাত পুষ্প

তমাল আচার্য,

গোরক্ষপুর, উঃ প্রদেশ

একদা নন্দনকাননে এক প্রলয়ংকর সংগ্রাম সৃষ্টি হল। দেবকুল এ দৃশ্য দেখার জন্য কদাপি প্রস্তুত ছিল না। একি কলঙ্কিত অঘটন। দেবরাজ ইন্দ্র এবং শ্রীকৃষ্ণ পরস্পর পরস্পরের বিরুদ্ধে যুযুধান! এ বিষময় বিবাদ অন্যান্য দেবতাদের বিস্ময়ে ভাবিয়ে তুলল। বিবাদের মূল কারণ ব্রহ্মা পুত্র নারদ মুনির অবিমৃস্যকারিতায় ইন্দ্রপুরীতে এই ন্যক্কার জনক ঘটনা ঘটে গেল।

শ্রীকৃষ্ণ দর্শন অভিলাষে মুনিবর নারদ যাত্রা করলেন। রৈবতক পর্বতের উদ্দেশ্যে- প্রভু যেথায় জ্যেষ্ঠা মহিষি রুক্মিণী সহ বিহার করছেন।
পথমধ্যে দেবরাজ ইন্দ্রের সুরম্য নন্দনকানন দর্শনে ক্ষণকাল কালক্ষেপ করলেন। সংবাদ শ্রবণে দেবরাজ ইন্দ্র আহ্লাদিত মনে তৎক্ষণাৎ উপস্থিত হয়ে মুনিবর কে সাদর অভ্যর্থনা করে উদ্যান থেকে একটি অতীব সুবাসিত পুষ্প তাঁকে প্রদান করলেন। এই অত্যাশ্চর্য পুষ্প দেব লোকে বিরল পৃথিবী লোকে অদৃশ্য। যথাযথ শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে হরষিত মনে নারদ মুনী প্রদত্ত পুষ্পটি বীণা মাঝে আবদ্ধ করে প্রভু সকাশে গমন করলেন। প্রফুল্ল চিত্তে শ্রীপ্রভুর চরণ বন্দনা করে পরস্পর কুশল বিনিময় করে চারিধার আমদিত করা পুষ্পটি প্রভুকে অর্পণ করলেন। সহাস্যে পুষ্পটি গ্রহণ করে প্রভু শ্রীকৃষ্ণ মহিষী রুক্মিণীকে প্রেম ভাষ্যে প্রদান করলেন।
বিগলিত চিত্তে রুক্মিণী তৎক্ষণাৎ পুষ্প দ্বারা আপন কেশদাম সজ্জিত করলেন।

কিয়ৎক্ষণ পরে মুনিবর প্রভুর অনুমতি ক্রমে পুনরায় চরণ বন্দনা করে গাত্রোত্থান করলেন।
অকষ্মাৎ দ্বারকা নগরীতে কৃষ্ণ জায়া সত্যভামাকে পুষ্পকথা শোনাবার আগ্রহে তথায় উপস্থিত হলেন। কৃষ্ণপত্নী সত্যভামা নারদ মুনির আগমনের হেতু জানবার আগ্রহ প্রকাশ করলেন এবং মুনিবর সকলই বিস্তারিত বর্ণনা করলেন। শ্রবণ মাত্র অভিমানিনী সত্যভামা ক্রোধে রোরুদ্য মানা ভূলুন্ঠিতা ও মূর্ছীতা। ভয়াতুর নারদ শীঘ্রাতিশীঘ্র কৃষ্ণ সমীপে উপস্থিত হয়ে সত্যভামার হৃদয়বিদারক অবস্থার কথা জানালেন। শ্রীকৃষ্ণ উদ্বিগ্নচিত্তে সত্যভামার নিকট উপস্থিত হয়ে নানাবিধ প্রবোধ বাক্যে প্রিয় ভার্যাকে আশ্বস্ত করলেন। অঙ্গীকারবদ্ধ হলেন, এই পুষ্প আহরণ করে প্রিয়াকে প্রদান করে আহ্লাদিত করবেন।

মুনিপ্রবরকে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলেন, জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা দেবরাজ ইন্দ্রের নন্দন বনে এই দুর্লভ পুষ্প "পারিজাত"- বৃক্ষ সংরক্ষিত। পরম পুলকের কৃষ্ণ নারদ মুনি দ্বারা ইন্দ্রর নিকট বার্তা পাঠালেন, বৃক্ষটির প্রত্যার্পণের।
বিফল মনোরথ মুনি প্রবর ব্যক্ত করলেন দেবরাজ পুষ্প বৃক্ষটি প্রত্যার্পনে অরাজি। কৃষ্ণ ক্রধান্বিত হয়ে যুদ্ধ সাজে সজ্জিত হয়ে সত্যভামা সহিত পক্ষীরাজ গরুড়, সুদর্শন চক্র সমাভিব্যহারে নন্দনকানন অভিমুখে যাত্রা করলেন। যে প্রকারে হোক পারিজাত বৃক্ষ চাই-ই সত্যভামার মানভঞ্জনের জন্য।
বার্তা পেয়ে দেবরাজ ইন্দ্র পত্নী শচী পুত্র জয়ন্ত এবং ঐরাবত ও উচ্চৈঃশ্রবা সমাভিব্যহারে আগুয়ান হলেন কথোপকথন বাদ বিবাদে অতিষ্ঠ হয়ে উভয়ে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হলেন। অপরদিকে ইন্দ্র জায়া শচী ও সত্যভামার কোন্দল নিরন্তর হয়ে চলেছে।
ভয়াতুর নারদ কাশ্যপ মুনি সকাশে গমন করে বিস্তারিত বর্ণন করলেন। কাশ্যপু মুনি নারদ মুনি সহ বিস্ময়াক্রান্ত হয়ে দেবাদিদেব মহাদেবের শরণাগত হলেন।
মহাদেব বিস্তারিত জ্ঞাত হয়ে নন্দনকাননে উপস্থিত হয়ে দেবরাজ কে বললেন, -"হে ইন্দ্র দেবরাজ, তুমি এবং কৃষ্ণ তোমরা উভয়ে কাশ্যপ মুনির ঔরাসজাত এবং অদিতির গর্ভজাত পুত্র সন্তান। তোমরা উভয়ে উভয়ের ভ্রাতা। ইন্দ্র তুমি জ্যেষ্ঠ এবং কৃষ্ণ কনিষ্ঠ। তোমাদের এরূপ আসুরিক আচরণ দেব কুলের লজ্জার কারন! অধিক কি বলিব, সমুদ্রমন্থন কালে নানাবিধ সম্ভার সহ এই অপরূপ "পারিজাত"- বৃক্ষটি এবং অমর "অমৃত" প্রাপ্ত হয়েছিল। তুমি নিশ্চয় জ্ঞাত আছো, সমুদ্র মন্থনে উত্থিত "উচ্চৈঃশ্রবা" অশ্ব এবং "ঐরাবত" গজ ও তৎসহ "পারিজাত" বৃক্ষটি তোমার কনিষ্ঠ ভ্রাতা কৃষ্ণের কারণে প্রাপ্ত করেছ। তুমি বিস্মৃত নও, তোমার অনুজ তোমায় স্বর্গরাজ্যের রাজসিংহাসনে অধিষ্ঠিত করেছে।"

শিব বাক্যে সম্যক জ্ঞান প্রাপ্ত হয়ে হৃষ্টচিত্তে দেবরাজ ইন্দ্র দুর্লভ পারিজাত বৃক্ষটি কৃষ্ণকে প্রদান করলেন এবং কৃষ্ণ সহ সত্যভামা ইপ্সিত বৃক্ষটি নিয়ে দ্বারকায় প্রত্যাবর্তন করে সানন্দে পৃথিবীতে রোপন করলেন।

দেবাদিদেব মহাদেব মুনি শ্রেষ্ঠ কশ্যপ এবং মুণি প্রবর নারদ আপন আপন গন্তব্যে গমন করলেন। অন্যান্য দেবতা সকল আপন আপন গন্তব্যে গমন করলেন।
দেব লোকে এবং পৃথিবী লোকে শান্তি প্রতিস্থাপিত হল।

কাহিনী সূত্র : কাশীরাম দাস বর্ণিত- মহাভারত।