পাইলস বা অর্শ রোগের পথ্য চিকিৎসা
সুব্রত কুমার মন্ডল,
কলকাতা
পাইলস একটি অতি পরিচিত স্বাস্থ্য সমস্যা। এটি অর্শ রোগ নামেও পরিচিত।
অনেকেই এই সমস্যায় দীর্ঘদিন ভুগলেও এ ব্যাপারে পরামর্শ চাইতে বা ডাক্তার
দেখাতে সংকোচ বোধ করেন। তাই পাইলস বা অর্শ রোগ সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে এ
সম্বন্ধে সচেতন হওয়া জরুরি।
পাইলস বা অর্শ রোগ কী?
পায়ুপথ বা পায়খানার রাস্তার মুখ যদি কোনো কারণে ফুলে যায় এবং সেখান থেকে
রক্ত পড়ে কিংবা পায়খানার রাস্তায় যদি গোটার মত হয় তখন একে বলা হয় পাইলস।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এর নাম হেমোরয়েড। জটিল আকার ধারণ করার আগে
অপারেশন ছাড়া অর্শ রোগের চিকিৎসা সম্ভব।
পাইলস এর লক্ষণগুলো কী?
পাইলস বা অর্শ রোগের অন্যতম চারটি লক্ষণ নিচে তুলে ধরা হলো। এসব লক্ষণ
দেখা দিলে চিকিৎসা শুরু করা জরুরি।
১. পায়খানার সাথে রক্ত যাওয়া
পাইলস হলে পায়খানার সাথে উজ্জ্বল লাল বর্ণের অর্থাৎ তাজা রক্ত যেতে পারে।
কিন্তু যদি কোনো কারণে পায়খানার সাথে গাঢ় খয়েরী রঙের রক্ত যায়, বা
আলকাতরার মতো কালো ও নরম পায়খানা হয়, তবে তা সাধারণত পাইলস এর কারণে নয়।
পরিপাকতন্ত্রের কোনো অংশে রক্তপাতের কারণে পায়খানার সাথে এমন গাঢ় রক্ত
যেতে পারে, তাই এমনটা হলে রক্তপাতের কারণ জানার জন্য দ্রুত ডাক্তারের
শরণাপন্ন হতে হবে।
২. পায়ুপথের মুখের অংশগুলো বেরিয়ে আসা
পাইলস হলে সাধারণত মলত্যাগের পরে অ্যানাল কুশনগুলো নরম গোটার মতো বের হয়ে
আসে। এগুলো কিছু সময় পর নিজে নিজেই ভেতরে ঢুকে যায়। অনেকের ক্ষেত্রে
এগুলো আঙ্গুল দিয়ে ভেতরে ঢোকানোর প্রয়োজন হতে পারে। আবার কারও কারও
ক্ষেত্রে পাইলস এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে আঙ্গুল দিয়েও গোটাগুলো ভেতরে
ঢোকানো যায় না।
৩. পায়খানার রাস্তায় ব্যথা হওয়া
পাইলস রোগে সাধারণত তীব্র ব্যথা হয় না। তবে যদি পায়ুপথের গোটা এমন
পর্যায়ে চলে যায় যে সেগুলো আঙুল দিয়ে ঠেলেও ভেতরে ঢোকানো না যায়, এবং
সেগুলোতে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, সেক্ষেত্রে অনেক সময় তীক্ষ্ণ বা তীব্র
ব্যথা হতে পারে। এই ব্যথা সাধারণত ১-২ দিন স্থায়ী হয়। ব্যথা বেশি হলে
ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। এছাড়া বিশেষ প্রয়োজনে ঘরোয়া উপায়ে ব্যথার
চিকিৎসা করা যায়।
৪. পায়খানার রাস্তায় চুলকানি
পাইলস হলে কখনো কখনো পায়ুপথে বা এর মুখের আশেপাশে চুলকানি হতে পারে।
এছাড়া পায়ুপথ দিয়ে মিউকাস বা শ্লেষ্মা-জাতীয় পিচ্ছিল ও আঠালো পদার্থ বের
হতে পারে। অনেক সময় মলত্যাগ করে ফেলার পরও বারবার মনে হতে পারে যে পেট
পরিষ্কার হয় নি, আবার মলত্যাগ করা প্রয়োজন।
পাইলস কেন হয়?
কিছু কিছু জিনিস পাইলস এর ঝুঁকি বাড়ায়, সেই সাথে ইতোমধ্যে কারো পাইলস রোগ
হয়ে থাকলে তার তীব্রতাও বাড়িয়ে দেয়, যেমন—
১) শক্ত বা কষা পায়খানা
২) মলত্যাগের সময় জোরে চাপ দেয়া
৩) অনেক সময় ধরে মলত্যাগের কসরত করা
৪) পায়খানার বেগ আটকে রাখা
৫) শারীরিক পরিশ্রম না করা
৬) অতিরিক্ত ওজন
এছাড়া গর্ভাবস্থায় নানান শারীরিক পরিবর্তনের কারণেও কারও কারও ক্ষেত্রে
পাইলস এর ঝুঁকি বেড়ে যায়।
স্বাভাবিক অবস্থায় পায়খানার রাস্তা বা পায়ুপথের মুখ সাধারণত বন্ধ থাকে।
যখন প্রয়োজন হয়, তখন চাপ দিয়ে পায়ুপথের মুখ খুলে শরীর থেকে পায়খানা বা মল
বের করে দেওয়া হয়।
পায়ুপথের মুখ বন্ধ রাখতে সেখানে বেশ কিছু জিনিস একসাথে কাজ করে। তার
মধ্যে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হল অ্যানাল কুশন। এই কুশনগুলো ৩ দিক থেকে চাপ
দিয়ে পায়ুপথের মুখ বন্ধ রাখতে সাহায্য করে।
যদি কোনো কারণে তিন দিকের এই কুশনগুলো ফুলে যায়, সেগুলো থেকে রক্তক্ষরণ
হয়, সেগুলো নিচের দিকে নেমে যায়, অথবা পায়ুপথের চারপাশে গোটার মত দেখা
যায়, তখন তাকে পাইলস বা অর্শ রোগ বলা হয়ে থাকে।
এই রোগের পরিচয় অপেক্ষা এ রোগ কোন কোন দেহে প্রাধান্য থাকে সেটা
সংক্ষেপে বলি। এই রোগ বায়ু পিত্ত ও শ্লেষমা প্রধান দেহে হয়ে থাকে। আরও
হয় সান্নিপাতিক ও রক্তজ। এর চিকিৎসা খুব সহজ সরল নয়। সব অর্শই এক ধরনের
চিকিৎসায় সারে না। তার পদ্ধতি ও ভিন্ন, যেমন ক্ষার সূত্র দিয়ে অথবা
শস্ত্রের সাহায্যে (অপারেশন) বা অগ্নিময় ভেষজ প্রয়োগ করে কিংবা
অভ্যন্তরে এর চিকিৎসা হতে পারে। এইসব অভ্যন্তরিক ঔষধ প্রয়োগের মূল
লক্ষ্য থাকে বায়ুর অনুলোম করা জঠরাগ্নির বল বৃদ্ধি করা। অর্শ হলেই যে এক
পথ্য হবে তা নয়, কারণ অর্শ অভ্যন্তরীণ হয়, আবার বাহ্যিক ও হয়। সুতরাং
প্রত্যেকটির চিকিৎসার ও পার্থক্য হবে।
আভ্যন্তরিক অর্শের উপযোগী পথ্য :-
রসুন, পেঁয়াজ, পুঁইশাক, কুলথি, মসুর, অরহড় ডালের জুস, মাখন, তরকারির
সাথে কালো তিল বাটা, আমলকি বা হরিতকীর মোরব্বা, আখের রস /গুড়, কিসমিস,
ফলসা, গাওয়া ঘি, ছানা, কাঁকরোল, কাঁচা পেঁপে, বেতোশাক, পুরনো চাল
কুমড়ো, পুরানো ওল, (মাটি থেকে তুলে রাখার চার পাঁচ মাস বাদ ) পটল, পলতা,
লাউডগা লাভ হয়। আদার কুঁচি বা শুঠের গুঁড়ো মিশিয়ে টাটকা ঘোল।
অর্শ রোগে অপথ্য :-
ছাগ মাংস, বড় মাছ, পিঠে, মাসকলাই, ডাল, কাঁচা আম, পালং শাক, বরবটি, হাঁস
-মুরগির ডিম, লাল কুমড়ো, বাঁধাকপি, ফুলকপি, মহিষের দুধ/ দই, শালুক ডাটার
তরকারি, কচু, চুবড়ি আলু, পোস্ত ও তিল বাটা দেওয়া তরকারি, তেতুলের টক,
সরষে শাক, বেগুন, নিম পাতা, মান কচু, কচুরমুখী, টমেটো, মুলো, কলা, বেশি
লঙ্কা বর্জন করা উচিত।
অর্শের জন্য ঘরোয়া চিকিৎসা
১) ১/২ গ্রাম দেশি কর্পূরকে কলার এক টুকরোয় মেখে খালি পেটে গিলে খান।
এক ডোজে রক্তস্রাব বন্ধ হয়ে যাবে। রক্তস্রাব বন্ধ না হলে উক্ত প্রয়োগ
তিনবার পর্যন্ত করতে পারেন, এর থেকে বেশি বার করবেন না।
২) গরুর এক কাপ গরম দুধে হাফ লেবুর রস নিকড়ে দুধ কেটে যাওয়ার আগেই পান
করে নিন।
এই প্রয়োগেও রক্তার্শজনিত রক্তস্রাব তৎক্ষণাৎ বন্ধ করে দেয়। উক্ত
প্রয়োগ দুবারের বেশি করবেন না।
৩) নাগদন এর পাতা সবুজটা (যে পাতা সবুজ মাঝে সাদা ছিট আছে কাজ হবে না)
তিনটি পাতা ভালো করে জলে ধুয়ে নিয়ে চিবিয়ে খেয়ে নিন তিনদিন।
বিঃ দ্রঃ- যদি জানা থাকে তবে বাহ্যের পর গণেশ ক্রিয়া করবেন।