শৈল শহর- নৈনিতাল

অর্ঘ্যদীপ গুড়িয়া,

নতুন দিল্লি


তখন আমি সদ্য ক্লাস টেন-এ উঠেছি। সময়টা ২০১৯ সালের মে মাসের প্রায় শেষের দিকে, তখন আমাদের স্কুলে গরমের ছুটি চলছে। এই ছুটির সময়ে প্রায় প্রতি বছরই আমরা দাদু- দিদুর কাছে কলকাতায় যাই এবং মাসখানেক গ্রামের মনোরম পরিবেশে আনন্দের সাথে কাটিয়ে আসি। তবে সে বছর আমার ক্লাস টেন এর বোর্ড ছিল তাই পড়াশোনার চাপটা একটু বেশি। সেই জন্য আগে থেকেই ঠিক করা ছিল আমরা কলকাতা যাবনা। কিন্তু কলকাতা না গেলেও কাছাকাছি কোথাও দিন কয়েকের জন্য ঘুরে আসাই যায়, তাই নিয়ে আমি আর বোনু দুজনেই বাড়িতে খুব জিদ করছিলাম। এদিকে আমার বাবার ও নাচের পা, দুদিনের ছুটি পেলেই কোথাও ওনার ঘুরতে যেতে মন করে। আমার ঠাম্মা বলতো- "তোর বাবার পায়ে সরষে লাগানো আছে। এক জায়গায় টিকে পড়ে থাকতেই পারে না, দু এক মাস অন্তর অন্তরই তার মন পালাই পালাই করে।"
আমাদের সাথে যোগ দিলেন বাবাও।

বাবা বলল-
"এই দেড় মাস বাচ্চাদের ছুটি, কোথাও না কোথাও তো যেতেই হয় বলো, নইলে বাচ্চাদের মন খারাপ হয়ে যায়। একভাবে কি পড়াশোনা করতে পারে ওরা! "

অগত্যা বেড়াতে যাওয়ার জন্য মাম্মা কে ও রাজি হতেই হলো।

তো মাম্মা বলল-
" ঠিক আছে চলো, দুদিনের শর্ট ট্রিপে আমরা ভরতপুর, ঋষিকেশ বা আগ্রা ঘুরে আসতে পারি। "

আমরা তিনজনেই সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠলাম -"আর কতবার আগ্রা, ভরতপুর বা ঋষিকেশ নিয়ে যাবে আমাদেরকে, এর আগেও তো তিন চার বার করে হয়ে এসেছি।"

ঠিক আছে চলো তাহলে এবার আমরা জয়পুর ঘুরে আসি।

বাবা বলল
"খেপেছো এই গরমে জয়পুর......."

আমি বললাম তার চেয়ে চলো না মাম্মা এবারে আমরা কোন হিল স্টেশন থেকে ঘুরে আসি। এই যেমন ধরো কুল্লু-মানালি, শিমলা, কৌশানী, পালামপুর বা রানিখেত।

মাম্মা স্পষ্ট মানা করে দিল। বলল- এইসব জায়গায় বেড়াতে গেলে কম করেও দিন পাঁচেক লাগবে, তার চেয়ে তোমরা দুই একদিন ভেবে দেখো, আমিও ভাবি, আশেপাশে কোথায় দু দিনের শর্ট ট্রিপে যাওয়া যায়। নইলে যাওয়ার জন্য ঋষিকেশ তো আছেই!

আসলে মাম্মা কোন হিল স্টেশনে বেড়াতে যেতেই চায় না। কারণ মাম্মার অনেকটা উপর থেকে নিচের দিকে দেখলে বা রাস্তার মধ্যে ব্লাইন্ড টার্ন গুলোতে ভীষণ রকম অসুবিধা হয়। খুব শরীর খারাপ হয়ে যায় মাম্মার। এর আগে একবার জম্মুতে আর একবার বৈষ্ণব দেবীতে বেড়াতে গিয়ে মাম্মাকে নিয়ে আমরা সবাই খুব বিপাকে পড়েছিলাম। গাড়িতে করে যাওয়ার সময় আঁকাবাঁকা চড়াই উতরাই পাহাড়ী রাস্তায় বমি করে করে আর তার উপরে ব্রিদিং প্রবলেম এ মাম্মার শরীরের অবস্থা যাচ্ছে তাই। বাবা তো মাম্মাকে প্রায় টেনে টেনে পাহাড়ে উঠিয়েছে আবার নামিয়েছে। মাম্মার সব থেকে পছন্দের জায়গা ঋষিকেশ। আমার মনে হয় মাম্মাকে যদি প্রতি মাসে ঋষিকেশ নিয়ে যাওয়া হয় মাম্মা যেতে রাজি আছে। তবে কিন্তু হরিদ্বার যাবে না। বলবে হরিদ্বারে বড্ড ভিড়। মাম্মার আবার ভীড়-ভাট্টা একেবারেই পছন্দ নয়। আমার মাম্মা বাঙালি হয়েও ভিড়ের কথা ভেবে দুর্গাপূজায় কলকাতায় যায় না। আবার দিল্লিতে ও দুর্গাপূজার সময় দিনের বেলা ঠাকুর দেখতে যায় না। রাত্রে সবাই যখন ঠাকুর দেখে বাড়ি ফেরে তখন আমরা ঠাকুর দেখতে বেরোই।


মায়া নগরী মুম্বাই বেড়াতে গিয়ে আমরা সবাই খুব এনজয় করলেও মাম্মার একটুও ভালো লাগেনি। কারণ একটাই- মুম্বাইয়ের জনস্রোত। যেসব জায়গা যে সিজনে বেড়াতে যাওয়ার জন্য সবথেকে বেশি উপযোগী, মাম্মা সেইসব জায়গায় বেড়াতে যাওয়ার জন্য অফ সিজন বেছে নেবে। কারণ সিজনের সময় লোকজনের ভিড় বেশি থাকে। বেড়াতে যে মাম্মার ভালো লাগে না তা কিন্তু একেবারেই নয়, বেড়ানোর নেশা মাম্মার মধ্যেও ষোল আনা। তবে শান্ত নির্জন পরিবেশ মাম্মার বেশি পছন্দের।

মাম্মা অফিসে বেরিয়ে গেলেই আমি আর বোনু পড়াশোনা শিকেয় তুলে চিন্তা করতে থাকি কোথায় ঘুরতে যাওয়া যায়। বাবাও বোধ করি কাজের ফাঁকে ফাঁকে সেটাই চিন্তা করছে।

এর দু-একদিন বাদে মাম্মা অফিস থেকে ফিরেই বলল চলো আমরা সবাই মিলে 'জিম করবেট ন্যাশনাল পার্ক' ঘুরে আসি।



শুনেই তো আমরা খুশিতে প্রায় লাফিয়ে উঠেছি। তার কারণ স্যার জিম করবেটের নরখাদক বাঘ শিকারের হাড় হিম করা কাহিনীর প্রায় সবই আমার পড়া। আর জিম করবেট আমাদের কাছে একেবারে নতুন অভিজ্ঞতা হবে। এর আগে কখনোই আমরা জিম করবেটে যাইনি। সেইমতো গুগল থেকে সার্চ করে বিভিন্ন সাইট ঘেঁটে নিজেদের পছন্দ মত জিম করবেট ন্যাশনাল পার্কের ভেতরে সবুজের মাঝখানে গ্রাম্য পরিবেশে 'ডিয়ার ভিউ' নামে একটা রিসর্টে আমরা শুক্র শনি রবি এই 3 দিনের জন্য কটেজ বুক করলাম।



যথারীতি বৃহস্পতিবার রাত্রে আমরা দিল্লি থেকে রওনা হলাম জিম করবেটের উদ্দেশ্যে। প্রথমেই দিল্লির বাস আড্ডা থেকে উত্তর প্রদেশ পরিবহনের বাস ধরে আমরা গিয়ে নামলাম রামনগর। তখন সময় প্রায় ভোর সাড়ে চারটে। কিন্তু আমাদের হোটেলে চেক ইন ছিল দুপুর ১২:০০ টায়, এতটা সময় আমরা কোথায় কিভাবে কাটাবো সেটা ভেবে পাচ্ছিলাম না। তবে স্থানীয় লোকের থেকে জেনে নিয়ে বুঝলাম যে এখান থেকে প্রায় ঘন্টা দুয়েকের ব্যবধানে নৈনিতাল শহরটা এই সময়ের মধ্যে বেশ ভালোই ঘুরে আসা যায়। যেমন ভাবা তেমন কাজ। ওই রামনগর বাস ডিপো থেকেই আমরা নৈনিতালের জন্য ছোট মিনিবাস টাইপের একটা গাড়িতে চড়ে বসলাম। পাহাড়ি চড়াই-উৎরাই রাস্তা, মাম্মা তো খুব ভয় পাচ্ছিল। কোনো রকমে চোখ বন্ধ করে বাবার কাঁধে মাথা রেখে শুয়ে শুয়ে প্রায় পুরো রাস্তা গেছে। আমাদের গাড়িটা বেশ কিছুটা রাস্তা চলার পর মাঝখানে কালা ডুংগি বলে একটা জায়গায় দশ মিনিটের ব্রেক দিয়েছিল। আমরা গাড়ি থেকে নেমে সামনে একটা ছোট্ট ঢাবা থেকে দারুন টেস্টি গরমাগরম আলুর পরোটা আর আচার খেয়েছিলাম। তবে মাম্মা কিছুই খায়নি। মাম্মার আবার গাড়িতে বমি হওয়ার ভয় থাকে।


কালা ডুংগি জায়গাটা আমার ভীষণ ভালো লেগেছিল। চারিদিক ঘন জঙ্গলে ঘেরা, মাঝখান থেকে পাহাড়ি রাস্তা চড়াই উৎরাই পেরিয়ে সর্পিল গতিতে এঁকে বেঁকে চলে গেছে সামনের দিকে। জঙ্গল থেকে ঝিঝিঁ পোকার ডাক আসছিল, তখনো ভালোভাবে সূর্য ওঠেনি। হালকা আলো আঁধারিতে এক রোমাঞ্চকর অনপেরিয় চারিদিকে একটা বুনো গন্ধে বাতাস যেন ভারী হয়েছিল। জুন মাসের ভ্যাপসা গরম তখন যেন আর গরম ছিল না, চারিদিক শান্ত শীতল পরিবেশ।

রামনগর বাস ডিপো থেকে নৈনিতালের উদ্দেশ্য ছাড়া প্রথম গাড়িটা প্রায় খালি ছিল বললেই চলে। রাস্তায় দু চার জন যাত্রী ওঠানামা করেছেন। আমি আর বোনু একেবারে সামনে ড্রাইভার এর পাশের সিটে বসে রাস্তা এবং রাস্তার দুপাশের বন জঙ্গল গাছগাছালি দেখতে দেখতে খুব উপভোগ করতে করতে সকাল প্রায় সাড়ে ছটা নাগাদ আমরা পৌঁছে যাই নৈনিতাল।



সমতলে বাস করার মানুষ আমরা, আমাদের চোখে শৈল সৌন্দর্য এক অসামান্য মাত্রা এনেছে। যেদিকে তাকাই পাহাড় আর সবুজ গাছগাছালিতে ঘেরা, যেন কোন ক্যানভাসে আঁকা ছবি।

সবে তো ভালোলাগার শুরু, প্রকৃতি যে কি অপরূপ সৌন্দর্যের ডালি নিয়ে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে তা বুঝতে খুব বেশি সময় আমাদের লাগল না। বাস থেকে নেমে বেশ কিছুটা পথ হেঁটে আমরা উপস্থিত হই লেকের পাশে। এই সময় আবার হালকা ঝিরঝিরে বৃষ্টিও শুরু হয়েছিল মিনিট পাঁচ সাতেকের জন্য। এটা নাকি এখানে খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার।

স্থানীয় লোকেদের পোশাক-আশাক দেখে আমি আর বোনু খুব হাসছিলাম। জুন মাসে দিল্লিতে যেরকম তাপপ্রবাহ থাকে নৈনিতালে অবশ্যই তা ছিল না, তবে সোয়েটার গায়ে দেওয়ার মতো ঠান্ডাও ছিল না। কিন্তু তবুও স্থানীয় লোকেরা সবাই প্রায় সোয়েটার পরে ছিল।

নৈনি তাল, লেক, হ্রদ, যাই বলুন না কেন তার ব্যপ্তি ছিল বিরাট বিশাল। লেকের পাশে গিয়ে আমরা প্রায় আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলাম। চারিদিকটা ঘন সবুজ বৃক্ষে বেষ্টিত উঁচু পাহাড়ের বেষ্টনী, আর মাঝে স্বচ্ছ জলের বিরাট বড় প্রাকৃতিক হ্রদ। আর অনেক ওপরের ঝকঝকে নীল আকাশটা যেন পুরোটাই নেমে এসেছে ওই স্বচ্ছ জলের গভীরে আর তাতেই মনে হচ্ছে হ্রদের জল ঝকঝকে নীল।

ওই অতো সকালেও বেশ ভালোই টুরিস্ট আশেপাশে চোখে পড়ছিল। আর তার সাথে সমানতালে পাল্লা দিয়েছিল ক্যামেরাম্যান, শিকারা চালক, স্থানীয় ট্রেডিশনাল পোশাক-আশাক ভাড়া দেওয়ার দোকানী, পুঁতি- পাথরের মালা বিক্রেতা এবং অবশ্যই পুলিশ।

আমরা হ্রদের ধারে নিজেদের ক্যামেরা দিয়ে অনেক ছবি তুললাম। এরপর বাবা দাম-দর করে একটা সিকারা ঠিক করল একঘন্টা লেকের জলে ঘোরার জন্য। আমাদের চারজনকে শিকারাতে বসিয়ে লেকের মাঝ বরাবর যখন নিয়ে যাওয়া হল এক অপরূপ সৌন্দর্যের অপার্থিব ভালো লাগা ঘিরে ধরল আমাদেরকে। আমাদের সীকারা চালকটিও বেশ হাসমুখ ও মিষ্টভাষী ছিলেন, তিনিও নানাভাবে আমাদেরকে লেক এবং আশপাশের দর্শনীয় স্থানের ব্যাপারে বলছিলেন ও বোঝাচ্ছিলেন এবং জলের মধ্যে হাত দিতে বারণ করছিলেন। লেকের জলে ছোট ছোট ঢেউ, আশেপাশে ঘুরে বেড়ানো ধবধবে সাদা বড় বড় রাজহাঁস, আর প্রচুর বড় বড় মাছ। আর আমাদের আশেপাশে আরও অনেকগুলি সিকারা ও স্পিডবোটে ঘুরে বেড়ানো মানুষের উল্লাস ধ্বনিতে চারিদিক মুখরিত ছিল।

আমরা সিকারাতে ওঠার আগেই বেশ কয়েক প্যাকেট করে হাঁস আর মাছেদেরকে খাওয়ানোর জন্য নির্ধারিত খাবার কিনে নিয়েছিলাম। আমি আর বোন মাছ আর হাঁসদেরকে খাবার খাওয়াতে মত্ত হয়ে রইলাম অনেকক্ষণ। সেই সুযোগে মাম্মা বাবা অনেক ছবি তুলল। এরপর সময় প্রায় শেষ হয়ে আসছিল, তাই সিকারা আবার পুনরায় ঘাটে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার পালা। বিরাট বড় বড় মাছ আর হাঁস খাবার লোভে আমাদের শিকারার পিছন পিছন ঘুরছিল। মাম্মা তো খুব ভয় পাচ্ছিল, মাছের লেজের ঝাপটে আমাদের শিকারা না উল্টে যায়। মাম্মা বাবা আর আমি সাঁতার জানলেও আমার বোনু সাঁতার জানে না। আমার আর বোনুর তো শিকারা থেকে নামার ইচ্ছেই ছিল না। কিন্তু কি আর করা যাবে, সময় ফুরিয়ে গেলে ছেড়ে তো দিতেই হয়। তাই মন খারাপ হলেও সিকারা ছেড়ে দিলাম আমরা।



এর মাঝে কখন যে সময় গড়িয়ে গেছে আর ঘড়ির কাঁটা বলছে এগারোটা বেজে গেছে, আমরা বুঝতেও পারিনি। ঘড়ি দেখার পর আমাদের সবার পেটে খিদেও চনমনিয়ে উঠেছে। বেলা যতো বাড়ছে তত টুরিস্টের আনাগোনাও বাড়ছে। আমরা যখন এসেছিলাম তখন যা ভিড় ছিল এখন ভিড় তার প্রায় ১০ গুন। নৈনিতালে দেখার জায়গা অনেক ছিল, কিন্তু এবারের জার্নিতে আমাদের লিস্টে আগে থেকে নৈনিতাল না থাকায় আমরা যেটুকু ঘুরলাম তা আমাদের জন্য বোনাস হয়ে রইল।


আমাদের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল জিম করবেট ন্যাশনাল পার্ক। সেই মতো আমরা আবার নৈনিতাল থেকে ফেরার জন্য গাড়ির উদ্দেশ্যে লেকের পাড় থেকে রওনা দিলাম ডিপোর দিকে। লেকের পাড় থেকে ডিপো পর্যন্ত যে সামান্য পথ তার দুদিকে ভরা বিভিন্ন জিনিসের দোকান। সেখান থেকেই আমরা আমাদের আত্মীয় পরিজনকে দেওয়ার জন্য মোমের তৈরি কিছু মূর্তি নিলাম, বাবা মাম্মার জন্য পছন্দ করে কিনে দিল রংবেরঙ্গী চুড়ির সেট। এরপর একটা রেস্টুরেন্টে বসে আমরা কিছু খেয়ে নিয়ে এবারের মত নৈনিতালকে টা- টা, বাই -বাই করে গাড়িতে চড়ে বসলাম জিম করবেটের উদ্দেশ্যে। কয়েক ঘন্টার শর্ট ট্রিপে আমাদের হাতে থাকা সময়কে কাজে লাগিয়ে বেশ ভালোই উপভোগ করেছিলাম আমরা। গাড়িতে ফেরার পথে আমাদের পাশে বসা স্থানীয় এক ভদ্র লোকের থেকে নৈনিতাল সম্বন্ধে আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানতে পারলাম, যা আমাদেরকে আবারও শৈলশহর নৈনিতাল ঘুরতে আসার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছিল।



সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৬৩৫৮ ফিট উচ্চতায় কুমায়ুন হিমালয়ের পাদদেশে দেরাদুন শহর থেকে ৩৪৫কিমি অদূরে অবস্থিত শৈলশহর নৈনিতাল।

শৈলশহর নৈনিতালের ইতিহাস সম্পর্কিত কিছু ঐতিহাসিক তথ্য থেকে জানা যায় - দশম শতকে কাত্যুরী সম্রাজের পতনের পরে কুমায়ুন অঞ্চলটি কয়েকটি খণ্ডে বিভক্ত হয়। সেই সময় কুমায়ুনের নৈনিতাল শহরটি পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন খাসিয়া পরিবার। তবে কাত্যুরী সম্রাজের পতনের পরে চান্দ্ সাম্রাজ্য কুমায়ুন অঞ্চলে রাজত্ব শুরু করেন। এই চান্দ্ সাম্রাজ্য এর অন্যতম প্রধান রাজা ত্রিলোক চান্দ্ ১৩ শ শতকে ভীমতালে একটি ফোর্ট নির্মাণ করেন। তবে এই সময়ে সমগ্র নৈনিতাল চান্দ্ সাম্রাজ্য এর অন্তর্ভূক্ত ছিল না। এরপর ১৪৩৩ সাল এবং তার পরবর্তী সময়ে চান্দ্ সাম্রাজ্য সম্পূর্ণ নৈনিতাল অঞ্চলে রাজত্ব শুরু করেন।


পরবর্তীকালে (১৮১৪ - ১৬) অ্যাংলো- নেপাল যুদ্ধের পরে ইংরেজরা সমগ্র ভারতের মতো কুমায়ুন অঞ্চলেও শাসন শুরু করেন। ১৮৪১সালে ইংরেজ শাসনের তত্ত্বাবধানেই নৈনিতাল শৈল শহরের উৎপত্তি ঘটে।

নৈনিতালের পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে -পুরানে বর্ণিত ৫১টি শক্তিপীঠের অন্যতম পীঠ হল নৈনি লেক। আমরা সকলেই জানি বিষ্ণু তার সুদর্শন চক্রের সাহায্যে সতীর মৃতদেহ ধ্বংস করেন এবং ভগবান শিবের রুদ্র তান্ডব শান্ত করে ত্রিলোক কে রক্ষা করেন। সেই সময় ভগবান শিব দুঃখে কাতর হয়ে সতীর মৃত শরীর নিয়ে সমগ্র জগৎ ঘোরেন, ফলে সতীর দেহের অংশবিশেষ পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে পতিত হয়। মানুষের বিশ্বাস সতীর দেহত্যাগের পর সতীর চোখ বা নয়ন এই নৈনি লেকে পতিত হয়। তাই এখানে নয়না দেবী মন্দির ও স্থাপন করা হয়। লেকের দক্ষিণ পাড়ে অবস্থিত এই মন্দিরটি স্থানীয় মানুষের কাছে নৈনি মাতা মন্দির হিসেবেই পরিচিত।



দর্শনীয় স্থান-

নৈনিতাল নামের পিছনে মুখ্য কারণ হলো নৈনি লেক। স্বচ্ছ জলে পরিপুষ্ট এই লেকটি সমগ্র কুমায়ুন অঞ্চল জুড়ে বেশ পরিচিত। এই লেক কে কেন্দ্র করে রয়েছে সাতটি পাহাড়ের চূড়ার অবস্থান। এগুলি হল- আয়ার্পাতা, দেওপাতা, হান্ডি বান্ডি, চিনা পিক, আলমা, লারিয়া কান্তা, শের কা ডান্ডা। এই লেকটি মূলত দুইটি খন্ডে বিভক্ত, যার উত্তরের অংশটি মল্লিতাল এবং দক্ষিণের অংশটি তাল্লিতাল নামে নামকরণ করা হয়েছে। পর্যটনের উদ্দেশ্যে এই নৈনি লেকে বোটিং করার সুব্যবস্থা রয়েছে।


নৈনি দেবী মন্দির-
নৈনিতাল শহরটি কিন্তু একটি বিখ্যাত তীর্থক্ষেত্র হিসেবেও পরিচিত। পুরাণের ৫১টি শক্তিপীঠের অন্যতম পীঠের নিদর্শন হলো এই নৈনি দেবী মন্দির। এই মন্দিরের গর্ভগৃহে স্থাপিত আছেন নৈনি দেবী। এছাড়াও এই মন্দিরে দেবী কালী এবং ভগবান গণেশের মন্দির রয়েছে।

এছাড়াও নৈনিতালে দর্শন করার মতন আরও অনেকগুলি জায়গা আছে যেমন - স্নো ভিউ পয়েন্ট, ইকো কেভ গার্ডেন, টিফিন টপ, নীম কারোলি বাবা আশ্রম, ভীমতাল, চিড়িয়াখানা, মল রোড ইত্যাদি।

নৈনিতালে বছরের যে কোনো সময় ভ্রমণ করে আসতে পারেন। এখানে বছরের সব সময় আবহাওয়া মনোরম থাকে। তবে পর্যটকরা নৈনিতাল ভ্রমণের জন্য মে -জুন মাসটিকে বেছে নেনে। শীতের সময় এখানে তুষারপাতের সম্ভাবনা থাকে, তাই রোমান্টিক সময় কাটাতে শীতকালে ও নৈনিতাল ভ্রমণ করতে পারেন।