ষাঁড়ের তাল

সুলেখা ভান্ডারী,

কসবা বালিগঞ্জ, কলকাতা

একি ষাঁড়ের তালেরে বাবা একি ষাঁড়ের তাল!
সত্যি সত্যি সত্যি বলে খাচ্ছি দিব্যি,
একটুও নয় মিথ্যে কথা; নয় চাতুরি ছল।
সবাই বলে ওটা নাকি মা বিশালক্ষীর ষাঁড়
আপন মনে ঘুরে বেড়ায়; নেয় যেথায় খুশি ঠাঁই।
বেঁধে রাখা যায় না তারে উচ্ছোগ্য করা ষাঁড়,
মাঠের ধান ক্ষেতের ফসল ইচ্ছেমতন খায়।
আবার ইচ্ছে হলে পায়ের চাপে নষ্ট করেও দেয়,
বাধা দিতে গেলেই অমনি শিং বাগিয়ে ধায়।

একদিন কি হয়েছিল তাই বলি,
দুপুর বেলায় গাছের ছায়ায় -
পেটটি নাদুস করে ঘুমিয়ে ছিলেন তিনি,
কারোর ক্ষেতের ফসল নষ্ট; কারো জমির ধান
কারোর আবার ভেঙেছে বেড়া নষ্ট বরজ পান।
সেই রাগেতেই সবাই মিলে বললে- এই সুযোগ,
চল ব্যাটাকে বেঁধে রাখি, যেমন ভাবা তেমন কাজ।
জোগাড় হল শক্ত মোটা দড়ি, পাড়ার যত জোয়ান ছেলেপুলে
উচ্ছ্বাসে আর স্ফুর্তিতে ভরপুর, চুপিসারে পা টিপে টিপে চলে-
দড়িতে গিঁট বেঁধে দূরের থেকে ঘুরিয়ে দড়ি পরিয়ে দিল গলায়
মজবুত দড়ি শক্ত করে বাঁধে গাছের গোড়ায়,
মজা দেখবে বলে সবাই এদিক ওদিক লুকায়।
ষাঁড় বাবাজির ঘুম ভেঙেছে গলায় দড়ির টান
রাগের চোটে মাথা নাড়িয়ে দিলে হেঁচকা টান
শিকড় সমেত উপড়ে এলো এই এত্তো মোটা গাছ
ভয়ের চোটে দিগ্বিদিকে ছুটল সবাই লয়ে আপন প্রাণ।

আরেক দিনের কথা, শুনি মামার বাড়ির কাছেই
বাবার ছিল বিঘে কয়েক জমি
বাবা আমার বড় মনের মানুষ তাই লোকের হিতে জমি করলে দান,
সেই জমিতেই হয়েছে হাই স্কুল,
তারা বাবাকে জানাবে সম্মান।

স্কুলে তখন চলছে গ্রীষ্মাবকাশ;
মা-বাবার সাথে আমরা ভাই বোনেরা
মামার বাড়ি গেলাম, থাকব পুরো মাস।
মামার বাড়ি রসের হাঁড়ি ভারী মজা সেথায়
হাসি মজা আনন্দ কোন বকাবকি নাই।
ঘুম ভাঙলেই ভোরের বেলা হাতে রসের গ্লাস
তাতে ভরা টোই টুম্বুর তাজা তাল গাছের রস।
আহা মধুর মত মিষ্টি সে রস সুঘ্রানেতে ভরা -
গাছ ভরা আম লিচু তরমুজ ফুটি শসা মাঠ জোড়া।
তালের পাটালি গুড় সে যে অমৃতের সমান
গোয়াল ভরা দুধেল গাই পুকুর ভরা মাছ
ইচ্ছে মতন খেয়ে ঘুমিয়ে ছুটে বেড়িয়ে গেয়ে ছিলেম গান।
সপ্তাখানেক কাটল এইভাবে, তারপরে এক ভোরের বেলায়
মেজদি আমায় বললে- মানু চল দুই বোনেতে স্কুলটা আসি দেখে।
আমি বললাম না না বাবা আমায় ছাড়,
তুই অন্য কাউকে বল, ঘুম জড়ানো চোখে।
তোর মাথাটা খারাপ নাকি মেজদি? ওই অত দূরে
গাড়ি ছাড়া হেঁটে হেঁটে এই গরমে
যাচ্ছি নাকো মোটে।
এই জলা জঙ্গল দেশে গাড়ি কোথায় পাবি?
কদিন পরেই তো ফিরবো বাড়ি, আর হবেনা দেখা।
তার চাইতে দুই বোনেতে ঠান্ডা হাওয়ায় সকাল বেলা
ঘুরে আসি চল একা।
নিম রাজি হয়ে চলছি দিদির সাথে, রাস্তা যেন ফুরায় না আর
আমি পরেছি লাল রঙা ফ্রক দিদি পরেছে শাড়ি,
কারোর পায়েই নেইকো জুতো,
মাথায় নেইকো ছাতা আর না আছে সাথে জল,
বাড়িতে কাউকে না জানিয়েই দিয়েছি দু বোন পাড়ি।
যেতে যেতে কি মনে করে হঠাৎ দেখি পিছনে ঘুরে
একটা ষাঁড়ে আপন মনে খাচ্ছে ঘাস খানিক দুরে।
কেমন একটা শব্দ শুনে পিছনে ঘুরে চক্ষু চড়ক গাছ
মূর্তিমান যমের মত ষাঁড় বাবাজি আসছে ধেয়ে
মোদের পানে, - এইবারে তুই বাঁচ।
মেজদি বলে ছোট রে মানু ছোট, আর দৌড় কাকে বলে-
আমাদের ধরা কি এতই সোজা! স্পোর্টসে আমরা প্রতিবছর প্রাইজ পাই ইস্কুলে।
কিন্তু এ ষাঁড় তো আর যেমন তেমন নয়, খোদ বিশালক্ষীর ষাঁড়।
দেখি দিদির দিকে নয়, ছুটছে যে ষাঁড় আপন বেগে আমার দিকেই
বুঝতে পারিনি আগে, পরে বুঝলাম
ষাঁড় ক্ষেপেছে আমার লাল জামাটা দেখেই।
ছুটতে ছুটতে হুড়মুড়িয়ে গেলাম পড়ে
মাঠের শক্ত মাটি ইটের মত; হাঁটুটা গেল ছোড়ে।
ঝর ঝরিয়ে রক্ত ঝরছে, মেজদি আমার হাতটা ধরে তোলে
আরো জোরে ছুট লাগা বোন, নইলে -
পড়বো ভারী বিপদে, মেজদি আমায় বলে।
ছুটতে ছুটতে আমরা দুজন পৌঁছে গেলাম হাই স্কুলের কাছে
ছোট্ট একটা চায়ের দোকান।
সকালবেলা গুটি কয়েক লোক বাঁশের বেঞ্চে বসে-
খাচ্ছিল চা, বাঁচাও বাঁচাও বলে দু বোন বেদম চেঁচাই কোষে।
দেখে তো ওরা ভীষণ অবাক, বললে-
কারা তোমরা, কোথায় থাকো? হয়েছে কি তাই বল!
কোনোমতে বলি ষাঁড়, ষাঁড় আসছে এদিক পানে ছুটে,
দেখতে কেমন? লম্বা চওড়া নাদুস নুদুস সাদা কাঁধ আর কালো কটকটে।
খুব ধারালো সিং দুটো তার ইয়া বড় বড়
শুনে সবাই হুড় মুড়িয়ে ঢোকে দোকান ঘরে,
বলে ঝাঁপ বন্ধ করো।
ওই ছোট্ট একটা গুমটি দোকান ঘরে
ঢুকে বসেছি এত্তোগুলো মানুষ
নড়াচড়ার জায়গা ছিল না মোটে, ভয়তে কারো পড়ছিল না নিঃশ্বাস।
দেখছি সবাই ঝাঁপের আড়াল থেকে
ষাঁড় বাবাজি খানিক দৌড়ে এদিক সেদিক
ভীষণ রাগের চোটে লম্বা শিং এর গুঁতো দিল চায়ের দোকান ঘরে
সামনে কাউকে দেখতে না পেয়ে ফোঁস-ফোঁস করে আস্তে আস্তে সেখান থেকে ফেরে।
সবার ধড়ে এলো প্রাণ, আস্তে আস্তে চায়ের দোকান থেকে
একে একে বেরিয়ে এলাম সবাই
এক বুড়ো দাদু বললে, কি হয়েছিল ঠিকঠাক গুছিয়ে বলতো দিদিভাই?
আর একজনে বললে- গুছিয়ে বলবে কি?
দেখছো না ওর জামার রংটা টুকটুকে লাল, ওটাই কারণ আর কি।
তখনো আমি ভয়ে কাঁপছি থরো থরো
কোনমতে বাড়িতে ফিরে জুড়েছি কান্না
দোকানি বললে- বিপদ গেছে কেটে, নাও জলের গ্লাস ধরো।
গ্লাসের জল নিমিষে শেষ, গলা শুকিয়ে কাঠ
যেই ভাবছি ফিরতে হবে আবারো ওই পথে
পেরিয়ে মাঠে ঘাট।

আর রবো না হেথা মা গো, বাড়ি যাবই কাল
জীবনেও ভুলবো না ভাই, সেকি ষাঁড়ের তাল রে বাবা; সেকি ষাঁড়ের তাল!