সন্ধি পূজার মাহাত্ম্য

সুচিত্র রঞ্জন পুরকাইত,

ডায়মন্ড হারবার দক্ষিণ ২৪ পরগনা

দুর্গাপূজা বাঙালির প্রধান উৎসব। পৃথিবীর সব প্রান্তের বাঙালিরাই বছর বছর মেতে ওঠেন তাদের প্রধান উৎসব দুর্গাপূজায়।

আজকাল দুর্গোৎসবের সূচনা এবং ঠাকুর দেখার ঢল মহালয়ার দিন থেকেই শুরু হয়ে যায়। এবং তার সাথে সাথে সোশ্যাল মিডিয়ায় শুরু হয়ে যায় একে অপরকে অভিনন্দন জানানোর প্রক্রিয়া। আর সেই প্রক্রিয়াটিতে প্রতিটা দিনের সাথে 'মহা' শব্দটা উল্লেখ করা হয়ে থাকে। যেমন মহা চতুর্থীর শুভেচ্ছা, মহা পঞ্চমীর শুভেচ্ছা, মহা ষষ্ঠীর শুভেচ্ছা ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু দুর্গাপূজায় মহা শব্দটা কেবলমাত্র দুটো তিথির সাথেই প্রযোজ্য, অষ্টমী এবং নবমী। বাকি অন্য কোন তিথির সাথে মহা শব্দটি প্রযোজ্য নয়।
দুর্গোৎসব নিয়ে এযাবৎ কালে লেখা প্রমাণ পুস্তকের কথা যদি বলতে হয়, তাহলে স্মার্ত পণ্ডিত রঘুনন্দন ভট্টাচার্যের অষ্টবিংশতি তত্ত্বের কথা না বললে চলবে না। মার্কণ্ডেয় পুরাণে রাজা সুরথের দ্বারা, মহাভাগবত পুরাণে রামের দ্বারা, বা ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে কৃষ্ণের দ্বারা দেবীর পূজার আদি উল্লেখ আছেই যেখান থেকে পূজাটা এসেছে। কিন্তু এই যে “মহা” কথাটা আসলো তার উল্লেখ শাস্ত্র থেকে রঘুনন্দন করছেন এমন-

মহাবিপত্তারকত্বাদ্ গীয়তেঽসৌ মহাষ্টমী ।
মহাসম্পাদ্দায়কত্বাৎ সা মহানবমী মতা ।।

বঙ্গানুবাদ : মহাশক্তি দুর্গার আবির্ভাবে মহাবিপদ কেটে গেলো বলে অষ্টমী তিথির নাম হলো মহাষ্টমী এবং মহাসম্পদ লাভ হলো বলে নবমী তিথি হলো মহানবমী।

সকল গ্রন্থেই - মহাভাগবত, কালিকা, বৃহন্নদিকেশ্বর বা দেবী পুরাণে এবিষয়ে সবাই এক মত যে, ষষ্ঠীতে বোধনের পূজা করলেও তা হবে বিল্ববৃক্ষে (বেলগাছে)। মৃণ্ময়ী প্রতিমায় মূল পূজা হয় সপ্তমী থেকে দশমী অবধি। চারদিনের কাজের বর্ণনাও দেবী পুরাণাদি শাস্ত্র দিচ্ছে-

শারদীয়া মহাপূজা চতুঃকর্মময়ী শুভা ।

অর্থাৎ , শারদীয়া মহাপূজায় চারটি কাজ মূল থাকবে।

চতুঃকর্মময়ীত্যনেন চতুরবয়বত্বেনাভিধানাৎ স্নপনপূজনবলিদানহোমরূপা...

বঙ্গানুবাদ : চারটি কাজ অর্থাৎ স্নান, পূজা, বলিদান এবং হোম।

এই যে মহাপূজার চার কাজ, সপ্তমীতে স্নানই মূল, অষ্টমীতে পূজা, নবমীতে বলিদান এবং হোমই মূল কাজের হয়। দশমীতে কেবল বিসর্জনের কাজ হয়।

তবে বর্তমানে নিয়ম নিষ্ঠা সহকারে পূজা খুব একটা দেখা যায় না, এখন সব থিমের পূজা। থিমের প্যান্ডেল, থিমের মূর্তি। আর কে কত বেশি টাকা খরচ করে পূজা করতে পারবে তার রেষারেষি।
আমার মতে প্যান্ডেলের সংখ্যা আর প্রচুর খরচের চেয়ে সপ্তমীতে মহাস্নানের, অষ্টমীতে কুমারী পূজা আর সন্ধিপূজার সঙ্গে সঙ্গে মহাগুরুত্বপূর্ণ মহানবমীর হোম। এটা দেখার বা করার ইচ্ছা সবার বৃদ্ধি পাক এটাই আশা রইলো। যাইহোক এখন আমাদের মূল আলোচ্য বিষয়ের উপর আলোকপাত করা যাক।

প্রধানত এই মহাপূজা চলে ৪ দিন ধরে, তবে সবার বিশেষ আকর্ষণ থাকে সন্ধি পূজায়। চার দিনের মহাপূজায় কেবল এই কিয়দাংশে সবচেয়ে বড় আয়োজন দেখা যায়। অষ্টমী তিথির শেষ ২৪ মিনিট এবং নবমি তিথির শুরুর ২৪ মিনিট, মোট সময়কাল মাত্র ২ দণ্ড (৪৮ মিনিট) হলেও দেখবেন ১০৮ টা প্রদীপ জ্বলছে, ১০৮ পদ্মের দ্বারা দেবীকে আরাধনা করা হয়। কী এর কারণ?

সন্ধিপূজা মূলতঃ দেবী চামুণ্ডেশ্বরী বা চামুণ্ডার পূজা। দেবী চামুণ্ডা মাতৃকা বর্গের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকরী। মার্কণ্ডেয় পুরাণোক্ত দেবীমাহাত্ম্যে দেখা যায়- ধূম্রলোচন বধে অসুররাজ শুম্ভ ক্ষুব্ধ হয়৷ যুদ্ধে পরের সেনাপতি হিসাবে নিযুক্ত করা হয় চণ্ড ও মুণ্ড অসুরকে। আদেশ দেয়, দেবী অম্বিকাকে বেঁধে কেশাকর্ষণ পূর্বক ( চুলের মুঠি ধরে) তার সামনে উপস্থিত করাতে। আজ্ঞা অনুযায়ী তারা হিমাচলে গেলো যুদ্ধ করতে। অন্তর্যামীনি দেবী অম্বিকা তাদের এই মনোভাব বুঝতে পেরে ক্রোধে ফেটে পড়েন। ক্ষোভের কালিমা তার মুখে প্রকাশিত হতে থাকে, তা হতে নির্গত হয় এক ভয়ঙ্করী দেবী। চণ্ডীতে সেই দেবীর রূপ বর্ণিত আছে এভাবে,-
"সেই দেবী খড়্গ ও পাশ হস্তা, সেই দেবী বিচিত্র নরকঙ্কালধারিণী, নরমুণ্ডমালিনী, ব্যাঘ্রচর্ম পরিহিতা, অস্থিচর্মসার মাত্র তার দেহ, অতিভীষণা, বিশাল বদনা, লোলজিহ্বায় ভয়প্রদা, কোটরগত আরক্ত চক্ষু বিশিষ্টা এবং বিকট শব্দে দিঙমণ্ডলপূর্ণকারিণী।" (শ্রী শ্রী চণ্ডী, ৭/৬ ~ ৯)

দেবীর কী ভীষণ রূপ তা শ্রী শ্রী চণ্ডী পড়েই জানার অনুরোধ রইলো। এমন বর্ণনা আমার পক্ষেও ঠিক ঠিক দেওয়া সম্ভব নয়। অনন্তর, অষ্টমী নবমী সন্ধিক্ষণ উপস্থিত হলে সেই ভয়ঙ্করী দেবী খড়্গ উঠিয়ে চণ্ডের দিকে ধাবিত হলেন। চণ্ডের কেশ ধরে তার শিরশ্ছেদ করলেন। এমতাবস্থায় দেবী দেখেন মুণ্ড দেবীর দিকে ধাবিত। কিন্তু মুন্ড দেবীর উপর আক্রমণ করে আঘাত হানার আগেই দেবী খড়্গ দিয়ে আঘাত করে তাকে ধরাশায়ী করেন।

যুদ্ধ শেষে দেবী অসুরদ্বয়ের মাথা নিয়ে দেবী অম্বিকার সম্মুখে উপস্থিত হলো। খুশি হয়ে দেবী বললেন,

য়স্মাচ্চণ্ডঞ্চ মুণ্ডঞ্চ গৃহীত্বা ত্বমুপাগতা।

চামুণ্ডেতি ততো লোকে খ্যাতা দেবী ভবিষ্যতি।। (শ্রী শ্রী চণ্ডী, ৭/২৭)vv বঙ্গানুবাদ : দেবী অম্বিকা (জগন্মাতা বা পরমেশ্বরী) বলছেন — দেবী, তুমি চণ্ড ও মুণ্ডের মস্তকদ্বয় আমার নিকট আনিয়াছ বলিয়া পৃথিবীতে তুমি চামুণ্ডা নামে বিখ্যাত হইবে।vv এরপর দেবী কালিকা রক্তবীজকেও বধ করেন।

এবার আসা যাক, নতুন এক প্রশ্নে। দেবী তো অনেক অসুরকেই বধ করেছেন৷ এটার আলাদা মাহাত্ম্য কী?

বেলুড় মঠের দুর্গাপূজা বিশেষ করে কুমারী পূজা এবং সন্ধি পূজা জগত বিখ্যাত। সেখানেই প্রতিবছর সন্ধিপুজোর প্রাক মুহূর্তে একজন মহারাজজী সবার জ্ঞাতার্থে সন্ধিপুজোর মাহাত্ম্যকে বিশ্লেষণ করে বলেন যে-
ধ্যান মন্ত্রে বলা হচ্ছে, দেবীর রূপ এমন "চিত্তে কৃপা, সমরে নিষ্ঠুরতা"। কিন্তু দেবী তো মা, তাহলে এই নিষ্ঠুরতা কেনো? এর উত্তরে বলতে হয় দেবীর সঙ্গে অসুরের যুদ্ধ কেবল বাহ্যিক যুদ্ধ নয়। এই যুদ্ধ সংগঠিত হয় আমাদের মধ্যেও। চণ্ড ও মুণ্ড আমাদের কাম ও ক্রোধ আর রক্তবীজ আমাদের সংস্কার। দেবী চান তার সন্তান যেন জীবন মরন প্রহেলিকা থেকে মুক্ত হয়। সেই মুক্তি অর্জন করতে সাধককে প্রচণ্ড যুদ্ধ করতে হয় সাধকেরই অন্তঃকরণের সঙ্গে। আর সেই মুক্তি অর্জনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় আমাদের কাম, ক্রোধ ও সংস্কার।
গীতায় ভগবান বলছেন, নরকের তিনটি দ্বার- কাম, ক্রোধ ও লোভ। আমরা দেবীর সন্তান তাই আমাদের উত্তরণ সাধনই দেবীর মুখ্য উদ্দেশ্য। আমরা দেবীকে মা বলে ডাকবো কিন্তু কাম, ক্রোধ ও সংস্কারের বেড়াজালে আটকে থাকবো তা দেবী কখনো সহ্য করেন না। তাই আমাদের মনের এই দুর্দমনীয় অসুরদের নাশের জন্য মা এই কোপময়ী মূর্তিতে আবির্ভূতা হন। তাই চণ্ড ও মুণ্ড সেই দুই ভাই, কাম ও ক্রোধ। যারা সর্বদা একসঙ্গে অবস্থান করে। গীতায় বলা হয়, " কামাৎ ক্রোধ বিজায়তে"
কাম বাধাপ্রাপ্ত হয়ে ক্রোধ উৎপন্ন হয়। তখন চণ্ড অর্থাৎ জীব উন্মত্ত হয়, মুণ্ড অর্থাৎ তার মস্তিষ্ক বুদ্ধিভ্রষ্ট হয়। সেই জন্য দেবী চণ্ডমুণ্ডের বিনাস করেন।

সবশেষে বলা যায়, কাম ক্রোধ যদিও বা জয় করা যায়, সংস্কার জয় করা খুবই কঠিন। এই সংস্কারের প্রভাবেই আমাদের পুনর্জন্ম হয়। তাই জন্মমৃত্যু প্রহেলিকা থেকে মুক্ত হওয়ার প্রধান অন্তরায় আমাদের সংস্কার। এই সংস্কারও রক্তবীজের মতো একবার কেটে ফেললে আবার সমান বলশালী অসুরের মতো উৎপন্ন হয়। এই সংস্কারকে আমরা জন্মজন্মান্তর ধরে বহন করে মোহ কূপে আবর্তন করতে থাকি। তাই মা এই জীবনে এগোতে সকল বাধা দায়ী সংস্কার থেকে মুক্ত করেন।

দেবীর কোনো কাজই এক উদ্দেশ্য বহ নয়। দেবী অম্বিকা আমাদের একসঙ্গে অনেক বার্তা নিয়ে আসেন। এটা আমাদের উপলব্ধির বিষয়।

আমাদেরও উচিৎ তার থেকে শিক্ষা নিয়ে কাম, ক্রোধ মুক্ত হওয়া। আমাদেরও উচিৎ জীবনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা। বাধাদায়ী সব সংস্কারকে দেবী চামুণ্ডার মতো ভক্ষণ করা। সর্বোপরি মোক্ষ প্রাপ্তির উদ্দেশ্য নিয়ে এগিয়ে যাওয়া।

সকলকে দুর্গাপূজার অশেষ শুভকামনা।

 || জয়তু জয়তু দেবী চামুণ্ডা ||

         || নমশ্চণ্ডিকায়ৈ ||