শেষটুকু এখনও বাকি(প্রথম পর্ব-)

প্রসেনজিৎ দাস,

পশ্চিম মেদিনীপুর


পূর্ববর্তী অংশটি পড়ার জন্য লাইব্রেরি বিভাগে দেখুন...

বেলডাঙ্গা গ্রামের ভেতরটা যেন ঘুমিয়ে থাকা কোনো পুরোনো কাহিনির মত। সরু কাঁচা রাস্তা, দু’ধারে ধানখেত, মাঝেমাঝে কিছু তাল আর বাবলা গাছ। গ্রীষ্মকালের শুরু , মাটি ফেটে চৌচির, কিন্তু বাতাসে পেঁয়াজ-পোড়া রোদেও একটা অদ্ভুত শান্তি।

এই গ্রামেরই প্রান্তে একটা মাটির ঘর , পাঁচিল ধরা, দরজায় কুলঘন্টা। ওটাই রমেন মালির ঘর। রমেন এক সাধারণ কৃষক। ছোটোবেলা থেকেই কষ্ট দেখেছে, কিন্তু কখনো ভাঙেনি। চোখে একরাশ আস্থা, মুখে হাসি আর ঠোঁটের কোণে একটাই কথা:

“মা আছে, তাই তো এখনও বেঁচে আছি।”

জীবনে কিছু কিছু মানুষ থাকে, যাদের প্রতি পদক্ষেপই যেন এক একটি গল্প। প্রতিটি বাঁকে বাঁকে লুকিয়ে থাকে নতুন নতুন অভিজ্ঞতা, অজানা অধ্যায়। রমেন তেমনই একজন মানুষ, যার জীবনের প্রতিটি মোড় যেন লিখে চলেছে এক অভিনব উপাখ্যান।

"মা আছে তাই বেঁচে আছি" - এই আস্থাই রমেনকে সাহস জুগিয়েছে প্রতিকূলতার মধ্যেও পথ খুঁজে নিতে। বারবার ধাক্কা খেয়েও সে পিছপা হয়নি। জীবনের প্রতিটি চ্যালেঞ্জকে গ্রহণ করেছে প্রশান্ত চিত্তে, অটুট আত্মবিশ্বাসে।

আজ, যখন আমরা একবিংশ শতাব্দীর প্রায় মধ্য ভাগে দাঁড়িয়ে, বিজ্ঞানের আলোয় অনেক অলৌকিক ঘটনাকেই কুসংস্কার, কাকতালীয় কল্পনা কিংবা নিছক প্রতারণা বলে উড়িয়ে দিই , সেই সময়ে দাঁড়িয়েও রমেনের জীবনের কিছু কিছু অধ্যায় যেন প্রশ্ন তোলে বাস্তব আর অদ্ভুতের মাঝের সূক্ষ্ম সীমানা নিয়ে।

আসলে, রমেনের জীবনের যে অধ্যায়গুলো এক একটি অলৌকিক ঘটনার ইঙ্গিত দেয়, সেগুলোর সূত্রপাত হয়েছিল ঠিক ৩৮ বছর আগে তার জন্মলগ্ন থেকেই। এক ব্যথাবিধুর সূচনা, যেখানে কষ্ট ছিল সঙ্গী, অনিশ্চয়তা ছিল ছায়াসঙ্গী। চিকিৎসকরা তখনই বলেছিলেন, এই শিশু ও মায়ের জীবন ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু কে জানত, সেই দুর্বল আর্ত চিৎকারের মধ্যেই এক দিন লুকিয়ে থাকবে এক অসম্ভব জীবনযুদ্ধের শক্তি !

দিনটি ছিল পঞ্চমী তিথি।

তৎকালীন সময়ে গ্রামে সরস্বতী পূজার তেমন জাঁকজমক ছিল না। বাড়ি বাড়ি পূজোর আয়োজন এখনকার মতো সাধারণ ছিল না । পুরো গ্রামে হয়তো মাত্র এক-দুটি জায়গায় পুজো হতো, তার বেশির ভাগই স্কুলঘর কিংবা বড়ো বাবুদের উঠোনে, একেবারে সরল উপায়ে।

সেই দিনেই পূর্বা দেবীর প্রসববেদনা শুরু হয়। তিনি তখন ছিলেন নিজের বাপের বাড়িতে, কারণ শ্বশুরবাড়িতে তাকে দেখভাল করার মতো কেউ ছিল না। বাপের বাড়ির পাশেই ছিল প্রাচীন শীতলা নাট মন্দির, সেখানে চলছিল সরস্বতী পূজার প্রস্তুতি। সারারাত জেগে প্রতিমা সাজানো, আলপনা আঁকা আর পুজোর সামগ্রী গোছানোর ব্যস্ততা চলছিল।

ঠিক সেই রাতেই পূর্বা দেবীর প্রসবযন্ত্রণা তীব্র হতে থাকে।

গ্রামে তখন ডাক্তার বলতে একজন হাতুড়ে চিকিৎসক আর একজন প্রবীণ ধাইমা। আধুনিক চিকিৎসা তো দূরের কথা, প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রও ছিল বহু দূরে, মাটির কাঁচা রাস্তা পার হয়ে পৌঁছতে হতো সেখানে।

অথচ রাতের অন্ধকার, কাকুরে পথ আর অব্যবস্থার মধ্যে কারো পক্ষেই তাকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না।

ভোর হতেই পূর্বা দেবীর অবস্থা সংকটজনক হয়ে ওঠে। সন্তান আসতে চলেছে, কিন্তু গর্ভস্থ শিশুর অবস্থাও ভাল নয়।

ঘরের মধ্যে, বাতাসে ধূপ-ধুনোর গন্ধ মিশে গিয়েছিল প্রসবের ঘাম, আতঙ্ক আর যন্ত্রণার ভারী গন্ধে।

অবশেষে, দীর্ঘ যন্ত্রণার পর জন্ম নেয় একটি পুত্র সন্তান।

কিন্তু সেই জন্মের সাক্ষী হয়ে থাকা রমেন এর বাঁ চোখের কোনের দাগ বলে দেয় সে রাতের ইতিহাস।

সব হারাতে হারাতে শেষ মুহূর্তে যে পুত্র সন্তান এর জন্ম দিয়েছেন , সাধ করে তার নাম রেখেছিলেন হারা।

হারা, যার আরেক নাম রমেন, ধীরে ধীরে বেড়ে উঠতে থাকে দারিদ্র্যের ছায়া গায়ে মেখে।

তার বাবা, সাধন বাবু, ছিলেন একজন দিনমজুর , লোকের বাড়িতে কাজ করে যে সামান্য রোজগার করতেন, তা দিয়েই কোনোরকমে চলত সংসার।

রমেনের বয়স যখন মাত্র তিন, তখন সাধন বাবুকে তাঁর নিজের ভাইয়েরা মিলে ঘর থেকে বের করে দেয়।

বাড়ির অন্দরে আর ঠাঁই থাকল না তার।

অসহায় পূর্বা দেবী তাঁর ছোট্ট ছেলেকে আঁচলে মুড়ে রাত কাটান রান্নাঘরের উনুনের এক কোণে।

সেই রান্নাঘর ছিল তালপাতায় ঢাকা, নিচে কাদা জল জমে ছিল বৃষ্টির কারণে।

জলের মধ্যে বসে, ঠান্ডা আর অন্ধকারে কেঁপে কেঁপে কেটেছিল সেই ভয়ানক রাত।

সকালে পাড়ার কিছু সদয় মানুষের হস্তক্ষেপে, সাধন বাবু সাময়িকভাবে আবার ফিরে আসেন ঘরে।

তবে সেই ঘরে ফেরার পথ ছিল শর্তসাপেক্ষ ,

দুই মাসের মধ্যে তাদের সেই বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও আশ্রয় নিতে হবে।

এদিকে ঘটে গেল আরেক অপ্রত্যাশিত ঘটনা।

গ্রামের লোকজনের চাপ হোক বা দাদাদের কৃত্রিম কৃপায় - সাধন বাবু, পূর্বা দেবী এবং তাদের ছোট্ট পুত্রসন্তান দুই মাসের জন্য আবার সেই ঘরে ঠাঁই পেলো বটে।

কিন্তু রয়ে গেল একটি অসহায় দুর্বলতা , ওই ঘরের দরজায় তালা দেবার কোনও ব্যবস্থা ছিল না।

একদিন, পূর্বা দেবী হঠাৎ বাবার বাড়ি থেকে দেওয়া একটি পুরনো টিনের বাক্স খুলে দেখলেন , যে কয়টি সোনা-রুপোর গয়না ছিল, একটি পর্যন্ত অবশিষ্ট নেই।

মুহূর্তে যেন আকাশ ভেঙে পড়ল মাথার উপর।

এই দুর্দিনে, ওই সামান্য গয়নাগুলোই ছিল তার সঞ্চিত ভরসা।

হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন পূর্বা দেবী।

পেছনে তার ছোট্ট ছেলে হারা মায়ের আঁচল ধরে ঘুরে বেড়াচ্ছে । মায়ের কান্নার মানে কি সে বোঝে?

বাড়িতে ছড়িয়ে পড়ে হুলুস্থুল কাণ্ড।

কে চুরি করেছে, কেউ স্বীকার করে না।

অবশেষে, পূর্বা দেবীর বাপের বাড়ির লোকজন উদ্যোগ নিয়ে ডাক পাঠাল সেই সময়কার পরিচিত এক "নল চালা সুপারি চালক" কে - যিনি চোর ধরার জাদুমন্ত্রে খ্যাত।

তিনি এসে দৃপ্ত কণ্ঠে বললেন,

“ যে সোনা চুরি করেছে আমার এই অব্যর্থ মন্ত্র তার ক্ষতি না করে ছাড়বে না।”

এই কথা শুনে সাধন বাবুর দাদারা প্রতিবাদে রুখে দাঁড়ালেন।

অনেক তর্ক, চিৎকার, অস্বস্তি আর অস্বীকারের শেষে জোর করেই বিদায় জানানো হলো সেই চালককে।

চোখের জলে ধুয়ে, বুকের ভেতর জমাট কষ্ট নিয়ে পূর্বা দেবী শেষমেশ মুখ বুজে মেনে নিলেন নিজের নিয়তিকে।

চুপচাপ সেই অপমান আর দুর্ভাগ্যকে সঙ্গী করে রইলেন তিনি, এক করুণ স্তব্ধতায়।

এই ঘটনার পর থেকেই পূর্বা দেবীর জীবনে যেন এক দীর্ঘ ছায়া নেমে আসে। সাধন বাবুর উপর ষড়যন্ত্রের জাল আরও ঘন হতে থাকে, আর অবহেলার তীক্ষ্ণতা হয়ে ওঠে অসহ্য। এই পরিবার যেন হারা-কে মেনে নিতে পারেনি । হারা ছিল যেন এক অবাঞ্ছিত উপস্থিতি, যার হার না মানা অস্তিত্ব কিছু মানুষকে অস্থির করে তুলতো।

হারা যখন ছোট ছোট পা টেনে হামাগুড়ি দিয়ে কারো দুয়ারে গিয়ে উঠত, তখন স্নেহের হাত তো দূর, তার বদলে পেত নির্মম নির্যাতন। কোনো কারণ ছাড়াই জ্যাঠিমশাইরা কখনো তার মাথার চুলের মুঠি টেনে ধরতেন, কখনো বা কান মুলে দিতেন যন্ত্রণা। শিশুর গলায় চিৎকার ফেটে পড়লে, পূর্বা দেবী সব কাজ ফেলে ছুটে যেতেন ছেলেটার কাছে। হারা কাঁদতে কাঁদতে হাত তুলে দেখিয়ে দিত কারা তাকে কষ্ট দিয়েছে।

পূর্বা দেবী সব বুঝতেন, তবুও মুখে কিছু বলতে পারতেন না। সংসারে তার অবস্থান ছিল অনেকটাই নীরব এক সযত্নে চেপে রাখা বেদনার সমুদ্র, যার ঢেউ শুধু তার চোখের কোণেই জানিয়ে দিত ক্ষত-বিক্ষত হাহাকার।

এই প্রতিনিয়ত অবহেলা, অভাব আর কষ্টের মধ্যে দিয়েই হারা একটু একটু করে বড় হতে থাকে। সাধন বাবু দিনমজুরের কাজ করতেন। যেদিন কাজ জুটতো, সেদিন চুলায় কিছুটা ভাতের আশা থাকত। যেদিন কাজ না থাকতো, সেদিন শুধু হতাশা আর অভাবের অন্ধকার ঘিরে ধরত গোটা সংসারকে।

এই সময়ে, পূর্বা দেবী ও সাধন বাবুর ঘরে আরেকটি সন্তান জন্ম নেয় একটি পুত্র সন্তান । ঘর আলো করে আসে একটুখানি আশার আলো। পরিবারে যেন খুশির হালকা হাওয়া বয়ে যায়, কিন্তু মানুষের অবহেলা যে সেখানে হিংস্র হয়ে ঘাপটি মেরে বসে ছিল! হারা-র প্রতি সেই অবজ্ঞা যেন আরও বাড়তে থাকে, সে হয়ে ওঠে তুলনাহীন একলাথা কষ্টের প্রতীক।

একদিন, আকাশ ছিল ঘন বর্ষায় কালো। বাইরে অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে। সেই দিনটাতে সাধন বাবুর হাতে কোনো কাজ ছিল না। বাড়ির চালচুলো প্রায় শেষ, পাতিলের তলায় কেবল কিছুটা চাল। পূর্বা দেবী বাপের বাড়ি থেকে নিয়ে আসা কিছু শুকনো চালের কোনা সেদ্ধ করে কোনো রকমে ছেলেদের মুখে একমুঠো ভাত তুলে দিতে পারেন। সেই সামান্য সেদ্ধই ছিল রোজ সকালের টিফিন।

আহা রে !

ছোট ছোট দুটি শিশু তাদের না পাওয়ার ইতিহাস যেন আকাশের মতই দীর্ঘ। কতদিন ধরে যে একমুঠো মুড়ি খেতে পায়নি তারা! পাশের বাড়ির ছেলে-মেয়েরা যখন স্কুল থেকে ফিরত মুড়ির ঠোঙা হাতে, তখন হারা আর তার ভাই চুপচাপ তাকিয়ে থাকত তাদের দিকে চোখে একরাশ অব্যক্ত চাহনি।

তারা যখন মুড়ি খেতে খেতে হাসত, ছুটত, নিচে যে ক’টা মুড়ি পড়ে যেত, সেটাই কুড়িয়ে নিয়ে খেতে গিয়ে ভাইদুটো যেন একটু স্বাদ খুঁজে নিত ।

এই দৃশ্য দেখে পূর্বা দেবী লুকিয়ে চোখ মুছতেন। কষ্ট চাপা দিয়ে ভেতরে ভেতরে পুড়ে যেতেন তিনি। সন্তানদের না-পাওয়া, স্বামীকে ঘিরে সমাজের অবিচার আর নিজের মৌন প্রতিবাদের দহন মিলেমিশে পূর্বা দেবী হয়ে উঠেছিলেন এক নীরব যোদ্ধা।

এই ছিল হারা-র শৈশব

এক বুক বঞ্চনা, একটি চোখভরা জল, আর অদম্যভাবে বেঁচে থাকার এক সাহসী সংগ্রাম।

সেদিন রমেনের বয়স মাত্র পাঁচ। ধুলো-মাখা শৈশব আর অনটনের ঘন ছায়া সঙ্গী করে যখন প্রথমবার গ্রামের ছোট্ট প্রাইমারি স্কুলের চৌকাঠ পেরোল সে, তখন তার বাবা সাধন বাবু, পাঁচ টাকার কষ্টসাধ্য জোগাড়ে বুক ভরে স্বপ্ন দেখেছিলেন। সে ছিল এক অসাধারণ দিন , যেদিন এক দরিদ্র পিতার চোখে নিজের সন্তানের জন্য শিক্ষার আলো প্রথম ঝলমল করেছিল।

রমেনের জীবনের প্রথম শিক্ষালয়টিতে তার পরিচয় হয়েছিল দু’জন মানুষের সঙ্গে , নতুন মাস্টার সৈয়দুল বাবু, আর আরেকজন, সকলের চিরপরিচিত পুরাতন দিদিমণি, পুষ্পা সামন্ত। হয়তো এই দুই শিক্ষকের স্নেহময় হাতেই লুকিয়ে ছিল রমেনের মানুষ হয়ে ওঠার গোপন চাবিকাঠি।

গ্রীষ্মের তাপদাহে স্কুলের সময় পরিবর্তিত হলো সকালবেলা পড়াশোনা। কিন্তু ভোরে না খেয়ে ছোট্ট ছেলে কি স্কুলে টিকে থাকতে পারবে! মা পূর্বাদেবীর চোখে নেমে এলো চিন্তার ছায়া। দুপুরবেলা হলে অন্তত দশটার সময় খানিকটা খুদের ভাত ফুটিয়ে দিতে পারতেন তিনি। কিন্তু এই অভাবের সংসারে রুটি, কেক, কিংবা অন্য কোনো টিফিনের বিলাসিতা তো কল্পনার অতীত।

সন্তানের অনাহার কেবল মায়ের বুকেই নয়, বাবার বুকেও একরাশ কষ্ট হয়ে বাজে। সাধন বাবু স্থির করলেন যেভাবেই হোক, প্রতিদিনের জন্য একটু করে মুড়ি জোগাড় করবেন রমেনের টিফিনের বাক্সে দেওয়ার জন্য। তিনি যাঁদের জমিতে দিনমজুরির কাজ করতেন, তাঁরা সকালের খাবার হিসেবে কিছু শুকনো মুড়ি দিতেন। সেই সামান্য মুড়িই তিনি নিজে না খেয়ে সন্তানের মুখে তুলে দিতে ঘরে ফিরতেন হাঁপানো বুক আর মনের গভীরে একটাই তৃপ্তি, *"ছেলেটা একটু খাবে।"*

এইভাবে সময় গড়ায়…

রমেন আর তার ভাই ধুলোমাখা মাঠে, চঞ্চল বিকেলে আর নিরুপায় রাতের মাঝে ধীরে ধীরে বড়ো হতে থাকে। দারিদ্র্য ছিল তাদের চিরসঙ্গী, কিন্তু সেই অভাবের মধ্যেই ছড়িয়ে ছিল অপার ভালোবাসা, আত্মত্যাগ, আর এক অলিখিত প্রতিশ্রুতি , এই সন্তান একদিন মানুষ হবে, সেই মানুষ হয়ে ফিরিয়ে দেবে হাজারো অপূর্ণতার প্রতিদান।

রমেন এখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নিয়মিত ছাত্র। লেখাপড়ার প্রতি তার আগ্রহ ঈর্ষণীয়, আচরণে নম্রতা, ব্যবহারে ভদ্রতা , সব মিলিয়ে একজন আদর্শ শিক্ষার্থী। স্কুলে তার কয়েকজন সঙ্গী-সাথীও হয়েছে। তবুও, লেখাপড়ার ফাঁকে যখন তার ছোট্ট মনটাও চায় মাঠে ছুটে যেতে, খেলতে, হাসতে, তখন একরাশ চিন্তার ছায়া নামে পূর্বাদেবীর চোখে।

রমেনের শরীরটা বরাবরই দুর্বল, হাড় জির জিরে শরীর । যদি খেলতে গিয়ে কোথাও ব্যথা পায়, যদি অসুস্থ হয়ে পড়ে , এই আশঙ্কায় মা তাকে খেলাধুলায় সায় দেন না। তাই স্কুল ছুটির সঙ্গে সঙ্গেই তাকে সোজা বাড়ি ফিরতে হতো।

এদিকে তার ছোট ভাই একটু একটু করে বড় হয়ে উঠছে। ভাইয়ের দিন কাটে খেলাধুলা আর মায়ের কোলে ঘুম দিয়ে। রমেন ওই ছোট ছোট হাতেই শিখে নিয়েছে বাড়ি ঝাঁট দেওয়া, প্রদীপে তেল ঢালা, ঘরের কোণে মাটি লেপা , আরও কত কিছু। সংসারে অভাবের গা-সওয়া ছায়া থাকলেও, ভাইয়ে-ভাইয়ে বন্ধনের উষ্ণতা তাদের একত্র বেঁধে রেখেছিল।

দারিদ্র্যের জাল ভেদ করে সংসারটাকে একটু সোজা পথে ফেরাতে এবার পূর্বা দেবী নিজেই সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি ও ঠিকে মজুরির কাজ করবেন সাধন বাবুর সঙ্গে। সাধন বাবু এই সিদ্ধান্তে কষ্ট পেলেও কিছু বললেন না; দরিদ্র মানুষের যন্ত্রণা যে চুপ করেই গিলে নিতে হয়।

তাই বাড়ির সব দায়িত্ব এসে পড়ল ছোট্ট রমেনের ঘাড়ে। হাড়ি-বাসন মাজা, জল ভরা, সন্ধ্যাবেলায় প্রদীপে তেল ঢেলে আলো জ্বালানো আর ভাইয়ের যত্ন, তার পড়াশোনা সবটা তেই রমেন জায়গা করে নিল। পাড়ার বাচ্চারা যখন বিকেলে মাঠে ছুটে যায়, তখন রমেন ব্যস্ত থাকে জল কনকনে হাতে হাঁড়ি বাসন মাজতে, অথবা বাড়ির সব কাজ করতে ।

রমেনের ছোটবেলায় একটিই আশ্রয় ছিল, যেটুকু শান্তির নিঃশ্বাস সে টানতে পারত তার মামাবাড়ি। দিদার কাছে, মামার দাওয়ায় বসে গল্প শোনা ছিল তার চোখের মণির মতো প্রিয়। একবার বাবা-মায়ের সঙ্গে সাইকেলে বসে রমেন কয়েকদিনের জন্য গেল মামাবাড়ি। দিদিমার শীতল হাতের স্পর্শে মনের ভেতর জমে থাকা ক্লান্তি কেটে গেল তার।

পরদিন সাধন বাবু একা ফিরে এলেন বাড়ি, কিন্তু পূর্বা দেবী রয়ে গেলেন মায়ের অসুস্থতার কারণে। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন কিছুদিন মায়ের পাশে থাকবেন। এর মধ্যেই কয়েকদিন যেতে না যেতেই, রমেনের স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। ছেলের পড়াশোনার দিকে নজর রাখতে, এবং সংসার সামলাতে, পূর্বা দেবী ফেরার সিদ্ধান্ত নিলেন।

কিন্তু রমেন যেতে চাইল না। সে কেঁদে বলল, *"আর দুটো দিন থাকি না মা, !"*

তবুও মা তাকে টেনে তুললেন, আর ফেরার বাসে চেপে রওনা হলেন। রমেনের চোখে তখন অশ্রুর ধারা, মন ভারে ঠাসা , এ যে বিদায় নয়, যেনো এক অজানা শূন্যতার সংকেত।

বাড়ি ফিরলেও তার মন পড়ে থাকল দিদার কাছে। অগোচরে সে হয়তো অনুভব করেছিল কিছু , যা ভাষায় বলা যায় না। ঠিক দুই দিন পর সেই আশঙ্কাই বাস্তব রূপ নিল।

এক রাতে হঠাৎই খবর এলো পূর্বা দেবীর মা প্রচণ্ড পেটের যন্ত্রণায় ছটফট করছেন। আশপাশের এক হাঁটু কাদা ভেঙে, খাটে করে গ্রামীণ হাসপাতালে নেওয়ার পথেই তিনি হার্ট ফেল করে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন।

এই খবরে যেনো আকাশ ভেঙে পড়ল পূর্বা দেবীর মাথায়। রমেনকে বুকে জড়িয়ে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়লেন,

*"বাছা আমার, তুই কি আগেই বুঝতে পেরেছিলি রে? তাই কি আসতে চাইছিলি না বাবা ! "*

একটা বড় আশ্রয়… যেন হঠাৎই এক দমকা হাওয়ায় উড়ে গেল।

রমেনের শৈশবের সেই মায়াময় ছায়াটুকু এক ঝটকায় হারিয়ে গেল, রেখে গেল বুকভরা শূন্যতা, আর এক গভীর, অবর্ণনীয় অভিমান।

ক্রমশ..............