শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব
অভিজিৎ মুখোপাধ্যায়,
নতুন দিল্লি
শীতের মরশুমে অর্থাৎ ইংরেজি জানুয়ারী মাসের শেষ সপ্তাহে প্রতি বছর পালিত
হয় শহর কলকাতায় বই মেলে উৎসব । যেন অনেকটা সার্বজনীন শারদীয়া দূর্গা
পুজোর আদলে গড়া এই বই মেলা উৎসব । সেই একই রকম হৈ-হৈ, রৈ-রৈ উত্তেজনা ।
চোখে না দেখলে বিশ্বাস করার উপায় নেই । এ এক এমনই অত্যাশ্চর্য উৎসব !
কলকাতাবাসী বাঙালিদের বেশির ভাগ মানুষই পুস্তক প্রেমী, সেই বিষয়ে কোন
সন্দেহ নেই । কিন্তু তবু কিছু সংখ্যক মানুষ এমনও আছেন যারা বইয়ের মূল্য
বোঝেন না । তাঁদের বিচারে বই পড়ার অর্থ বৃথা কালক্ষেপ আর বই কেনার অর্থ
অর্থের অপচয় । কালের অমোঘ নিয়মে পৃথিবীর সর্বক্ষত্রে পরস্পর বিরোধী দুটো
বিপরীত ধর্মী ক্রিয়ার প্রভাব দেখতে পাওয়া যায় । যদিও এতে অস্বাভাবিক কিছু
নেই । খুবই যুক্তিসঙ্গত । সমাজে দুই ধরণের মানুষের উপস্থিতি একান্ত ভাবে
বিশেষ প্রয়োজন, তা নাহলে ভালো-মন্দ বিচার হবে কি ভাবে ? অন্ধকার আছে বলেই
আলো আমাদের কাছে এত প্রিয় । অসামঞ্জস্যতা আছে বলেই পৃথিবীর সামঞ্জস্যতা
এখনও বজায় আছে । তা নাহলে যে পৃথিবী জুড়ে মহাপ্রলয় শুরু হয়ে যাবে ! যদিও
পুস্তক বিদ্বেষীদের নিয়ে আলোচনা করার ধৃষ্টতা এবং আগ্রহ আমার কোনটাই নেই
।
এবার আসল কথায় আসা যাক । শিক্ষা দুই প্রকার । এক ধরণের মানুষ আছেন যাদের
জানবার ইচ্ছে থাকে প্রবল । সে শুধু জ্ঞান আহরণের জন্যেই তাঁরা বই পড়েন ।
বইয়ের মাধ্যমেই সে পৃথিবীর রহস্য উন্মোচন করার চেষ্টা করেন । বই তাঁর সুখ
দুঃখের একমাত্র সাথী হয়ে ওঠে । বইয়ের মাধ্যমেই বিকশিত হয়ে ওঠে তাঁর মানস
জগৎ । তাঁর চরিত্র গঠনেও সহায়ক হয়ে ওঠে বই । বই মানুষকে চিন্তাশীল হতে
এবং কাল্পনিক জগতে বিচরণ করতেও সাহায্য করে । অথচ আশ্চর্যের বিষয় এই, যে
শ্রীরামকৃষ্ণের উপমা অনুযায়ী ‘চাল-কলা বাঁধা বিদ্যে’ ব্যতীত বাদ বাকি
সকলকেই তাঁদের স্বীকৃত ছাড়পত্রের অভাবে আমরা অশিক্ষিত বলে উপহাস করি ।
বলতে বাঁধা নেই যে, বাংলার বহু প্রাতস্মরণীয় মহাপুরুষদের শৈশব অতিবাহিত
হয়েছে আমাদের বিচারে সেই তথাকথিত অশিক্ষিত দাদু-ঠাকুমা, দাদু-দিদিমা,
মা-বাবার ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে । অথচ এঁদেরই সহায়তায় একদিন বাংলার
মহাপুরুষদের ভবিষ্যৎ জীবন গড়ে উঠেছিল খুবই অনাড়ম্বর জীবনযাত্রার মাধ্যমে
। মাইকেল মধুসূদন দত্তের কবি হয়ে ওঠার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান ছিল তাঁর
জননী জহ্নবী দেবীর । জীবনানন্দ দাশের কবিত্ব স্ফূরণের নপথ্যে যার প্রভাব
এবং অবদান অনস্বীকার্য তিনি ছিলেন তাঁর মা কুসুমকুমারী দেবী । কথাশিল্পী
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের যুগান্তকারী সাহিত্যিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভের
পেছনে যার অবদান অনস্বীকার্য তিনি ছিলেন তাঁর পিতৃদেব মতিলাল
চট্টোপাধ্যায় । এরকম উদাহরণ আরো অনেক আছে । এতৎদ্দারা একটা কথা স্পষ্ট
প্রমাণিত, আগের দিনে যে শিশুরা দাদু-ঠাকুমা বা দাদু-দিদিমার শাসনে যৌথ
পরিবারের মধ্যে বেড়ে উঠেছিলেন তাঁরা সকলেই বিদ্যা, বুদ্ধি, জ্ঞান,
হৃদয়বত্তায়, মস্তিস্কের উৎকর্ষতায়, ত্যাগে অবিস্মরণীয় ও অতুলনীয়
ব্যক্তিত্বের অধিকারী হয়েছিলেন । এটা সম্ভব হয়েছিল শুধুমাত্র আমাদের
বিচারে যাঁরা অশিক্ষিত নামে চিহ্নিত সেই সব মানুষদের সান্নিধ্যে বড় হয়ে
ওঠার কারণে । তাঁরাই ছিলেন প্রকৃত মানুষ গড়ার আসল কারিগর ।
তাঁদের অনেকেরই এখনকার শিক্ষিত মানুষদের মতো স্কুল, কলেজ বা ইউনিভার্সিটি
প্রদত্ত মানপত্র ছিল না । ছিল নিজের চেষ্টায় বড় হয়ে ওঠার প্রবল তাড়না ।
অর্থাৎ ‘মানুষ হইতে হবে এই যার পণ’। রাজা রামমোহনের সময় কোন কলেজ বা
ইউনিভার্সিটি ছিল না তবু সেকালের দিনে তাঁর সমকক্ষ শিক্ষিত ব্যক্তি
দ্বিতীয় আর একজনও ছিলেন না । বইয়ের মাধ্যমেই তিনি নিজেকে যুগোপযোগী
শিক্ষিত করে তুলেছিলেন । বহু শাস্ত্র ও ধর্মগ্রন্থ পাঠ করার পর
ন্যায়-অন্যায় ব্যাপারে যে সিদ্ধান্ত তিনি নিয়েছিলেন সেই ধারালো অস্ত্রের
সাহায্যেই সম্ভব হয়েছিল তখনকার বহুল প্রচলিত কুসংস্কারের বিরুদ্ধাচারণ
করার । বিদ্যাবত্তার গুণেই সেই যুগের প্রচলিত সতীদাহ প্রথা তিনি বন্ধ
করতে পেরেছিলেন । প্রথম ভারতীয় হিসেবে ইংল্যান্ড যাওয়ার শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন
করা শুধু নয়, সেকালের দিনের প্রথম ভারতীয় যিনি ফরাসী বিপ্লবের পূর্ণ
সমর্থকও ছিলেন । তাঁর সমকক্ষ জ্ঞানী তৎকালীন ভারতবর্ষে দ্বিতীয় আর একজনও
ছিল না । ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ক্ষেত্রেও সেই একই যুক্তি প্রযোজ্য ।
লেখাপড়ার সাহায্যেই তিনি বিধবা বিবাহ প্রবর্তন করেছিলেন । অক্ষয়কুমার
দত্ত বাংলার এই মনীষী যিনি পিতার মৃত্যুর কারণে নিয়মিত স্কুলে গিয়ে
লেখাপড়া করতে না পারলেও নিজের গরজে শোভাবাজার রাজবাড়ির লাইব্রেরিতে গিয়ে
ক্যালকুলাস, জ্যামিতি, পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন বিজ্ঞান, ভূগোল, গণিত ও
জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করেছিলেন । তৎকালীন হিন্দু কলেজের
কৃতি ছাত্ররা পর্যন্ত তাঁকে সমীহ করতেন । শুধু বই পড়েই তিনি নিজেকে
যুগোপযোগী করে তুলেছিলেন । ইংল্যান্ডবাসী প্রখ্যাত বিজ্ঞানী মাইকেল
ফ্যারাডে এক বইয়ের দোকানে বই বাঁধাইয়ের কাজ করতেন । তিনি সেই সব বইগুলি
পড়তেন । বই পড়ে পড়েই বিশ্বমাঝে তিনি নিজেকে মাইকেল ফ্যারাডে হিসেবে
প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন । হয়তো অনেকেই শুনে থাকবেন বিগত কয়েক বছর আগে
মুম্বাইয়ের এক অটো চালকের ছেলে-মেয়ে দু’জনেই সর্বভারতীয় সি. এ. পরীক্ষায়
উত্তীর্ন হয়েছিল । মেয়েটি প্রথম স্থান অধিকার করেছিল । বলাবাহুল্য বই
শুধু চিত্ত বিনোদনের উপকরণ নয়, বই মানুষ তৈরী করার সামগ্রী । বইয়ের
অবমাননা করার অর্থ মনুষ্যত্বের অবমাননা । আজ পর্যন্ত পৃথিবীর যাবতীয়
উণ্ণতির ক্ষেত্রে বইয়ের অবদান অনস্বীকার্য । মানুষের একমাত্র পরিচয়
জ্ঞানে । কথায় আছে ‘রাজাপূজ্যতে রাজ্যে বিদ্যান পূজ্যতে সর্বত্র’ । এই
কারনেই অষ্টম শতাব্দীর আচার্য শঙ্কর এখনো আমাদের স্মরণে মননে অমর হয়ে
আছেন । জ্ঞানের দ্বারাই তৈরী হয় অধীত সংস্কার । মৃত্যুর পরে এই অধীত
সংস্কারটাই তার সহচরী হয় । পূর্বজন্মের অধীত মূলধন পরজন্মে অলঙ্কার
স্বরূপ আবার ফিরে আসে মানুষের সাথে । এইজন্যেই কথায় বলে – পন্ডিতের ঘরে
পন্ডিতের জন্ম হয় । স্বামী বিবেকানন্দও বলেছিলেন – “শিক্ষা হচ্ছে মানুষের
ভিতরে যে পূর্ণতা প্রথম থেকেই বিদ্যমান তারই প্রকাশ” ।
প্রাচীন যুগে যখন ছাপাখানা আবিস্কৃত হয়নি তখনো বহু মানুষ অধ্যায়ন ও
অধ্যাপনা করতেন । সেটা সম্ভব হয়েছিল শ্রুতি ও স্মৃতির মাধ্যমে । এই ভাবেই
সময়ের বিবর্তনের ফলে সৃষ্টি হয়েছিল চতুর্বেদ । ‘তমসো মা জ্যোতির্গময়’ ।
জ্ঞান মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে যায় । বইয়ের নেশা আর যাই হোক
সর্বনাশা মোটেই নয় । ঘরে যদি একটিও জানালা না থাকে ঘরটি অন্ধকার ও
অস্বাস্থ্যকর হওয়াই স্বাভাবিক । ঠিক সেই রকম শিক্ষার অভাবে মনুষ্যত্বের
বিকাশ হওয়াও অসম্ভব ।
পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম যে বইটি মানুষের হস্তগত হয়েছিল তার নাম ‘হীরক
সূত্র’ । ৮৬৮ খ্রিষ্টাব্দের পূর্বে বইটি চীনে আত্মপ্রকাশ করেছিল ।
মুদ্রিত হয়েছিল প্রাচীন মুদ্রন প্রথা অনুযায়ী অর্থাৎ কাঠের টুকরোর উপরে
ছবি আর অক্ষর খোদাই করে । তারপর মানুষের অক্লান্ত চেষ্টায় মানব সভ্যতার
বহু শতাব্দীর পরে ১৪৫৬ সালে ইয়োহানিস গুটেনবার্গ (Johannes Gutenberg)
জার্মানির মেনজ শহরে আধুনিক পদ্ধতিতে প্রথম হরফ অক্ষরে ছেপেছিলেন বাইবেল
। সেই থেকে বই নির্ভরশীল জগতের সূচনা । শিক্ষিত মানুষদের অপরিহার্য বস্তু
হিসেবে বই স্বীকৃতিলাভ করতে পেরেছিল । বইপ্রেমী মানুষদের কাছে বইয়ের
মূল্য যে কতখানি তা ভাষায় বর্ণনা করার উর্দ্ধে । পৃথিবীর যাবতীয় জ্ঞান
নিহিত থাকে বইয়ের মধ্যে । নিরলস পরিশ্রমের দ্বারা পিঁপড়ের মতো সংগ্রহ
করতে হয় সেই জ্ঞান ।
(২)
দ্বিতীয় শ্রেণীর মানুষ যারা তাঁদের কাছে বইয়ের মূল্য শুধু ‘চাল-কলা বাঁধা
বিদ্যা’টুকু আয়ত্তগত করা পর্যন্ত । তাঁরা কূয়োর ব্যাঙ হয়ে থাকতেই বেশি
পছন্দ করেন । তাঁরা বই পড়াকে বৃথা কালক্ষেপ মনে করেন । সেই কারণে তাঁরা
বইয়ের তুলনায় আধুনিক প্রযুক্তি বিদ্যার আশীর্বাদ গুণে প্রাপ্ত টেলিভিশন,
মোবাইল ইত্যাদির ক্রীতদাস হয়ে পড়েছেন । কারণ মস্তিস্ক কখনোই অলস হয়ে
থাকতে নারাজ । তারও খোরাক চাই । তাঁরা সেই খোরাকের জোগান দেন এইসব
উপকরণের সাহায্যে । তাতে মানুষের সহজাত কল্পনা শক্তির অকাল মৃত্যু ঘটে ।
এই সহজ কথাটা তাঁরা বুঝতে পারেন না । সত্যি বলতে কি তাঁরা বোঝার
বিন্দুমাত্র চেষ্টাও করেন না । কারণ বুদ্ধিভ্রষ্ট মানুষ কখনোই নিজের ভুল
বুঝতে চান না । যেমনটি লঙ্কাপতি রাবণের দশা হয়েছিল । এটা তাঁদের ভ্রম
ছাড়া আর কিছু নয় । পুঁথিগত বিদ্যার বাইরেও যে অনাবিস্কৃত একটি জগৎ
বিদ্যমান এই ধারণা তাঁদের নেই । বই তাঁদের কাছে ‘বাঁদরের গলায় মুক্তোর
মালা’ সাদৃশ্য । সাধারণতঃ বাবা-মা’য়ের মনোবৃত্তির উপর নির্ভর করে পরবর্তী
প্রজন্মের আচরণ ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট, তা স্বত্ত্বেও মা-বাপেরা প্রত্যাশা
করেন তাঁদের ভবিষ্যত প্রজন্মের সফল জীবন । সর্বগুণ সম্পন্ন সন্তান কামনায়
অস্থির চঞ্চল হয়ে থাকে তাঁদের অন্তঃকরণ । কিন্তু তা কখনোই সম্ভবপর নয় ।
মানুষের জীবনে যা কিছু ঘটে তা সবই পূর্ব নির্ধারিত । সবই সৃষ্টির অধীনে
সনাতন নিয়মানুসারে পরিচালিত । তাই মরুভূমিতে কাঁটাগাছই জন্মায় গোলাপ গাছ
নয় ।
আত্মোন্নতির চেষ্টা ছাড়া কখনোই উজ্জল ভবিষ্যত গড়ে তোলা যায় না । জ্ঞান
আহরণ করার অভ্যেস তৈরী করতে হয় ছোটবেলা থেকে । অনেকটা ধ্যানের মতো অভ্যেস
সাপেক্ষ ব্যাপার । স্বামী বিবেকানন্দ নিঃসন্দেহে বাঙালির গর্ব । কিন্তু
কেন ? কারণ তিনি আমাদের মতো রক্ত-মাংসে সৃষ্ট শুধু মানুষ নন
জ্ঞানীশ্রেষ্ঠ পুরুষ ছিলেন । হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রাইট
সাহেব আমেরিকায় অনুষ্ঠিত বিশ্ব ধর্ম মহাসভায় অংশগহণ করার ব্যাপারে আমাদের
স্বামীজিকে পরিচয় পত্র প্রদান করার সময় কথা প্রসঙ্গে বলেছিলেন – এ
মানুষটির মাঝে যে বিদ্যা দেখেছি, আমাদের দেশের (আমেরিকার) সকল পন্ডিতদের
একত্র করলেও তাঁর সমান হবে না ।
সেই অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে আজ পর্যন্ত যে বাঙালি মনীষীরা আমাদের স্মৃতিতে
এখনো অমর হয়ে আছেন তাঁরা সকলেই ছিলেন বিদ্যান । বিদ্যা ব্যতীত কোন কাজেই
সফলতা অসম্ভব । পরাবিদ্যা বা অপরাবিদ্যার বেলাতেও সেই একই কথা । প্রকৃত
মানুষ হতে গেলে বিদ্যাকে অন্ধের যষ্ঠি মনে করে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া দ্বিতীয়
কোন বিকল্প নেই । যেমন বাড়িতে পুজো, শ্রাদ্ধ, পৈতে বা বিবাহ করানোর সময়ও
তাঁরা ভালো এবং শিক্ষিত পুরোহিতের খোঁজ করেন । আবার শারীরিক অসুস্থাতা
এবং সামাজিক ন্যায় বিচারের সময় তাঁদের লক্ষ্য থাকে যথাক্রমে অভিজ্ঞ
ডাক্তার এবং উকিলের প্রতি । অবচেতন মনে তাঁরা বিদ্যাকেই কিন্তু
অগ্রাধীকার দিয়ে থাকেন যদিও নিজের জীবনে প্রয়োগ করার বেলায় তাঁদের
প্রচন্ড অনীহা । এই ধরণের মানুষদেরই বলতে হয় আত্মঘাতী ।
কোন এক সুদূর অতীত কালে সংগৃহীত মানপত্রের জোরে কিছু মানুষ সমাজে নিজেদের
নিঃসন্দেহে শিক্ষিত বলে দাবি করেন । অথচ আশ্চর্যের বিষয় তাঁদেরই
ছেলে-মেয়েরা শিক্ষাপ্রাপ্তির উদ্দেশ্যে বাধ্যতা মূলক যায় অন্যত্র জ্ঞান
আহরণের উদেশ্যে । এই বিষয় তাঁদের প্রশ্ন করলে নিজের সপক্ষে তাঁরা কী
অজুহাত দেয় জানেন ? সেই কবে লেখাপড়া করেছি এতদিন পরে কী তা মনে থাকে?
বলাবাহুল্য সেই শিক্ষার মূল্যই বা কী যা কারো উপকারে না লাগে? এর একটাই
অর্থ তাঁরা কোনদিন নিজের গরজে শেখার জন্যে বিদ্যাশিক্ষা করেননি, সেই
শিক্ষা ছিল বাধ্যতামূলক অর্থাৎ দায় পড়ে শিখতে হবে বলে শিখেছিলেন । তাই এই
নির্মম পরিণতি তাঁদের জীবনে । সমাজের প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিরা
যদি বলে ওঠেন – ‘সেই কবে লেখাপড়া করেছি এতদিন পরে কী তা মনে থাকে’ ?
তাহলে দুনিয়াটা অশিক্ষায় ভরে যেত যে ! কিন্তু তা হওয়ার নয় । সৃষ্টির একটা
নিজস্ব নিয়ম আছে । ‘নদীর একূল ভাঙ্গে তো ওকূল গড়ে’ । কিছু মানুষ
আমৃত্যুকাল পর্যন্ত মা সরস্বতীর আরাধণা করে যান । তাই ছাত্রাবস্থায় তাঁরা
যা শিখেছিলেন ভবিষ্যত জীবনেও সেই অধীত বিদ্যার অনুশীলন করেন । অন্যদিকে
কিছু মানুষ আছেন যারা মিথ্যে আস্ফালনের দ্বারা নিজেদের শিক্ষিত বলে
প্রচার করেন । শুনলে সেই আপ্ত বাক্যটির কথা মনে পড়ে যায় - ‘গর্ভশূণ্য
পাত্রের গম্ভীর নিনাদ’ । তাঁদের অনুশীলনের প্রতি থাকে ঘোর অরুচি ।
বিদ্যার অভাবে মানুষের জীবন হতাশায় ভরে ওঠে । জীবন রসশূণ্য বলে মনে হয় ।
একাকীত্বের দংশনে আক্রান্ত মানুষ প্রতি নিয়ত নিজেকে অসহায় এবং নিঃসঙ্গ
বোধ করে ।
বলাবাহুল্য উভয় শ্রেণীর মানুষদের পক্ষেই বই একান্ত প্রয়োজনীয় বস্তু বিশেষ
। প্রতিটি মানুষের ক্ষণস্থায়ী জীবনে বইয়ের অবদান অনস্বীকার্য । একমাত্র
কিছু সাহিত্যমনস্ক বাঙালিদের বাড়িতেই এখনো বই দিয়ে আলমারি সাজানোর
প্রবনতা দেখা যায় ।