শিশু বোধ
শ্রীমতী মনিকা পুরকাইত,
পোর্ট ব্লেয়ার, আন্দামান
আমার সাড়ে তিন বছরের ছোট্ট নাতি অভিজ্ঞান। বয়সে ছোট্ট হলে কি হবে? ওর
জ্ঞান বুদ্ধি কিন্তু অনেক বেশি। মাঝে মাঝে আমি নিজেই অবাক হয়ে যাই ওর
বিভিন্ন রকম কার্যকলাপ দেখে।
এইটুকু বয়সে ওর মনে হাজার প্রশ্ন। এটা কেন, ওটা কেন, এটা কিভাবে হয়,
ওটা কিভাবে হয়?
সারাদিনে ওর দাদুকে আর আমাকে প্রশ্নে প্রশ্নে জর্জরিত করে রেখে দেয়।
একদিন হয়েছে কি- মশা মারার ইলেকট্রিক ব্যাট দিয়ে মশা মেরে ওর দাদু ঘর
থেকে বাইরে গেছে কোন কাজে। হঠাৎ অভিজ্ঞানের চেঁচামেচিতে ওর দাদু বাইরে
থেকে ভেতরে আসে আর এসে দেখে কি সেই মৃত মশাদের শরীর কিছু পিঁপড়ে বয়ে
নিয়ে যাচ্ছে। তাই দেখে অভিজ্ঞান বলে ওঠে
-"দাদু দাদু দেখো তোমার মারা মশাগুলো আবার জ্যান্ত হয়ে গেছে"!
শুনে ওর দাদু হেসে জবাব দেয়-" না দাদুভাই, মশাগুলো জ্যান্ত হয়ে যায়নি।
- কিন্তু আমি তো দেখতে পাচ্ছি মশাগুলো চলে চলে এগিয়ে যাচ্ছে।
-দেখছো না পিঁপড়েরা মশাদের বয়ে নিয়ে যাচ্ছে?
-কেন নিয়ে যাচ্ছে দাদু?
-মশাদের মৃত শরীরগুলো পিঁপড়েগুলো খাবে, সেই জন্য পিঁপড়েরা ওদের বাসায়
নিয়ে যাচ্ছে।
- ও তাহলে মরা মশাগুলো পিঁপড়েদের খাবার তাই না দাদু?
এর দু তিন দিন পর একদিন হঠাৎ আমি শুনছি অভিজ্ঞান দরজার পাশে এক কোনায়
বসে কিছু একটা বলছে। আমি কাছে গিয়ে শুনে যার পর নাই অবাক হয়ে গেলাম।
আমি ওকে বাংলা ছড়া শিখিয়েছি- "সিংহ মশাই সিংহ মশাই মাংস যদি চাও"
...............
সেই ছড়াটার অনুকরণ করে কিছু বলছে আর মনোযোগ সহকারে কিছু একটা করছে।
কিন্তু কি বলছে আর কি করছে সেটা দেখার জন্য আমি কিছুক্ষন অপেক্ষা করলাম ও
ভালো করে লক্ষ্য করে দেখলাম। ও কোথা থেকে একটা মরা মশা নিয়ে গিয়ে দরজার
কোনায় যেখানে আগের দিন পিঁপড়ে গুলোকে মশা নিয়ে যেতে দেখেছিল আর ওর
দাদু বলেছিল ওখানেই পিঁপড়েদের গর্ত আছে সেখানে রেখে দিয়ে আপন মনে বলছে
-"পিঁপড়ে মশাই পিঁপড়ে মশাই
মশা খেতে চাও?
আরো অনেক মশা আছে
সবাই মিলে খাও "।-
আমি ওর আনমনে বলা ছড়াটা শুনে আমার বড় মেয়েকে ফোন করে সবটা জানিয়ে
হাসতে হাসতে বললাম
- অভিজ্ঞানও ওর মাসীমণিদের গুণ পেয়েছে, এখন থেকেই মুখে মুখে ছড়া কাটতে
শিখেছে, স্বভাব কবি একেবারে, হাহাহাহাহা।
আমার বড় মেয়ে আমাকে বললো
-রক্তে থাকলে কখনো না কখনো পরিস্ফুটো হবে। কিন্তু মা একটা জিনিস লক্ষ্য
করেছো! তুমি যে ছড়া শিখিয়েছো তাতে কিন্তু 'সবাই মিলে খাও' কথাটা নেই,
'সবাই মিলে খাও'- এই কথাটা ও কোথা থেকে পেল মা!
আমি বললাম -আরে ঠিক তো, আমি তো ওকে যে ছড়া শিখিয়েছি তাতে তো সবাই মিলে
খাওয়ার কথাটা নেই, তবে!
পরে অভিজ্ঞানের দাদুই আমাকে বলল
- কেন ছোট (আমি বাড়ির ছোটবৌ বলে বাড়ির আর সকলের মতই উনিও আমাকে এই
নামেই সম্বোধন করেন) তুমি লক্ষ করোনি কখনো, এইটুকু বাচ্চা সবার সাথে সব
কিছু শেয়ার করতে জানে, ভাগ করে নিতে জানে, সেই এক দেড় বছর বয়স থেকেই।
তাইতো ওর মনে হয়েছে পিঁপড়েরা ও সবাই মিলে মশাদের মৃত শরীর গুলিকে ভাগ
করে খাক।।