স্পর্শকাতর
ঝুম্পা মন্ডল,
ডায়মন্ড হারবার
একটু রাতের দিকে, সবাই যখন নিচে ব্যস্ত তখন আমি আসতে আসতে ছাদের লোহার
বাঁকানো সিঁড়ি দিয়ে ছোট ছাদে উঠলাম, হুহু করে হাওয়া বইছে। আমার বরাবর খুব
ইচ্ছে করে রেলিং এর উপরে বসি। এখন যখন কেউ আশেপাশে নেই, তখন.... আমি আয়েস
করে বসে একটা পা ছড়িয়ে দিলাম রেলিং এর উপরে। আরেকটা পা দোলাতে লাগলাম
ধীরে ধীরে। অনেকদিন পরে কেমন অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে আমার। ভালোলাগা আর
খারাপলাগা মিলেমিশে একাকার। ছাদের একপাশে বাঁশের ডগায় আকাশ প্রদীপটা
তিরতির করে জ্বলছে। মায়ের কথা মনে পড়ে গেলো। মা এখন নিচে ভীষণ ব্যস্ত
দেখে এলাম। আমি আর ডাকিনি মাকে, থাক সবার মধ্যে হাসি ঠাট্টায় , মন ভালো
থাকবে ওনার।
মনে পড়লো লক্ষ্মী নারায়ণ পুজো উপলক্ষে সন্ধ্যেবেলায় আকাশ প্রদীপ ধরানোর
সময় মা যখন মাথায় ঘোমটা দিয়ে মৃদু স্বরে মন্ত্র উচ্চারণ করতো মা
"দামোদরায় নভসি তুলায়াবে লোলয়া সহ প্রদীপন্তে, প্রযোচ্ছমি নম অনন্তায়
বেধসে " তখন আমি মায়ের মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকাতাম, আকাশ প্রদীপের তির
তির করে কাঁপানো হলুদ আলোয় মায়ের মুখটা অদ্ভুত সুন্দর দেখাতো। মা রোজ
এইভাবে দামোদর মানে নারায়ণ আর লোলয়া মানে লক্ষ্মীকে আহ্বান করত , মায়ের
কাছে শুনেছি লক্ষ্মীনারায়ণের উদ্দেশ্যে আকাশপ্রদীপ জ্বালতে হয়
গেরস্থালির ঘর আলোকিত করতে। যাতে লক্ষ্মীনারায়ণ আমাদের ঘরবাড়িটিকে
আকাশের স্বর্গ থেকেই চিনে নিয়ে আমাদের বাড়ি এসে সুখ স্বাচ্ছ্যন্দে ভরিয়ে
তুলতে পারেন, এই আশায়। মায়ের মুখে শোনা এই গল্পটা শুনতে আমার বেশ ভালো
লাগতো , ঠাকুর দেবতায় ভয়ের তো কিচ্ছু নেই। কিন্তু যেদিন ঠাম্মির কাছে
শুনলাম ওই আকাশ প্রদীপকেই চিহ্ন করে আমাদের পূর্বপুরুষদের আত্মারাও
নিজেদের বাড়ি আসার রাস্তা খুঁজে নেয় , সেদিন থেকে বুকের ভিতরে ঢিপঢিপানি
শুরু আমার ।
আমি কতদিন ঠাম্মার কোলের কাছে শুয়ে তার বুকে মুখ গুঁজে শুনেছি
পূর্বপুরুষদের আত্মা এই একটা মাস আমাদের আশেপাশে ঘোরে , ওরেবাবা...
ভাবলেই বুক শুকিয়ে যায় আমার। ঐকয়দিন অন্ধকার এড়িয়ে চলতাম, কেমন যেন মনে
হত আমার ঘাড়ের পিছনে নিঃশ্বাস ফেলছে কেউ, নেহাত ছেলে হয়েও ভীতুর ডিম বলবে
সবাই তাই ভয় পাই বোঝাতাম না, শুধু সূয্যি পাটে গেলেই মা এর কাছছাড়া হতাম
না।
রাতে ঠাম্মির কাছে শুতে গিয়ে দেখতাম ঠাম্মি শোয়ার আগে পূর্বপুরুষদের
উদ্দেশ্যে কপালে হাত ঠেকাত ভক্তিতে, কিন্তু উনি কি বুঝতে পারেনা ? যে
আমার ছোট্ট মন, যতই পূর্বপুরুষ হোক, আত্মা তো!! রাতের বেলায় ভয়ে আমার বুক
ধুকপুক করে, বারবার কেঁপে উঠি এই ভেবে ওনারা তারমানে এখন আমার খাটের
চারিপাশেই ঘোরাঘুরি করছেন, যদি হঠাৎ পা ধরে টানে?...
ভেবেই চটজলদি পা গুটিয়ে পেটের মধ্যে সেদিয়ে চোখ বন্ধ করে ঠাম্মিকে জাপ্টে
জড়িয়ে ধরেছি কতবার । ঠাম্মি হেসে কোলের কাছে টেনে নিয়েছে আমাকে। বুঝিয়েছে
ওনারা ভয় দেখাতে নয়, আশীর্বাদ করতে আসেন।
আরে দূর বাবা যতই যাই বলুক, আত্মা মানে ভূত আর ভূত মানেই ভয়, কেন যে
ঠাম্মিটা বোঝেনা!!
দিন গুনতাম কবে অমাবস্যা আসবে, ওনারা ফিরে যাবেন। অমাবস্যার রাতে নাকি
ফিরে যাওয়ার সময় ওই আকাশ প্রদীপ দেখেই আকাশকে স্বর্গ ভেবে স্বর্গের দিকে
যাওয়ার রাস্তা সহজে চিনে নিতে পারেন যাতে,সেইজন্য বাঁশের আগায় রাতভর
জ্বালিয়ে রাখতে হয় আকাশপ্রদীপ। আজও অমাবস্যা। রেলিং এ বসে আকাশ প্রদীপের
দিকে তাকিয়ে আছি এই বিষণ্ণ রাতে, চারিদিকে বাজি পোড়ানোর আওয়াজ। আজ আমার
একা ছাদে একটুও ভয় করছেনা। লম্বা বাঁশের আগায় নতুন কেনা মাটির হাঁড়ির
মধ্যে টিমটিম করে জ্বলছে প্রদীপটা , হাওয়ায় কাঁপছে তার শিখা, কিন্তু
নিভছে না, হাঁড়ির উপরের দিকে অনেক ফুটো করা পথে আসা বাতাসই কাঁপিয়ে দিয়ে
যাচ্ছে শিখাটাকে।
ওর দিকে তাকিয়ে আনমনা হয়ে গেলাম,পুরো কার্তিক মাস ধরে এইভাবে আকাশপ্রদীপ
জ্বালানো হবে । এই ব্যবস্থা আমাদের আশেপাশের বাড়ির কারোর নেই, খুব ভালো
লাগে ভাবলে আমাদের বাড়িতে এই প্রথা আজও আছে বলে। কেমন একটা অদ্ভুত
সুখানুভূতি অনুভব ছড়িয়ে থাকে ওই আলো জুড়ে। আসলে ঈশ্বর ও পূর্বপুরুষ –
উভয়ের উদ্দেশেই এই প্রদীপ জ্বালানো হয়।
এইসব সাত পাঁচ ভাবছি, পাশে মা আর জেঠু কখন এসে দাঁড়িয়েছে বুঝতেই পারিনি,
ঠিক খুঁজতে খুঁজতে চলে এসেছে। আমাকে দেখে ওনারা মৃদু হাসলেন। রেলিং থেকে
পা নামালাম । আজও জেঠুকে দেখে বরাবরের মত ঘাবড়ে গেলাম , কম মার খেয়েছি
আমি জেঠুর হাতে? সামনাসামনি পড়লে বরাবর এড়িয়ে যাওয়ার অভ্যেস আমার আজও
যায়নি। আগেরদিন হলে এই সন্ধেবেলায় একা এখানে এসে বসলে, একে তো ছোট ছাদ,
তার উপরে কার্ত্তিক মাসের হীম, কান ধরে টেনে হিচড়ে নামাতো, তারপরে পিঠের
উপরে দুমাদুম কিল। এখন জেঠুর সেই হুঙ্কারও নেই আর গায়ে জোর ও নেই। আজ যেন
বড্ড বুড়ো লাগছে জেঠুকে। কেমন যেন মুষড়ে পড়েছেন। মায়া হলো জেঠুকে দেখে।
অসংখ্য বলিরেখার ছায়ায় বয়স হলে মানুষ কত বদলে যায়।
নিচের তলায় সব্বাই হুল্লোড় করছে, আত্মীয় স্বজনদের হা হা হিহি হাসির আওয়াজ
শুনতে পাচ্ছি, মন চাইছে আর একবার নিচ থেকে ঘুরে আসি। কিন্তু না আর নয়, এই
কয়দিন বেশ ভালো কেটেছে ওদেরকে পাশে পেয়ে। অনেক রাত হয়েছে, নিচে গেলে আবার
আটকে যাবো, ওদের পাশে বসে গল্প শুনতে গেলেই দেরি হয়ে যাবে, মায়া বড়ো
অদ্ভুত জিনিস। জেঠু ঘরঘরে গলায় বললো "বৌমা চলো, চল বাবু চল, তাহলে আমরা
এবারে রওনা দিই।"
আমি মাথা নাড়লাম, মন খারাপ হলেও ফিরে যেতে যখন হবেই। মা আমার মাথায় হাত
বুলালো আদর করে, তারপরে রওনা দিলাম তিনজনে, আকাশ প্রদীপ পিছনে পরে রইলো,
ওর আলোয় সত্যিই প্রকাশিত হয়েছে আমাদের সামনের পথ, কয়েক বছর হলো ঠাম্মি আর
আসেনা, হয়তো সত্যি মুক্তি হয়েছে তার।
আমারও তো অল্প বয়সে চলে যাওয়া হঠাৎ, ছেলে বৌকে ছেড়ে, ইচ্ছে তো হয়না,
কিন্তু নিরুপায়, সারাবছর অপেক্ষা করি কবে মহালয়া আসবে। এই একটা মাস মন
ভরে ওদের আশেপাশে ঘুরি, স্পর্শ করার বৃথা চেষ্টা করি । আমার স্ত্রী
অপর্ণা যখন ঠাকুর পুজো দিয়ে আমার বসানো শিউলি গাছের শিউলি ফুল মুঠোয় ভরে
আমার ছবির সামনে রেখে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মন খারাপ করে, তখন আমার
মনটা ছট ফট করে ওঠে, মনে হয় ওকে জানান দিই.... "মন খারাপ কোরোনা অপু, আমি
এখনও তোমার পাশেই আছি। "
ও কেমন চমকে ওঠে যেন। ঠিক বুঝতে পারেনা, কিন্তু চোখ ছল ছল করে ওর। একটা
দীর্ঘশ্বাস ফেলে। আমি নিরুপায় হয়ে মনে মনে বলি, "তুমি এইভাবে কেঁদোনা অপু
, আমার বড্ড কষ্ট হয়।" ও শুনতে পায় কিনা জানিনা, পরোক্ষণেই কি মনে করে
চোখের জল মুছে শাড়ির আঁচল দিয়ে আমার হাসি মাখা ফটোটা সযত্নে মুছে দেয়। এ
যেন দুজনের দুজনকে অলক্ষ্যে সান্ত্বনা দেওয়া। মনটা হালকা হয় আমার।
আমি মায়া ভরা চোখে নাতিকে দেখি , এখনকার বাচ্চারা আমাদের মত ভীতু নয়,
তাছাড়া এখন অন্ধকারটাই বা কোথায়? এখন তো চারিদিকে বিদ্যুতের আলো, আর আমার
নাতিটা আমার ছেলের মতোই ভীষণ বুদ্ধিদীপ্ত, দেখলে মন ভরে যায়। একদম আমার
ছেলের ছোট্টবেলাটা ফিরে আসে যেন ওকে দেখলে। মনের ভিতরে আকুলি বিকুলি করে
কেমন। ইচ্ছে হয় চেঁচিয়ে ওকে ডাকি, একটু বুকে জড়িয়ে ধরি, একটু ছুঁয়ে দেখি,
কিন্তু নাহ সে উপায় তো নেই। মনকে বোঝাই এইযে আসলাম, একমাস একসঙ্গে
পাশাপাশি থাকলাম, ভালোবাসলাম, এখন কালী পুজোর অমাবস্যায় আমার চলে যাওয়ার
তাড়া,তারপরে আবার এক বছরের অপেক্ষা। এর বেশি আর কি পাওয়ার আছে এখন?
সাত পাঁচ এইসব ভাবতে ভাবতে কিছুটা এগিয়ে গেছি আকাশ প্রদীপের আলোর নিশানা
ধরে, হঠাৎ জানালা থেকে আমার নাতি চেঁচিয়ে বলে উঠলো "ঠাম্মি দেখো ওই যে
তিনটে ফানুস... হেলে দুলে বাতাসে ভাসতে ভাসতে মিলিয়ে যাচ্ছে । "
আমি দূরে মিলিয়ে যাওয়ার আগে একবার তাকালাম, দেখলাম অপু নাতিকে কোলে নিয়ে
একদৃষ্টিতে এদিকে আকাশের দিকে তাকিয়ে কি যেন খুঁজছে, সত্যিই কি ও ফানুস
খুঁজছে!! নাকি!!....
মৃদু হাসলাম আমি, মানুষ মরে যায় কিন্তু আশা মরেনা। প্রাণ ভরে আশীর্বাদ
করলাম আমার ছোট্ট নাতিকে, এখন স্পষ্ট বুঝি ভয় পাওয়ার কিচ্ছু নেই।
পূর্বপুরুষদের আত্মাকে ভয় পেতে নেই। কারণ আমরা আসি শুধু আশীর্বাদ করতে,
হাতে হাত রেখে ছুঁতে না পারলেও ওদের আশেপাশে হাওয়া হয়ে একটু স্পর্শ করে
যেতে পারলেই ভীষণ খুশি হই আমরা।
~সমাপ্ত~