চেনা জানা বন্ধুরা
সুচিত্র রঞ্জন পুরকাইত,
ডায়মন্ডহারবার, দক্ষিণ ২৪ পরগনা
গাছ আমাদের পরম বন্ধু। আমাদের প্রতিদিনের জীবন ধারণে গাছের উপকারিতা
অনস্বীকার্য, তা সে অক্সিজেনই হোক বা ঔষধপত্রই হোক, গাছ ছাড়া আমরা
বাঁচবো না।
গাছ গাছড়ায় রোগ নিরাময়ের কথা কম বেশি আমরা সবাই জানি। কিন্তু আজকের
দিনে না আছে সেই একান্নবর্তী পরিবার আর না আছে বড় বড় বাড়ি, উঠোন,
বাগান।
পরিস্থিতির চাপে বড় বড় বাড়ি ভেঙ্গে তৈরি হয়েছে ছোট ছোট বাড়ি অথবা
ফ্ল্যাট বাড়ি। গ্রাম গঞ্জের কথা ছেড়ে দিলে দেশের প্রায় ৭০% মানুষ এখন
ফ্ল্যাটে অথবা কোয়াটারে বসবাস করি আমরা। তাই ইচ্ছে থাকলেও আমরা সেখানে
বাগান করতে পারি না। কিন্তু বিশেষ কিছু গাছ আছে যেসব গাছ লাগানোর জন্য
আমাদের বাগানের প্রয়োজন হয় না, আমরা বাড়ির ভেতরেই সেসব গাছ লাগাতে
পারি।
ঠান্ডা লাগা, গলা খুশখুশ কিংবা মাথা ধরা। এইসব মোটামুটি নিত্যনৈমিত্তিক
রোগে পরিণত হয়েছে। প্রতিনিয়ত ওষুধ পত্রের পেছনে আমরা টাকা ঢেলেই চলেছি।
অথচ বাড়ির বারান্দায় বা ব্যালকনি অথবা ছাদে এমন কিছু গাছ লাগালে তার
মূল,পাতা ,ফুল,ফল প্রভৃতি থেকে আমরা এইসব “রেগুলার” রোগের প্রতিকার পেতে
পারি খুব সহজেই।
প্রাচীন বাংলায় জীবনাচরণ নিয়ে খনার বচন প্রখ্যাত হয়ে আছে।
“নিম নিসিন্দা যথা,মানুষ কি মরে তথা?”
এই লেখায় আমরা এমন দশটি উদ্ভিদ সম্পর্কে জানবো যা খুব সহজেই বাড়ির
বারান্দায় কিংবা ছাদে লাগানো যায়। এসব উদ্ভিদ একদিকে যেমন ঘরোয়া
চিকিৎসায় কাজে দেবে ঠিক তেমনভাবেই শহরের ইট-পাথরের ইমারতে আনবে সজীবতা।
১ তুলসী
. সর্দি-কাশিতে তুলসী পাতার রস এবং মধুর মিশ্রণ অত্যন্ত উপকারী। তুলসীর
রস ফুটিয়ে গড়গড়া করলে গলা ব্যথা কমে।
. তুলসী চা মাথাব্যথায় কার্যকরী ফল দেয়।
বিশ্বের অনেক দেশে মানসিক চাপ কমাতে তুলসী ব্যবহৃত হয়। তুলসীর এন্টি
অক্সিডেন্ট মানসিক চাপমুক্ত থাকতে সহায়তা করে।
. বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় দেখা গেছে, তুলসী ফুসফুসের সমস্যা, ব্রঙ্কাইটিস
প্রভৃতি রোগে কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
. তুলসী পাতার রস রক্তের সুগার ও কোলেস্টরেলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রেখে
ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।
সার্জারির পর ক্ষতস্থানে তুলসী পাতা বেটে লাগালে তা ক্ষত সারাতে সাহায্য
করে।
. স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধেও তুলসীর ভূমিকা অপরিসীম।
অর্থাৎ, বাড়িতে একটি তুলসী গাছ আপনার অনেক সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম।
২ থানকুনি
. পেটের অসুখের নিরাময়ে থানকুনি পাতা অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করে।
. আমাশয়ের চিকিৎসায় এটি ব্যবহৃত হয়।
প্রচুর পরিমানে ভিটামিন সি থাকার ফলে এটি রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে।
. মুখের ব্রণ দূর করে।
. শরীরের ক্ষত এবং ঘা সারাতে সাহায্য করে।
. সাময়িকভাবে কাশি থামাতে সাহায্য করে।
. গলা ব্যথার জন্য উপকারি।
৩ ঘৃতকুমারী বা অ্যালোভেরা
. ঘৃতকুমারী শরীরের কোলেস্টরলের মাত্রা কমিয়ে দিয়ে হৃদযন্ত্র সুস্থ
রাখতে সাহায্য করে। রক্তে অক্সিজেন চলাচল বৃদ্ধি করে।
. ব্লাড প্রেসার নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করে।
. মাংসপেশী ও জয়েন্টের ব্যথার স্থানে ঘৃতকুমারী ব্যবহার করলে এটি ব্যথা
কমাতে সাহায্য করে।
. ঘৃতকুমারীর জুস দাঁত ও মাড়ির ব্যথা কমায়। মুখের ইনফেকশন সারাতেও এটি
সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
. অ্যালোভেরা জুসের এন্টি ইনফ্লেমেটরি উপাদান শরীরের মেদ কমাতে সাহায্য
করে।
. অ্যালোভেরা মানুষের অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়া বাড়িয়ে দিয়ে
হজমশক্তি বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এটি ডায়রিয়ার বিরুদ্ধেও
কার্যকর।
. ঘৃতকুমারীতে থাকা অ্যালো ইমাডিন স্তন ক্যান্সারের বিস্তারকে প্রতিরোধ
করে থাকে।
. অ্যালোভেরা ত্বকের সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে ব্যবহৃত হয়। এটি ব্রণ দূর করতে
সহায়ক।
. অ্যালোভেরার জুস নিয়মিত পান করলে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয়।
৪ নিশিন্দা
. স্মৃতিশক্তি বর্ধক হিসেবে নিসিন্দা পাতা ব্যবহৃত হয়।
. মলদ্বারের ক্ষত সারাতে এটি ব্যবহৃত হয়।
. খুশকি ও টাকের চিকিৎসায় এটি অত্যন্ত কার্যকরী।
. ক্ষতস্থান ও ফোঁড়া সারানো ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয়।
. নিসিন্দা পাতার গুঁড়ো মেদ কমাতে সহায়তা করে।
. কৃমি সারাতে এটি অত্যন্ত কার্যকরী।
. শরীরের বিভিন্ন স্থানের চুলকানি, ঘা,পাঁচড়া প্রভৃতি নিরাময়ে এটি
ব্যবহৃত হয়।
. নিসিন্দা গাছের বাকল চায়ের মতন করে খেলে হাঁপানি সারিয়ে তোলে।
. দেহের উপরের কোন জায়গায় টিউমার হচ্ছে দেখা গেলে যদি নিসিন্দা পাতা
বেঁটে লাগানো হয় তবে তা সারিয়ে তোলে।
. এটি বাতের ব্যথা সারিয়ে তোলে।
. শিশুদের শয্যামূত্র বন্ধ করতে নিসিন্দা অত্যন্ত কার্যকরী।
৫ নিম
. শিশুদের কৃমি উপশম করতে নিম পাতার রস ব্যবহৃত হয় ।
. বুকে কফ জমে থাকলে তিন/চারদিন নিম পাতার রস নিয়মিত পান করলে তা বুকের
কফ সরিয়ে দেয়।
. নিমের পাতা হাল্কা বেটে মাথায় ব্যবহার করলে তা উকুন নাশ করতে সহায়তা
করে।
. পোকা-মাকড়ে কামড়ালে বা হুল ফোটালে সেখানে নিমের পাতা বা ছাল বেটে
লাগালে ব্যথা উপশম হয়।
. খোসপাঁচড়া, দাদ প্রভৃতির চিকিৎসায় নিমপাতা বা তার ছাল-বাকল খুবই
কার্যকরী।
. নিমের তেল গর্ভনিরোধক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
. পেটের অসুখ বা পাতলা পায়খানায় নিমের রস খুবই উপকারী।
৬ বাসক
. বাসক শ্লেষ্মা বা কফ সারাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
. হাঁপানি ও শ্বাসজনিত রোগের চিকিৎসায় এটি ব্যবহৃত হয়।
. খোস ,দাদপাঁচড়া সারাতেও এটি ব্যবহৃত হয়।
. প্রসাবের রাস্তায় জ্বালা যন্ত্রনা সারাতেও এটি ব্যবহৃত হয়।
. উকুননাশক হিসেবেও এটি ব্যবহৃত হয়।
৭ গাঁদা
. গাঁদা ফুলে থাকা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও ফ্ল্যাভোনয়েড নামক উপাদান
মানবদেহের ক্যান্সার কোষ এর বৃদ্ধিতে বাঁধা প্রদান করে।
. এর অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
গাঁদা ফুলের পাতা কোথাও পিষে লাগালে ক্ষত ভাল হয় এবং রক্ত পড়া বন্ধ
হয়।
. এছাড়া হাড়ের ক্ষয় রোধ, আর্থ্রাইটিস ও গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা দূর
করতেও গাঁদাফুল সাহায্য করে।
৮ পুদিনা
. পুদিনায় থাকা রোজমেরিক এসিড হাঁপানি দূর করতে সাহায্য করে।
. স্তন, লিভার, অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসার রোধ করে।
. পেটের সমস্যা উপশমে দারুণ কার্যকরী।
. খুশকি ও উকুনের চিকিৎসায় সহায়ক।
৯ পাথরকুচি
. কলেরা, ডায়রিয়া বা রক্ত আমাশয় সারাতে এটি খুবই কার্যকরী।
. সর্দিতে পাথরকুচির রস গরম করে খেলে তা ভাল কাজ করে।
. উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে এবং মূত্রথলির সমস্যা থেকে মুক্তি পেতেও
পাথরকুচি ব্যবহার করা হয়।
. মৃগীরোগের চিকিৎসায় এটি ব্যবহৃত হয়।
. ত্বকের এলার্জি সারাতে পাথরকুচি ব্যবহৃত হয়।
১০ জবা
. চর্মরোগ কিংবা হাতের তালুর ছাল ওঠার প্রতিকার হিসেবে জবাফুল ঘষে
ব্যবহার করা হয়।
. বমি বমি ভাব দূর করতে জবা ফুলের শরবত খেতে পারেন।
. নারীদের অনিয়মিত মাসিক এবং অতিস্রাবের সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে জবা
ফুল ব্যবহৃত হয়।
. চুলের অকালপক্কতা রোধে জবা ফুলের কুঁড়ি বেটে মাথায় ব্যবহার করা যেতে
পারে।