দশটা শূন্য
উজ্জ্বল দাস,
কলকাতা
-রাত ০২:০৫।
মোবাইলটা হঠাৎ কাঁপতে শুরু করল। হাতিবাগানের অভিজাত পরিবারের ছোট ছেলে
শুভ্র, চোখ খুলে দেখল: অচেনা নম্বর। ঘুমঘুম চোখে রিসিভ করলো ফোনটা।
কিন্তু ওপারে কেউ কথা বলল না। শুধু হালকা নিশ্বাসের শব্দ রাতের
নিস্তব্ধতা আরও বাড়িয়ে দিলো।
"হ্যালো? কে?"
নিস্তব্ধতা।
শুভ্র বিরক্ত হয়ে মোবাইল নামিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকাল: কিন্তু.... রিংটা
নেই!
কোনো কল লগ নেই, কোনো নম্বর নেই!
কিন্তু সেতো রিসিভ করেছিল! এইমাত্র!
সে উঠে বসল। ঘরটা থমথমে, বাইরে বাতাসে পাতারা খসখস করছে। হঠাৎ করেই একটা
ঠান্ডা হাওয়া ঘরের ভেতর ঢুকে তার শরীরটা শান্ত করে দিয়ে গেলো।
ঘরের কোণ থেকে একটা ফিসফিসানি ভেসে এল: "ঘুমাও শুভ্র ঘুমাও, জেগে থাকার
সময় শেষ।” শুভ্র হঠাৎ স্থির হয়ে গেল। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতে গিয়েও পারল
না। গলা শুকিয়ে এলো। আস্তে আস্তে জানলার দিকে এগোতেই চোখ আটকে গেল
আয়নায়।
আয়নায় নিজেকে আর সৌমিলিকে দেখতে পেলো সে। তিন বছর আগে সৌমিলির সঙ্গে
প্ল্যানড্ ব্রেকাপ করে সে। তারপর সৌমিলির বন্ধু সৃজিতার সঙ্গে জড়িয়ে
পড়ে সম্পর্কে। আর সবটাই পরিকল্পনা মাফিক। সে সম্পর্ক মাস আষ্টেক থাকার
পর, ভুল বুঝতে পারে সৃজিতা। বেরিয়ে আসতে চায় সে, ফিরে আসতে চায় বন্ধুর
পাশে। কিন্তু সেই আটমাসের মধ্যে কবে যেন সৌমিলি কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে
ফেলে! সৃজিতা জানতো না যে, সৌমিলি কবেই সবাইকে ছেড়ে স্বেচ্ছামৃত্যু
নিয়েছে।
একেরপর এক ভুল সিদ্ধান্ত, প্রতারণা, এত বড় ধাক্কা আর কাটিয়ে উঠতে
পারেনি সৃজিতা। মেনে নিতে পারেনি কিছুতেই। সবকিছু ভেবেচিন্তে সৃজিতা আর
বন্ধুত্বের শোক থেকে বেরিয়ে আসতে চায়নি। আত্মহত্যা করে, মনীন্দ্র
কলেজের সামনে বসে, ইনজেক্ট করে রক্তে বিষক্রিয়া ঘটিয়ে। কোনো এক
মধ্যরাতে সমস্ত উষ্ণতা হারিয়ে নিথর হয়ে পড়ে থাকে। পরের দিন ফুটপাথে
পাওয়া যায় যুবতীর লাশ।
শুভ্রর ঘরে একটা ছায়া। খুব ধীরেধীরে তার কাঁধে হাত রাখছে। কাঁধে ঠান্ডা
একটা ছোঁয়া টের পেয়ে চিৎকার করতে চাইল সে। কিন্তু গলা দিয়ে শব্দ বেরোলো
না। সৃজিতা… সেই চেনা মুখ মিষ্টি হাসি টানাটানা কাজলের চাহনি। পরনে
হাতিবাগান থেকে শুভ্রর কিনে দেওয়া শেষ চুড়িদার। শিউরে ওঠার আগেই সব কেমন
তালগোল পাকিয়ে যায় তার।
পরদিন সকালে, শুভ্রর মা ঘরে ঢুকে দেখে বিছানা খালি। সকালে খবরের চ্যানেলে
তখন জোরেজোরে বারবার একই খবর, ব্রেকিং নিউজ মনীন্দ্র কলেজের সামনের
ফুটপাথে যুবকের লাশ। মোবাইলটা হাতে ধরা—স্ক্রিনে শেষ করা কল—রাত
০২:০৫।
নম্বরটা লেখা, দশটা শূন্য।
0000000000…
~সমাপ্ত~