ত্রিপুরার ডাইরি (ত্রিপুরেশ্বরী_মন্দির ও নীরমহল)

সীমন্তিনী রায়,

আসাম

জীবনটা " চলতি কা নাম গাড়ি " হয়ে উঠেছে , যখন তখনই আমাদের ছোট্ট চারচাকা গাড়িটাকে নিয়ে বেড়িয়ে পরি অজানা অচেনা রাস্তায় । দীপকে কর্মসূত্রে এখানে সেখানে যেতেই হয় , মাঝে মাঝে আমিও সঙ্গ নি ।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে বড়ই ভালবাসি । বেশির ভাগ সময় এই জার্নিটাই আমাদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে । কারণ হোটেলে পৌঁছে আমি পুরো সেঁধিয়ে পরি চারদেওয়ালের মাঝে আর দীপ ব্যস্ত হয়ে পরে তার কাজে । মার্কেটিং জব ।


কাজের ফাঁকে কিছু সময় পেলে ঘুরে নি আশেপাশের কিছু জায়গা । প্রায় এক সপ্তাহ কেটে গেল , শুধু এখান থেকে ওখানে ছুটতে । #গৌহাটি থেকে #করিমগঞ্জ পৌঁছতেই প্রায় ৯-১০ ঘন্টা কেটে গেল ।পরের দিন করিম গঞ্জ থেকে #ধর্মনগর গেলাম ৫ ঘন্টা জার্নি করে । সেখান থেকে একদিন পর আরো ৭-৮ ঘন্টা লাগল #আগড়তলা পৌঁছতে ।

দীপ নিজেই ড্রাইভ করে , পাশের সিটে আমি । মাঝে মাঝে ই ঝিমুনি আর নাক ডাকা চলে আমার আবার চোখ কচলিয়ে দেখি গাড়ির কাঁচের বাইরের দৃশ্য । দীপ মাঝে মাঝে গাড়ি থামায় পেটের তাড়নায় , কখনো পেট খালি করতে আবার কখনো পেট ভর্তি করতে আর কী । লং ড্রাইভ করতে করতে তারও চোখে মাঝে মাঝে ঘুম জড়িয়ে আসে , লম্বা লম্বা ঠ্যাং দুটো টনটন করে , তখন চা পর্বের ছোট্ট বিরতি চলে ।


যাই হোক রবিবার কাজের মাঝেই একটু সময় বের করে গেলাম ত্রিপুরেশ্বরী মন্দির । ছুটির দিন হওয়ায় মন্দির চত্তর লোকে লোকারণ্য , বিশাল লাইন । কোথাও আবার এক একজন হাতে ২ টো বা ৪ টে করে ছাগলকে টানতে টানতে নিয়ে চলেছে বলির উদ্দেশ্যে ।

যাই হোক সেই লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে পুজো দেওয়া মিটে যাবার পর , মন্দির চত্তরেই এক জায়গায় পরোটা তরকারি খেয়ে আবার বেড়িয়ে পরলাম । দীপ কাজে নামলো এক জায়গায় , আমি রয়ে গেলাম গাড়ির ভিতর একা ঘন্টা খানেকের জন্য । এটা আমাকে করতেই হয় কারণ তার কাজের ফাঁকে আমার বেড়ানো চলে যেহেতু । ফিরে আসার পর আবার চলা শুরু ,#মেলাঘরের (জায়গার নাম ) উদ্দেশ্যে গন্তব্য #ত্রিপুরা_নীরমহল_রাজবাড়ি । পথে এক জায়গায় বিকেল বেলা লাঞ্চ করা হল , বিরিয়ানি , একদম কলকাতার মত , সবচেয়ে খুশি হলাম তাতে আলুর দেখা পেয়ে ।


ত্রিপুরা রাজবাড়ি যখন পৌঁছলাম তখন শেষ বিকেল । একটা বড় ঝিল পার করে ওপাড়ে যেতে হবে যার নাম #রুদ্রসাগর_লেক "। ঝিলের জল কম তবু নৌকায় চেপে রাজবাড়ি পৌঁছতে খুব ভাল লাগলো । ভীষণ সুন্দর সেই প্রাসাদ । ঘোরা শুরু হতে না হতেই সূর্য পাটে বসে গেছে । শেষ বিকালের মনখারাপি আলোয় দেখলাম পুরো প্রাসাদ । প্রাসাদটি তৈরী হয়েছিল #বীর_বিক্রম_কিশোর_মানিক্য_দেব_বর্মার আমলে ১৯৩০ সালে সেই সময় #ব্রিটিশ_কোম্পানী_মার্টিন_এন্ড_বার্নস ৯ বছর ধরে এটি নির্মান করে ।


সত্যি অপরূপ সৌন্দর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেটা , একাকি । নির্জন প্রান্তরে একরাশ স্মৃতিকে নিয়ে ইতিহাস গড়তে দেখেছে এই প্রাসাদ , পতনের একাকি সাক্ষ্য হয়ে নিরবে দাঁড়িয়ে আছে আজ । যে প্রাসাদ এককালে জন কোলাহলে মুখরিত থাকতো সেই প্রাসাদ আজ একাকি দাঁড়িয়ে আছে একটা রাজত্বের কতশত গল্পকে বুকে জড়িয়ে ।

এই মহল দুই ভাগে বিভক্ত #পশ্চিম দিকের অংশকে #অন্দরমহল বলা হয় । #পূর্ব দিকের অংশ #মনোরঞ্জনের জন্য নির্মিত হয়েছিল । যেখানে ছিল নাট মহল , থিয়েটার আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য বরাদ্দ। মহলে মোট ২৪(24) টি ঘর(room ) আছে । এই মহলের ভিতরে দুই দিকের দুটি সিঁড়ি লেকে নেমে গেছে যে '#রাজঘাট 'থেকে রাজবংশের সদস্যরা নৌকা ভ্রমনে বেড়োতেন ।


এইসব জায়গা দেখতে দেখতে আমার মন কেমন করে ওঠে , মনে হয় এই তো সেই শোয়ার ঘর ! যেখানে এক সময় কোন এক রাজকণ্যা আরামের নিদ্রা যেত কতশত স্বপ্নকে চোখে নিয়ে , নাচঘর এক সময় ভরে থাকতো ঘুঙুর আর বাদ্যযন্ত্রের মধুর আওয়াজে । আর আজ সব শূণ্য , ফাঁকা । সেই রাজাও নেই আর সেই রাজত্বও নেই ।

শুনলাম সেই রাজার বংশধর আজো আছেন , ছবিও দেখলাম দীপের সঙ্গে কাজ করা এক দাদার মোবাইলে । বেশ সুদর্শন যুবক। জানা যায় Manikya Dynasty which is supposed to be the second longest remaining dynasty in the world to day .


যখন সেখান থেকে ফিরলাম তখন চারদিকে আঁধার ঘনিয়ে এসেছে । চারদিকে কালো কালো জল নির্বাক নিশ্চুপ , ছল ছল শব্দও কানে আসে না নৌকারের মোটরের শব্দ ভেদ করে । মনটা কেমন করে উঠল , পিছনে ছেড়ে আসা রাজ বাড়িটাকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে নিলাম শেষ বারের মতন ।

আলো আঁধারি র মাঝখানে রয়ে যাওয়া সেই নীরমহল যেখানে এক সময় মানুষের কোলাহলে নির্জনতা কোথায় হারিয়ে যেত , একাকি নিঃসঙ্গ হওয়ার কেউ সুযোগই পেতো না । আর আজ সেই বিশাল বাড়ি তার ইঁট কাঠ পাথরের পাঁজর নিয়ে বড় নিসঙ্গ , একা , মানুষজনের অভাবে । আজ শুধু কঙ্কালের মতন দাঁড়িয়ে আছে সাজ সজ্জা হীন হয়ে । বিদায় ।


#বিশেষ দ্রষ্টব্য :--- ৮০০ মিটার দূর থেকে না হলে পুরো রাজমহলের ছবি পাওয়া যায় না ।