উজ্জয়নীর আনন্দময় দিনগুলি

বাসবদত্তা গুড়িয়া,

নতুন দিল্লি


ভারতের পশ্চিম-মধ্যভাগে শিপ্রা নদীর তীরবর্তী স্থানে অবস্থিত ভারতের প্রাচীন শহর উজ্জয়িনী। ইতিহাসবিদদের মতে এই শহরের উৎপত্তির সময়কাল হল প্রায় ৬০০ খ্রীস্টপূর্ব। অবন্তী শাসনকালে এই শহরটি রাজধানী শহর হিসেবে বিবেচিত হত। মোটামুটি ১৯ শতক পর্যন্ত এই রাজ্যটি রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে বেশ উন্নত ছিল। পরবর্তী কালে ইন্দোর শহরের নির্মাণ হলে এই শহরটির প্রধানত্বের শিরোপা ছিন্ন হলেও এই শহরের ঐতিহ্যকে অস্বীকার করা যায় না।

মহাভারতে বর্ণিত আছে উজ্জয়িনী অবন্তী রাজ্যের রাজধানী ছিল । এক সময় এই শহরটি মৌর্য সাম্রাজ্যের অধীনস্থ ছিল, সেই কারণে এই শহরটিতে মৌর্য সাম্রাজ্যের রাজা অশোক বাস করতেন । মৌর্য সাম্রাজ্যের পরবর্তী সময়ে এখানে শতবাহন সম্রাজ্যের উত্থান শুরু হয় । পরবর্তীকালে গুপ্তযুগ থেকে মুঘল আমলে ও মালোয়া অঞ্চলের রাজধানী হিসেবে উজ্জয়িনীকেই বেছে নেওয়া হয়েছিল । ইতিহাসের দিকে দৃষ্টিপাত করলে জানা যায় শুধুমাত্র রাজনৈতিক দিক থেকে নয় গণিতশাস্ত্র এবং জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে ও এই শহরটি শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি পেয়েছিল ।

এহেন প্রাচীন বিখ্যাত শহরে স্বামী সন্তান নিয়ে বাস করে আমার মেজো মাসীমণি। গতবছর ডিসেম্বর মাসে আমরা সবাই অর্থাৎ কলকাতা থেকে আমার এক মাসিমনি আর তাঁর ছেলেরা আর হায়দ্রাবাদ থেকেও আমার আর এক মাসিমনি আর তাঁর ছেলেরা এবং আমাদের পরিবার ঠিক করেছিলাম সবাই আমরা নতুন বছরে একসঙ্গে উজ্জেন- এ মহাকাল দর্শন করব। আসলে আমরা এবং আমার মাসিমনিরা সবাই ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজ্যে বসবাস করি। আমরা যেমন দিল্লিতে থাকি তেমনই কেউ কলকাতায় কেউ হায়দ্রাবাদে কেউ উজ্জয়িনীতে কেউ বা আবার পোর্ট ব্লেয়ারে, তাই সবার সাথে একসাথে দেখা-সাক্ষাৎ প্রায় হয় না বললেই চলে। দিল্লি এবং উজ্জয়নীর মধ্যে দূরত্ব খুব বেশি নয়, তাই আমি এর আগেও মেজো মাসিমনির বাড়িতে বেশ কয়েকবার এসেছি। কিন্তু এবারের আসার অভিজ্ঞতাটা একেবারেই অন্যরকম, সবাই মিলে এক সাথে জমিয়ে মজা করার অভিজ্ঞতাই আলাদা।

সেই মতো ২০২৩ সালে ডিসেম্বর মাসের ২৬ তারিখে আমি মা আর বাবা আমরা সবাই মিলে মাসিমনির বাড়িতে যাওয়ার জন্য দিল্লির নিজামউদ্দিন স্টেশন থেকে ইন্দোর ইন্টারসিটি ট্রেনে চেপে রওনা দিলাম।
পরের দিন অর্থাৎ ২৭ তারিখ সকাল বেলায় আমরা মাসি মনির বাড়িতে পৌঁছে গেলাম। ততক্ষণে অবশ্য আমার কলকাতার মাসিমনি আর তার দুই ছেলে দিপু দাদা আর রুপু দাদা মেজ মাসিমনির বাড়ি পৌঁছে গেছে। সেইদিন অর্থাত ২৭ তারিখে আবার আমার মায়ের জন্মদিন। তাই সারাটা দিন আমরা খুব হই হই করে কাটালাম। দুই মাসীমণি মিলে প্রচুর রান্নাবান্না করে খাওয়া দাওয়ার আয়োজন করেছিল। বিকেলের দিকে মশাই মানে আমার মেসোমনি আমাদের সবাইকে নিয়ে কার্তিক মেলায় বেড়াতে গেল। কার্তিক মেলায় আমরা ভাই-বোনরা মিলে খুব মজা করলাম। মেলা থেকে অনেক কিছু খেলাম, শেষে মশাই আমাদের সবাইকে উজ্জেনের বিখ্যাত মিষ্টি পান খাওয়ালো। এরপর জ্যোৎস্নায় ভেসে যাওয়া শিপ্রা নদীর রামঘাটে কিছুক্ষণ ফেরি চলাচল, জলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ উপভোগ করলাম। তারপর রাত্রে সেখান থেকে ফিরে মায়ের বার্থডে কেক কেটে নাচ গান করে আমরা সবাই মিলে মায়ের জন্মদিন সেলিব্রেট করলাম।


আমার হায়দ্রাবাদের মাসীমণিদের উজ্জেনে আসতে তখনও দুদিন বাকি আছে তাই আমরা ঠিক করলাম এই দুদিনে আমরা ওঙ্কারেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ দর্শন করে আসব। যেমন ভাবা তেমন কাজ, পরদিন ভোরবেলা অর্থাৎ 28 ডিসেম্বর ২০২৩ আমরা স্নান-টান করে রেডি হয়ে একটি ভাড়া করা ফরচুনার গাড়িতে করে ওমকারেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ দর্শন করতে রওনা দিলাম। আমার বাবার ইচ্ছানুসারে ড্রাইভার দাদা গাড়িতে পুরনো দিনের কিশোর কুমার, মোহাম্মদ রফি, লতা মঙ্গেশকর, হেমান্ত কুমার, মুকেশের গাওয়া হিট সব গান বাজাচ্ছিল।

ওমকারেশ্বরে যাবার পথে আমাদের গাড়ির ড্রাইভার দাদার মুখে কিছুটা শোনা, কিছুটা ওমকারেশ্বর মন্দিরের এক পুরোহিত বা বলা ভালো পান্ডার থেকে শোনা আর কিছুটা গুগল থেকে পাওয়া তথ্য আমি আপনাদের সাথে শেয়ার করলাম।

আমরা অনেকেই জানিনা জ্যোতির্লিঙ্গ কি!
পুরাণ অনুসারে যখন ভগবান ব্রহ্মার এবং ভগবান বিষ্ণুর সর্বোত্তম দেবতা কে তা নিয়ে তর্ক হয়েছিল, তখন ভগবান শিব আলোর স্তম্ভ হিসাবে আবির্ভূত হন এবং প্রত্যেককে শেষ খুঁজে বের করতে বলেছিলেন। কিন্তু এই আলোর স্তম্ভের যে কোথায় শুরু আর কোথায় শেষ তা কেউই নির্ধারণ করতে পারেনি। এটা বিশ্বাস করা হয় যে ধরিত্রীর যেখানে এই আলোর স্তম্ভগুলি পড়েছিল সেখানে জ্যোতির্লিঙ্গগুলি অবস্থিত।

12 টি জ্যোতির্লিঙ্গের মধ্যে, ওমকারেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গে একটি জ্যোতির্লিঙ্গ রয়েছে, যা দুটি মন্দির - ওমকারেশ্বর এবং অমরেশ্বরের মধ্যে বিভক্ত বলে মনে করা হয়।

ওমকারেশ্বর মানে 'ওমকার বা ওম ধ্বনির প্রভু' এবং অমরেশ্বর মানে 'অমর প্রভু'।

ওমকারেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ মধ্যপ্রদেশের খান্ডওয়া জেলার নর্মদা নদীর তীরে মান্ধাতা বা শিবপুরী নামে একটি দ্বীপে অবস্থিত।

ওমকারেশ্বর মন্দিরের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো- মন্দিরটিতে প্রায় 60টি বিশাল এবং বিস্তৃতভাবে খোদাই করা পাথরের স্তম্ভ সহ একটি বড় প্রার্থনা কক্ষ রয়েছে। এটি একটি পাঁচ তলা কাঠামো যার প্রতিটি তলায় আলাদা আলাদা দেবতা রয়েছে। ওমকারেশ্বর লিঙ্গের উপরে রয়েছে মহাকালেশ্বর মন্দির। সিদ্ধনাথ, গুপ্তেশ্বর এবং ধ্বজেশ্বর মন্দিরগুলি যথাক্রমে তৃতীয়, চতুর্থ এবং পঞ্চম তলায় রয়েছে।

মন্দিরটিতে বেশ কয়েকটি উঁচু চূড়া রয়েছে।

ওমকারেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গের ইতিহাস :-


পুরাণে এই পবিত্র স্থানটিকে একটি জনবসতি এবং আধ্যাত্মিক স্থান হিসাবে উল্লেখ করেছে।

আদিবাসী ভীল সর্দাররা মালওয়ার পারমার শাসকদের অধীনে ওমকারেশ্বরকে শাসন করতেন; এটি ছিল 10-13 খ্রিস্টাব্দ এবং তারপর চৌহান রাজপুতদের দ্বারা। মারাঠারা খ্রিস্টীয় 18 শতকে ক্ষমতা গ্রহণ করে যখন অনেক মন্দির তৈরি এবং সংস্কার করা হয়েছিল।

ওমকারেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ নিয়ে বেশ কিছু গল্প শোনা যায়। একটি কিংবদন্তি বলে যে ইক্ষ্বাকু রাজবংশের সম্রাট মান্ধাতার দুই পুত্র কঠোর তপস্যা করেছিলেন এবং ভগবান শিবকে খুশি করেছিলেন যার কারণে পর্বতটিকে মান্ধাতা পর্বত বলা হয়। এবং ভগবান শিব নিজেকে জ্যোতির্লিঙ্গরূপে প্রকাশ করেছিলেন ।

আরেকটি কিংবদন্তি বলে যে বিন্ধ্য পর্বত বিন্ধ্যদেরকে তাঁর আবাসস্থল করার জন্য কঠোর তপস্যা করে ভগবান শিবের কাছে প্রার্থনা করেছিলেন। কেউ কেউ বলে যে এটি মেরু পর্বতের চেয়েও লম্বা হবে। ভগবান শিব তপস্যায় সন্তুষ্ট হন এবং সেখানে জ্যোতির্লিঙ্গরূপে আবির্ভূত হয়ে তাঁর ইচ্ছা পূরণ করেন।

দেবতা ও ঋষিদের নির্দেশে, ভগবান শিব লিঙ্গটিকে দুটি ভাগে বিভক্ত করেন - একটি ওমকারেশ্বরে এবং অন্যটি অমরেশ্বর বা মমলেশ্বরে। তাই মান্ধাতা দর্শনের সময় ভক্তরা এই উভয় মন্দিরে যান।

কথিত আছে যে ভগবান শিবও বিন্ধ্যদের বেড়ে উঠতে দিয়েছিলেন কিন্তু যতক্ষণ না তিনি তীর্থযাত্রীদের কষ্ট দেননি। যাইহোক, সময়ের সাথে সাথে, বিন্ধ্য পর্বতের বিশালতা ভক্তদের জন্য সমস্যা সৃষ্টি করেছিল এবং তাই তারা ঋষি অগস্ত্যের সাহায্য চেয়েছিল। ঋষি পর্বতটিকে ক্রমবর্ধমান বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন যতক্ষণ না তিনি সেখানে ফিরে আসেন, যা তিনি কখনও করেননি এবং তাই তিনি ভক্তদের সমস্যার সমাধান করেছিলেন।

ওমকারেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ সম্পর্কে সবচেয়ে আকর্ষণীয় তথ্য হলো দুটি শিব মন্দির একে অপরের কাছাকাছি অবস্থিত, উভয়ই ভক্তদের জন্য বিখ্যাত তীর্থস্থান - মূল ভূখণ্ডে অমরেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ এবং একটি দ্বীপে ওমকারেশ্বর।
কথিত আছে যে মান্ধাতা দ্বীপ, যার উপরে ওমকারেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ অবস্থিত, এটি পবিত্র ওম (ॐ) প্রতীকের আকারে রয়েছে।
এই মন্দিরের মধ্যে পঞ্চমুখী গণেশের মন্দির এবং অন্নপূর্ণার মন্দির রয়েছে।


উজ্জেন থেকে রওনা হয়ে প্রায় দেড়শ কিলোমিটার পথ একটানা প্রায় সাড়ে তিন ঘন্টা গাড়িতে বসে হালকা কুয়াশার আস্তরণ ভেদে সূর্য ওঠা প্রাক সকালের আলো-আঁধারির মধ্যে কিছুটা পথ ঘুমিয়ে কিছুটা পথ গান শুনে আর কিছুটা পথ রাস্তার দুপাশের মনোরম সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশ দেখতে দেখতে অবশেষে সকালবেলা পৌনে নটা নাগাদ আমরা ওমকারেশ্বরে পৌঁছে গিয়েছিলাম। যেহেতু আমরা সবাই ঠিক করেছিলাম আমরা সকলেই উপবাস করে বাবাকে দর্শন করব সেই মতো রাস্তায় কোথাও না দাঁড়িয়ে আমরা ওমকারেশ্বরে পৌঁছে ছিলাম। গাড়ি পার্কিংয়ে লাগিয়ে গাড়িতেই আমরা সবাই আমাদের নিজের নিজের জুতো খুলে রেখে খালি পায়ে মন্দিরের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম।

রাস্তার দুপাশে সারি সারি দোকান। ফুল মালা, মিষ্টি, জলখাবার, রেস্টুরেন্ট, হোটেল এবং সর্বোপরি অন্যান্য তীর্থস্থানে যেমনটা দেখা যায় তেমনি পুজোর জিনিসপত্র, প্রদীপ, ধূপদানি, বিভিন্ন ঠাকুরের মূর্তি, বাচ্চাদের খেলনা, জামা- কাপড়, সিঁদুর- আলতা, নানা রঙের ছোট বড় পুঁতির মালা, রুদ্রাক্ষের মালা ইত্যাদি সম্ভার নিয়ে সারি সারি দোকান এর মাঝ থেকে নর্মদা নদীর উপর তৈরি খুব সুন্দর একটি ঝুলন্ত ব্রিজ পার হয়ে আমরা ওমকারেশ্বর মন্দিরে পৌঁছেছিলাম।

ব্রিজের উপর থেকে দেখছিলাম কি সুন্দর সুন্দর রঙিন নৌকা ভেসে বেড়াচ্ছে নর্মদার স্বচ্ছ জলের উপর। নর্মদার জল এত স্বচ্ছ যে তলদেশের পাথর অবধি দেখা যাচ্ছিল। মন্দিরে পুজো দেওয়ার জন্য স্থানীয় একটি দোকান থেকে আমরা ফুল মিষ্টি কিনে দর্শনার্থীদের লাইনে দাঁড়িয়ে গেলাম। সেদিন মন্দিরে খুব ভিড় হয়েছিল, দীর্ঘ প্রায় পাঁচ ঘন্টা লাইনে দাঁড়ানোর পর আমরা ওমকারেশ্বর মহাদেব কে দর্শন করার সুযোগ পেলাম এবং বাবার অসীম কৃপায় খুব সুন্দর ভাবে আমাদের দর্শন হয়েছিল।

এরপর মন্দির থেকে বেরিয়ে পাশাপাশি আরো কয়েকটি মন্দির দর্শন করে স্থানীয় একটি রেস্টুরেন্টে আমরা লাঞ্চ সেরে আবার উজ্জেনের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। বলাই বাহুল্য এর ফাঁকে আমরা অজস্র ফটো তুলেছি। ফেরার পথে রাস্তায় দু'বার দাঁড়িয়ে একবার গাড়িতে পেট্রোল ভরা হয়েছিল এবং একবার আমরা সবাই চা কফি খেয়েছিলাম। এরপর রাত প্রায় দশটা নাগাদ একেবারে মাসিমনির বাড়িতে পৌঁছে আমরা সবাই রাতের ডিনার সেরে শুয়ে পড়েছিলাম। সারাদিনের পথশ্রমে ক্লান্ত দুচোখে ঘুম নামতে দেরি হয়নি।


পরের দিন ২৯ তারিখে আমার হায়দ্রাবাদের মাসীমণি আর মাসিমনির ছেলে রানা দাদা আমাদের সাথে এসে যোগ দিলো। এইবারে আমাদের দলটা আরো বড় আর ভারী হলো। সেই দিন সন্ধ্যেবেলায় আমরা গেলাম উজ্জেন হস্তশিল্প মেলায়।

পরের দিন ৩০ তারিখে আমরা মাসি মনির ছাদের উপরে ইট আর মাটি দিয়ে দিয়ে উনান বানিয়ে পার্ক থেকে ভেঙে আনা গাছের ডাল পালা আর কাঠের টুকরো জ্বালানি করে অনেক বড় কড়াইতে সবার জন্য মাংস রান্না করলো হায়দ্রাবাদের মাসিমনি। আর আমরা ভাইবোনেরা মিলে অনেক আলু বেগুন পুড়িয়ে মজা করে খেয়েছিলাম সেই আগুনে। সেদিন আমরা দারুন এক পিকনিক উপভোগ করেছিলাম, ধোঁয়া ধোঁয়া মাংসের কি অপূর্ব স্বাদ, আজও মুখে লেগে আছে।

৩১ তারিখ সারাটা দিন আমরা ভাইবোনেরা বাইরে পার্কে ক্রিকেট খেলে সাইকেলিং করে কাটালাম। তারপর সন্ধ্যেবেলা সবাই আমরা অন্তাক্ষরি খেলেছিলাম আর রানা দাদা আমাদের সবার জন্য হায়দ্রাবাদি চিকেন বিরিয়ানি পোলাও রায়তা আরো অনেক কিছু রান্না করেছিল। রানা দাদাকে হেল্প করেছিল রুপু দাদা আর দীপায়ন দাদা আমাদের সবার জন্য খুব সুন্দর মকটেল বানিয়েছিল। আমি আর ভাই অর্থাৎ আমার মাসিমনির ছেলে ডোডো আমরা দিপু দাদাকে সাহায্য করেছিলাম। সেই দিন রাত্তির বেলা বছরের শেষ ডিনারটা আমরা ভাই-বোনেরা মিলেই বানিয়েছিলাম। মা আর মাসিমনিদেরকে রান্নাঘর থেকে ছুটি দিয়ে আমরাই রান্না ঘরের দখল নিয়েছিলাম।

পরদিন অর্থাৎ পয়লা জানুয়ারি ২০২৪ খুব ভোর-ভোর ঘুম থেকে উঠে আমরা স্নান করে সবাই তৈরি হয়ে আমাদের জন্য আগে থেকে নির্ধারিত গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিলাম। মশাই আগে থেকেই সবার জন্য গাড়ি বুক করে রেখেছিল। যথাসময়ে গাড়ি এসে পৌঁছল মাসিমনির বাড়ির দরজায়। তারপর একে একে সবাই সেই গাড়িতে করেই আমরা একসাথে হৈ হৈ করতে করতে মহাকালেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ এবং পাশাপাশি উজ্জেনের আরও সবকিছু দেখার জন্য বেরিয়ে পড়লাম।

সেই দিন আমাদের মুখ্য উদ্দেশ্য মহাকালেশ্বর দর্শন করা হলেও আমরা কিন্তু দিনের একেবারে শেষ ভাগে মহাকালেশ্বর দর্শন করে ছিলাম এবং সেই সাথে বাড়তি পাওনা ছিল শিপ্রা আরতি দর্শন। কারণ সেই দিন বছরের প্রথম দিন আর মশাই জানতো যে প্রথম দিনে প্রচুর দর্শনার্থীর ভিড় হবে, এবং ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই আমাদের সময় নষ্ট হবে। তাই সময় নষ্ট না করে মশাইয়ের পরামর্শে আমরা আগে উজ্জেনের অন্যান্য জায়গা দর্শন করার পর সবশেষে ধীরে সুস্থে খুব সুন্দর করে দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের অন্যতম মহাকালেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ দর্শন করেছিলাম।

ধর্মপ্রাণ পর্যটকদের কাছে উজ্জয়িনী ভ্রমণের মুখ্য কারণ হল - মহাকালেশ্বর দর্শন । স্বয়ম্ভূ এই শিবলিঙ্গটি ১২টি জোতির্লিঙ্গ এর অন্যতম । শিবের মূর্তিটি দক্ষিণমুখী হওয়ায় হিন্দুদের কাছে এটি একটি পবিত্র স্থান। এই মন্দিরের বিখ্যাত ভস্ম আরতি দর্শনের জন্য দূর-দূরান্ত থেকে বহু পর্যটকের সমাগম হয় । এই মন্দির নির্মাণের ক্ষেত্রে মারাঠা, ভূমিজা, চালুক্য সংস্কৃতির মিশ্র ধারণা লক্ষ করা যায় ।

রাম ঘাট এবং উজ্জয়িনী শহরের সঙ্গে মিশে রয়েছে সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় পরম্পরা।
উজ্জয়িনীতে প্রতি ১২ বছর অন্তর কুম্ভমেলার আয়োজন করা হয় । হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী কুম্ভমেলার পবিত্র তিথিতে স্থান করে পুন্য অর্জন করা যায় । তাই সেই রীতি মেনেই হিন্দুরা উজ্জয়িনী ভ্রমণে এসে এই রাম ঘাটে স্নান করেন পুন্য অর্জনের কামনায় ।


কাল ভৈরব মন্দির
উজ্জয়িনী যে শহরের সঙ্গে মিশে রয়েছে সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় পরম্পরা
ভগবান শিবই কাল ভৈরব নামে পরিচিত । এই কালভৈরব হলেন তন্ত্র সাধনার প্রধান দেবতা। ৮ ভৈরবের মধ্যে অন্যতম হলেন কাল ভৈরব ।

হরসিদ্ধি মন্দির
হরসিদ্ধি মন্দিরে স্থাপিত আছেন দেবী অন্নপূর্ণা । যিনি মহাসরস্বতী এবং মহালক্ষ্মীর মিলিত রূপের অধিকারী । একটা সময় পর্যন্ত এই মন্দিরটি ভগ্নপ্রায় ছিল। পরে মারাঠাদের তত্ত্বাবধানে মন্দিরটি পুনঃগৌরব ফিরে পায়।

কালিয়াদেয় প্যালেস (K.D. Palace)
১৪৫৮ সালে নির্মিত এই প্যালেসটি শিপ্রা নদীর তীরে অবস্থিত । বর্তমানে ভগ্নপ্রায় এই প্যালেসটিতে একসময় আকবর, জাহাঙ্গীরের মতো সম্রাটরা এখানে এসেছিলেন । পারস্য স্থাপত্য এর অসাধারণ নিদর্শনের সাক্ষী এই প্যালেস। এই প্যালেসে একটি সূর্য মন্দির আছে এবং প্যারিসটিস সামনে একটি গভীর এবং বিশালাকায় কুন্ডু আছে।

ঈশ্বরের অসীম করুণায় বছরের প্রথম দিনই উজ্জ্বেন গোশালা মঙ্গল নাথ মন্দিরে আমাদের বাবা মহাদেবের অন্ন ভোগ প্রসাদ প্রাপ্তি ঘটেছিল।

১লা তারিখে আমাদের সবকিছু দর্শন করা সম্ভব পর হয়ে উঠলো না তাই পরের দিন রেস্ট নিয়ে আবারও আমরা ৩রা জানুয়ারি দর্শন করার জন্য বেরিয়ে পড়লাম। আমাদের এই দিনের জার্নী শুরু হয়েছিল সন্দীপনী আশ্রম থেকে।

মহর্ষি সন্দীপনি আশ্রমের একটি অসাধারণ গল্প রয়েছে এবং এটি মহান ইতিহাসে পরিপূর্ণ। বিশ্বাস করা হয় যে এই আশ্রমে ঋষি সন্দীপনীর কাছ থেকে ভগবান কৃষ্ণ তাঁর শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। আশ্রমটি প্রশান্তি প্রকাশ করে, যা দর্শক এবং পরিবেশের মধ্যে একটি গভীর সংযোগ তৈরি করে। সন্দীপনি আশ্রম থেকে মাত্র 500 মিটার দূরে রয়েছে গোমতী কুন্ড, যা ভগবান কৃষ্ণের সাথেও জড়িত। গোমতী কুন্ডের পবিত্র জল প্রাচীন ঋষিরা পবিত্র আচার-অনুষ্ঠানের জন্য ব্যবহার করতেন বলে জানা যায়। আপনি কুণ্ডে ডুব দিতে না পারলেও, জল স্পর্শ করতে বা নিজের জন্য জল সংগ্রহ করার অনুমতি দেওয়া হয়।

যন্তর মন্তর, যা ভেধ শালা নামেও পরিচিত। এটি একটি মানমন্দির যা জ্যোতির্বিজ্ঞানের ঘটনা এবং স্বর্গীয় বস্তুর ভূ-অবস্থান অধ্যয়নের জন্য নির্মিত। ভারতে সময়ের পার্থক্য পরিমাপের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে, সময় অধ্যয়নের ক্ষেত্রে উজ্জয়িনীর উল্লেখযোগ্য গুরুত্ব ছিল। ভেধ শালা মানমন্দিরটি 1725 সালে নির্মিত হয়েছিল এবং এতে বেশ কয়েকটি কাঠামোগত যন্ত্র রয়েছে যা এখনও তাদের অভিপ্রেত উদ্দেশ্যগুলি গণনা করতে ব্যবহার করা যেতে পারে।


ভর্ত্রীহরি গুহা আরেকটি রহস্যময় স্থান যা আপনাকে প্রাচীন ভারতের ঐতিহাসিক অস্তিত্বের বিস্ময়ে ছেড়ে দেবে। উজ্জয়িনী একটি সমৃদ্ধ ইতিহাস নিয়ে গর্ব করে এবং অনেক উল্লেখযোগ্য ব্যক্তির আবাসস্থল ছিল। যাদের মধ্যে একজন হলেন রাজা বিক্রমাদিত্যের সৎ ভাই ঋষি ভাত্রিহরি। যিনি তার জীবদ্দশার বেশিরভাগ সময় ওই গুহার মধ্যে অতিবাহিত করেছিলেন এবং ভ্যান জপের মধ্যে নিজেকে নিমজ্জিত করে অশান্ত জীবনে শান্তি খুঁজে পেয়েছিলেন এবং সাথে সাথে তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ও তিনি রচনা করেছিলেন ঐ গুহার ভেতরে বসে।
গুহার গভীরে প্রবেশ করার পরে আপনি নিজেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশে নিমজ্জিত দেখতে পাবেন। এটা সত্যিই অবিশ্বাস্য যে কিভাবে এই গুহাগুলি প্রাচীন কালে আধুনিক যন্ত্রপাতির সাহায্য ছাড়াই নির্মিত হয়েছিল এবং হাজার হাজার বছর ধরে সময়ের পরীক্ষা সহ্য করে চলেছে।

বড়ে গণেশজি কা মন্দির বা চিন্তা মন গনেশ মন্দির
হল উজ্জয়নের আরেকটি বিখ্যাত স্থান, যা উজ্জয়িনী জংশন থেকে বেশ কিছুটা দূরে অবস্থিত। মন্দিরটি প্রায় 20 ফুট উঁচুতে শুয়ে থাকা ভগবান গণেশের বিশাল মূর্তির জন্য বিখ্যাত। মন্দির চত্বরের মধ্যে, কর্তৃপক্ষ সংস্কৃত এবং জ্যোতিষশাস্ত্রের পাঠও দেয়। উপরন্তু, মন্দিরে পাঁচটি মুখ বিশিষ্ট ভগবান হনুমানের একটি বিশাল মূর্তি রয়েছে, যা ভগবান গণেশের মূর্তির আগেই স্থাপন করা হয়েছিল বলে বিশ্বাস করা হয়।

এছাড়াও গড়কালিকা মন্দির, মঙ্গলনাথ মন্দির, ইসকন মন্দির এবং আরও অনান্য অনেক জায়গা দর্শন করি আমরা।

সারাদিন বিস্তর ঘোরাঘুরি করে রাত্রিবেলা বাইরে থেকে ডিনার সেরে আমরা একেবারে বাড়ি ফিরেছিলাম।

পরের দিন অর্থাৎ চার তারিখ দুপুরের খাওয়া দাওয়ার পরে মায়েরা গেল শপিং করতে আর আমরা ভাই বোনেরা সবাই মিলে আবারো হইহুল্লোড় হইচই কোলাহলে আনন্দপূর্ণ দিন অতিবাহিত করে ৫ তারিখে বিষন্ন হৃদয়ে আমরা সবাই একে অপরের থেকে বিদায় গ্রহণ করে যে যার বাড়ির রাস্তা ধরলাম। সঙ্গে করে নিয়ে এলাম উজ্জয়িনীর কয়েকটা দিনের মধুর স্মৃতি আর অসংখ্য ছবি, যা বারে বারে মনে করিয়ে দেবে সবাই মিলে একসাথে মেজ মাসি মনির বাড়িতে কাটানোর সুন্দর মুহূর্ত গুলো।

🙏জয় শ্রী মহাকাল ।। হর হর মহাদেব🙏